সোডার পরিবারের পাঁচ শিশু যারা ধোয়ায় মিলিয়ে গেছে

সোডার পরিবারের পাঁচ শিশু যারা ধোয়ায় মিলিয়ে গেছে

জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া শেষে মানুষ তার অন্তিম মূহুর্তে শুধু একটাই আশা থাকে তা হল স্বাভাবিক শান্তির মৃত্যু। কিন্তু সবার ভাগ্য তার পরিকল্পনামত চলে না, তাই কার মৃত্যু কখন কিভাবে হবে কারো পক্ষেই জানা সম্ভব হয় না। এমনই কিছু দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি। তবে তাদের এমন পরিণতির পিছনে কে দায়ী তার রহস্য উদ্ঘাটন করা কারো সম্ভব হয়নি এখন পর্যন্ত।

অনেক সময় প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় কে বা কারা খুন করেছে কিন্তু যদি প্রশ্ন ওঠে কিভাবে খুন হল বা আদৌ খুন হল নাকি, অনেকসময় তো লাশের কোন হদিসও পাওয়া যায় না। তবে কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল একজন জলজন্ত মানুষ? তেমনই অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন মনে নিয়ে চলুন দেখে নেই বিশ্বের এমন একটি মৃত্যু ঘটনা যা হয়ে আছে অজানা প্রহেলিকা।

১৯৪৫ ক্রিসমাসের সন্ধ্যা, সোডার পরিবার ক্রিসমাসের আনন্দে সারাদিন কাটিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৯ ছেলে-মেয়ে নিয়ে দোতালা বাড়িতে থাকেন মি: এবং মিসেস সোডার। ৫ জন থাকে উপরে আর নিচতলায় বাকি ৪ জনকে নিয়ে থাকেন সোডার দম্পতি।

ক্রিসমাস সন্ধ্যায় কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে তাদের সাথে যার কোন খেই খুঁজে পাচ্ছেন না মিচ্ছেন সোডার। হঠাৎ এক অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে এবং অপরিচিত একজন ব্যক্তির নাম বলেন। তাকে চিনতে না পেরে মিসেস সোডার ফোন রেখে দেন।

ফোন রেখে নিজের ঘরের দিকে যাবার সময় দেখতে পান লিভিং রুমের সবগুলো পর্দা খোলা এবং উপরে ওঠার সিড়ির বাতি এখনো জ্বলছে, কিন্তু বাচ্চারা তো অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়ত লাইট বন্ধ করতে ভুলে গেছে।

কিছুক্ষণ পর লক্ষ করলেন বাইরের প্রধান দরজাও খোলা। তা কি করে সম্ভব? যেহেতু সারাদিনের ব্যস্ততাই অনেকটাই ক্লান্ত ছিলেন এতকিছু না ভেবে দরজা বন্ধ করে লিভিং রুমের পর্দা দিয়ে ঘুমোতে চলে যান।

তার কয়েক মূহুর্ত পর হঠাৎ বাড়ির ছাদে একটা আওয়াজ পান এবং কিছু একটা গড়িয়ে পড়ার শব্দও পান। ঘুমের মধ্যে খুব একটা পাত্তা দেন না, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারেন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে।

১ ঘন্টার মধ্যেই আগুন ধরে যায় পুরো বাড়িতে। কিছু বুঝে ওঠার আগে বাচ্চাদের নিয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যান, তবে উপরের বাচ্চাদের আনতে পারেন নি মি.সোডার। কিন্তু তাদের জ্বলন্ত আগুনে পুড়তে দিতে পারেন না।

নানা চেষ্টা করতে থাকেন তাদের বের করতে কিন্তু অবস্থা এমনই ছিল যে উপর থেকে নামার সিড়ি একদম আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। জানালা দিয়ে বের করার চেষ্টা ও ব্যর্থ হন, এমন সময় কেন জানি তার গাড়িও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ইঞ্জিন স্টার্ট হচ্ছিল না।

তাদের সাথে বেড়িয়ে আসতে পারা মেয়ে ম্যরিয়ন দ্রুত প্রতিবেশীদের খবর দেয় যেন আগুন নিভানো বাহিনীকে ফোন দেয়, তবে উৎসবের দিন হওয়ায় ঐ সময়ে কাউকেই পাওয়া যায় নি। অতঃপর সকাল ৮টা নাগাদ দমকল বাহিনি এসে আগুন নেভায় এবং বাচ্চাদের উদ্ধার করতে যায়।

আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে কেউই ছিল না! ধারণা করা হয়, এত তাপে কোন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই তারা হয়ত মারা গিয়েছে কিন্তু যতক্ষণ বাড়িতে আগুন জ্বলছিল এত কম সময়ে একদম পুড়ে ছাই হতে পারে না কোন মানুষ। কারন সর্বোচ্চ ২০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ২ ঘন্টা সময় লাগে মানুষের হাড় সহ ছাই হয়ে যেতে, কিন্তু সোডার বাড়ি মাত্র ৪৫ মিনিট আগুন জ্বলে ছিল, বাচ্চারা পুড়ে গেলেও একদম ছাই হওয়া অসম্ভব। তাহলে কেন তাদের লাশ পাওয়া গেল না ঘরে? কোথায় গেল তারা?

সোডার পরিবারের পাঁচ শিশু

যেহেতু তারা এককথায় গায়েব হয়ে গিয়েছিল যেন, আর আগুনের মধ্যে থাকায় পুলিশ তাদের রিপোর্টে বাচ্চাদের নিখোঁজ বা মৃত্যু কারণ বলে “আগুন বা দমবন্ধ”দেখায়।

কিন্তু মিসেস সোডার ভাবছেন এখনও তার বাচ্চারা বেঁচে আছে না তো? তাই তিনি নিজে থেকে কিছু পরীক্ষা করতে থাকেন, মুরগী, শুকরের মাংস হাড্ডিসহ পোড়াতে থাকেন, কিন্তু যতই পুড়ে যাক না কেন কিছু না কিছু অংশ অবশিষ্ট থেকেই যায় যা থেকে বোঝা যায় কোন প্রাণীর অস্তিত্ত্ব ছিল। তারমানে মারা যায় না তার শিশুরা। তাহলে কি হয়েছে তাদের সাথে?

এদিকে আগুন লাগার কারণও বুঝে উঠতে পারছে না পুলিশ। ধরা হয়, হয়ত কারেন্টের তারের গণ্ডগোলের কারণে আগুন লাগতে পারে। বাড়ির ভিতর পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, তাদের ফোনের লাইন ও কাঁটা হয়েছিল। তারমানে তারা যদি বের হতে না পারত তবে যেন বাইরের কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। সম্পূর্ণই কি কাকতালীয় নাকি কোন গোপন ষড়যন্ত্রের শিকার হল সোডার পরিবার?

আগুন লাগার কয়েকদিন আগেই একজন আগন্তক তাদের বাড়িতে আসেন কারেন্টের তার ঠিক করতে, তখন হঠাৎই বলে উঠেন – এই তার একসময় আগুন ধরিয়ে দিবে মি.সোডার তার কথা কিছু বুঝতে পারে। আবার একবার তার বাড়ির বীমা কেউ একজন বিক্রি করে দেবার চেষ্টা করে এবং এও বলে যে “আপনার বাড়ি একদম ধোয়ার পূর্ণ হয়ে যাবে!”  আরো বলতে থাকে, “আপনার ছেলে-মেয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। মুসোলিনের বিরুদ্ধে যা খারাপ বলেছেন তার খেসারত দিতে হব। মি.সোডার প্রকৃতপক্ষে ইতালিয়ান স্বৈরশাসকের প্রতি তার অপছন্দ সম্পর্কে স্পষ্টবাদী ছিলেন, মাঝে মাঝে ফ্যয়েটভিলের ইতালিয়ান সম্প্রদায়ের অন্যান্য সদস্যদের সাথে উত্তপ্ত তর্ক করতে জড়িয়ে পড়তেন। ফলে কোন ব্যক্তির হুমকিকে গুরুত্ব দেন নি।

তার কিছু দিন পর সোডার বড় ছেলে বলে যে, ক্রিসমাসের ঠিক কয়েকদিন আগে, সে অদ্ভুত এক ব্যাপার লক্ষ করে। একজন লোক তাদের অনবরত ফলো করছে যখন ভাইবোন একসাথে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিল। তবে বোঝাই যাচ্ছে নিছক কোন কথা ছিল না ওগুলো।

সোডার পরিবার আবার তাদের পোড়াবাড়ি দেখতে গেলে বাড়ির উঠোনে তাদের মেয়ে সিলভিয়া শক্ত রাবারের মত একটি বস্তু মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। মিসেস সোডারের তখন সেদিনের ঐ আওয়াজের কথা মনে হয়, এবং বুঝতে পারেন এটি একটি ‘পাইনাপেল বোমা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। ধীরে ধীরে যেন রহস্যের জট খুলছে।

বাচ্চাদের নিখোঁজ সংবাদ দিয়ে অনেক আগেই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে রেখেছিল সোডার দম্পতি। তার কয়েকদিন পর একজন মহিলা রিপোর্ট করেন তিনি একজন বাচ্চাকে একটি চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি দিতে দেখেন যখন বাড়িতে আগুন লেগেছিল।

আরেকজন মহিলা বলেন তিনি অগ্নিঘটনার পরদিন সকালে বাচ্চাদের নাস্তা পরিবেশন করেন, তার দোকান ছিল ফ্যয়েটভিলের এবং চারলেস্টনের মাঝে। যে গাড়িতে করে বাচ্চাদের এখানে আনা হয় তা ফ্লোরিডা ট্যুরিস্ট কোর্টের ছিল বলেও জানান।

চারলেস্টন হোটেলের একজন মহিলাও বাচ্চাদের দেখার কথা দাবি করেন। তিনি জানান, ”বাচ্চাগুলো দুইজন মহিলা ও লোকের সাথে এখানে এসেছিল। বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে চাইলে লোকগুলো আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং তাদের সাথে কথা বলতে মানা করে দেয়। তারা মোটামোটি মধ্যরাতের দিকে এখানে আসেন এবং অনেকগুলো বিছানাসহ বড় একটি রুম ভাড়া নেন। তারা পুরোটা সময় ইতালিয় ভাষায় কথা বলছিল। পরদিন সকালেই তারা চলে যায়।

এ ঘটনার কয়েক বছর পর পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্র পাওয়া যাচ্ছিল বাচ্চাদের বেঁচে থাকার। একবার নিউ ইয়র্কের একটি খবরের কাগজে মি.সোডার অনেকগুলো বাচ্চার দলীয় ছবির মধ্যে তার মেয়ে বেটি-র মত একটি বাচ্চাকে দেখতে পান। তিনি দ্রুতই মানাহাটানে যান, ঐ পরিবারের সাথে দেখা করতে কিন্তু অদ্ভুতভাবে তারা তার সাথে দেখা করতে মানা করে দেন। বাচ্চাদের খুঁজে পাবা সব দরজা কি তাহলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

অতঃপর ১৯৬৮ সালে, প্রায় ২০ বছর পর মিসেস সোডার একটি পোস্টকার্ড পান। কিন্তু তাতে কোন ফেরত ঠিকানা ছিল না। ভিতরে ২০ বছরের কাছাকাছি একজন যুবকের ছবি ছিল যে দেখতে অনেকটাই তাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলে লুইসের মত! ছবির পিছনে কিছু কথাও লিখা ছিল- তারা একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা নিয়োগ করে এই চিঠির রহস্য খুঁজে বের করতে এবং কেতুচকিতে পাঠানো হয়। কিন্তু গোয়ান্দা যেন নিজেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তাকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি।

নিখোঁজ সন্তানের খোঁজ করতে করতে ১৯৬৯ সালে মারা যান মি,সোডার। এরপর নিজের আশেপাশে এক দেয়াল তৈরী করে ফেলেন তার স্ত্রী। সন্তান হারানোর শোক তারা কখনো ভুলতে পারে নি। এভাবে মনে কষ্ট নিয়েই ১৯৮৯ সালে মারা যান মিসেস সোডার। আর কোন খোঁজ পাননি তাদের বাচ্চাদের। আদৌ কি তারা বেঁচে ছিল? কি হয়েছিল তাদের পরিণতি? কারো জানা নেই।

গল্পের বিষয়:
ইতিহাস
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত