অশুভ রাস্তা

অশুভ রাস্তা

২৮ বছর বয়স্কা ফ্লোরেন্স ওয়ারওইক রাস্তার পাশে গাড়িটা দাঁড় করালেন। মনোযোগ দিয়ে এলাকার মানচিত্রটা দেখতে লাগলেন। আঁধার নেমে এসেছে। গাড়ির ভিতরের আলোতে একাগ্রচিত্তে মানচিত্রটার দিকে তাকিয়ে আছেন ভদ্রমহিলা। পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর হেডলাইট মাঝেমাঝে উজ্জ্বল আলো উপহার দিচ্ছে। হঠাৎই আবিষ্কার করলেন গাড়ির ভিতরটা ঠাণ্ডা বাতাসে ভরে গেছে। সময়টা মে,১৯৭৬। বছরের এ সময় আবহাওয়া হঠাৎ এমন শীতল হয়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে পেলেন না ফ্লোরেন্স। এসময়ই মনে হলো কে যেন একদৃষ্টিতে তাকে দেখছে। গাড়ির সামনের কাচ ভেদ করে বাইরে তাকালেন। বিশাল আকারের দুটো হাত চোখে পড়ল তার। মনে হলো উইণ্ডস্ক্রীনে চাপ দিচ্ছে। হাতের আঙুলগুলো কাঁচের ওপর যেন তবলা বাজাচ্ছে। তিনি ওগুলোকে দেখতেই আঙুলগুলোকে ব্যবহার করে হাতগুলো চলাফেরা করতে লাগল কাঁচের ওপর।

ফ্লোরেন্সের শরীর বেয়ে শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল। আতংকে চোখ বড় বড় করে হাত-দুটোর ভীতিকর কাজ-করবার দেখছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল হাত জোড়া।

তবে এই রাস্তায় এমন ঘটনাকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না। ফ্লোরেন্সেরই প্রথম এই অভিজ্ঞতা হয়নি। পোস্টব্রিজ থেকে ডর্টমুরের দিকে চলে যাওয়া রাস্তার এই জায়গাটিতে যে-ই গাড়ি দাঁড় করিয়েছেন তাকেই পৈশাচিক এই হাত জোড়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ লোজনকে সতর্ক করে জায়গায় জায়গায় বোর্ড টাঙিয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে কারো যদি পেট্রোলে টান পড়ে বা গাড়ি মেরামতির প্রয়োজন হয় তবে রাস্তার আরেকটু সামনে এগুলেই তা মিলবে। চালকদের পরামর্শ দেওয়া হয় এই এলাকায় গাড়ি দাঁড় না করানোর আর এদিকটা অতিক্রমের সময়ই প্রয়োজনীয় সব কিছু পর্যাপ্ত পরিমাণে সঙ্গে রাখার জন্য। তারপরও অনেক আগন্তুক আগে থেকে বিষয়টি সম্পর্কে জানা না থাকায় মুখোমুখি হয়ে যান ভীতিকর দুই হাতের। এ ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা চলে আসছে আশি বছর হলো, যখন থেকে ভৌতিক সব ঘটনার শুরু তখন থেকে। যত বিপদই হোক গাড়ি চালকরা চান এই এলাকা দ্রুত অতিক্রম করে যেতে।

টরবেতে ফিরে এলেন ফ্লোরেন্স। কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে এখানে থাকেন তিনি। ত্রিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসলেও কীভাবে আবার গাড়িটা চালানো শুরু করেছেন আর কীভাবেই বা, ফিরে এসেছেন নিজেও জানেন না। টরবেতে পরিচিত জনদের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বললেন। মনে মনে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন, বন্ধুরা নিশ্চয়ই এটা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করবে। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে তারা জানাল রাস্তায় মাঝে মাঝেই এমনটা ঘটে। এটাও বলল রাস্তার এই অংশটাতে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেকেরই। আর অপ্রত্যাশিতভাবে দুই হাতের উপস্থিতিতে আতংকিত হয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছেন অনেক গাড়ি চালকই।

যতদূর জানা যায় ১৯২০ সাল কিংবা তার আশপাশের সময় থেকে এ ধরনের অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড-কারখানা শুরু হয় এই রাস্তায়। তখন তো এই রাস্তায় বেশি দেখা যেত ঘোড়া। প্রায়ই আতংকিত হয়ে সাওয়ারিদের ছুঁড়ে ফেলে দিত ঘোড়ারা। পোষা গবাদিপশু এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ভয় পেয়ে জোরে দৌড়তে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ত। সাইকেল চালকরা অস্বাভাবিক কিছু দেখে আতংকিত হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ের খাদে পড়ত। একবার এক চিকিৎসক তাঁর মটর সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পাশেই সাইড কারে তার বাচ্চা দুটো। হঠাৎ মটর সাইকেলটা উল্টে পড়ল। তবে সৌভাগ্যই বলতে হবে চিকিৎসক আর তার দুই বাচ্চা সে অর্থে কোনো আঘাত পাননি।

১৯৪৫ সালের পর থেকে এই রাস্তায় অনেক চালকই গাড়ি দুর্ঘটনার জন্য হাত দুটোকে দায়ী করেছেন। হাত দুটো কখনো কখনো, গাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। এসময় গুডলোকে দেখে মনে হতে পারে কোনো আনাড়ী গাড়ি চালানো শেখার চেষ্টা করছে। আর গাড়ির ভিতরে ভুতুড়ে হাত দেখে কোন চালকেরই বা মাথা ঠিক থাকে! বেশিরভাগ সময়ই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারান তাঁরা। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জেকব পিটার এক সাংবাদিককে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মসৃণভাবে আমার গাড়িটা চলছিল। পোস্টব্রিজের কাছে দুটি ছোট সেতু পেরোনোর পর আশ্চর্য একটা অনুভূতি হয় আমার। তারপরই দেখলাম দুটো হাত আমার হাতের ওপর চেপে বসেছে। ভয় পেয়ে গেলাম। এগুলো কার হাত কিছুই বুঝতে পারলাম না, কারণ হাত ছাড়া শরীরের আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। উল্টো দিক থেকে আসা একটা গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে এক পাশে নিয়ে গেলাম গাড়িটা। হাতদুটো তখন আরো দ্রুত উল্টো দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করল ওটাকে। বড় কোনো দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও জোরে রাস্তার ওপর লাফিয়ে পড়ল গাড়িটা।

একের পর এক দুর্ঘটনায় বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ বিকল্প রাস্তা তৈরি করল। কিন্তু মনে হয় গোটা এলাকাটাই শাসন করছে অশুভ হাত জোড়া। কারণ নতুন বিকল্প রাস্তাতেও সে ভড়কে দিতে লাগল চালকদের।

১৯৫৫ সালের ঘটনা। নব বিবাহিত এক দম্পতি গাড়ি নিয়ে এই রাস্তায় যাচ্ছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড কুয়াশায় ঢেকে গেল চারপাশ। কুয়াশার কারণে একটু দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না, তারপর আবার সময়টা শীতকাল। রাস্তার পাশেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা। সঙ্গে আনা খাবার খেয়ে গাড়ির পিছনের অংশে শুয়ে পড়লেন দুজনে। রাতে মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেল। তার মনে হলো কেউ একজন গাড়ির দরজার কাঁচে টোকা দিচ্ছে। প্রথমে ভাবলেন এটা নিশ্চয়ই পাড়া বেড়ানো কুকুরের কাজ। শীতের থেকে বাঁচার জন্য ভিতরে আশ্রয় পাবার আশায় নখ দিয়ে দরজা আঁচড়াচ্ছে। স্বামীর দিকের দরজার কাচে চোখ পড়তেই পাথর হয়ে গেলেন। দুটো ভয়ঙ্কর হাত চলাফেরা করছে কাচের ওপর। চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করতে শুরু করলেন। তারপরই অদৃশ্য হয়ে গেল হাত জোড়া।

এই অশুভ হাত জোড়া নিয়ে প্রচুর গল্প ছড়িয়ে আছে। এর কোনোটা সত্যি, কোনোটা আবার লোকের বানানো। তবে ১৯৬০ সালের একটা ঘটনা ভয়াল হাত দুটোর ব্যাপারে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে ঘোরতর অবিশ্বাসীকেও বাধ্য করল।

রাস্তার অভিশপ্ত অংশটাতে নিজের গাড়ির ধবংস্তুপের নীচে পাওয়া গেল এক চালকের মৃতদেহ। গাড়িটা উল্টে গেছে। কিন্তু রাস্তায় অন্য কোনো গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের চিহ্ন নেই। গাড়ির এঞ্জিনও চমৎকার অবস্থায় ছিল। এমনকী অন্য কোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটিরও আভাস মিলল না। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিশ্চিত করছে ভদ্রলোক পাকা চালক। কারণ বারো বছর ধরে তিনি গাড়ি চালাচ্ছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মাতাল ছিলেন এমন কোনো তথ্যও পাওয়া গেল না।

পুলিশ আবিষ্কার করে মৃত ব্যক্তির হাত জোরে স্টিয়ারিংয়ের ওপর চেপে বসে আছে। আঙুল ভেঙে গেলেও স্টিয়ারিং থেকে হাত শিথিল করেননি ভদ্রলোক। ডিক কেলি নামের এই ভদ্রলোকের হাতে বল প্রয়োগের চিহ্নও মিলল। আতংকে বড় বড় হয়ে আছে তার চোখ। গলা নীচের দিকে বেঁকে আছে- যতদূর বোঝা যাচ্ছে ভীতিকর কোনো কিছুর দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল তাঁর সমস্ত মনোযোগ।

তাহিরা-রহস্য

আবদুর রউফ গাড়ির একটা গ্যারেজের মেকানিক। কাজ শেষ করে সেদিন যখন বাড়ি ফিরছেন বেশ রাত হয়ে গেছে। এসময়ই দেখলেন এক তরুণী রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে খুব বিপদে পড়েছে। রউফ ভাবলেন এত রাতে বাড়ি ফেরার মত কিছু না পেয়ে আতংকিত হয়ে পড়েছে মেয়েটা।

স্কুটারের পিছনে মেয়েটাকে নিয়ে নিলেন। একট রাস্তার সামনে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল মেয়েটি। তারপরই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটল। কয়েক কদম এগিয়েই ভোজবাজির মত তার চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। পরদিন সকালে বন্ধুবান্ধব আর তাঁর সহকর্মীদের ঘটনাটি খুলে বললেন রউফ। তবে কেউ এটাতে কান দিল না। ঠিক চারদিন পর, ১৯৭৯ সালের ২২ জুলাই প্রচণ্ড জ্বরে মারা গেলেন আবদুর রউফ।

ঘটনার উৎস খুঁজতে দু-বছর পিছনে যেতে হবে আমাদের। বন্ধুর বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরছিল তাহিরা নামের একটি মেয়ে। গাড়ির চালকের আসনে ছিল তার ভাই। হঠাৎ গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারাল। তারপর গিয়ে ধাক্কা খেল একটা বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে। এতে উল্টে পড়ল গাড়িটা। ঘটনাস্থলেই মারা গেল তাহিরা।

যতদূর জানা যায় দুশ্চরিত্র এক শিল্পপতি ছিলেন ঘটনার পিছনে। এক মেকানিক আর পুলিশ কর্মকর্তার সাহায্যে দুর্ঘটনার নাটকটি সাজান তিনি। তবে পরিকল্পনা ছিল দুর্ঘটনাটায় চালকের, আসনে বসা ভাইটি মারাত্মক আহত হবে। তখন তাহিরাকে অপহরণ করা সহজ হবে। কিন্তু মারা গল উল্টো তাহিরাই।

এর ঠিক এক বছর পর ওই শিল্পপতিও মারা গেলেন দুর্ঘটনায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন নীল রঙের শাড়ি পরা এক নারীকে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে তারা গাড়িটা যখন বৈদ্যুতিক খুঁটিতে আঘাত হানে তখন। অপর দিকে পুলিশের একটা টহল দল দাবি করেছে গাড়ির ভিতরে নীল শাড়ি পরা একজন নারীকে দেখেছেন তাঁরা।

কিন্তু একটা মেয়ে একই সঙ্গে গাড়ির ভিতরে আর বাইরে থাকে কীভাবে? সম্ভবত এই একই জিনিস শিল্পপতিকে আতংকিত করে তুলেছিল। হয়তো পাশের সিটে আর গাড়ির বাইরে একই নারীকে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেননি ভদ্রলোক। আর তাই ব্রেকের বদলে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন। যতদূর জানা যায় রাতের একটা পার্টি শেষে বাড়ি ফিরছিলেন শিল্পপতি।

আগের বছর যে সময় তাহিরা মারা যায় ওই একই সময় মৃত্যু হয় শিল্পপতির। শুধু তাই না দুর্ঘটনার জায়গাও ছিল একই।

পরের বছর একই দিন মারা যান আবদুর রউফ। অবশ্য কোনো কোনো সূত্র দাবী করে জ্বরে নয়, সাগরে ডুবে মরেছেন আবদুর রউফ। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি কখনোই।

এর ঠিক এক বছর পরের ঘটনা। জুলাইয়ের ১৭ কি ১৮ তারিখ। শুল্ক বিভাগের সঙ্গে জড়িত এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা শিকারে পরিণত হলেন তাহিরার। বাড়ি ফেরার পথে মেয়েটির সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। গাড়ি থামাবার ইশারা করে মেয়েটা। তারপর পুলিশ কর্মকর্তাকে বলে একটা দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে সে। তাকে যেন তিনি দয়া করে বাড়ি পৌঁছে দেন।

মেয়েটার গলায় তাজা ক্ষতচিহ্ন দেখে আর্দ্র হয়ে ওঠে ওই কর্মকর্তার মন। তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে চান। কিন্তু মেয়েটি বলে বাড়িতেই যাবে সে। কি আর করা তাকে তার বাংলোর সামনে নামিয়ে দেন। কিন্তু তার চোখের সামনে বাড়িতে ঢোকার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায় মেয়েটি। এর মাত্র দু-দিন বাদে আফিম কারবারীদের একটা দলের গোপন আস্তানায় হামলা চালানোর সময় গুলিতে মারা পড়েন পুলিশ কর্মকর্তা।

তারপর থেকে অনেকগুলো বছর রাস্তার ধারে নীল শাড়ি পরা, কোনো মেয়েকে দেখলে আর গাড়ি দাঁড় করাতেন না চালকেরা। বিশেষ ক্লরে জুলাই মাসের ১৭ কিংবা ১৮ তারিখ আরো বেশি সতর্ক থাকতেন চালকেরা। তবে তাহিরার এই কাহিনি ছড়িয়ে আছে পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায়। শহর ভেদে এর মধ্যে কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। তবে পুরো সত্যি জানা যায়নি কখনোই। তাই তাহিরা রয়ে গেছে এক রহস্যই।

জিপানি ভ্রমণ

এই অভিজ্ঞতাটি বর্ণনা করেছেন ফিলিপাইনের ম্যাথু। চলুন তাঁর মুখ থেকেই শুনি।

এটি আমার এক বান্ধবী আর তার জিপানি ভ্রমণের সত্যি ঘটনা। আপনারা যারা জিপানি চেনেন না তাদের বলছি জিপানি হল ফিলিপাইনের সাধারণ মানুষ পরিবহনের জনপ্রিয় একটা যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা আমেরিকান পরিত্যক্ত সামরিক জীপগুলোকে ঠিকঠাক করে জিপানিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এ ধরনের গাড়ি জাকাল সাজসজ্জা আর প্রচুর লোক উঠানোর জন্য বিখ্যাত।

আমার বান্ধবীর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজেক্টের কাজ শেষে বাসার পথে রওয়ানা হতে হতে বেশ দেরি হয়ে যায় এদিন। কিছুদিন আগে থেকে ইউনিভার্সিটি অভ দ্য ফিলিপিন্সের ডিলিমান ক্যাম্পাসে থাকতে শুরু করেছে সে। আর এত রাতে ট্যাক্সির চেয়ে জিপানি ব্যবহার করাই নিরাপদ মনে হয় তার কাছে। যখন জিপানিতে উঠল তখন বেশ রাত। একটু পরেই অস্বস্তি শুরু হলো তার। চালক গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে তাকে দেখছে একটু পর পরই। শুধু তাই না মাঝে মাঝে পিছন ফিরেও তাকাচ্ছে। কিন্তু এত রাতে গাড়িতে একা থাকায় কিছু করাও সম্ভব হলো না তার পক্ষে। এখন প্রতিটি জিপানির নির্দিষ্ট রুটে আছে। রাস্তা বদলে অন্য পথে কোনো শর্টকাট কোনোভাবেই ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ সেক্ষেত্রে পুলিশের রোষানলে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু এই চালক যে শুধু তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে তা না। একটু পরপরই রাস্তা বদল করছে সে। চালকের মতিগতি বুঝতে না পেরে চিন্তায় পড়ে গেল আমার বান্ধবী। এদিকে আবার রাস্তার মোটামুটি মাঝপথে চলে এসেছে। এই : অবস্থায় নেমে গিয়ে আরো বিপদে পড়তে পারে। তাই গাড়িতেই বসে রইল। শেষ বাঁকটা ঘোরার পর আবিষ্কার করল চালক আবার মূল পথে ফিরে এসেছে।

বাস স্টেশনে পৌঁছার আগে চালক আমার বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে যদি ভয় পাইয়ে দিয়ে থাকি তবে দুঃখিত। আসলে আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। আর বাসায় ফিরে অবশ্যই পরনের কাপড়গুলো পুড়িয়ে ফেলবে। এবার রীতিমত অবাক হয়ে আমার বান্ধবীটি তার এই অদ্ভুত আচরণের কারণ জানতে চাইল। জিপানির চালক তখন ব্যাখ্যা করল, আমি তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম, কারণ গাড়ির পিছনের ভিউ মিররে যখন দেখছিলাম, তোমার শরীরের সঙ্গে মাথা ছিল না। তখনই আমার সন্দেহ হয় এর মধ্যে অশুভ কিছু একটার কারসাজি আছে। তাই গাড়ির রাস্তা বদলে ফেলছিলাম। আশা করেছিলাম এতে ওই এলাকাটায় যে পিশাচটা আছে ওটার আওতার বাইরে চলে যেতে পারব। আর তোমার কাপড় পুড়িয়ে ফেলতে বলছি কারণ আমার মনে হচ্ছে ওটা এখনো তোমার কাপড়ের মধ্যে থেকে যেতে পারে।

আমার বান্ধবী যখন বাড়িতে পৌঁছল তখনও সে আতংকে কাঁপছে। তারপরও এই অবস্থাতেই যত দ্রুত সম্ভব পোশাকগুলো পুড়িয়ে ফেলল। এর কয়েকদিন পরেই সে খবর পেল সেদিনের ঘটনার পরদিনই ওই জিপানি চালক মারা গেছে। হায়! দুর্ভাগা চালক আমার বান্ধবীর জন্য ভয় পেলেও অশুভ জিনিসটার নজর পড়েছিল আসলে তার ওপর।

সেতুর ধারের নারী

এবারের অভিজ্ঞতাটি হয় মানস্টার অ্যাণ্ড লেইনস্টার ব্যাংকের মি. জে. জে. উলির। আয়ারল্যাণ্ডের ক্লনমেলের বাইরে, একটা

সড়ক চলে গেছে পর্বতের ধারে পুরানো এক বসতির দিকে। এই রাস্তা ধরেই ক্রউলি যাচ্ছিলেন তার দুই বন্ধুর বাসায়। বন্ধু দুজনও চাকরি করেন ব্যাঙ্কে। রাত আটটার মত বাজে তখন। আকাশে চাঁদ নেই। একসময় একটা সেতুর পোয়া মাইলের মধ্যে চলে এলেন। ছোট্ট একটা ঝরণার ওপরে সেতুটা। ওটার ধারেই তাঁর বন্ধুদের বাড়ি। এসময়ই একটা মেয়েকে দেখলেন। পরনে সাদা পোশাক, তবে কালো একটা কাপড় ঝুলছে কাঁধ থেকে, দীঘল চুল। আস্তে আস্তে সেতুতে উঠছে। তারপরই সেতুর অপর পাশ দিয়ে নীচে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। অবাক হয়ে ক্রউলি ভাবলেন এত দূর থেকে চাঁদহীন রাতে কাঠামোটা এত পরিষ্কারভাবে দেখতে পাওয়ার কারণ কী তাঁর? মনে হলো নিশ্চয় কোনো ধরনের আলো মেয়েটির ওপর পড়েছে, কিংবা আশপাশে অন্য কেউ আছে, যে একটা ম্যাচ জ্বেলে। সেতুর কাছে পৌঁছলেন যখন, চারপাশে ভালভাবে খুঁজে কাউকে পেলেন না।

বন্ধুদের বাড়িতে পৌঁছে কী দেখেছেন বললেন। এসময় তাঁদের একজন একটা ঘটনা বললেন। কয়েক রাত আগে হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে যায়। তারপরই দেখেন বিছানার ধারে একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে। মেয়েটার পরনের পোশাক আর গঠন ক্রউলির বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়। ভয়ে বন্ধুটি তখনই এই কামরা ছেড়ে দৌড়ে বের হয়ে যান। রাতে কাটান বাড়ির অন্য এক ভাড়াটের সঙ্গে। ঘটনাটি বাড়িওয়ালীকে জানান পরে। ভদ্রমহিলা তখন বললেন নারীমূর্তিটিকে এই এলাকায় মাঝেমাঝেই দেখা যায়। এটা তারই এক মেয়ের আত্মা। বছর কয়েক আগে বেশ কম বয়সে মারা যায় মেয়েটা। আর মারা যাওয়ার আগে তার পরনে ছিল তারা যে পোশাকে রাত নারীমূর্তিটিকে দেখেছেন ঠিক সেই পোশাক। মেয়েটার কাঠামো আর আকার-আকৃতিরও রাতে দেখা দেওয়া রহস্যময় নারীর সঙ্গে মিল আছে। ক্রাউলি ছায়ামূর্তিটিকে দেখার আগে বাড়িওয়ালীর মেয়ের ভূত সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। কাজেই এটা তার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা কিংবা দৃষ্টিবিভ্রম, এমনটা হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

পিছনে কে?

এই অভিজ্ঞতাটি ভারতীয় তরুণ হরিহরের। বছর কয়েক আগের ঘটনা। বেড়াতে গিয়েছিলেন কর্নাটকের ছোট্ট শহর কামতাতে, খালার বাসায়। তাঁর বাসাটা গজনির কাছে। এখানে বেশ কিছু ছোট্ট লেকের দেখা পাওয়া যায়। প্রথমবার এই এলাকায় বেড়াতে আসায় জায়গাটাতে ঘুরে আসার ব্যাপারে একটা কৌতূহল ছিল তাঁর। বাকি অংশটা বরং হরিহরের জবানীতেই শোনা যাক।

খালা বেশ ধার্মিক মহিলা। কেন যেন ওই লেকগুলোর দিকে যাওয়ার জন্য পই পই করে বারণ করে দিলেন। কারণ জানতে চাইলে শুধু বললেন জায়গাটা ভাল না। তারপর এখানেই এই বিষয়টার ইতি টানলেন।

রাত সাড়ে নটার দিকে খাওয়া-দাওয়া শেষে হাঁটতে বের হলাম। এখনো মনে আছে রাতটার কথা। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। লেকের জলে তার রূপালি ছটা পড়ছে। আর এতে গজনিকে আরো মোহনীয় মনে হচ্ছে, ঠাণ্ডা বাতাস আমাকে যেন জোর করে ওদিকেই নিয়ে যেতে লাগল। গজনির রাস্তার আলোগুলোও এখান থেকে মোহনীয় মনে হচ্ছে।

গজনির দিকে মোটামুটি আধমাইলটাক এগিয়েছি। এমন সময় কেমন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি শুরু হলো। শীতল বাতাস শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। শান্ত, নিশূপ উপত্যকা দিয়ে এগুনোর সময় হঠাৎ পিছনে বেশ কয়েক জন মানুষের পায়ের আওয়াজ পেলাম। মনে হলো যেন আমার পিছনে একটা দল আসছে, আর তাদের হাসি, কথা-বার্তার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। তবে সব কিছুই কেমন অস্পষ্ট। হঠাৎ কী মনে করে চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরলাম। বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করলাম সেখানে একজন অশীতিপর বৃদ্ধা দাড়িয়ে আছে, আর কেউ নেই।

মনে হলো জ্ঞান হারাব। এতজন লোকের পায়ের আওয়াজ, কণ্ঠ পেলাম। আর ভোজবাজিতে সব অদৃশ্য হয়ে হাজির হলো এক বুড়ি। এলোমেলো, লম্বা চুল তার, হাতে লাঠি; সামনের দাঁত নেই। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু একটা হাসি দিল। কেন যেন আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে উঠলাম। মনে হলো বিদ্যুতের একটা প্রবাহ বয়ে গেছে শরীরের ভিতর দিয়ে। নড়তে পারছি না, পা জোড়া কাঁপতে শুরু করেছে। এভাবে মনে হয় দশ-পনেরো সেকেণ্ড থাকলাম। তারপরই বড় রাস্তার দিকে দৌড়তে শুরু করলাম। যখন সেখানে পৌঁছে ফিরে তাকালাম, গজনির দিকে কাউকে দেখতে পেলাম না।

বাসায় ফিরে খালাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম। গজনিতে যাওয়ার জন্য ইচ্ছামত বকাবাদ্য করলেন খালা আর খালাতো বোন। তারপর ঘুমাতে পাঠিয়ে দিলো। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মনে হলো যেন কে আঠা দিয়ে শরীরটা বিছানার সঙ্গে আটকে দিয়েছে। মাথা এপাশ-ওপাশ করতে এমনকী মুখ দিয়ে একটা শব্দও করতে পারলাম না। খুলতে পারলাম না চোখও।

কাঁদার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, সেটা পারলাম। আর কান্নার শব্দ শুনে আমার খালাতো বোন দৌড়ে এল আর খালাকে ডেকে নিয়ে এল। বিছানায় বসিয়ে কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলেন তাঁরা। কিছু না বলে শুধু কাঁদতেই থাকলাম। আমার মাথায়, বুকে আর পায়ে অ্যাপাতিসাল নামের এক ধরনের ভেষজ মলম লাগিয়ে দিলেন তারা। আস্তে আস্তে ভাল লাগতে শুরু করল আমার। তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দু-দিন জ্বর থাকল খুব। তবে দ্রুতই ভাল হয়ে উঠলাম।

রহস্যময় সেই লোকটা

এই কাহিনিটি পাওয়া গেছে রেভারেণ্ড এইচ.আর.বি. গিলেসপির কাছ থেকে। ঘটনাটা যাঁরা দেখেছেন তাঁদের একজনই এটা বলেন তাঁকে। এটা উনিশ শতকের শেষদিকের ঘটনা।

চন্দ্রালোকিত এক রাতে আয়ারল্যাণ্ডের লেইট্রিমের এক গ্রাম্য রাস্তা ধরে ঘোড়ার গাড়িতে আসছিলেন এক লোক, তার দুই মেয়ে আর ভদ্রলোকের এক বন্ধু। একসময় খাড়া একটা পাহাড়ের কাছে এলেন। ঘোড়াটার বোঝা কমাতে চালক ছাড়া বাকিরা নেমে হাঁটা শুরু করলেন রাস্তা ধরে। মেয়েদের একজন সামনে, তার পিছনে বাকি দুজন। খুব বেশিদূর এগোননি এমন সময় পিছনের দুজন দেখলেন সামনের মেয়েটার পাশেই জীর্ণ, ছেঁড়াখোড়া পোশাকের এক লোক হাঁটছে। তবে মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে না পাশের লোকটার উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন সে। লোকটা কে হতে পারে ভেবে, তাকে ধরার জন্য জোরে পা চালালেন পিছনের দুজন। কিন্তু যখনই প্রায় ধরে ফেলেছেন এমন সময় দৌড়ে রাস্তার পাশের একটা পরিত্যক্ত কামারশালার ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে গেল ওটা। ঘোড়াটা, যেটা এতক্ষণ খুব শান্ত ছিল, প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠল। এদিকে যে মেয়েটার পাশে রহস্যময় লোকটা হেঁটেছে সে কিছু দেখেনি এমনকী কোনো শব্দও শুনতে পায়নি। রাস্তার কিনারায় গাছপালার সারি কিংবা কোনো ঝোপ-জঙ্গল নেই। তাই চাঁদের আলোয় দৃষ্টিবিভ্রম ঘটেছে এটাও বলা যাবে না। মেয়েদের একজন পরে স্থানীয় এক শ্রমিককে ঘটনাটি খুলে বললে এর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। শ্রমিকটা জানায়, এটা সম্ভবত সেই কামার, ছমাস আগে যাকে মৃত অবস্থায় ওই কামারশালায় পাওয়া যায়।

শিকল পায়ে কে যায়?

এই কাহিনিটি বলেছেন আয়ারল্যাণ্ডের ডাবলিনের এক মহিলা। মোটামুটি সোয়াশো বছর আগের ঘটনা এটি।

চমৎকার এক রাতে দুই বোন থিয়েটার থেকে বাড়ি ফিরছেন। কিমেজ রোডের খুব নির্জন একটা অংশ পার হচ্ছেন তারা। গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় এতটাই মশগুল যে অন্য দিকে তেমন একটা নজর নেই। এসময়ই তাদের দিকে শিকল পরা কারও এগিয়ে আসার শব্দ পেলেন। ক্লিক, ক্লিনক। প্রথমে ভাবলেন এটা নিশ্চয়ই কোনো ছাগল কিংবা গাধা। ছুটে গিয়ে, শিকল মাটিতে হেঁচড়ে হেঁচড়ে তাদের দিকে আসছে। কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছেন

তারা। শিকলের শব্দ ছাড়া কানে আসছে না অন্য কোনো আওয়াজও। কিন্তু রাস্তাটা পরিষ্কার আর সোজা চলে গেছে। শব্দটা ক্রমেই কাছে আসছে, সেই সঙ্গে চড়ছে। যখন তাদের পাশ কাটাল, একটা দমকা বাতাস এসে লাগল গায়ে। অজানা একটা আতংকে যেন নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন তাঁরা। তারপর খুব কষ্টে বাকি পোয়া মাইল পেরিয়ে বাড়ি পৌঁছলেন। এদের মধ্যে বড় জনের স্বাস্থ্যের অবস্থা এমনিতেই খারাপ। তাকে বলতে গেলে বয়ে নিয়ে আসতে হলো ছোটজনকে। বাড়িতে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে বড় বোন শরীর ছেড়ে দিলেন। ব্র্যাণ্ডি খাইয়ে তাঁকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলো।

পরে জানা গেল, রাস্তার যেখানে বোনদের এই অভিজ্ঞতা হয় এর ধারেই এক বুড়ো মহিলাকে অর্থ-কড়ি হাতাবার জন্য খুন করে এক ভবঘুরে। ধারণা করা হয় কিমেজ রোডে ভুতুড়ে কাণ্ড-কীর্তির সঙ্গে ওই মহিলার কোনো সম্পর্ক আছে।

দৌড় শুধু দৌড়

এবারের ভৌতিক অভিজ্ঞতাটি হয়েছে সিংগাপুরের এক তরুণীর। এটা বরং তার মুখ থেকেই শুনি।

গত বছর জীবনের সবচেয়ে ভীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। আরেকটু হলেই মরতে বসেছিলাম।

আমার ষান্মাসিক পরীক্ষার দু-মাস আগের ঘটনা। ক্লাসের শিক্ষক ক্রস-কান্ট্রি দৌড় প্রতিযোগিতার জন্য বাছাই করলেন আমাকে। অনেক গাঁইগুই করেও পার পেলাম না। কারণ গত বছরও এতে অংশ নিয়েছিলাম আমি।

অনেক দিন ধরে দৌড়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। প্রস্তুতিটা ঠিকমত হওয়ার জন্য নিয়মিত দৌড় অনুশীলনের সিদ্ধান্ত নিলাম, কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে। ঠিক হলো ম্যাকরিটচি রিজার্ভে অনুশীলন করব আমরা।

পরের শনিবার একদম সকালে সেখানে হাজির হয়ে গেলাম। তখনও খুব একটা আলো হয়নি। তবে দুটো মেয়ে ইতিমধ্যে উপস্থিত হয়ে গেছে। এখনও এসে না পৌঁছননা তিনটা মেয়ের জন্য অপেক্ষা না করে দৌড়নো শুরু করে দিলাম আমরা।

কয়েকশো গজ এগুবার পরই বুঝে গেলাম অনেক দিন না দৌড়নোতে আর আগের মত সাবলীল নেই আমি। বান্ধবীরা আমার থেকে অনেক ফিট এখন। তারা যেন বুনো খরগোশের মতই দৌড়চ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ পিছনে পড়ে গেলাম। মনে মনে আমার শিক্ষককে, দু-পাশের এই জঙ্গলকে আর নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিজের কপালকে অভিশাপ দিতে দিতে একা একা ধীর গতিতে ছুটতে লাগলাম।

দৌড়বার সময় বানরদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। বনের যেখানটায় এখন আছি এদিকে গাছপালা বেশ গভীর। সকালের সূর্যের আলো ভালমত ভিতরে ঢুকতে পারছে না। এ কারণেই ম্যাকরিটচি রিজার্ভকেই, যেটাকে লোকে পোষ মানানো একটা বাগান বলে, গভীর জঙ্গল বলে মনে হতে লাগল।

চারপাশের গাছপালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দৌড়চ্ছি, যদি একটা বানরের দেখা পেয়ে যাই এই আশায়। এসময়ই হঠাৎ বাম গালে জ্বালা ধরানো একটা ব্যথা অনুভব করলাম। মনে হলো যেন নিচু হয়ে ঝোলা কোনো ডালের বাড়ি খেয়েছি। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে এমন কোনো ডাল-পালা নজরে এল না। মনে মনে বললাম, তবে নিশ্চয় কোনো পোকামাকড় কামড়েছে।

আর কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই এরপর দৌড় চালিয়ে যেতে পারলাম। শেষমেশ পাহাড়ের ওপরের ক্যান্টিনে বান্ধবীদের সঙ্গে মিলিত হলাম আবার। এখানে কফি পান করতে করতে ওপর

থেকে পুরো সংরক্ষিত বনটা দেখতে লাগলাম।

এসময়ই একজন বান্ধবী আমার মুখের দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই, কী হয়েছে? তোমার বাম গাল কি কেটে ফেলেছ নাকি?

কী খুব বেশি কেটেছে? সচকিত হয়ে উঠলাম। খুব নয়। তবে একেবারে হেলাফেলা করার মতও না। বলল সে।

সম্ভবত কোনো পোকা কামড়েছে। বললাম আমি। অন্যরাও একমত হলো।

বাসায় ফিরে পরে একটা মলম লাগালাম গালের ক্ষতে। তারপর পড়তে বসলাম। আমার মা-ও ক্ষতটা দেখে জানতে চাইলেন কীভাবে ওটা হয়েছে। সামান্য একটা পোকার কামড় বলে আশ্বস্ত করতে চাইলাম। কিন্তু তাঁর দুশ্চিন্তা গেল না।

কিন্তু কাটাটা বেশ খারাপ মনে হচ্ছে, মা। বললেন তিনি।

আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলাম এটা আগের চেয়ে আরো বেশি নজরে পড়ছে। ঠিক চোখের নীচেই ক্ষতটা। তবে কোনো ধরনের যন্ত্রণা বা চুলকানি হচ্ছে না। তাই মলমটা কাজ করে কিনা তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা স্থির করলাম।

মোটামুটি বেশ রাত পর্যন্ত পড়ালেখা করার অভ্যাস আমার। সাধারণত সাড়ে বারটার আগে পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠি না, বিশেষ করে শনিবারে। আসলে গত বছর পরীক্ষায় ভাল না করায়

এবার শুরু থেকেই পড়ালেখায় খুব মনোযোগ দিয়েছি।

এগারোটার দিকে গালের যে জায়গাটায় কিছু একটার কামড় খেয়েছি মনে হয়েছে সেখানটায় ব্যথা শুরু হলো। বারোটার দিকে এসে ব্যথাটা রীতিমত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেল। ব্যথার চোটে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করল আমার। কিন্তু এত রাতে কিছুই করার নেই। মনে হলো কোনো মতে ব্যথা চেপে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কাল সকালে কোনো চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যাবে।

শুরুতে এই যন্ত্রণার কারণে মোটেই ঘুম আসতে চাইল না। তারপর যেমন আরম্ভ হয়েছে তেমনি হঠাৎই ব্যথাটা চলে গেল। এতটাই ভারমুক্ত মনে হলো নিজেকে, সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই একটা ধাক্কা খেলাম। বাসার বাকি সবাই দেখেও ভয় পেয়ে গেল। ক্ষতটার চেহারা বেশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে, গালটা ফুলে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় একটুও যন্ত্রণা নেই।

দ্রুত নাস্তা সারলাম। তারপরই আমাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন মা দেখে চিকিৎসক ভদ্রলোকও বললেন কোনো পোকামাকড়ের কামড়ে এই অবস্থা হয়েছে, চিন্তার কিছু নেই। তারপর একটা অয়েন্টমেন্ট দিয়ে বললেন দিন দুয়েকের মধ্যে ফোলা কমে যাবে।

সারাটা দিন এমনকী রাতের শুরুটা ভালই কাটল। গতকালের মতই এগারোটা বাজতেই আবার ব্যথা শুরু হলো, ঠিক একই জায়গায়। এবার যন্ত্রণার পাশাপাশি একটা চিন্তাও উদয় হলো মনে। শুধু রাতে কেন জায়গাটায় ব্যথা করে? মলমটাও কোনো কাজই করছে না। রাত গভীর হলে এক সময় আগের মতই হঠাৎ ব্যথাটা অদৃশ্য হলো।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলাম গাল আরো ফুলে গেছে। এতটাই যে বাম চোখে ভালমত দেখতে পর্যন্ত পাচ্ছি না। তবে অদ্ভুত ব্যাপার কোনো ব্যথা নেই। এবার সত্যি চিন্তায় পড়ে গেল আমার বাসার লোকেরা। মা স্কুলে যেতে মানা করলেন। বললেন আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

ডাক্তারের কথা শুনে ভয় আরো বাড়ল। তিনি বললেন, কী কারণে এটা হচ্ছে বুঝতে পারছেন না। মলমটা আরো কয়েকবার লাগিয়ে আগামীকাল আবার আসতে বললেন।

তবে ভাগ্যই বলতে হবে মা ডাক্তারের এই পরামর্শ মেনে না নেওয়া স্থির করলেন। আমার এক আন্টিকে ফোনে ঘটনাটি খুলে বললেন তিনি। নানান বিষয়ে বেশ ভাল অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।

বাসায় এসে আমাকে দেখেই চমকে উঠলেন তিনি। দেরি না করে আমাকে আর মাকে তার পরিচিত একজন ওঝা বা মেডিসিন ম্যানের কাছে নিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ওঝা। তারপর কীসব আওড়ালেন। একসময় মাকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন, তোমার মেয়ের ভাগ্য খুব ভাল। কোনো দুষ্ট আত্মা তাকে একটা চিমটি কেটেছে কেবল। কিন্তু যদি ওটা ওকে ভালমত একটা চড় দিত তাহলে সম্ভবত সে মারা যেত। তবে এখন আর দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমি এটা ঠিক করে দিচ্ছি।

আমাকে কিছু তন্ত্র-মন্ত্র পড়ে ফু দিলেন। তারপর জায়গাটায় লাগানোর জন্য একটা মলম দিয়ে কিছু খাবার আপাতত বেছে চলতে বললেন।

ভাগ্য ভাল তার চিকিৎসায় কাজ হলো। কয়েকদিনের মধ্যে ফোলা কমে গেল। সবচেয়ে বড় কথা, যেদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে সে রাত থেকেই ব্যথা একদম চলে গেল।

এখনও ম্যাকরিটচি রিজার্ভে ক্রস কান্ট্রি দৌড়ের প্রশিক্ষণ নিই আমি। যদিও মা বিষয়টা খুব একটা পছন্দ করেন না। তবে এখন সবসময়ই বান্ধবীদের সঙ্গেই থাকি দৌড়নোর সময়।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত