জাত-গোক্ষুর

জাত-গোক্ষুর

সকালবেলার কচি রোদে মাইকোনোস হারবার যেন প্রকাণ্ড একটা নীলা। প্রায় বন্ধ একটা হারবার, পাহাড়-প্রাচীরের ভেতর পানিতে ভাসছে অসংখ্য মাছ ধরার ছোট ছোট নৌকা আর লঞ্চ, বাইরে নোঙর ফেলে আছে দুটো প্রকাণ্ড ক্রুজ শিপ। মাইকোনোসে জাহাজ ভেড়ে না। নড়বড়ে গ্যাঙপ্ল্যাঙ্ক বেয়ে নামতে হয় আরোহীদের, হাতে থাকে লটবহর, ডুবু-ডুবু লঞ্চ প্রতিবার অল্প কিছু লোককে তীরে পৌঁছে দেয়। অভিজ্ঞতাটা কেমন তা অবশ্য রানা ও তারানার জানার সুযোগ হয়নি, কারণ প্রায় এক ঘণ্টা আগে দ্বীপের আরেক প্রান্তে নির্মিত নতুন এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছে ওরা, তারপর বাসে চড়ে ঝাঁকি খেতে খেতে জেলে পাড়ায় পৌঁচেছে। এই মুহূর্তে পানির কিনারা ঘেঁষা একটা কাফেতে বসে রয়েছে রানা, মাথার ওপর বহুরঙা কাপড়ের চাঁদোয়া। ওর কাছ থেকে পনেরো গজ দূরে দর্শনীয় গোঁফ বিশিষ্ট ছ’জন গ্রীক নাবিক নতুন রঙ করা একটা ফিশিং বোটকে ঠেলে পানিতে নামাচ্ছে। রানার দু’দিকে ধনুকের মত বাঁকা হয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ওয়াটারফ্রন্ট বা পানির কিনারা; আরেক দিকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সাদা চুনকাম করা দালান, সামনের অংশে কফি হাউস, রেস্তোরাঁ, হোটেল, দোকান-পাট ইতাদি। চেয়ারে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে রানা, স্ট্রহ্যাট পরা বুড়ো এক লোককে আঙুর আর ফুল বিক্রি করতে দেখছে। এরকম একটা পরিবেশে মনে রাখা কঠিন যে একজন লোককে খুন করতে এখানে এসেছে ও।

ওর সঙ্গে তারানা নেই। আঁকাবাঁকা পাকা রাস্তা ধরে কিছুক্ষণ আগে অদৃশ্য হয়ে গেছে সে। মাইকোনোসে বেশ কিছু মুসলমান পরিবার বাস করে, বছর দুই আগে বেড়াতে এসে এরকম এক মুসলিম পরিবারের বুড়ি কর্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তারানার, সেই বুড়ির সঙ্গে দেখা করতে গেছে সে। মাইকোনোসের কোথায় কি ঘটছে জানতে হলে এখানকার যে-কোন বুড়িকে প্রশ্ন করলেই চলে, কারণ তারা নাকি সমস্ত খবর জানে এবং বহিরাগত প্রশ্নকর্তাকে জানাতে পছন্দ করে, বিশেষ করে প্রশ্নকর্তা যদি সংশি−ষ্ট বুড়ির একটা কামরা ভাড়া নেয়। তারানা তার পরিচিতা বৃদ্ধার কাছে মিলিটারি ক্যাম্প সম্পর্কে জানতে গেছে। ক্যাম্পের কমান্ডার কোথায় থাকে তা-ও জানার চেষ্টা করবে সে, কারণ ধরে নেয়া চলে ওই কমান্ডারের ওখানেই পাওয়া যাবে আকার্ডিয়া মারকাসকে।

দ্বিতীয় কাপটা শেষ হয়ে আসছে, এই সময় ফিরে এলো তারানা। ‘তোমাকে কিন্তু একদমই ট্যুরিস্টের মত লাগছে না, জ্যাকেট আর টাই না পরলে গ্রীক ভাবটা আরও বোধহয় খানিক বাড়ত।’

‘আরও একটু সময় দাও আমাকে,’ বলল রানা। ‘কিছু জানা গেল?’

ওয়েটারকে ডেকে এক কাপ চা চাইল তারানা। ওয়েটার চলে যেতে বলল, ‘আমি একা গিয়ে ভালই করেছি। সুফিয়া প্রথমে মুখ খুলতে রাজি হয়নি। যখন অভয় দিয়ে বললাম যে তার কোন ক্ষতি হবে…’

‘সংক্ষেপ করো।’

ওয়েটার চা দিয়ে যাবার পর শুরু করল তারানা। ‘ওরনস সৈকতের কাছে একটা ক্যাম্প আছে। দ্বীপের মাত্র দু’জন লোক ওই ক্যাম্পের ভেতর ঢুকতে পেরেছে। ক্যাম্পের কাছাকাছি একটা ভাড়া করা ভিলায় থাকেন কমান্ডার। তাঁর নাম কর্নেল গেনাডি গাম্বুস।’

‘গুড। আর কিছু জানা যায়নি?’

‘একজন স্থানীয় ট্যাক্সি ড্রাইভার দু’জন আমেরিকানকে রাহমানিয়া হোটেলে পৌঁছে দিয়েছে। হোটেলটা এই গ্রামেরই শেষ মাথায়। পরে ওই ট্যাক্সি ড্রাইভারই আমেরিকান দু’জনকে কমান্ডার গাম্বুসের ভিলায় পৌঁছে দেয়।’

‘সত্যি, দারুণ ইন্টেলিজেন্স ওঅর্ক,’ বলল রানা, দাঁড়িয়ে পড়ল। ‘চলো, রাহমানিয়া হোটেলটা দেখে আসি।’

‘এই তো সবে বসলাম,’ প্রতিবাদের সুরে বলল তারানা। ‘চায়ে মাত্র একটা চুমুক দিয়েছি…’

‘পরে তোমাকে দশ কাপ খাওয়াব, লক্ষ্মীটি,’ বলে টেবিলের ওপর কিছু ড্র্যাকমা কয়েন রাখল রানা।

‘উফ্‌! কেমন মানুষ রে বাবা!’ দ্রুত চুমুক দিতে গিয়ে জিভ পোড়াল তারানা, তারপর রানার সঙ্গে থাকার জন্যে প্রায় ছুটতে শুরু করল।

সাগরের কিনারা ঘেঁষে হাঁটছে ওরা; আরেক পাশে দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, কাফে আর হোটেল। খোলা একটা চৌরাস্তায় চলে এল, এখানে বাস থেকে স্থানীয় লোকজন আর ট্যুরিস্টরা লটবহর নিয়ে নামছে। চৌরাস্তার এক মাথায় পোস্ট অফিস আর হারবার পুলিসের হেডকোয়ার্টার। রাস্তার মাঝখানে একটা আইল্যান্ড, সেখানে ব্রোঞ্জের তৈরি প্রাচীন কোন গ্রীক বীরের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। চৌরাস্তাকে পিছনে ফেলে ছোট একটা আবাসিক এলাকায় ঢুকল ওরা, এরপর পঞ্চাশ গজ হাঁটতেই আকাশের গায়ে দেখতে পেল রাহমানিয়া হোটেল।

হোটেলটা বহুতল, এবং পাহাড়ের মাথায়। পেঁচানো রাস্তা আছে, সরাসরি গাড়ি নিয়ে ওঠা যায়; আবার ধাপও কাটা আছে, হেঁটে উঠতে পারো।

রিসেপশন ডেস্কে বসা লোকটা ভদ্র ও অমায়িক। ‘হ্যাঁ, গতকাল দু’জন আমেরিকান উঠেছেন। তাঁরা কি আপনাদের বন্ধু?’ ‘তাদের নাম কি?’ জিজ্ঞেস করল রানা।

‘এক সেকেন্ড, প্লীজ।’ কাউন্টারের নিচে থেকে একটা খাতা নিল সে, পাতা ওল্টাল। ‘এই তো। মিস্টার ব্রায়ান আর মিস্টার জক।’

হেসে উঠল রানা। ‘হ্যাঁ, এরা আমাদের বন্ধু। কত নম্বর রূমে আছে? ওদেরকে আমরা এমন একটা সারপ্রাইজ দেব না!’

‘স্যুইট নম্বর তিনশো বারো। কিন্তু তাঁরা তো বাইরে বেরিয়েছেন। বলে গেছেন দুপুরের দিকে লাঞ্চ খেতে ফিরে আসবেন।’

দ্বীপে ক্রাইম রেট প্রায় শূন্যের কোঠায়, তাই সিকিউরিটির ব্যবস্থা না থাকারই মত। রানার কাছে জাদুর কাঠি অর্থাৎ মাস্টার কী আছে, মিস্টার ব্রায়ান ও মিস্টার জকের স্যুইটে ঢুকতে কোন সমস্যা হলো না। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে তল্লাশী চালাল ওরা। দুটো বেডরূমেই বিছানা এখনও তৈরি করা হয়নি। সিটিংরূমে স্কচ হুইস্কির একটা বোতল পাওয়া গেল-অর্ধেক খালি। রেকর্ড বলে, মারকাস খুব একটা খেতে পারে না, বমি করে ফেলে; কাজেই রানা ধরে নিল হুইস্কিটুকু খেয়েছে মারকাসের সঙ্গে আসা গানম্যান।

হুইস্কি আর কয়েকটা সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ছাড়া তারা কিছু ফেলে রেখে যায়নি। মারকাস সম্ভবত সঙ্গে করে কোন লাগেজ নিয়ে আসেনি। সে যে কাজের জন্যে এসেছে তাতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। নিজেকে ডাফু সালজুনাস বলে পরিচয় দিয়ে কে ফোন করেছিল তা তদন্ত করে দেখা আর ক্যাম্প কমান্ডার গেনাডি গাম্বুসের আনুগত্য যাচাই করা। কমান্ডার গাম্বুসের জীবন বিপজ্জনক ঝঁুি কর মধ্যে পড়ে গেছে, সত্যি যদি তিনি সালজুনাসের অনুরোধ মেনে নিয়ে মুভ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে থাকেন। মারকাস যেহেতু এখানে গতকাল পৌঁছেছে, গাম্বুস হয়তো এরইমধ্যে নিহত হয়েছেন।

পাহাড় থেকে নেমে আধঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর একজন প্রৌঢ় ট্যাক্সি ড্রাইভারকে পাওয়া গেল, প্রচুর খেয়েও দাবি করছে সে মদ খায়নি, মাতালও হয়নি। তার কালো বুইক গাড়িটার বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে তো কম নয়। পুরানো এঞ্জিন স্টার্ট নেয়ার সময় যে হাঁচিটা দিল, রানার সন্দেহ হলো গোটা দ্বীপ কেঁপে উঠেছে।

পাহাড়ের কার্নিসই রাস্তা, আরেক পাশে অনেক নিচে সাগর। ওরনস সৈকতের কাছাকাছি চলে এসেছে বুইক, এই সময় বাঁক ঘুরে ক্যাম্প আর ভিলার পথ ধরল ড্রাইভার।

দূর থেকে ক্যাম্পটার শুধু আভাস পাওয়া গেল, ভাল করে কিছু দেখার সুযোগ মিলল না। সারি সারি সবুজ দালান যেন গুঁড়ি মেরে আছে, গাড়ির পাশের দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া থেকে বহুদূরে। বেড়ার দিকে পিছন ফিরল ট্যাক্সি। এখান থেকে ভিলাটা বেশ অনেকটা দূরে।

বাড়িটার ছাদে টালি বসানো হয়েছে। কাছাকাছি পৌঁছে ড্রাইভারকে থামতে বলল রানা। মদ খেলেও, লোকটা ঠিকমতই গাড়ি চালাচ্ছে।

কারুকাজ করা সদর দরজার কড়া নাড়ল রানা। যে-কোন ঘটনার জন্যে তৈরি ওরা। তারানা তার পার্সের পিছনে বেলজিয়ান আগেড়বয়াস্ত্রটা আবার লুকিয়ে রেখেছে। তার আশা, এবার ওটা ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। রানা ওর পিস্তল জ্যাকেটের সাইড পকেটে রেখেছে, একটা হাতও ওর সেখানেই। বুড়ো এক গ্রীক চাকর দরজা খুলল।

‘শুভেচ্ছা স্বাগতম, হুজুর,’ গ্রীক ভাষায় অভ্যর্থনা জানাল সে। ‘আপনারা কি কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’ ‘এক্সকিউজ মি,’ বিড়বিড় করে বলল রানা, নরম হাতে তাকে একপাশে সরিয়ে তারানাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এটা বড় একটা লিভিংরূম। একদিকের পুরোটা দেয়াল কাঁচ দিয়ে তৈরি, পাহাড় আর বনভূমি দেখা যাচ্ছে।

‘প্লীজ!’ বুড়ো চাকর ইংরেজিতে প্রতিবাদ করল।

এক কামরা থেকে আরেক কামরায় ঢুকে সার্চ করছে ওরা। সবশেষে আবার হলরূমে ফিরে এল। ভিলায় আর কেউ নেই।

‘কমান্ডার কোথায়?’ বুড়োকে জিজ্ঞেস করল তারানা।

প্রবলবেগে মাথা নাড়ল লোকটা। ‘নেই। চলে গেছেন।’

‘কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল রানা।

‘গেছেন আমেরিকানদের সঙ্গে। গেছেন ক্যাম্পে।’

ভিলা থেকে বেরিয়ে এসে ট্যাক্সিতে চড়ল ওরা। ‘মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে চলো,’ ড্রাইভারকে বলল রানা।

‘একবার তো বলেছি আমি মাতাল নই, তারপরও এভাবে আমাকে পরীক্ষা করার মানেটা কি?’ চোখ রাঙিয়ে জিজ্ঞেস করল ড্রাইভার।

‘তোমাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে না,’ বলল রানা। ‘আমরা সত্যি সত্যি মিলিটারি ক্যাম্পে যেতে চাইছি।’

‘এই কথা! তাহলে আমিও ওখানে আপনাদেরকে নিয়ে গিয়ে প্রমাণ করব যে সত্যি আমি মাতাল হইনি।’

‘ওখানে গিয়ে কি করব আমরা?’ রানাকে জিজ্ঞেস করল তারানা।

কাঁকর ছড়ানো পথ ধরে আবার ছুটল বুইক। ‘কি করব তা এখনও ঠিক করিনি,’ স্বীকার করল রানা। ‘তবে কেন যেন মনে হচ্ছে অন্তত বাইরে থেকে হলেও ক্যাম্পটা একবার দেখা দরকার।’

তবে অত দূর ওরা গেল না। বাঁক নিয়ে যে রাস্তায় উঠল সেটা কাঁটাতারের বেড়ার সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে, কিছুদূর যাবার পর কিছু ঝোপ আর গাছপালা দেখতে পেয়ে ড্রাইভারের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠল রানা, ‘স্টপ!’ রাস্তা ছেড়ে ওই ঝোপ আর গাছগুলোর দিকে এগিয়েছে কোন গাড়ির চাকার দাগ।

সঙ্গে সঙ্গে বুইক থামিয়ে ড্রাইভার অভিমানী সুরে জানতে চাইল, ‘এখনও আপনারা অভিযোগ করবেন যে আমি মাতাল?’

তার কথায় কান না দিয়ে তারানা জিজ্ঞেস করল, ‘কি ব্যাপার, রানা?’

‘ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি বসো।’ গাড়ি থেকে নেমে পিস্তলটা বের করল রানা। ঝোপগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে টায়ারের দাগ থেমে গেছে। পাশেই কয়েক জোড়া জুতোর ছাপ, এখানে সম্ভবত ধস্তাধস্তি হয়েছে। দাগগুলোকে পিছনে ফেলে ঝোপের দিকে এগোল রানা। আরেকটু এগোতে যা ভয় করছিল, দেখল সেটাই সত্যি। দীর্ঘদেহী একজন মানুষ ঘন একটা ঝোপের আড়ালে পড়ে আছে, এক কান থেকে অপর কান পর্যন্ত গলাটা কাটা। ধরে নেয়া যায় কমান্ডার গেনাডি গাম্বুসকে রানা খুঁজে পেয়েছে।

ট্যাক্সিতে ফিরে এসে কি দেখেছে তারানাকে বলল রানা। দু’জনেই ওরা চুপচাপ বসে থাকল কিছুক্ষণ। ওদেরকে গম্ভীর ও চিন্তিত দেখে ড্রাইভারও নিজেকে সামলে রাখল।

‘কমান্ডার গাম্বুসের সহকারী কাউকে এরইমধ্যে পাশে পেয়ে গেছে মারকাস,’ একসময় নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল রানা। ‘আমরা যদি মারকাসকে ধরতে না পারি, এখানকার ট্রূপসকে কাল সে এথেন্সে নিয়ে যাবে।’

‘কিন্তু আমরা তো আর তাকে ধরার জন্যে ক্যাম্পে ঢুকতে পারি না,’ বলল তারানা। ‘ছোটখাট হলেও, ওখানে একটা আর্মি তাকে পাহারা দিয়ে রেখেছে।’

‘চলো তাহলে হোটেলে ফিরি,’ বলল রানা। ‘দুপুরে লাঞ্চ খেতে ফিরবে বলেছে মারকাস, সত্যি সত্যি ফিরতেও পারে। আমরা তার জন্যে অপেক্ষা করব।’

রাহমানিয়ায় পৌঁছে ট্যাক্সির ভাড়া মেটাচ্ছে রানা, ড্রাইভার আবার প্রসঙ্গটা তুলল, ‘আল্লাহর কিরে লাগে, সত্যি কথা বলবেন, আমি কি একবারও এতটুকু মাতলামি করেছি, স্যার?’

তারানার দিকে তাকাল রানা। ‘তুমি কি বলো, ও মাতাল?’ তারানা মাথা নাড়ল।

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন করল। ‘আমি যদি মাতাল না হই, তাহলে কেন বলা হবে আমি মদ খেয়েছি?’

রানা ও তারানা দৃষ্টি বিনিময় করল। তারানা বলল, ‘কে বলে তুমি মদ খেয়েছ?’

‘আপনারা না, আপনারা না! বলে ওই শালী, আমার বউটা। আমি নাকি সারাক্ষণ মদ খাচ্ছি, আর তাই দোজখের আগুনে পুড়তে হবে আমাকে।’

ভুরু কুঁচকে রানা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নামটা কি বলো তো।’

‘ইমানুল জাকারিয়াস।’

‘তুমি মুসলমান!’

‘জ্বী। আপনারাও বুঝি?’ ড্রাইভারকে বিব্রত দেখাচ্ছে। মাথা ঝাঁকাল রানা।

‘দোয়া করবেন, স্যার-আমি যেন মদটা ছাড়তে পারি।’

লোকটার প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে।

রানা ভাবল চিৎকার করে বলে…কিন্তু সিদ্ধান্ত পাল্টে চুপ করে থাকল ও।

রাহমানিয়া ইন্টারন্যাশনালে পৌঁছে আবারও কারও চোখে ধরা না পড়ে মারকাসের স্যুইটে ঢুকল ওরা। দরজায় তালা লাগিয়ে অপেক্ষা করছে। বেলা প্রায় বারোটা এখন, ইতিমধ্যে বেডগুলো তৈরি করা হয়েছে; মেইড বা রূম-সার্ভিসকে নিয়ে উদ্বিগড়ব হবার কিছু নেই।

স−্যাকস সুট-এর সঙ্গে ছোট একটা ভেস্টও পরেছে তারানা, সেটা খুলে ফেলায় স−্যাকসে গোঁজা রইল ছোট্ট একটা ব−াউজ। বিছানায় শুয়ে পড়ল সে, পা দুটো এখনও মেঝেতে, লাল চুল নীল চাদরে ছড়িয়ে পড়েছে। সিলিঙের দিকে চোখ রেখে বলল, ‘এই যে ছাড়াছাড়ি হবে, আবার কবে দেখা হবে কে জানে। আর যদি দু’জনের একজন মারা যাই, কোনদিনই আর দেখা হবে না।’ ‘হ্যাঁ, আমাদের পেশায় এটা একটা খারাপ দিক…’

‘কাজেই ভবিষ্যতের জন্যে অপেক্ষা করার কোন মানে হয় না,’ বলল তারানা। ‘ভাল লাগে, কাজেই সুযোগ থাকতে থাকতে যতটা পারা যায় তোমাকে পেতে হবে আমার।’ খোলা জানালা দিয়ে নরম, ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে মারকাসের বেডরূমে। তারানা তার ব−াউজের বোতাম খুলতে শুরু করল।

‘এই, কি করছ, এখন না!’ দ্রুত বলল রানা। ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? জানো না মারকাস যে-কোন মুহূর্তে ফিরে আসতে পারে।’

চাপা স্বরে হেসে উঠল তারানা। ‘দেখতে চাইছিলাম তোমার পঙতিক্রিয়া কি হয়। ঠিক আছে, এখন না।’

প্রতিটি মিনিট পার হতে যেন এক ঘণ্টা লাগছে। সাড়ে বারোটার সময় নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না তারানা। ‘আমি ডেস্কে যাচ্ছি।’

‘কেন?’

‘মারকাস হয়তো ফোন করে কিছু জানিয়েছে। কিংবা হোটেলের কর্মচারীরা লোকমুখেও তার সম্পর্কে কিছু শুনে থাকতে পারে।’

‘ঠিক আছে, যাও,’ অনুমতি দিল রানা। ‘তবে মারকাসকে দেখতে পেলে একা কিছু করতে যেয়ো না। এখানে আসতে দিয়ো তাকে।’

এক সেকেন্ড ইতস্তত করল তারানা। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, রানা। কথা দিলাম।’

তারানা চলে যাবার পর মেঝেতে পায়চারি শুরু করল রানা। উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছেই। মারকাসকে এই স্যুইটের ভেতর পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে তার পিছনে কম দৌড়ানো হয়নি। হোটেলের রিসেপশন এরিয়ার দিকে তারানা গেছে পাঁচ মিনিটও হয়নি, এই সময় করিডরে পায়ের শব্দ পেল রানা। পিস্তল বের করে দরজার সামনে চলে এলো ও। কান পেতে আছে, আরেকটা শব্দ হলো। অপেক্ষা করছে, কিন্তু কিছুই ঘটছে না। অত্যন্ত সাবধানে ও নিঃশব্দে দরজার তালা খুলল। একটু একটু করে এক ইঞ্চি ফাঁক করল কবাট, সেই ফাঁকে চোখ রেখে করিডরে তাকাল। কেউ নেই। আরও একটু ফাঁক করল কবাট। করিডরের আরও বড় অংশ দেখতে পাচ্ছে এখন। নেই কেউ। স্যুইট থেকে বেরিয়ে এলো এবার। কই, কিছু না। করিডরের একদিকে খিলান আকৃতির দরজা, দরজার ওপাশে বাগান। খিলানের তলা দিয়ে বাগানে বেরিয়ে এসে চারদিক সার্চ করল। এখানেও নেই কেউ। বাগান থেকে বেরিয়ে যাবার আরেকটা দরজা আছে, পঞ্চাশ ফুট দূরে, সেদিকটাও একবার দেখে এল। একটা বিড়াল পর্যন্ত নেই। অবশেষে হাল ছেড়ে দিল রানা। উত্তেজিত সড়বায়ুকে দায়ী করল ও, হয়তো কিছু শোনেইনি। করিডরে ফিরে এসে আধ খোলা দরজা দিয়ে স্যুইটে ঢুকল।

কবাট ধরে ওর পিছনে দরজা বন্ধ করতে যাবে, এই সময় চোখের কোণ দিয়ে কিছু একটা নড়ে উঠতে দেখল রানা। তবে রিয়্যাক্ট করার সময় পাওয়া গেল না। খুলিতে লাগা আঘাতটা সারা শরীরে তীব্র ব্যথার ঢেউ তুলল।

হাত থেকে পড়ে গেল ওয়ালথার। চৌকাঠ আঁকড়ে ধরল রানা, ওটার ওপরই বাড়ি খেলো শরীরটা। এক পলকের জন্যে একটা মুখ দেখতে পেল, মনে পড়ল এথেন্সের পেন্টহাউসে দেখেছে। নিরেট দেয়াল, ওরফে আকার্ডিয়া মারকাস। হিংস্র পশুর মত দুর্বোধ্য একটা শব্দ বেরিয়ে এলো রানার গলার ভেতর থেকে-চোখে ভাসছে হায়েনাটার পলায়ন, মুখে কায়সারের খানিকটা মাংস-হাত বাড়িয়ে মারকাসের চোখ দুটোর নাগাল পেতে চাইল ও। কিন্তু তখনই আরেকটা আঘাত লাগল মাথার পাশে, ভেতরে বিস্ফোরিত হলো উজ্জ্বল আলো। তারপর অকস্মাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেল।

গল্পের বিষয়:
ভৌতিক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত