গল্প লিখছিলাম তখন

গল্প লিখছিলাম তখন

একি! কে বাসন মাজছে ওই পুকুরের সামনে, সুজয় চিৎকার করে উঠল…

ওর চিৎকার শুনে ওর বাবা মা ছাদের উপর থেকে ওই পুকুরের দিকে তাকিয়ে দেখল পুকুরে কেউ নেই। ওনারা সুজয়কে এরপর ঘরে নিয়ে যায়। এই পুকুরটার একটা কোটা আছে প্রত্যেক বছর একটা করে প্রাণীকে নিজের কাছে টানবেই সে – সে মানুষ হোক, কিংবা পশু; লোকমুখে প্রচলিত আছে, ওই পুকুরটা যেদিন কাটা হয়েছিল তখন ১৯৯০ সাল, চারিদিক জঙ্গল আর জঙ্গল, খুন খারাপি লেগেই থাকত। এই পুকুরের নীচে এক পাগলী বুড়িকে খুন করে পুঁতে রাখা হয়েছিল। শুধু পাগলী বুড়িই নয়, আরও অনেক লোকের দেহ পুঁতে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ওই পাগলী বুড়ি কারুর ক্ষতি করতনা। সেই পাগলী বুড়িকে অনেকেই দেখেছে; তবে ওই পাগলী বুড়ি যাকে তাকে দেখা দেয়না। যখন কারুর খারাপ সময় থাকে, কিংবা যখন কারুর ভালো সময় আসে তখনি দেখা পাওয়া যায় ওই বুড়ির।

‘না জানি আমার ছেলে কেন দেখতে পেল ওই বুড়ি-কে’, সুজয়ের বাবা ফিসফিস করে সুজয়ের মা কে বলল।

‘কি জানি বাবা! আজকাল গভীর রাতে কুকুর গুলো ডাকতে থাকে প্রচণ্ড এই পুকুরের সামনে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বলল সুজয়ের মা।

‘রাত অনেক হল শুয়ে পড়ো।‘

‘হুম..তুমি যাও, আমি আসছি,’ ফিসফিসিয়ে উত্তর দিলো সুজয়ের মা।

পুকুরটা একেবারে শান্ত। এই পুকুরের কাছে অনেকেই অনেক কিছু দেখেছে, কিন্তু সেইসব অলৌকিক জিনিস কারুর কোনো ক্ষতি করেনি। হঠাৎ এই শান্ত পুকুরটা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল – এক মাসের ভিতর; কিভাবে ক্ষিপ্ত হল পুকুরটা সেই কারণ অজানা সকলের।

তবে আজকাল ওই পুকুর-টার আশেপাশে কারুর বাড়িতে সদ্যজাত পুত্র সন্তান জন্ম নিলে সেই সন্তান যে কিভাবে নিখোঁজ হয়ে যায় তা বোঝা বড় দায়। শুধু কি তাই! আশেপাশে যত বাড়িঘর ছিল সেই বাড়িঘর গুলো থেকে মুরগি,ছাগল অদ্ভুত ভাবে নিখোঁজ হতে শুরু করল। কিন্তু কোথায় যে যায় তা ক্রমশঃ রহস্য হতে থাকলো। এর পিছনে যে অলৌকিক ঘটনা জড়িয়ে আছে সেটা কেউ বিশ্বাস না করে, এটাকে চোরের কারসাজি বলে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিল সকলে। কিন্তু শেষে যখন চুরির পরিমাণ বেড়েই চলল, তখন শেষমেষ গ্রামবাসীরা মিলে ঠিক করল তারা পাহারা বসাবে। কথামতো দুইজন পাহারাদার নিযুক্ত করা হল; তাদের কে গ্রামবাসীরা চাঁদা বাবদ প্রত্যেক মাসের শেষে কিছু নগদ অর্থ দেবে এবং বিনিময়ে তারা পাহারা দেবে।

বেশ ভালো….

এই পাহারা দার নিযুক্ত করার পর, গ্রামে ছাগল,মুরগি দুইদিন মতন চুরি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে আবার ও চুরির পরিমাণ বেড়ে যায়। এবার শুধু চুরিই না, সাথে প্রত্যকটা বাড়িতে ইঁট,পাথরের টুকরো পরা আরম্ভ হল। আর যে পাথর গুলো পড়ত, সেগুলো কিন্তু সকাল বেলা গেলে খুঁজে পাওয়া যেতনা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এটাই যে, যেদিন থেকে পাথরের উপদ্রব শুরু হয়েছিল তার পরের দিন থেকেই ওই পুকুর পারের আশেপাশে অনেক বড়ো বড়ো পাথরের খোঁয়া পড়ে থাকতে দেখা যেত। এইরকম একটা ঘটনা দেখে তারা সকলেই অবাক। তাদের মনে এই ধারণা তৈরি হল যে, ওই পুকুরের কাছে কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। গ্রামবাসীদের অনুরোধে ওই পাহারাদার গুলো ওই পুকুরটার আশেপাশে ভালোভাবে পাহারা দিতে থাকল।

সামনে সুজয় দের বাড়ি থেকে রাতের খাবারও দিয়ে যায় ওই পাহারাদার দের। গরম কালের রাত। লোকজন প্রায় চেতনই থাকে আবার তারমধ্যে যাদের বাড়িতে খামার রয়েছে তাদের তো দুশ্চিন্তাতে ঘুমই হয়না ঠিকঠাক।

দিনটা ছিল বুধবার। দুটো থালায় ভাত,ডাল,ইঁচড়ের তরকারি, আর বকফুলের বড়া – পেটপুড়ে খেলো ওই পাহারাদার গুলো। ওই পুকুরের সামনে একটা মাঠ আছে সেইখানেই তাদের নৈশভোজ সারল। তারপর…

অমিত বলে উঠল, ‘যা, রতন, থালা দুটো দিয়ে আয় সুজয়ের বাড়িতে। আমি ততক্ষণে হাত-পা ধুঁয়ে নিই।’

রতন থালা দুটো দিয়ে এসে ওই পুকুরপাড়ের কাছে গিয়ে যা দেখল, তাতে রতনের পিলে চমকে গেল। রতন দেখল অমিতকে চার থেকে পাঁচজন মোটা কালো কুৎসিত বেঁটে মানুষ জাপটে ধরে জলের মাঝখানের দিকে নিয়ে গেছে; চাঁদের আলোয় তাদের মুখের গঠন না দেখা গেলেও, ওরা চার-পাঁচ জন ছিল তা রতন বুঝতে পারল। রতন একটা চিৎকার দিয়ে উঠে; ওর চিৎকার শুনে আশেপাশের বাড়ির লোকেরা দৌঁড়ে আসে। তারাও দেখল এই দৃশ্য।

পরেরদিন সকালে অমিতের লাশ ভেসে উঠে। গ্রামবাসীরা তো জলে নামতে পর্যন্ত ভয় পাচ্ছিল; কয়েকজন সাহস করে জলে নেমে সেই লাশ নিয়ে আসে।

এই খবরটা ধীরেধীরে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল; আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজনেরা এসে ওই পুকুরটাকে দেখতে লাগল। কয়েকজন এই বাকি ঘটনাগুলোর জন্য পুকুরটাকে দায়ী করলো; তাদের মতে এই পুরো ঘটনার পেছনে পুকুরটার কিছু যোগসুত্র আছে।

কিন্তু এটা তো অলৌকিক কাজ, যার অলৌকিক ক্ষমতা আছে সেই পারবে সমাধান করতে। অনেক তান্ত্রিক,ওঝা, সন্ন্যাসীদেরকে বলা হল এর সমাধানের জন্য; কিন্তু তারা কেউ রাজী হলেন না।

শেষমেষ এক তান্ত্রিক রাজী হলেন। তিনি বললেন তাকে যদি মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয় তবে সে কাজটা করে দেবে। ইতিমধ্যে খবর এলো রতন নাকি মারা গেছে। কয়েকদিন জ্বরে ভুগছিল, জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকছিল, তারপর একসময় সে মারা যায়।

এই ব্যাপারটায় গ্রামবাসীরা মর্মাহত হয়, তাই ওই তান্ত্রিককে অনুরোধ করে দ্রুত এই পুকুর থেকে অলৌকিক শক্তি তাড়ানোর কাজ শুরু করতে।

তান্ত্রিক দিনক্ষণ ঠিক করে মঙ্গলবার রাতটাকে বেছে নেয়। ভর অমাবস্যা ছিল সেদিন। রাত ১১.০০ টা থেকে শুরু হয় যজ্ঞ। তান্ত্রিক একটা গণ্ডি কেটে দেয় তার পাশে; ওই গণ্ডি দেখিয়ে বলে এর ভেতরে কেউ যেন না আসে।

এরপর তান্ত্রিক তার কাজকর্ম শুরু করে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্র পাঠ করে তান্ত্রিক; মন্ত্রপূত ছাই ওই পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে। গ্রামবাসীদের মনে তখন প্রবল উদ্বেগ। কারণ ওই পুকুরের জল অনবরত নড়ছিল, পুকুরের আশেপাশে যত গাছ আছে সেগুলো দুলছিল হাওয়ায়।

কিছুক্ষণ পর এক অদ্ভুত জিনিস দেখা যায়, যা দেখে হকচকিয়ে যায় তান্ত্রিক ও। ওই দুরের শাল গাছটা থেকে একজন উড়ে এসে তান্ত্রিকের থেকে দুই হাত দূরে এসে দাঁড়ায়। সে ছেলে কিনা মেয়ে বোঝা যাচ্ছিলনা। একেবারে কালো অন্ধকারের থেকেও কুঁচকুঁচে কালো।

তান্ত্রিক নিজের হাতে একটু জল ও ঘি নিয়ে, ওই আগুনের উপরে বেশ কিছুক্ষণ ঘুড়িয়ে ওই কালো অবয়বটার উপর ছুঁড়ে মারে। তারপর…

তান্ত্রিক গমগম করা গলায় বলে ওঠে, ‘কে তুই? এখানে কি করছিস?’

ওই অবয়বটা কিরকম অদ্ভুত সুরে বলে উঠল, ‘আমি বদলা চাই।’

তান্ত্রিক প্রশ্ন করে, ‘বদলা? কিসের বদলা?’

অবয়বটা বলে ওঠে, ‘আমি বিদ্যুৎ এর বউ সুপ্রিয়া-কে শেষ করে দিতে চাই।’

‘কে তুই? কেন মারতে চাস ওকে?’

অবয়বটি বলে, ‘আমি এতকাল ধরে পুকুরে পড়ে আছি কারুর কোনো ক্ষতি করিনি, কিন্তু এই সুপ্রিয়া…ছিঃ, কি নীচ মানসিকতা এর একে হয় তোরা শাস্তি দে, নাহলে ওকে আমার কাছে দিয়ে দে।

‘কেন কি করেছে সুপ্রিয়া তোকে?’ তান্ত্রিক উঁচু গলায় শুধায়।

‘ও ভরদুপুর বেলায় কয়েকদিন আগে সৈকত দের বাড়িতে যায়। সৈকত এর মা,বাবা,সৈকত কেউই ঘরে ছিলনা। সৈকত স্কুলে গিয়েছিল, সৈকতের মা গিয়েছিল জল আনতে, আর সৈকতের বাবা কাজে। সৈকতের মায়ের সাথে একটু ভাব ছিল সুপ্রিয়ার। আর সৈকতের সদ্য একটা বোন হয়েছে। সৈকতের বাড়িতে গিয়ে কাউকে না দেখে সুপ্রিয়া সৈকতের বোনের সাথে খেলতে থাকে। কোলে নিয়ে ওইটুকু ছোটো মেয়েটাকে নিয়ে কি নাচনকোঁদন। কিন্তু হঠাৎ হাত ফসকে মাটিতে পড়ে যায় সৈকতের বোন। এদিকে সৈকতের মাও ঘরের দিকে আসতে থাকে। ওই বাচ্ছা মেয়েটার মধ্যে কোনো হেলদোল না দেখে অপরাধের ভয়ে ওই ছোটো মেয়েটাকে ভর দুপুরে নিয়ে আসে পুকুরপাড়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে পুকুরের শেষ প্রান্তে গিয়ে ভাসিয়ে দেয় একটা ড্রামের মধ্যে করে। আর ড্রামটার সাথে ইঁট বোঝাই করা কয়েকটা বস্তা বেঁধে দেয়। ছিঃ বিবেকে বাঁধেনি ওই সুপ্রিয়ার!’

‘ও দাদা….দাদা….’

‘কি হল….ও দাদা….সরবৎ নেবেন নাকি?’

একেবারে ধড়মড় করে উঠলাম। আসলে কানে হেডফোন দিয়ে, মোবাইলে গল্প টাইপ করে লিখছিলাম। মামাবাড়ি যাচ্ছিলাম ট্রেনে করে।

তো কে ডাকছিলো আমাকে? আমি জানলার বাইরে তাকালাম। দেখি এক আম পোড়া সরবৎ বিক্রেতা। আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমার সরবৎ লাগবেনা বলে আমি ট্রেনের জানলাটা বন্ধ করে আবার ও কানে হেডফোন দিয়ে গল্প লেখায় মন দিলাম। তারপরই আমার পিলে চমকে গেল। এটা কিভাবে সম্ভব? ট্রেনতো দুরন্ত গতিতে ছুটছে, তাহলে আমি কিছুক্ষণ আগে ট্রেনের জানলার বাইরে যে লোকটার সাথে কথা বললাম সে কে ছিল….

সেদিন আমার আর গল্পটা লেখা হয়ে উঠলো না।

******************************************(সমাপ্ত)****************************************

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত