মধ্যযুগের ভয়ঙ্কর ১১ মৃত্যুদণ্ড

মধ্যযুগের ভয়ঙ্কর ১১ মৃত্যুদণ্ড

ধ্যযুগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ভয়াবহভাবে হত্যা করা হতো। হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতিগুলো এতই পৈশাচিক ছিলো, যা নির্মমতার মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। তাই বর্তমানেও নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে তুলনা করা হয় মধ্যযুগের বর্বরতার সঙ্গে। তখনকার সেই হত্যাকাণ্ডের কথা শুনলে যে কারও গা শিউরে ওঠে। মধ্যযুগের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হত্যাকাণ্ডের ১১ পদ্ধতি নিয়ে আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

চার্লিম্যাগ্নি

মধ্যযুগ হলো ইউরোপীয় ইতিহাসের একটি সময়কাল। ৪৭৬ থেকে ১৪৯৩ সাল পর্যন্ত মধ্য যুগ ধরা হলেও মূলত ৪৭৬ থেকে ৮০০ সালকে বোঝানো হয় মধ্যযুগ। যে সময়ে চার্লিম্যাগ্নি সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তিনি ৭৭৪ সালে ইতালির রাজা হন। মধ্যযুগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের যে ১১ পৈশাচিক পদ্ধতিতে হত্যা করা হতো-

১, সিদ্ধ করে হত্যা (Death by Boiling) : 
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে প্রথমে একটি পানি ভর্তি পাত্রে রাখা হতো। এরপর পাত্রের নিচে আগুন দিয়ে পানি গরম করে ধীরে ধীরে সিদ্ধ করা হতো। বন্দির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত পানি ফোটানো হতো। পাশবিক এ মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতি যুক্তরাজ্যে চালু ছিলো ১৫০০ শতক পর্যন্ত।

২,ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যা (Crucifixion) : 
মৃত্যুদণ্ডের এ পদ্ধতি যিশু খ্রিস্টকে হত্যার পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রচলিত হয়। একটি ক্রুশে বন্দির হাত-পায়ে পেরেক ঠুকে বিদ্ধ করা হতো। এরপর বন্দিকে খোলা যায়গায় ছেড়ে দেওয়া হতো। রক্তক্ষরণে মারা যেত বন্দি। রক্তক্ষরণে কারো মৃত্যু না হলেও ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তিনি মারা যেতেন। অনেকে তীব্র ঠাণ্ডায় জমে মারা যেতেন।
ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যা

৩, চামড়া ছাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড (Flaying) : 
এ পদ্ধতিতে বন্দি মারা যাওয়ার আগে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতেন। জীবন্ত অবস্থায় ধীরে ধীরে বন্দির সমস্ত শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হতো। কষ্ট বাড়ানোর জন্য মাঝে মাঝে উন্মুক্ত স্থানে লবণ মাখানো হতো। এটি ছিলো একটি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সার্বজনীন পদ্ধতি।

৪,অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে হত্যা (Disembowelment) :
চুরি ও ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে এ শাস্তির প্রচলন হয়েছিলো। ইংল্যান্ডে এ শাস্তির রেওয়াজ চালু হয়। দোষীর দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধারালো ছুরি দিয়ে একে একে বিচ্ছিন্ন করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো।

৫,ক্যাথরিনের চাকা (Breaking Wheel) : 
এ পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে একটি চাকার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা হতো। এরপর চাকাটি খুব জোরে ঘোরানো হতো। তখন জল্লাদ ঘূর্ণায়মান ব্যক্তির শরীরে চাবুক বা লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করতে থাকতো। এরপর জল্লাদ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির হাতে ও পায়ে পেরেক ঠুকে দিতো। পুনরায় চাবুক ও লাঠি দিয়ে আঘাত করতো জল্লাদ। এরপর পেরেক ঠোকা অবস্থায় ওই ব্যক্তিকে শহরের মাঝে জনসমক্ষে ঝুলিয়ে রাখতো, যাতে সবাই এ নির্মমতা দেখতে পায়।

৬, শূলে চড়িয়ে মৃত্যু (Impalement) : 
এ পদ্ধতিতে বন্দির হাত-পা বেঁধে সূচালো একটি দণ্ডের ওপর বসিয়ে দেওয়া হতো। বন্দি তার নিজের শরীরের ভারে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে যেত। অনেক সময় খুঁটিটির মাথা সূচালো না করে ভোঁতা রাখা হত যাতে হৃৎপিণ্ড বা অন্যান্য প্রধান অঙ্গ বিদ্ধ হয়ে তাড়াতাড়ি মারা না যায়। এতে অপরাধী বেশি কষ্ট পেত। এ পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে অনেক সময় এক থেকে দু’দিন সময় লাগতো।

প্রথম শূলে চড়ানোর ইতিহাস পাওয়া যায় প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে। তখন রাজদ্রোহীদের শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। তৎকালীন পারস্যের রাজা প্রথম দারিউস ব্যাবিলন জয় করার পর প্রায় ৩ হাজার ব্যাবিলনবাসীকে শূলে চড়িয়েছিলেন। শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য বেশি কুখ্যাত ছিলেন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ওয়ালেশিয়া রাজ্যের যুবরাজ তৃতীয় ভ্লাদ, যাকে বলা হয় ড্রাকুলা।

৭, হাতির পায়ে পিষ্ট করে মৃত্যু (Crushing) :
মৃত্যদণ্ড কার্যকর করার এই পদ্ধতি কিন্তু সুদূর কোনো দেশের প্রচলিত পদ্ধতি নয়। বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদ্ভাবিত। এ পদ্ধতিতে বিশাল আকৃতির হাতি তার পা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাথা থেঁতলে দিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার হাতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, যাতে সে ধীরে ধীরে পায়ের চাপ বাড়ায়। যাতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ কষ্ট ভোগ করে মৃত্যুর সময়।

৮,পুড়িয়ে হত্যা (Death by Burning) : 
এ পদ্ধতিতে প্রথমে বন্দি ব্যক্তির পায়ে, তারপর উরু, নিম্ন উদর, বুক, ঘাড় ও সবশেষে মাথায় আগুন দেওয়া হতো। বন্দি ব্যক্তি মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সীমাহীন যন্ত্রণা ভোগ করতেন। জোয়ান অব আর্ককে (১৪১২-১৪৩১) এ পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়।

জোয়ান অব আর্ক

পূর্ব ফ্রান্সের একটি সামান্য কৃষকের ঘরে জন্মানো জোয়ান ফরাসী সেনাবাহিনীর জন্য বিরল যুদ্ধজয় এনে দিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই ফ্রান্স জিতে নেয় তাদের বেহাত হয়ে যাওয়া ভূমি। তিনি সপ্তম চার্লসের ক্ষমতারোহনের পেছনেও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশের জন্য এতো গৌরব বয়ে আনা সত্বেও তাকে বার্গুনডিয়ানরা আটক করে ইংরেজদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে একটি খৃষ্টান আদালতের রায়ে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। সে সময় তার বয়স ছিলো মাত্র ১৯ বছর। ১৪৩১ সালের ৩০ মে তাকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর ২৪ বছর পর সপ্তম চার্লসের উদ্যোগে পোপ তৃতীয় ক্যালিক্সটাস তার পুনর্তদন্তে জোয়ানকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেন। তখন তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়।

৯,করাতে কেটে মৃত্যুদণ্ড (Sawing) : 
এই পদ্ধতি আগে চালু ছিলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। এক্ষেত্রে মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে উল্টো করে দুই পা দুই দিকে ফাঁক করে বেঁধে রাখা হতো। এরপর মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির যৌনাঙ্গ বরাবর করাত রেখে দেহকে মাঝ বরাবর কেটে ফেলা হতো। আর উল্টো করে ঝোলানোর কারণে ব্যক্তিটির মস্তিষ্ক যথেষ্ট পরিমাণ রক্ত পেতো, যাতে তিনি শরীরের মাঝ বরাবর কেটে ফেলার ব্যথা সম্পূর্ণটাই অনুভব করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কাটার আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকতো বন্দি।

১০, লিং চি (Ling Chi) :
মৃত্যুদণ্ডের এ পদ্ধতিটি চিনে চালু ছিলো। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে লোকালয়ে এনে বেঁধে ফেলা হতো। এরপর একজন জল্লাদ বিশেষ ছুরি দিয়ে ওই ব্যক্তির দেহ থেকে বিভিন্ন অঙ্গ ধীরে ধীরে আলাদা করে ফেলতো। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি যাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে অধিক যন্ত্রণা ভোগ করে।

১১,নির্লজ্জ ষাঁড় (Brazen Bull) :
নির্লজ্জ ষাঁড় বা Brazen Bull পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আরেকটি অমানবিক পদ্ধতি। সিসিলির স্বৈরশাসক Akgragas এই পদ্ধতি প্রথম চালু করেছিলেন। পরামর্শদাতা ছিলেন তৎকালীন ধাতু কারুকার্যকর প্রিলিয়স (Prilios)। ধাতু দ্বারা নির্মিত এই ষাঁড়কে অনেক বড় করে বানানো হতো। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ওই ষাঁড়ের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে পেটের নিচে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। এর ফলে ষাঁড়ের ভিতরে থাকা ব্যক্তি সরাসরি আগুনে না ঝলসে আগুনের গনগনে তাপে ঝলসে যেত। ষাঁড়টিকে এমনভাবে নির্মাণ করা হতো, যাতে ভেতরে পুড়তে থাকা ব্যক্তির চিৎকার শুনে মনে হতো, ষাঁড়টি যেন চিৎকার করছে। পুড়তে থাকা ব্যক্তির পোড়া ধোঁয়া ষাঁড়ের নাক দিয়ে বেরিয়ে আসতো।

গল্পের বিষয়:
ইতিহাস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত