পিসীমার পোষা বাঘ

পিসীমার পোষা বাঘ

আমার স্কুলের বন্ধুরা বিশ্বাস করে না, কিন্তু তোমরা ভাই নিশ্চয় করবে। আমার পিসীমার বাড়িতে একটা পোষা বাঘ আছে। সত্যিকারের বাঘ-পটুদা স্বচক্ষে দেখেছে। বাঘটা বাড়িতেই থাকে। চেন-টেন দিয়ে বাঁধা নয়, একেবারে খোলা। ঘরের কাজকর্ম করে। পিসীমারই ঘরের মেঝেয় মাদুর পেতে শোয় রাত্তিরবেলা।

পিসীমা বলেন, ঘুসুড়ির মহারাজা রায়বাহাদুর নিঃশেষ চোধুরী বাঘটা তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৌঠান আমরা নিমিত্ত মাত্র এ শিকার আপনার প্রাপ্য। আসলে স্বর্গত পিশেমশায়ের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন মহারাজা। তাঁর লন্ড্রিতে মহারাজার সমস্ত খাকির জামা-প্যান্ট, ধুতি পাঞ্জাবি ধোলাই হতে আসতো। সেই সুবাদে ঘনিষ্ঠতা কিন্তু পটুদা বলে, ওটা পিসীমার বিনয়। সত্যি খবর তো চাপা থাকে না। চার-পাঁচ বছর আগের ঘটনা। পিশেমশাই তখন বেঁচে নেই।

একদিন মহারাজা আপিশ-ফেরত পিসীমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বললেন, সুন্দরবনে শিকার করতে যাচ্ছি, যদি বাঘে খায় তাহলে আর ফিরব না। তাই ভাবলাম-! পিসীমা বললেন, আমাকেও নিয়ে চলো না ঠাকুরপো, সুন্দরবনে কখনো যাইনি। না জানি কী সুন্দর জায়গা!
মহারাজা নিঃশেষ চৌধুরী তো শুনে আকাশ থেকে পড়লেন। সে কী করে সম্ভব। শিকারে গেলে যে খাকির হাফ প্যান্ট পরতে হয়।
পিসীমা বললেন, সে আমি লন্ড্রি থেকে একটা বেছে নেবো।
-খাকির হাফ শার্ট?
-যোগাড় হয়ে যাবে।
-চামড়ার বেল্ট?
-তোমার দাদার একটা আছে। আমায় ফিট করবে।
মহারাজা বললেন, বন্দুক তো আমার আছে, আপনি তো চালাতে জানেন না! শেষকালে একজন মহিলা বেঘোরে-
পিসীমার ভালো নাম জগদম্বা। তিনি এত অল্পে ছাড়বার পাত্রী নন। বললেন, যেতে-যেতে শিখে নেবো।

নৌকো থেকে নেমে, সারাদিন হেঁটে, গ্রাম-ট্রাম ছাড়িয়ে ওঁরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকলেন। মানুষের পায়ের শব্দে মশারা ভনভন করে উঠলো, পাখিরা কিচমিচ করে উঠলো, বাঁদরেরা খঁ্যাক খঁ্যাক করে উঠলো। কাঁটা লেগে হাঁটুর চামড়া ছিঁড়ে গেল মহারাজার। হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে উঠল ওঁদের সঙ্গী হাবিলদার হৃদ্কম্ সিং। পিসীমার ভ্রূক্ষেপনেই। গ্রামের যে লোকটা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তাকে শুধু একবার জিগ্যেস করলেন, বাঘের গন্ধ পাচ্ছি না যে!
লোকটা বললো, টোপ রাখা থাকবে আপনাদের মাচানের নিচে, গন্ধ পেয়ে রাত্তিরে এক সময় ঠিক এসে পড়বে দেখবেন হুজুর।
-কিসের টোপ? পিসীমা জানতে চাইলেন।
লোকটা বললো, ছাগল।

মাচানের ওপর তিনজন, মাচানের নিচে ছাগলটা। সারা রাত অপেক্ষা। বাঘ-টাঘ এল না। পিসীমা ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছেন। হাবিলদার হৃদ্কম্ সিং-এর যতোবার নাক ডেকেছে, পিসীমা বকুনি দিয়েছেন-শাট আপ! ছাগলটা দু একবার ব্যা-ব্যা করে উঠেছিল, পিসীমা তাকেও বকেছেন ওপর থেকে-শাট-আপ!

এই ভাবে ভোর হয়ে গেল। গভীর জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে বন্দুকের গুলির মতো নিঃশব্দে সূর্যের আলো এসে বিঁধলো একটা দুুটো। জপ করতে করতে পিসীমা হঠাত্ লক্ষ করলেন, ছাগলটা কাত্ হয়ে পড়ে আছে। জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে, চোখ দুটো খোলা। তার মানে, ঘুমোয় নি, আবার বেঁচেও আছে। বুঝলেন, ছাগলটার মাথা ধরেছে। কারুর জন্য অনেকক্ষণ ধরে ওয়েট করলে মাথা ধরে ওঠে, পিসীমা জানেন।
দুটো হাঁটুর মাঝখানে ছোট আয়না রেখে ঘুসুড়ির মহারাজা দাড়ি কামাচ্ছিলেন। একটা গাল তখন বাকি, এমন সময় তিনি ফিশফিশ করে চেঁচিয়ে উঠলেন, ওই তো, ওই দিকে!

পিসীমা দেখলেন, হৃদ্কম্ সিং দেখলো, একটু দূরে আলোছায়া মতো কী একটা নড়ছে। এগিয়ে আসছে আস্তে আস্তে। মৃদু মৃদু বোটকা গন্ধ ধূপের ধোঁয়ার মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে জায়গাটায়।
মাথা-ধরা থেকে ছাগলটা লাফিয়ে উঠলো।

হৃদ্কম্ সিং বগলের বন্দুকটা বাগিয়ে ধরেছে টাইট করে। মহারাজার একটা দোনলা বন্দুক। আর একখানা পিসীমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
পিসীমার হাত জোড়া। জপ শেষ হয়নি তখনও। বললেন, এখন থাক।
যেই না বাঘের উঁচু করা লেজটা দেখা গেছে আর অন্য দুজন ওর মাথার দিকে টিপ ঠিক করছেন, এমন সময় পিসীমা চিত্কার করে উঠলেন, লজ্জা করে না? অসভ্য!

বাঘটা থতমত খেয়ে প্রথমে এদিক-ওদিক, তারপর মাচানের ওপরে বসা পিসীমার রাগী এতবড়ো মুখখানার দিকে চেয়ে দেখলো।
পিসীমা আবার গর্জন করে উঠলেন বনের রাজা তুমি, ন্যাংটো হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? লজ্জা করে না! ছিঃ!
এবারে বাঘটা লেজের ওপর বসে পড়ল চুপ করে। মাথা নিচু। কারুর বুঝতে বাকি রইল না, ও খুব লজ্জা পেয়েছে।
পিসীমা তরতর করে মাচান থেকে নামলেন। তারপর কান ধরে বাঘটাকে হিড় হিড় করে টানতে টানতে এদিকে নিয়ে এলেন। হেঁকে বললেন, হৃদকম্পো, একগাছা দড়ি দাও।

হৃদ্কম্ সিং দূর থেকে দড়ি গাছা ছুঁড়ে দিল। মহারাজা নিঃশেষ চৌধুরী আর পিসীমা দুজনে মিলে বাঘটাকে জমপেশ করে বাঁধলেন।
জেনুইন রয়্যাল বংগাল আছে, হৃদ্কম্ সিং বললো, তা না হলে বাংলা কথা বোঝে!
আঁচলের অভাবে শুধু হাত দিয়েই নাক চাপা দিলেন পিসীমা। বাঘটার দিকে তাকিয়ে আবার ধিক্কার দিলেন, কী দুর্গন্ধ, বাপ্, চল্, তোকে আগে সাবান দিয়ে চান করাবো। মহারাজা বললেন, এ শিকার আপনারই প্রাপ্য। আপনি বাড়ি নিয়ে যান বৌঠান।

দুই

পটুদা নিজের মুখে আমায় বলেছে, তোমরা বিশ্বাস করো, যে মাধাই একদম বদলে গেছে এখন। মাধাই সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নাম।
পিসীমা রোজ ওকে চান করিয়ে দেন। শীতকালে গরম জল দিয়ে আর গরম কালে ঠান্ডা জল দিয়ে দুবেলা। রোজ সকালে দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজিয়ে দেন। প্রত্যেক রবিবার পিসীমা নিজে নখ কাটেন, মাধাইএরও নখ কেটে দেন। চান করার পর বাথরুম থেকে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে ওকে প্যান্ট পরতে হয়, ও আপত্তি করে না। পাড়ার লোকেরা বলে, জগদম্বা দেবী যেভাবে মাধাইকে মানুষ করেছেন, নিজের ছেলেকেও কেউ তা পারে না।

অবশ্য মাধাইয়ের মতো ছেলেও আমাদের দেশে খুব বেশি নেই। আমরা খেতে বসে কতরকম বায়না করি। পটল খাব তো বেগুন খাবো না। দুধ খাবো তো সর খাবো না। অড়হর ডালে বিচ্ছিরি গন্ধ, কলাইয়ের ডাল কেমন নাল-মাখা, ঘেন্না করে। তাই না?

অথচ মাধাই, রয়েল বেঙ্গল বাড়ির ছেলে, নাকি সব খায়। পটুদা স্বচক্ষে দেখেছে, পিসীমার পাশে বসে ও ঝিঙ্গেপোস্ত দিয়ে ভাত কী রকম চেটে-পুটে খায়। একাদশীর দিন ফলমূল খেয়ে থাকতে ওর একটুও অসুবিধে হয় না। শুধু মাঝে মাঝে যখন ওর দাঁত সুড়সুড় করে হাড় চিবোবার জন্যে, তখন পিসীমা ওকে এক টুকরো আখ খেতে দেন। ও তাতেই খুশী। তোমরা স্বীকার করবে, মানুষ হয়ে জন্মালে মাধাই দেশের মুখ উজ্জ্বল করতো।
আমি নিজেও মাধাইকে দেখেছি। যেদিন ক্যালেন্ডার দিতে গিয়েছিলাম। ইংরেজী-বাংলা দু-রকম তারিখ দেওয়া ক্যালেন্ডার পিসীমার কাজে লাগে। এবছর কাগজের অভাবে তো খুব কমই ছাপা হয়েছে। তবু বাবা অনেক কষ্ট করে তিনটে ক্যালেন্ডার ম্যানেজ করতে পেরেছিলেন। তার মধ্যে একটাতে ছিল প্রকাণ্ড বাঘের মুখ। কোনো কাগজকলের ক্যালেন্ডার। ভাবলাম, পিসীমাকে দিয়ে আসি, উনি তো বাঘ ভালোবাসেন।
পেয়ে তো পিসীমা খুব খুশী। তখনই দেয়ালে টাঙিয়ে দিলেন। আমায় বাড়ির তৈরী সন্দেশ খাওয়ালেন। বললেন, কতিদন পরে এলি! পিসিকে একেবারে ভুলে গেছিস তোরা।

আমি বললাম, আসল কথা তা নয় পিসীমা। আসতে আমার ভয় করে। আপনার পোষা বাঘটা যদি-
-কে, মাধাই? কী যে বলিস! ওর মতো ছেলে হয় না।
–তারপর ভেতরের দরোজার দিকে মুখ ঘুরিয়ে খুব আদরের গলায় ডাকলেন, বাবা মাধাই, এদিকে আয় তো একবার।
মিউ করে একটা শব্দ এল ভেতর থেকে।
পিসীমা বললেন, হাতের কাজ সেরেই আয়।
তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, ঘর মুছছে, এখুনি আসবে। দেখবি, কী শান্ত ছেলে ও।
একটু পরে দরোজার পর্দা ফাঁক করে যে ঢুকলো তাকে দেখে আমি অবাক। একটা শাদা রঙের বেড়াল; সাধারণ বেড়ালের চেয়ে একটু বড়ো। পরেন একটা ঢলঢলে জাঙিয়া। লম্বা লেজ, তার ডগায় একটা ভিজে ঝাড়ন জড়ানো। ঢুকে একবার পিছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করলো, পারলো না। তারপর পিঠ সোজা করে বসলো পিসীমার পায়ের কাছে। অনেকিদন নিরামিষ খাওয়ার ফলে বাঘটার চেহারায় একটা স্নিগ্ধ ভাব ফুটেছে।

বসে বসেই সামনের দেওয়ালে টাঙানো নতুন ক্যালেন্ডারটার দিকে চোখ পড়ল ওর। অনেকক্ষণ চেয়ে রইলো একদৃষ্টে ছবির হিংস্র মুখটার দিকে। ঝাড়ন বাঁধা লেজটা মেজেতে ঝাপটালো দু বার। ওর পেটের ভেতর থেকে কেমন গরগর গরগর করে একটা শব্দ উঠে আসছে, আমার মনে হোল।
তারপর দেখলাম, শব্দ নয়, জল। ওর চোখ দুটো দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
পিসীমা মাধাইকে কোলে তুলে নিলেন। ওর পরিস্কার শাদা লোমে, নখহীন থাবায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। ওর দাঁতন দিয়ে মাজা পরিচ্ছন্ন মুখটার কাছে মুখ এনে চুমো খেলেন। বললেন, লক্ষ্মী, সোনা আমার। যাও, ভেতরে যাও। তারপর ক্যালেন্ডারটা নামিয়ে নিলেন দেয়াল থেকে।

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত