চাচা vs ভাতিজা

চাচা vs ভাতিজা

প্রচন্ড গরমের মধ্যেও ফুল স্পীডে ফ্যান ছেড়ে কাঁথা মুরি দিয়ে ইচ্ছাকৃত ভাবে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছি। আহহ কি আরামের ঘুমরে কাকু কাকু কাকু ও কাকু ও কাকু তোমায় ডাকে? কাঁথাটা সরিয়ে ধরফর করে উঠলাম। দেখি আমার ভাতিজা নতুন শার্ট, প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম ক্যারে এত্ত চিল্লাইয়া ডাকোস ক্যান? তোমারে আব্বায় ডাকে। ক্যারে? জানিনা। আচ্ছা তুই যা আমি আসছি।

ভাতিজা চলে গেলো। আমি ভাবছি “আচ্ছা ভাই আমারে এত সকালে ডাকে ক্যান? কোন আকাম কুকামও তো করি নাই। তাইলে কেমনে কি।” ভাইয়ার কাছে গেলাম, বললাম ভাইয়া কিছু বলবা? তুই এখনি রেডি হ। ক্যান? শান্ত (আমার ভাতিজা) আর তোর ভাবিকে নিয়ে আমার শ্বশুর বাড়ি যা। কেনো? সেটা গেলেই বুঝতে পারবি। এই বলে ভাইয়া চলে গেলো। আমি কিছুই বুঝলামনা। হঠাৎ ভাবিকে নিয়ে তার বাবার বাড়িতে? ভাবিকে বললাম ভাবি কি হইছে? ভাবি যা বলল তাতে বুঝলাম, ভাবির একমাত্র ভাইয়ের পরশু বিয়ে। তাই আমাকে তাদের সাথে যেতে হবে। বিয়ে বাড়ি আমার জন্য অভিশাপ বলা চলে। তাই না যাওয়াই ভালো। ভাবিকে বললাম ভাবি আমি যেতো পারবনা। কেনো? এমনি, তুমি ভাইয়ার সাথে যাও। আরে তোমার ভাইয়ের অফিসে একটু কাজ আছে,তাইতো তোমাকে বলছে আমাকে নিয়ে যেতে।

কিন্তু ভাবি কোন কিন্তু নয়। চলো আমাদের সাথে। তারপর ভাবি অনেক জোরাজুরি করল। কি আর করার। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু ভয় এক জায়গায়, সেটা হলো আমার একমাত্র ভাতিজা। কারণ,ভাতিজা কখন কি করে বসে তার কোন ঠিক নাই। মাঝখান থেকে বিপদে পরব আমি। আমরা তিনজনে মিলে বাইকে করে যাচ্ছি। আমি বাইক চালাচ্ছি। আমার পিছনে ভাতিজা, তার পিছনে ভাবি। যাইহোক আমরা ভাবিদের বাড়ি এসে পৌছালাম। দুইদিন আগেই দেখি বাড়িতে অনেক মেহমান এসেছে। আমি তালোই সাহেবকে দেখে সালাম দিলাম আসসালামু আলাইকুম তালোই সাহেব, ভালো আছেন? ওয়ালাইকুম আসসালাম বাবা, ভালো আছি। তোমাদের আসতে কোন সমস্যা হয়নি তো? না না, কোন সমস্যা হয়নি।

আমার দেখাদেখি ভাতিজাও বলল আসসালামু আলাইকুম তালোই সাহেব, ভালো আছেন? ভাতিজার এমন কথা শুনে আমি আর তালোই সাহেব অবাক হলাম। আমার দেখাদেখি ভাতিজাও তার নানাকে তালোই বলেছে। লও ঠ্যালা। আমি ভাতিজার মাথায় গাট্টা মেরে বললাম শুভ এইটা তর নানা হয়। তাইলে তুমি তালোই কইলা ক্যান? তর নানা তো আমার তালোই-ই হবে। তাইলে আমারও তালোই হবে। আমরা তো এক-ই বাড়িতে থাকি। তাইনা তালোই সাহেব? (ওর নানাকে উদ্দেশ্য করে) বিস্ময় দৃষ্টিতে তালোই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের নাতির মুখ থেকে তালোই ডাক শুনলে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। আমি বললাম হারামি নানা বল? তাইলে তুমি নানা কও? আমারতো তালোই হয়। তোর নানা হয়।

না আমিও তালোই কমু। ক্যারে তালোই সালাম দিছি সালাম ফিরান না ক্যারে? (তালোই অবাক) আইচ্ছা তালোই গেলাম পরে কথা হবে। (আমি) এই বলে ভাতিজাকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে আসলাম। একটু পর আবার মায়োই সাহেবার সাথে দেখা। আমি ভাতিজার কারণে কিছু বললাম না। শুধু বললাম আপনার শরীর কেমন? ভালো আছেন? এইতো বাবা ভালো,তুমি কেমন আছো? ভালো। ভাতিজাও তখন বলল আপনার শরীর কেমন? ভালো আছেন? শান্তর এমন কথা শুনে মায়োই ভ্রু-কুঁচকে তাকালেন। আমি শান্তকে টোকা মেরে বললাম হারামি এইডা তর নানি? তাই আমার কি? একটু ভালো করে কথা বল? নানী সাহেবা আপনার শরীর কেমন? ভালো আছেন? এই ভাবে না, বল নানি কেমন আছো?(আমি) নানি কেমন আছো? এইতো…..ভা…ভালো (আমতা আমতা করে) নানী আমারে কোলে নেও। কেনো? ছোট বেলায় না আমাকে কোলে নিতে। তখনতো তুমি ছোট ছিলেগো না না, আমাকে এখনও কোলে নিতে হবে।

বাধ্য হয়ে মায়োই শান্তকে কোলে নিলেন। কোলে নিয়ে পরলেন আরেক বিপদে। কারণ শান্ত তার নানীর কোলে উঠে সমানে নড়াচড়া শুরু করছে। মায়োই সাহেবা হালকা বুড়ি মানুষ। তার মুখ কালো হয়ে গেছে। তারপরেও মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ পর ভাতিজা আচমকা তার নানীর কোলে মুতে দিলো। অমনি মায়োই শান্তকে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন। আমি শান্তকে বললাম এইডা কি করলি? কি করলাম? এই যে তর নানীর কোলে প্রসাব করলি। ছোট থাকতে মুতছি, তাই প্রাকটিস করলাম দেখি এখনো মুততে পারি নাকি। ভাতিজার এমন কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পরলাম। কথায় কি লজিকরে মাইরি। মায়োই সাব চলে গেলেন। আমি ভাতিজাকে নিয়ে চলে আসলাম। তারপর ভাতিজাকে নতুন কাপড় পরিয়ে দিলাম।

বলা বাহুল্য ভাবির একটা বোনও আছে। আমি, বেয়াইন আর শান্ত রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। রাস্তায় এক ঝালমুড়ি ওয়ালাকে দেখে ভাতিজা বলল কাকু কাকু, ও কাকু কাকু আমি ঝালমুড়ি খামু। পরে খাইস? না আমি এখনি খামু। আচ্ছা। তারপর ভাতিজাকে ঝালমুড়ি কিনে দিয়ে আমি আর রিদিতাও (বেয়াইন) ঝালমুড়ি কিনলাম। আমরা হেঁটে হেঁটে ঝালমুড়ি খাচ্ছি আর কথা বলছি। কিছুদূর যেতেই পরলাম আরেক বিপত্তিতে। কারণ একটা কুকুর আমাদের দেখে ঘেউঘেউ শুরু করলো। আমিতো এমনিতেই ছোট বেলা থেকে কুকুর ভয় পাই। বেয়াইন সাহেবা দেখি ভয়ে কাঁচুমুচু হয়ে গেছেন। ভাবছি দৌড় দিমু, কিন্তু নাহহহ। সাথে বেয়াইন সাহেবা আছে। এদিকে ভাতিজা কুকুরের সাথে দুষ্টুমি করা শুরু করছে। ভাতিজা কুকুরকে উদ্দেশ্য করে বলছে কিরে হালায় ঝালমুড়ি খাবি? ঘেউঘেউ ঘেউ।

ঝালমুড়ি খাবি না? ঘেউঘেউ,ঘেউউউউউউ হালার পুত হালা ঘেউঘেউ মারাও ক্যারে? ঘেউঘেউ, ঘেউঘেউ,ঘেউউউউউ ঘাউউ ঘাউউ হালায় কি কস এইগুলা? বাংলা বুঝোসনা? ঝালমুড়ি খাবি? ঘাউউউউউ এই বলে ভাতিজা রাস্তায় থাকা ইটের টুকরো দিয়ে কুকুরকে দিলো ঢিল। তারপর বলল কাক্কু দৌড় দেও ভাতিজা দিলো দৌড়। আমিও ভাতিজার পিছে পিছে দৌড়। আমাদের দৌড়ান দেখে রিদিতাও আমাদের সাথে দৌড়। এদিকে কুকুর সমানে ঘেউঘেউ শুরু করছে। ভাতিজাও সমানে ঘেউঘেউ শুরু করছে। আমরা তিনজনে আতাইলা পাতাইলা দৌড়। আমাদের সাথে দৌড়ে না পেরে রিদিতা হোঁচট খেয়ে পরলো রাস্তার পাশে ধান ক্ষেতে। তার শরীর কাঁদায় মাখামাখি। এদিকে আমাদের পিছনে কুকুর। ভাতিজা আর দৌড়াতে না পেরে একটা পুকুরে দিলো ঝাপ। আমিও জান বাচানোর জন্যে দিলাম পুকুরে ঝাপ। আমাদের দেখাদেখি কুকুরও দিলো ঝাপ। কিন্তু কুকুর ঝাপ দিয়ে অনেক দূরে ছিটকে পরলো। আমি আর শান্ত পুকুর থেকে উঠে এক দৌড়ে বাসায় আসলাম।

বাসায় এসে দুজনেই হাঁপাচ্ছি। আমাদের এমন অবস্থা দেখে ভাবি বলল একি নাইম তোমাদের শরীর ভেজা কেনো? রিদিতা কই, আর তোমরা এভাবে হাঁপাচ্ছো কেনো? আমি কিছু বললাম না। হাঁপিয়ে চলছি, ভাতিজাও হাঁপাচ্ছে। ভাবি আবার বলল কি হলো নাইম ? আসলে ভাবি কুত্তায় দৌড়ানি দিছে। রিদিতা কই? আসলে ভা ঠিক তখন-ই রিদিতার আগমন। রিদিতার পুরো শরীর কাঁদায় মাখামাখি। ভাবি রিদিতার এমন অবস্থা দেখে বলল কিরে তোর অবস্থা কেনো? (অবাক হয়ে) রিদিতা রাগে অগ্নিপীন্ড হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তারপর মাথা নিচু করে চলে গেলো। আমিও সেখান থেকে চলে আসলাম।

বিকেল বেলা। বসে বসে মোবাইল টিপাটিপি করছি। কিছুক্ষণ পর হৈঁচৈঁ শুনতে পেলাম। দৌড়ে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি ভাতিজা আর এক ছোট মেয়ে ঝগড়া করছে। ভাতিজা শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মেয়েটির চুল টেনে ধরছে। মেয়েটিও ভাতিজার শার্ট ধরেছে। দুইজন দুইজনরে সমানে মারছে। ভাতিজা মেয়েটিকে চুল ধরে ঘুরাচ্ছে। মেয়েটিও ভাতিজাকে সমানে কিলাচ্ছে। আমি তাদের ঝগড়া থামানো বাদ দিয়ে মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছি। আর সাংবাদিকতা করছি “সুপ্রিয় দর্শক মন্ডলী আপনার দেখছেন একটি ছেলে আর একটি মেয়ে ঝগড়া করছে। ছেলেটি আর কেউ না, আমার একমাত্র ভাতিজা। মেয়েটিকে আমি চিন্তে পারছিনা। তবে ঝগড়ায় মেয়েটি বেশি মার খাচ্ছে। আর আমার ভাতিজা তাকে চুল ধরে সমানে ঘুড়াচ্ছে। সবাই খুব আগ্রহ সহকারে ঝগড়া দেখছে। আমিও দেখছি। দেখি কে জিতে এই ঝগড়ায়। আপনারা সবাই দোয়া করেন,যেন আমার ভাতিজা জয় লাভ করে।”

নাইম্মা তাকিয়ে দেখি ভাবি। আমি ভিডিও করা বাদ দিলাম। ভাবি গিয়ে দুইজনের ঝগড়া থামালেন। কিন্তু ভাতিজা তারপরেও ছোটাছুটি করছে। মেয়েটিকে নিয়ে তার মা চলে গেলো। ভাবি আমাদের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভাবি শান্তকে বলল তুই ঐ মেয়েটিকে মারছিলি কেনো? আমারে মিষ্টি দিলো না ক্যান? মানে? (ভ্রু-কুঁচকে) মাইয়া মিষ্টি খাইতেছিলো আমি মিষ্টি চাইছি দেওনাই, তাই চুল ধইরা মাইর দিছি। আমি সাথে সাথে বললাম সাব্বাস বেটা, এই না হলো আমার ভাতিজা। তুমি চুপ করো নাইম। তোমার জন্যই শান্ত দিনদিন এত দুষ্ট হচ্ছে। (রেগে) আম্মা কাকুরে গালি দিওনা। তুই চুপ কর। আমি বললাম সরি ভাবি। নাইম আমি আর মানতে পারছিনা। এই মুহূর্তে তুমি শান্তকে নিয়ে চলে যাও? কোথায় যাব ভাবি? বাড়ি চলে যাও।

ভাবি বলছি কি। আর কখনওআমি যা বলছি তাই করো। (রেগে) ভাবি রেগে চলে গেলেন। আমি আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে আছি। কি আর করার। আজকে ভাতিজার কারণে আমার এই অবস্থা। বাড়ি থেকে চলে আসলাম। আমার সাথে ভাতিজাও আছে। ভাতিজা বলল কাকু এই নাও টাকা। ভাতিজার দিকে তাকিয়ে দেখি তার হাতে টাকা। আমি অবাক হয়ে বললাম তুই এত টাকা কই পেলি? তালোইর মানিব্যাগ থেকে চুরি করছি। হারামি হেতি তর নানা হয়। ঐ একি কথা। আইচ্ছা দে টাকা দে।

শান্ত আমার হাতে টাকা দিলো। গুনে দেখলাম সারে সাত হাজার টাকা। আমি শান্তর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। শান্ত বলল চলো কাকু আজকে মিষ্টি খামু। চল,আজকে মিষ্টি খেয়ে পেট ফাটাবো। আমরা চাচা-ভাতিজা হাঁটছি। উদ্দেশ্য হোটেলে গিয়ে মিষ্টি খাব। কেউ খাইতে চাইলে আমাদের সাথে আসতে পারেন। চুরির টাকা দিয়ে মিষ্টি খাওয়ার অন্যরকম একটা মজা আছেন।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত