বেশ্যা মন

বেশ্যা মন

প্রিয়ন্তিকা আমার বন্ধু আশিকের গার্লফ্রেন্ড কিন্তু আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকায়।

আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি এটা আমার মনের রোগ। প্রিয়ন্তিকা কেন আমার দিকে তাকাবে? আমার দিকে তো ওর তাকাবার কথা নয়। কিন্তু যতই আমি প্রিয়ন্তিকাকে বন্ধুর প্রেমিকা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি ততই প্রিয়ন্তিকার ডাগর ডাগর চোখ দুটো ভেসে ওঠে আমার চোখের সামনে।

আমাদের দুতলার ভাড়াটিয়া রায়হান ভাইয়ের স্ত্রী প্রমিও এক দুইদিন আমার দিকে ওমন করে তাকালো। সেদিন শুক্রবার। প্রমি ভাবী ছাদে ভেজা কাপড় শুকাতে দিয়েছিলো, সুযোগ বুঝে আমি ডেকে জিজ্ঞেস করলাম।
-ভাবী শুনুন একটু?
-জি বলেন?
-এই যে সেদিন আমি তিনতলা থেকে নামছিলাম।আপনি কেমন ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। এভাবে তাকানোর কি অন্য কোনো অর্থ আছে?
-এই যে শুনেন! লাইন মারা শিখছেন কবে থেকে?

আমি থতমত খেয়ে গেলাম! বাড়িওয়ালার ছেলে হলেও ভাড়াটিয়ার বউর দিকে নজর দেওয়ার ইতিহাস নেই আমার। তবে এটা আমার মনের রোগই।

মনে মনে কিছুদিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ খুঁজলাম। কিন্তু মনের রোগ নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই কম। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হলো সেদিনের পর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দু তলার ল্যান্ডিং এ যতবারই দেখা হয়েছে প্রমি ভাবীর সাথে, ততরারই প্রমি ভাবী মুখ টিপে টিপে হেসেছে। শেষে দ্বিধায় পড়ে গেলাম মনের রোগটা আসলে কার? আমার না প্রমি ভাবীর?

সেদিন ফেসবুকে ঢুকেই দেখি প্রিয়ন্তিকা রিকুয়েস্ট দিয়েছে। সাথে একটা মেসেজও লিখেছে,
-কত্তো খুঁজে আপনাকে পেলাম ফেসবুকে। নিজের নামে চালাতে পারেন না ফেসবুক?
-আমাকে বেশি খুঁজবেন না। আমার মনের রোগ আছে কিন্তু।
-মজার তো। সেটা কিরকম?
-পরের বাড়ির পিঠা বেশি সুস্বাদু লাগে আমার কাছে।
-কী?
-ও আপনি বুঝবেন না। ছেড়ে দিন।
-দিলাম। আপনার বন্ধুর খবর জানেন কিছু?
-না তো। কি হয়েছে?
-ও ফেসবুকে ওদের বাসার বাড়িওয়ালার মেয়ে হুমায়রার ছবিতে লাইকের বন্যা বয়ে দিয়ে যায়।
-আহারে! বেচারারা আশ মিটে না অল্পতে।
-আপনাদের ছেলেদের চরিত্রই এমন।
-হু, বন্ধুর জন্মদিনে ওর গার্লফ্রেন্ডের দিকে কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকাই আমরা।
-আপনি কিন্তু পাজি খুব। খোঁচা দিচ্ছেন আমাকে।
-কোথায় দিলাম?
-বেশি হচ্ছে কিন্তু।
-আচ্ছা।
-শুনেন আপনার মতন দেখতে একটা ছেলে আমাকে পছন্দ করত অনেক বছর আগে। আপনার চেহারার সাথে খুব মিলে যায়, তাই আমার কনফিউশন হচ্ছিল খুব আর তাই আপনার দিকে!
-যুক্তিবিদ্যায় পি এইচ ডি ডিগ্রি নেয়া যায় কি? আপনি ট্রাই করে দেখতে পারেন।
-মানে?
-যুক্তিবিদ্যা মানেই তো অনেকগুলো বিকল্প দাঁড় করিয়ে তার থেকে যেকোনো একটির যৌক্তিকতা নিরুপণ। তা ভালো পারেন আপনি।

বাসায় আম্মা না থাকলে কাজের মেয়েটা গতর দেখায়; এটা নতুন না। মেয়েটার ভাবখানা এমন যে কাজে খুব ব্যস্ত, ওড়নার দিকে খেয়ালই নেই। সেদিন আমার রুমে এসে মুখ টিপে টিপে হাসছে।

মেয়েটাকে দেখলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। মারলাম এক ধমক। ওড়না কোথায় তোর? এত নির্লজ্জ কেন তুই?

মেয়েটা মুখ নিচের দিকে দিয়ে বলল, দুই তলার ভাবী আসছে আপনার কাছে।

প্রমি ভাবী বসে আছে ড্রয়িংরুমে। দুই তলা থেকে তিন তলায় আসতেই কি এমন সাজগোছ করে নারীরা?
নিজেকে সান্ত্বনা দেই, এটা আমার মনের রোগ।

-আরে ভাবী যে এই ভরদুপুরে। তা কেমন আছেন?
-ভালোই। আসলে হয়েছে কি আন্টি সেদিন বলছিলেন আপনার বই পড়ার অভ্যাস আছে। তাই ভাবলাম যদি কিছু বই ধার নেয়া যায় আপনার কাছ থেকে।
-ও। তা রায়হান ভাই ইদানীং সময় খুব কম দিচ্ছে বুঝি?
-ওর কথা আর কি বলব! কাজ ছাড়া আর কিছু বুঝে নাকি? জীবনটাই তেজপাতা হয়ে গেল। কেন যে বিয়ে করেছিলাম ওকে ভালবেসে! আমার কত যে ভালো ভালো..
-দেখলেই বুঝা যায় কিন্তু।
-কি?
-দেশের মন্ত্রী মিনিস্টাররা আপনাকে বিয়ের প্রপোজ করত। আপনি এত সুন্দর!
-হয়েছে, হয়েছে। আর বলতে হবে না।
-তা ভাবী আপনি এত সুন্দর। রায়হান ভাইও সময় দিতে পারে না খুব একটা। আপনাকে সন্দেহ করে না তো আবার?
-না। কি যে বলেন। ও আসলে খুব ভালো। আমাকে বিশ্বাস করে অনেক।
-তবে চলুন না একদিন সিনেমা দেখে আসি।

প্রমি ভাবীর গলায় মনে হয় রুই মাছের কাঁটা বিঁধল। কোন রকমে ডেকুর চিপে বলতে পারলো, বই!

আশিকের হঠাৎ খুব বেশি দরকাল হলো আমাকে। সকাল থেকে কম করে হলেও দশ বার ফোন দিয়েছে দেখা করার জন্য। রুম থেকে বেরুবো এমন সময় কাজের মেয়েটা লম্বা একটা ওড়না জড়িয়ে মাথায় বড় একটা ঘোমটা দিয়ে এসে বলছে, ভাইজান খালাম্মা ডাকছে আপনাকে। দেখলাম কালো একটা হিজাব দিয়ে মাথার চুলও ঢেকে রাখছে।
-এই ফ্যাশন আবার ধরলি কবে থেকে?

মেয়েটা মাথা নিচু করে আছে। ইদানীং এই মেয়েটা যাই করুক না কেন আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। এই সেদিন ওড়নাই রাখত না বুকে, এখন হিজাব পরে আসছে। আবার দুদিন গেলে দেখা যাবে, পার্লার থেকে চুল কেটে আসছে।

আসলে কমবেশি সকলের মনের মধ্যেই অস্থিরতা আছে। কাজের মেয়ে হলেও ওর মন আছে। কিন্তু আমি এও জানি ও মাত্রাতিরিক্ত বেসিজিল!

আম্মা নতুন আর কি বলবে?
পড়াশোনা শেষ হয়েছে এবার কাজকাম কিছু একটা করতে হবে তো। আম্মাকে কি করে বুঝাই, আমার কাজ করে কি হবে? আমার জন্য তো আর কোন বেলা বোস অপেক্ষা করে নেই।

আশিকের জরুরী তলব প্রিয়ন্তিকার জন্যই। মেয়েটাকে এখন আর বিশ্বাস করতে পারছে না। মেয়েদের মতিগতি বুঝা খুব কঠিন। আমি মুচকি মুচকি হাসছিলাম আশিকের কথায়।
-কিরে হাসছিস কেন?
-কোন প্রেমিককেই দেখলাম না প্রেমিকা ছাড়া অন্য কিছুতে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।
-তুই ই ভাল আছিস।
-হু, পুঁজি ছাড়া ব্যবসা আমার।
-মানে?
-ওই যে হারাবার ভয় নেই। মাঝখান থেকে যা পাওয়া যায় ওটাই লাভ।

আশিক জোর করে একটুখানি হেসে আবার গম্ভীর হয়ে যায়। প্রিয়ন্তিকাকে খুব ভালবাসি আমি। কেন যে ও ইদানীং কারণ ছাড়াই ঝগড়া করছে আমার সাথে বুঝতে পারছি না। তুই একটু ওর সাথে কথা বলে মিউচুয়াল করে দে না আমাদের। তোকে তো খুব ভাল জানে ও।

এর মধ্যেই আশিকের মোবাইলে ফোন আসে। আশিক খুব দ্রুত কথা শেষ করে, হুমায়রা শোনো! তুমি আমাকে যা বলেছ মনে আছে আমার। আসলে আমিও একটু ব্যক্তিগত ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তো।

কথা শেষ করে আশিক লাজুক একটা হাসি দিয়ে বলে, হুমায়রা।
-তা ভাল তো। ওর সাথেই লাইন মার নতুন করে।
-আরে নাহ। ওর বয়ফ্রেন্ড আছে।
-আছে?
-হু।

মনে মনে বলি, আমাদের বেশ্যা মন। বেশ্যা মন শব্দ দুটির সাথে আমার জীবনে আরো একটি নাম জড়িয়ে আছে, অহনা।

অহনাদের বাসা আমাদের বাসার দু বাসা আগে। সৌভাগ্যক্রমে আমরা একই ক্লাসে পড়ি তখন, নাইনে।
অহনার সাথে আমার প্রেম হয়ে গেল সে বছরই। আমি জানতাম সমবয়সীদের সাথে প্রেম করতে নেই কিন্তু আমার চেয়ে চার পাঁচ বছরের ছোট ছিল যারা তারা তখন ফ্রক পরে। পুঁচকি পুঁচকি মেয়ে আমার কোন কালেই পছন্দ ছিল না। শেষমেশ আবার চকলেটের জন্য কান্না শুরু করে দিলে বিপদে পড়ে যাব কেননা বাবা আমাকে তখন হিসেব করে হাত খরচের টাকা দেন। কাজেই অহনাই ঠিক আছে।

কিন্তু অহনা আমার সমবয়সী হলেও একসাথে স্কুলে যাওয়ার সময় এই এলাকার সব বড় ভাই যারা অনার্স,মাস্টার্সে পড়ে এবং আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে নজরুল মামার চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়, ওরাও অহনার দিকে কেমন চকচকে চোখে তাকায়। অহনাও বেহায়া মেয়েদের মতন কেমন একটা হাসি দেয় ওদের দিকে তাকিয়ে। আমার ঈর্ষা হত খুব এই বড় ভাইদেরকে। তার কারণ এই যে নাইনে পড়ুয়া অহনার সাথেও এরা টাংকি মারতে পারত আবার তাদের ক্লাসের বড় বড় মেয়েগুলা তো আছেই। কিন্তু আমার কপালে এক অহনাই ছিল!

একদিন বিকেলবেলা দেখি অহনা ওদের বাসার ছাদে আর আমাদের এলাকার মস্তান হিসেবে খ্যাত রবিন ভাই বাসার নিচে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফ্লাইং কিস কিস খেলতেছে। সেই থেকে অহনার আশা ছেড়েছুড়ে আমি ক্রিকেট খেলতে যেতাম বিকেলবেলা আর তখন থেকেই বিশ্বাস করি, অহনা আমাদের বেশ্যা মন!

রেস্টুরেন্টে, প্রিয়ন্তিকা আমার সামনে বসে আছে। আশিক বসে আছে আরো কিছুটা দূরে অনেকটা জড়োসড়ো হয়ে। কে যে ছেলেটার নাম আশিক রেখেছিল! নামটা কেবল ওর সাথেই যায়। বেচারা পুরো এক মাসের টিউশনের টাকা দিয়ে প্রিয়ন্তিকার টেবিলে কত রকমের মেনু সাজিয়েছে। প্রিয়ন্তিকা খাচ্ছে না কিছুই, বার বার চোখের জল মুছছে টিসু দিয়ে।
ওয়েটার এই দিয়ে দু বার টিসু দিয়ে গেল।

মিহির ভাইয়া, আপনি জানেন?
-কি জানব?
-আশিক আমাকে একটুও ভালবাসে না।
-বাসে না?
-উঁহু।
-আমার বার্থডের কথা পর্যন্ত ওর মনে ছিল না। আমাকে উইশ করছে সকাল দশটায়।
-দশটায়!
-হু।
-আবার সব মেয়েদের ছবিতে লাইক দেয়। হুমায়রার ছবিতে কী কমেন্ট করছে আপনি জানেন?
-কী?

প্রিয়ন্তিকা আর বলতে পারে না। চোখ আর নাকের পানি একত্র করে টিসু দিয়ে মুছে। সেই টিসু রেখে এবার উঠেই গেল টেবিল থেকে।
আমি সত্যিই ভেবে পাইনে প্রিয়ন্তিকা কি তবে শুধুই চোখ আর নাকের জল ফেলতেই এসেছিল এখানে?
তাছাড়া ওর এখানে আসার অন্য কোন কারণ তো আমি আর খুঁজে পাই না কিছু।
প্রিয়ন্তিকা যেতেই আশিক সামনে এসে বসল, কি বুঝলি?

প্রমি ভাবীর ইদানীং ঘন ঘন প্রয়োজন হয় তিন তলায়।
কখনো এটা সেটা দিতে আসেন কখনো বইয়ের জন্য কখনো আবার সেই বই ফেরত দিতে। এই বই দেয়া নেয়া খেলাটা মন্দ লাগে না আমার কাছে। মাঝেমাঝে কবিতার বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় আবার ফুল, লতা, পাতা, তারা কত কি এঁকে দেয় প্রমি ভাবী। আমি পরে আবার লতা পাতায় তাকিয়ে তাকিয়ে কয়টা টান দিয়েছে কলম দিয়ে সেটা হিসেব করি। মাঝেমাঝে তো নিজেকে নিজেই বুঝাই, মিহির এই লতা পাতা গুনে গুনে আর তোমার দিন যাবে না। এবার কিছু একটা করো।

সেদিন ছুটির দিন ছিল।
মনে হচ্ছে দুই তলায় কেউ গ্রেনেড মারছে। আম্মাকে বললাম, কি হয়েছে দেখেন তো গিয়ে।
আম্মা কিছুক্ষণ বাদে এসে জানালেন, রায়হান ছেলেটাকে তো ভালই জানতাম। সে নাকি ওর অফিসের কলিগ কি যেন নাম, হ্যাঁ রুবি! সেই মেয়েটার সাথে। ছি! ছি! এই নিয়ে অশান্তি খুব স্বামী স্ত্রীর মধ্যে। কী দিনকাল এলো ছেলেমেয়ের মতিগতি বুঝি না ঠিক।
আম্মা বিড় বিড় করে চলে গেলেন।

এরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। একদিন হয়তো এমন ছিল প্রমি ভাবীকে দেখার জন্য রায়হান ভাই উন্মুখ হয়ে থাকত খুব, প্রমি ভাবী চোখে কাজল দিত রায়হান ভাইয়ের জন্য। সেই দিনগুলো এদের গেছে। ভালবাসা, সংসার শেষ পর্যন্ত লোক দেখানো এক সান্ত্বনার নাম।

তবু রায়হান ভাই সুযোগ বুঝে একসময় প্রমি ভাবীকে সান্ত্বনা দিবে রুবি মেয়েটা ভালো না। সেই আমাকে ফুছলিয়ে ফাছলিয়ে। প্রমি ভাবী সান্ত্বনা দিবে রায়হান ভাইকে, আমি তো তোমাকে ছাড়া একটা মুহুর্তের জন্যেও অন্য কিছু ভাবিনি। আর তুমি?

হুমায়রা আর আশিকের নতুন প্রেম হবে। এরা একে অপরকে বুঝাবে জানো আগের রিলেশনটা কোন রিলেশনই ছিল না। ব্রেক আপ হয়েই ভালো হয়েছে। তোমাকে পেলুম। অহনা তার বরকে বলবে, আমার রিলেশনে বিশ্বাসই ছিল না। আমি বিশ্বাস করতাম মেয়েদের সব কিছু তার স্বামীর জন্যই রেখে দেয়া উচিত। মন, প্রাণ, দেহ, চুলকানি, সুড়সুড়ি সব সব।

আর প্রিয়ন্তিকা! হ্যাঁ, প্রিয়ন্তিকা হয়তো আমাকে বলবে আপনার মত একজনের দেখা আগে পেলে আমার জীবনটা এত বিভীষিকাময় হয়ে উঠত না।

আহা! এর নাম প্রেম! এই প্রেমের জন্য কেউ হাত কাটে, কেউ দড়িতে গলা বাঁধে, কেউ কেউ ভুল করে চলে যায় ওপরে। তবু আমরা সভ্য হই না, ভদ্র হই না, মানুষ হই না। তবু আমরা ভুল করি, বার বার করি।
আমাদের বেশ্যা মন………।

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত