আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট

আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট

চাঁদে নাকি বসত গড়বে মানুষ। মঙ্গল গ্রহে চলছে জরিপ। পৃথিবী জয় করে মানুষ এখন হাতের মুঠোয় পুরতে চাইছে বিশ্বজগত। কিন্তু এখনো এমন কিছু রহস্য আছে, যেগুলো যুগ যুগ ধরেই অমীমাংসিত। আবার কোনোটার মীমাংসা হয়ে গেলেও কিছু লোক সমাধান মানতে নারাজ। সেই সব রহস্যগুলোর মধ্যে অন্যতম এই ‘আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট’ রহস্য! ইন্ডিয়ানা জোনসের ‘রেইডার অব দ্য লস্ট আর্ক’ ছবিটার কথা মনে আছে? ছবির গল্পের শুরু ১৯৩৬ সালে। ‘ট্রেজার হান্টার’ ইন্ডিয়ানা জোনস পেরুভিয়ান জঙ্গলে জটিল ধাঁধার এক মন্দির থেকে উদ্ধার করেন একটা সোনার মূর্তি। যদিও সেটি দস্যুদের হাতে পড়ে ফিরে আসে আমেরিকায়। জোনস জানতে পারেন, হিটলারের নাৎসি বাহিনী খোঁজ করছে ‘আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট’-এর।

কিন্তু এই ‘আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট’ বস্তুটা কি আসলে কি? জিনিসটা একটা সিন্দুক, যা ঈশ্বরের নির্দেশে ধর্মযাজক জ্যাকবের (ইসলাম ধর্ম অনুসারে হজরত ইয়াকুব আ.) বারো বংশধর নির্মাণ করেছিল। আর সেই সিন্দুকে তারা সযতেœ রেখে দিয়েছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত ১০টি অনুশাসনের বাণী। বলা হয়, যার কাছে এ মহামূল্যবান ও পরম পবিত্র সিন্দুকটি থাকবে, তিনি মালিক হবেন পৃথিবীর সব শক্তির। সেই সিন্দুক নিয়েই জোনস আর নাৎসি বাহিনীর মধ্যে চলে নানা অভিযান, যুদ্ধ আর হানাহানি। কিন্তু আসলে কোথায় সেই আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট? এ রহস্যের আসলেই শেষ নেই। বাইবেলে বলা হয়েছে, সিন্দুকটি আসলেই বানানো হয়েছে ঈশ্বরের নির্দেশে। অ্যাকাসিয়া নামের মিসরের একটি পবিত্র গাছের কাঠ দিয়ে নির্মিত সিন্দুকটি পরে সোনা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়েছে। সিন্দুকটি লম্বায় ১.১৫ মিটার, প্রস্থে ০.৭ মিটার আর উচ্চতায় ০.৭ মিটার। সিন্দুকটি বহন করে নেয়ার জন্য আছে দুটি হাতল। নির্মাণের পর থেকে বহু বছর ইহুদিরা এটি তাদের কাছে সযতেœ রেখেছিল। যখন ইহুদিরা ‘ল্যান্ড অব ক্যানানে’ এসে পৌঁছায়, তখন তাদের পথ দেখিয়েছে এ সিন্দুক। এই সিন্দুকের জন্যই জর্দান নদী দুই ভাগ হয়ে রাস্তা করে দিয়েছিল তাদের। রাজা ডেভিড (হজরত দাউদ আ.) ও তার ছেলে সলোমন (হজরত সুলায়মান আ.) জেরুজালেমে স্থানান্তর করে সিন্দুকটিকে একটি মন্দিরে রেখে দেন। বহু বছর পর ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুচাঁদনেজার ধ্বংস করে ফেলেন মন্দিরটি। তারপর যে কী হল তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। অনেকে বলেন, ব্যাবিলন সভ্যতাই সিন্দুকটি তার কাছে রেখে দিয়েছে। অনেকে আবার বলেন, সলোমন নিজেই সিন্দুকটির এমন ভবিষ্যৎ আন্দাজ করতে পেরে ‘ডেড সি’র কাছে একটি গুহায় সযতেœ রেখে দিয়েছিলেন।

ইথিওপিয়ান খ্রিস্টানরা দাবি করে, সিন্দুকটি আসলে ইথিওপিয়ার অ্যাজিউমে সংরক্ষিত আছে। প্রতœতাত্ত্বিক লিন রিটমেয়ার গবেষণা করে বলেন, সিন্দুকটি রক্ষিত আছে টেম্পল মাউন্টে। এ কথা ঠিক যে নির্মাণের বহু বছর সিন্দুকটি জেরুজালেমে থাকলেও হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। এ শতাব্দীতে এসে নাকি সিন্দুকটির খোঁজও মিলেছে। যদিও এ নিয়ে কেউই কোনো কথা বলতে চায় না। তাই রহস্যগুলো আরো যেন জটিল হতে থাকে। অতীতের কথা ফেলে এখনকার কথা বলি। কোথায় আছে তবে সেই ‘আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট’? এ নিয়েও দাবির শেষ নেই। প্রথম দাবিটি জেরুজালেমের ‘টেম্পল মাউন্টের’। আরেকটি দাবি ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চের। তাদের ‘চার্চ অব আওয়ার লেডি মেরি অব জিউন’-এ সংরক্ষিত আছে আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট।

দক্ষিণ আফ্রিকা আর জিম্বাবুয়ের লেম্বা সম্প্রদায়ের দাবি যে তাদের পূর্বপুরুষরাই সিন্দুকটি বহন করে নিয়ে এসেছে। ২০০৮ সালে ‘চ্যানেল ফোর’ এ নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও প্রচার করে। ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডেরও এ নিয়ে দাবি কম নয়। আজো প্রতœতাত্ত্বিক ধর্মীয় যাজকদের আর্ক অব দ্য কোভেন্যান্ট নিয়ে অনুসন্ধানের শেষ নেই। বলা হয়, প্রতিবছর শুধু একবার প্রধান ধর্মযাজক পবিত্র প্রাণীর রক্ত হাতে মেখে দেখতে পারবেন সিন্দুকটি। ভ্রষ্টচারী বা কোনো পাপী কোনোভাবেই স্পর্শ করতে পারে না সিন্দুকটি। এমনকি সিন্দুকটি দেখারও অনুমতি নেই। ইতিহাসে আছে, যখনই সে চেষ্টা করেছে, সে-ই ঈশ্বরের কাছ থেকে পেয়েছে কঠিন শাস্তি। তবু বৈজ্ঞানিক মনের মানুষজাতির গবেষণার শেষ নেই। রহস্য অবশ্য রহস্যই থেকে যায়। মানুষ যতই এগিয়ে যায়, ততই আরো জটিল হতে থাকে কোথায় আছে সেই ঈশ্বরের সিন্দুকটি?

গল্পের বিষয়:
ইতিহাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত