পেয়েও না পাওয়া

পেয়েও না পাওয়া

১.

ভোরের ঠাণ্ডা বাতাসের অনুভূতিই অন্য রকম । ভোরের বাতাস গায়ে লাগলে মন এবং শরীর দুটোই পবিত্র পবিত্র লাগে । সেই ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যে দিয়ে রিয়ান হেঁটে হেঁটে বাসায় যাচ্ছে । বাতাসের বেগে ওর পাঞ্জাবি হাওয়ায় উড়ছে । রিয়ান মাথার টুপিটা ঠিক করে পড়ে নিলো । তারপর হাঁটার বেগ বাড়িয়ে দিল । কিছুক্ষণ যেতেই রাস্তায় একটা ছবি পড়ে থাকতে দেখল রিয়ান । কি মনে করে ছবিটা হাতে তুলে নিলো । একটা মেয়ের ছবি । প্রায় ওর সমান বয়সেরই হবে । ওর নিজের বয়স নয় (৯) । এই মেয়ে ওর থেকে বড় কখনোই হবে না । বয়স বেশি হলে সাত বা আট হবে । পবিত্র একটা মুখ মেয়েটার , হাসিটায় একটা অপার্থিব রকমের সচ্ছলতা । লম্বা চুলের একগুচ্ছ গালের উপর পড়ে আছে । রিয়ান ওর চোখ ছবিটা থেকে ফেরাতে পারেনা । তারপর এদিক ওদিক তাকাল ছবিটার মালিকের খোঁজে । ধারে কাছে কাউকে দেখা গেলো না । নিজের অজান্তেই রিয়ান ছবিটাকে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল । ছবিটাকে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে আবার হাঁটা দিল । কোন এক অজানা কারণেই রিয়ানের মনে অজানা অনুভূতির একটা ধীর্ঘ স্রোত বয়ে যেতে থাকল ।

২.

সন্ধ্যাবেলা রিয়ান পড়তে বসেছে । মা ওকে পড়াচ্ছিলেন । মা একটু রান্নাঘরে যাবার সুযোগেই রিয়ানের ছবিটার কথা মনে পড়ল । রিয়ান জলদি করে ওর পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছবিটা বের করে আনল ।

তারপর অপলক দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল । কোনভাবেই চোখ ফেরানো যায় না ছবিটা থেকে । কিন্তু চোখ ফেরাতে হল । মা রান্নাঘর থেকে চলে এসেছেন । তাই রিয়ান ছবিটাকে ওর হাতের কাছে থাকা বাংলা বইয়ের ভেতর তাড়াতাড়ি করে লুকিয়ে ফেলল । মা আবার অঙ্ক কষানো শুরু করেছেন ।

৭ টা আপেল আর ১০ টা কমলালেবু একটা ঝুড়িতে ………… কিন্তু রিয়ানের মন এখন ওর বাংলা বইয়ের কোন এক পাতায় ।

৩.

১২ বছর পরঃ আজ রিয়ানের বয়স ২১ বছর । রিয়ানের বাবার অবস্থা ভাল না । তাই রিয়ানের পরিবার থেকে চাপ জলদি বিয়ে করার জন্য । অবশ্য পাত্রী ঠিকই করা ছিল । শুধু জানার ছিল রিয়ানের মতামত । রিয়ানের না করার কোন কারণ ছিল না । তবে ওই ছবিটা রিয়ানের মনে একটু কষ্ট দিয়েছিল । ছোটবেলায় রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ওই ছবিটার কথা আজ ১২ বছর পরও রিয়ান ভুলতে পারেনি । কি জানি কি একটা যাদু করে দিয়েছে ছবিটায় । কিন্তু ওই ছবিকে ভুলতে হবে। কোনোদিন যাকে দেখা হয় নাই তাকে আর যাই হোক ভালবেসে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়া যায় না , কে জানে ওই মেয়ে এখন কোন দেশে কোন জায়গায় আছে ! মেয়ের বাড়ি যেতে আরো কিছুটা সময় বাকি আছে । এই ফাকে রিয়ান ছবিটাকে শেষবারের মত দেখে নিতে চাইল । ছবিটাকে হাতে নিলো । এখনও সেই আগের মতই সুন্দর রয়ে গেছে ছবিটা । সেই হাসিটা এখনও ওই নিষ্পাপ মুখে লেগে আছে । চুলগুলো এখনও আগের মতই লাবণ্যময় । রিয়ান এই প্রথম ছবিটার সাথে কথা বলল ।

” এই মেয়ে তুমি কোথায় ? তুমি এত সুন্দর কেন ? এখন দেখতে তোমাকে কেমন লাগে ? তুমি কি আরো সুন্দর হয়েছ ? নাকি একটু মোটা হয়ে গিয়েছ ? তুমি কি জানো কেউ একজন তোমার একটা ছবি ১২ বছর ধরে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে ? ওই ছবির কথা একবারও মনে পড়ে না ? একবার না হয় ছবিটা নিতে আসতে তাহলে তোমাকে বলতে পারতাম আমি তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম ৯ বছর বয়সেই । কিন্তু কি আর করার তুমি তো তুমিই । তুমি ছবি নিতে আসলে না , আর আমারও প্রেম নিবেদন করা হল না । আজ কিছুক্ষণ পর আমার বিয়ে । তাই তোমাকে এখন থেকে আর দেখতে পারবনা । তোমাকে এখন থেকে আমার গোপন ট্র্যাঙ্কে থাকতে হবে । ” কথাগুলো বলে রিয়ান ছবিটাকে ট্র্যাঙ্কে রেখে দিয়ে কন্যাপক্ষের বাড়ির দিকে রওনা দিল । মনের মধ্যে থেকে গেলো এক অজানা অতৃপ্তি ।

৪.

দুই বাচ্চার মা বাবা , একটা চালের ব্যবসা সাথে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের বাসা । এই হল রিয়ান এবং জেনিয়ার সংসার । সব কিছুই আছে তবুও কিছু একটা নেই ওদের মধ্যে । নেই সেই বুঝাপড়াটা , নেই সেই ভালবাসাটা । সপ্তাহে একদিন ঝগড়া না করলে ওদের হয় না । গত সপ্তাহে ঝগড়া এমন পর্যায়ে পৌছায় যে একজন আরেকজনকে আঘাত করতে শুরু করেছিল । তাই দুইজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ওদের তালাক হয়ে যাওয়াই ভাল । এতে দুজনেরই সুবিধা হয় । কেউই আর ঝামেলায় থাকবেনা । যার যার জীবন নিজের মত করে থাক । তবে ৭ বছরের সংসার জীবনে যে ওরা একবারও একজন আরেকজনকে বুঝতে পারলনা তা নিয়ে দুজনেরই আফসোস হয় । কিন্তু কি আর করা ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডন । আজ জেনিয়া বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে । ওর কাপড় গোছাচ্ছে ব্যাগে । সাথে বাচ্চা দুইটার কাপড়ও । ঘরের কোনোকোনোয় যা কিছু ছিল তার সবকিছু ব্যাগে গোছাচ্ছে । আজ রিয়ানের মনে হল ঘরের সব জিনিস জেনিয়ার , রিয়ান সারাজীবন কিছুই কামাই করেনি । সব খোঁজে শেষ হওয়ার পর জেনিয়া রিয়ানের গোপন ট্র্যাঙ্কের সন্ধানও পেল । লুকিয়ে লুকিয়ে জেনিয়া ট্র্যাঙ্কটা খুলে ফেলল । অবাক বিষয় এই যে ট্র্যাঙ্কে কোন তালা দেয়া নেই । হয়তো তেমন মূল্যবান কিছু নেই এই জন্য তালাহীন । সব কিছু ঘাটতে লাগল জেনিয়া । একটা পুরানো কবিতার বই , একটা ছেরা খাতা , স্কুলের ম্যাগাজিন এবং আরো অনেক কিছু । জেনিয়া কখনও জানত না যে রিয়ান কবিতা এত পছন্দ করে ।ওর লেখা কবিতাগুলো পড়ে জেনিয়া মুগ্ধ হয়ে গেলো । যে মানুষটা এত সুন্দর কবিতা লেখতে পারে , সে কিভাবে জেনিয়াকে এত কষ্ট দিতে পারে জেনিয়া সে কথা চিন্তা করতে থাকে আর ট্র্যাঙ্কে আবার হাত লাগায় । এবার একটা ছোট খাম পায় । খামটা আঠা দিয়ে লাগানো । মনে হয় অনেক পুরানো জিনিস । খামের ভেতর একটা ছোট মেয়ের ছবি । মুখটা অনেক পরিচিত মনে হচ্ছে জেনিয়ার কাছে । কোথায় যেন দেখেছে ! আরে ! জেনিয়া দৌড়ে রিয়ানের কাছে গেলো ।

” রিয়ান , এই রিয়ান । তুমি কোথায় ? আমার ছোটবেলার এই ছবি তুমি কোথায় পেলে ? আর এতদিন ধরে এটা তোমার ট্র্যাঙ্কে কি করছিল ? ” বলে জেনিয়া তার চুলগুলো গালের উপর থেকে সরিয়ে দিল ।

লিখেছেন – একলা চাঁদ |

গল্পের বিষয়:
ইতিহাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত