অন্ধকার আফ্রিকায়

অন্ধকার আফ্রিকায়

কর্ডলেস টেলিফোন থেকে মুখ তুলে ফ্রান্সিস বাইক পিয়েরে পলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পি. এ. সাহেব বলেছেন চীফ জাষ্টিস এভাবে কথা বলেন না।’

‘বলবে না মানে? টেলিফোনটা আমাকে দিন।’ বলে টেলিফোন নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল পিয়েরে পল। টেলিফোন মুখের কাছে এনেই বলল, ‘পি. এ. সাহেব?’

‘জি বলুন, বলছি আমি।’ বলল টেলিফোনের ওপ্রান্ত থেকে পি. এ.।

‘আপনাকে বলতে ভুলে গেছে, চীফ জাষ্টিসের সাথে ডঃ ডিফরজিস কথা বলবেন।’

‘কোন ডঃ ডিফরজিস? প্যারিসের?’

‘ঠিক। চীফ জাষ্টিস সাহেবের শিক্ষক।’

‘সব জানি। স্যরি স্যার। ওনাকে বলছি একটু ধরুন।’

পিয়েরে পল টেলিফোন থেকে মুখ একটু সরিয়ে ডঃ ডিফরজিসের দিকে চেয়ে বলল, ‘ডঃ গো ধরে থাকলে কোন লাভ হবে না। চীফ জাষ্টিসকে বলুন আমাদের সহযোগিতা করতে।’

বলেই মুখ টেলিফোনের কাছে নিয়ে বলল, ‘মাই লর্ড ডক্টর সাহেবকে দিচ্ছি।’ বলে পিয়েরে পল টেলিফোন ডঃ ডিফরজিসের হাতে তুলে দিল।

‘হ্যালো, উসাম কেমন আছ?’

‘ভালো। কিন্তু আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। আমি আকাশ থেকে পড়েছি। না জানিয়ে আপনি ক্যামেরুন এসেছেন। বাসায় না এসে টেলিফোন করছেন। আপনি কোথায়? আমি আসব।’

‘আমি আসিনি, আমাকে আনা হয়েছে। আমি কোথায় আমি জানিনা।’

‘কি বলছেন আপনি? এটা বিশ্বাস করা যায়?’

‘যা চোখের সামনে উপস্থিত। তা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন ওঠে না উসাম। আমাকে ওরা কিডন্যাপ করে এনেছে ক্যামেরুনে।’

‘কিডন্যাপ?’

ওপারের কথা শেষ হয়নি বুঝা যায়। কিন্তু কোন কথা ওপার থেকে শোনা গেল না। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে নিতে নিশ্চয় সময় লাগছে চীফ জাষ্টিসের।

আবার শোনা গেল ওপারের কণ্ঠ, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না জনাব। কি ঘটেছে বলুন।’

‘আমাকে কারা যেন কিডন্যাপ করে এনেছে।’

‘কেন?’

‘আমাকে পণবন্দী করেছে ওরা।’

‘পণবন্দী? কিসের জন্যে?’

‘তোমার কাছ থেকে একটা কাজ চায় ওরা।’

‘আমার কাছে? কিন্তু আপনাকে পণবন্দী করে কেন?’

‘কাজটা বেআইনি। আমাকে ওরা বলেছিল তোমাকে বলে কাজটা করিয়ে দিতে। রাজী না হওয়ায় কিডন্যাপ করেছে। আমাকে পণবন্দী করে কাজটা বাগিয়ে নিতে চায়। তাদের ধারণা আমার জীবন বাঁচাবার জন্যে তুমি কাজটা তাদের করে দেবে।’

‘কাজটা কি?’ ওপারে চীফ জাষ্টিসের কণ্ঠ বড় শুকনো শুনাল।

‘কাজের কথা আমি তোমাকে বলব না এবং কোন অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার তুমি কর, এটা আমি চাইব না।’

‘স্যার, ওদের কেউ আছে? আমি কথা বলতে চাই। শুনতে চাই ব্যাপারটা কি?’

‘ঠিক আছে। দিচ্ছি কথা বল।’

টেলিফোন হাতে নিল পিয়েরে পল। বলল, ‘মাই লর্ড, বলুন।’

‘ডঃ ডিফরজিসের মত একজন বৃদ্ধ, সম্মানী, দরদী মানুষকে আপনারা কিডন্যাপ করেছেন! কে আপনারা?’

‘মাই লর্ড, পরিচয়টা এই মুহূর্তে দিতে পারছিনা।’

‘কেন তাঁকে আপনারা কিডন্যাপ করেছেন?’

‘আমরা দুঃখিত মাই লর্ড। আমাদের উপায় ছিল না। ছোট একটা সহযোগিতা করতে তিনি রাজী হননি। কাজটা মোটেই বড় নয়।’

‘কাজটা কি?’

‘দুঃখিত, টেলিফোনে বলা যাবে না। মনে হয় টেলিফোনে এ ধরনের আলোচনা শোভনও হবে না।’

‘কিন্তু আমি এ মুহূর্তে শুনতে চাই।’

‘তাতে আমরা খুব খুশী হবো। কিন্তু টেলিফোনে নয়।’

‘তাহলে?’

‘মাই লর্ড, আজ কোর্ট ছিল না। আপনার সান্ধ্য ভ্রমনের অভ্যাস আছে। আপনি ‘ইন্ডিপেনডেনস পার্ক’ -এর গেটে আসুন। গেট পেরুলে প্রথম যে বেঞ্চ সেখানে আমরা বসব।’

‘এটা সম্ভব নয়। আমার বাড়িতে আসুন। আমার বাগানের নিরিবিলিতে কোথাও বসে কথা বলব।’

‘আমার আপত্তি নেই। এখন ৬টা। আমি সাড়ে ৬টায় বাগানের গেটে পৌঁছব। ৭টা পর্যন্ত থাকব।’

‘ঠিক আছে আসুন।’

‘মাই লর্ড, সাড়ে ছয়টায় বাগানের বাইরের গেটটা খোলা রাখতে হবে। গাড়ি বাগানের মধ্যে নিয়ে আমি গাড়ি থেকে নামব। চামড়া রংয়ের মুখোশ থাকবে মুখে।’

‘অলরাইট।’

‘আর একটা কথা। আশা করি অন্য কিছু ঘটবে না। আমি যদি ৮টার মধ্যে ফিরে না আসি তাহলে ডঃ ডিফরজিসের জীবন বিপন্ন হবে।’

‘আমি বিচারক। আপনার সাথে লড়াই-এ নামিনি আমি। একটি বিষয় জানার জন্যে আমি আপনাকে ডাকছি।’

‘ধন্যবাদ, মাই লর্ড।’

‘ধন্যবাদ।’

টেলিফোন রেখে পিয়েরে পল বলল, ‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক আমি তৈরী হতে গেলাম। আপনি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে খবর দিন।

তারপর ডঃ ডিফরজিসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার পক্ষ থেকে তাকে কিছু বলার আছে?’

‘নেই। তবে আমার একটা জিজ্ঞাসা আছে।’

‘কি?’

‘আমার সন্তান ও বৌমাকে কোথায় রেখেছেন আপনারা?’

‘দুঃখিত, আমাদের কথায় রাজী না হওয়া পর্যন্ত বলব না।’

‘আরেকটা কথা। কুমেটে যে বাড়িতে আপনারা আমাদের রেখেছিলেন, সেখান থেকে আমাদের আসার মুহূর্তে গোলা-গুলি হয়েছিল কেন? আমাদের সন্তানদের কোন ক্ষতি হয়নি তো?’

‘বলেছি, কোন সহযোগিতাই আমরা আপনাকে করব না।’

বলে পিয়েরে পল বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

চীফ জাষ্টিসের বাড়ি এবং বাড়ির রাস্তা পিয়েরে পলের মুখস্থ। ইয়াউন্ডি আসার পর বেশ কয়েকবার এখানে এসেছে।

পিয়েরে পল যখন চীফ জাষ্টিস উসাম বাইকের বাগানের গেটে পৌঁছল, তখন ঠিক সাড়ে ছয়টা।

গেট খোলা ছিল বাগানের।

গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে গাড়ি থেকে নামল পিয়েরে পল। তার আগে গাড়িতে বসেই মুখে মুখোশ লাগিয়ে নিয়েছিল।

গাড়ি থেকে নেমেই পিয়েরে পল দেখতে পেল অল্প দূরে বড় একটি আলো-শেড-এর নিচে একটা চেয়ারে একজন বসে আছে। চারদিকের আলোর মাঝখানে সেখানে অন্ধকারের একটা পাতলা আবরণ।

পিয়েরে পল ওদিকে চলল।

পিয়েরে পল সেখানে পৌঁছতেই উঠে দাঁড়াল চেয়ারে বসা সেই লোকটি।

‘গুড ইভেনিং, আসুন।’ বলে পিয়েরে পলকে বসার জন্য চেয়ার দেখিয়ে দিল।

বসল দু’জনে।

চীফ জাষ্টিস মধ্য বয়সী একজন লোক। রঙে সে খাস আফ্রিকান নিগ্রো। কিন্তু চোখ, চুল, ঠোঁট ইত্যাদির গড়ন তার বলে দেয় সে আফ্রো-ইউরোপীয় অথবা আফ্রো-এশীয় মিশ্র পরিবারের সন্তান। তার চেহারার মধ্যে একটা পবিত্র প্রসন্নতা।

চীফ জাষ্টিস বসেই বলল, ‘আমি ফ্রাংকোইস উসাম বাইক। আমি আপনার কথা শোনার জন্যে প্রস্তুত। বলুন।’

‘মাই লর্ড, আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে আমি প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমরা নিরুপায় হয়েই এই অবস্থায় পৌঁছেছি। আপনার সাথে আমাদের কোন পরিচয় নেই। তাই চেয়েছিলাম ডঃ ডিফরজিস আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন।কিন্তু স্বেচ্ছায় তিনি তা করেননি।’

বলে একটু থামল পিয়েরে পল। সম্ভবত কথাগুলো একটু গুছিয়ে নিল। শুরু করল আবার, ‘প্রথমেই বলে রাখি, আমার কিংবা কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যে আমি আসিনি। আমরা যা করতে চাই তা করতে পারলে লাভবান হবে জাতি, কোন ব্যক্তি নয়।’

একটু দম নিল পিয়েরে পল।

‘শুনছি, বলুন’ বলল চীফ জাষ্টিস।

‘মাই লর্ড, দক্ষিণ ক্যামেরুনের উপকূলীয় কাম্পু উপত্যকার দশ হাজার একরের একটা জমি খন্ড নিয়ে গন্ডগোল। ঐ জমি খন্ডের চারদিকের সব জমিই চার্চের। মাঝখানের ঐ জমি খন্ড একজন মুসলমানের। এই এক খন্ড জমি নানা দিক দিয়ে আমাদের অসুবিধা সৃষ্টি করছে এবং আরও অসুবিধার কারণ হতে পারে। তাই অনেক বছর ধরে আমরা ঐ জমির মালিককে অনুরোধ করে আসছি, জমির যা মূল্য তার চেয়ে কয়েকগুন বেশী মূল্য দেবো। কিন্তু জমি হস্তান্তরে সে রাজী হয়নি। পরে আমরা জানতে পেরেছি, তার এ অস্বাভাবিক অস্বীকৃতির মূলে একটা ষড়যন্ত্র রয়েছে। মক্কা ভিত্তিক ইসলামী সংগঠন রাবেতায়ে আলম আল-ইসলামী সেখানে বড় রকমের একটা ঘাঁটি বানাতে চায়। এই পরিস্থিতি আমাদের ভীষণ উদ্বিগ্ন করে। কারণ, তারা শান্তিপূর্ণ এ অঞ্চলে সংঘাত বাধাবার জন্যেই এটা করতে চায়। এসব জেনে আমরা নতুন করে যখন তাকে অনুরোধ করলাম, তখন সে রাবেতার পরামর্শে আপনার কোর্টে একটা উইল করে দেশ থেকে পালিয়ে যায়। আসলে জমি তার লক্ষ্য নয়, গন্ডগোল বাধানোই তার লক্ষ্য। আমরা জাতীয় স্বার্থেই এটা হতে দিতে পারি না।’

থামল পিয়েরে পল।

‘বলুন।’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।

‘এই অবস্থায় আমরা চাই, আপনি আমাদের সাহায্য করুন।’

‘উইলে কি আছে?’

‘সে কোর্টে হাজির হয়ে জমি হস্তান্তর না করলে তার জমি হস্তান্তর বৈধ হবে না। দ্বিতীয়তঃ সে যদি দুই বছর পর্যন্ত নিখোঁজ থাকে, তাহলে জমি ক্যামেরুন মুসলিম ট্রাস্টের সম্পত্তি বলে গণ্য হবে।’

‘আমার কাছে কি সাহায্য চান?’

‘জমি হস্তান্তর দলিলে ওমর বায়ার দস্তখতকে তার উপস্থিতি বলে ধরে নিতে হবে।’

‘ওমর বায়া কোথায়?’

‘আমাদের হাতে আছে।’

‘তাহলে ওকে কোর্টে হাজির করিয়ে দস্তখত নিন।’

‘কোর্টে হাজির করে তার কাছ থেকে দলিলে দস্তখত পাওয়া যাবে না।’

‘তার উইল অনুসারে তাকে কোর্টে হাজির না করে তার জমি হস্তান্তর হবে না।’

‘ধরুন, সে জমি হস্তান্তর করল না। এর বদলে সে যদি আগের উইল বাতিল করার আবেদন করে কিংবা নতুন উইল করে!’

‘তার জন্যেও উপস্থিতি একটা শর্ত।’

‘কিন্তু এ শর্তটা জমি হস্তান্তরের মত অত কঠিন নয়।’

‘শর্ত শর্তই, কঠিন-সহজ হয়না।’

‘তাহলে আপনার সাহায্য আমরা কিভাবে পাব?’

‘আপনিই বলুন।’

‘আমি দুইটা পথের কথা বলেছি। এক, জমি হস্তান্তর দলিলে তার দস্তখত উপস্থিতি হিসেবে ধরে নিতে হবে। অথবা দুই, তার আগের উইল বাতিল করার আবেদন গ্রহন করতে হবে।’

‘হাজির না করে দুই পদ্ধতির কোনটাই আইনসিদ্ধ নয়।’

‘মাই লর্ড, আমরা সেটা জানি। জানি বলেই আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। এখন বলুন আপনি আমাদের সাহায্য করবেন কিনা?’

‘এ অন্যায় সাহায্য না করলে কি করবেন?’

‘প্রথম কাজ হবে, আমরা পণবন্দীকে হত্যা করব। আরও কি করব সেটা আমরা এখন বলব না। শুধু জেনে রাখবেন, যত রক্তপাতের প্রয়োজন হোক, ‘ক্রস’ পরাজিত হবে না।’

‘আপনারা ওমর বায়ার জমির কি পরিমান মূল্য দিতে রাজি আছেন?’

‘ক্যামেরুনের সর্বোচ্চ যে রেট তার দ্বিগুন দিতে রাজি আছি।

‘এই টাকা কোর্টের সামনে অথবা কোর্টকে পরিশোধ করতে হবে।’

‘আমরা রাজি।’

‘দ্বিতীয়ত, ওমর বায়াকে কোর্টে এতটুকু হাজির করতে হবে যাতে আমরা তাকে দেখতে পাই। তার কথার কোন প্রয়োজন নেই।’

‘ঠিক আছে, এতে অসুবিধা নেই।’

‘তৃতীয়ত, ডঃ ডিফরজিস ও ওমর বায়াকে উইল রেজিস্ট্রির পর ছেড়ে দিতে হবে এবং চেম্বারে পৌঁছাতে হবে।’

‘আমরা ডঃ ডিফরজিসকে পৌঁছাব, কিন্তু ওমর বায়াকে নয়। তাকে আমরা ছাড়ব আমাদের জমির দখল সম্পূর্ণ হওয়ার পর। প্রয়োজন বোধ করলে আমরা তাকে দলিল সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপনের শেষ মেয়াদতক রাখতে পারি।’

‘ঠিক আছে, আপনারা প্রসেস করুন। আপনার উকিল যেন আমার অফিস থেকে কেসের তারিখটা ঠিক করে নেয়।’

‘ইয়েস মাই লর্ড। আমার একটা শর্ত আছে। আজকের কথাগুলো এবং জমি সংক্রান্ত ব্যাপার আপনার কান ছাড়া যতগুলো কানে পৌঁছবে তারা আমাদের হত্যা তালিকায় থাকবে।’

‘এ কথাগুলো আমাকে না বললেও চলতো। বিচারপতিরা ক্যামেরুনের পুলিশ কিংবা গোয়েন্দার দায়িত্ব পালন করেন না।’

‘থ্যাংকস মাই লর্ড। উঠি।’

বলে পিয়েরে পল উঠে দাঁড়াল।

চীফ জাস্টিস উসাম বাইক মাথা নাড়ল, মুখে কোন কথা বলল না।

ইয়াউন্ডি সুপার মার্কেট থেকে ফিরছিল ডোনা, ডোনার আব্বা এবং এলিসা গ্রেস।

আজ সকালেই তারা কুমেট থেকে ইয়াউন্ডি এসেছে।

সেদিন আহমদ মুসা কুমেট বিমান বন্দরে চলে যাবার এক ঘন্টা পর ডোনারা কুমেটে গার্লস ব্রিগেডের রেস্ট হাউসে সুমাইয়াদের কাছে পৌছে।

আহমদ মুসার প্লেন ১২টায় ক্যামেরুনরে উদ্দেশ্যে ছাড়ার কথা। সুতরাং ডোনাদের এয়ারপোর্টে নেয়ার সময় ছিল না।

আহমদ মুসার চলে যাবার সংবাদে ডোনা বিস্মিত হয়নি, কিন্তু আহত হয়েছিল। আহমদ মুসার সন্ধানে সে ছুটে এসেছিল প্যারিস থেকে সেন্টপোল ডে-লিউন-এ। কিন্তু অল্পের জন্যে দেখা পায়নি। আবার তারা ছুটে আসে কুমেটে। এক ঘন্টা দেরীর জন্যে এখানেও দেখা হয় নি।

আহমদ মুসার চলে যাবার খবর যখন সুমাইয়া দ্বিধাগ্রস্থ কন্ঠে ডোনাকে দিয়েছিল, তখন ডোনা মুহূর্তের জন্যে চোখ বুজে আঘাতটা সামলে নিয়েছিল।

পরে সুমাইয়া আহমদ মুসার রেখে যাওয়া চিঠি ডোনাকে দিয়েছিল।

কম্পিত হাতে ডোনা চিঠি নিয়েছিল। তার কাছে আহমদ মুসার এটাই প্রথম চিঠি। কি লিখেছে! প্যারিস থেকে তার চলে আসার জন্যে রাগ করেনি তো!

চিঠি নিয়ে ডোনা পাশের ঘরে চলে গিয়েছিল। চিঠিতে সে পড়েঃ

“মারিয়া,

আমি আমার কথা রাখতে পারিনি বলেই তোমাকে কষ্ট করে ডে-লিউন পর্যন্ত ছুটে আসতে হয়েছে। আবার কুমেট থেকেও টেলিফোন করতে পারিনি তোমাকে। করতে পারিনি ঠিক নয়, ভুলে গিয়েছিলাম। এ ভুলের মাশুল তোমাকেই দিতে হচ্ছে। তবু কুমেটে আমাদের দেখা হবে বলে মনে হচ্ছে না। এ সব কিছুর জন্যে নিজেকে দোষী ভাবার সাথে সাথে কিছুটা আনন্দবোধও আমার হচ্ছে। বুক ভরা উদ্বেগ নিয়ে কেউ কখনও এভাবে আমার পেছনে ছুটে আসেনি। কারও দুটি সজল চোখ এইভাবে কখনও আমাকে খুঁজে ফেরেনি। কিন্তু আমার জন্যে যা আনন্দ, তোমার জন্যে সেটা কষ্ট। তোমার এ কষ্টের জন্যে দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কি করতে পারি আমি বলো।”

চিঠি শেষ করেও অনেক্ষন চিঠি থেকে চোখ সরাতে পারেনি ডোনা। তারপর তার চোখ দু’টি সরে গিয়ে দক্ষিনের জানালা দিয়ে নিবদ্ধ হয়েছিল দক্ষিন দিগন্তে। যেন দেখতে পাচ্ছে সে ক্যামেরুনের পথে ছুটে চলা আহমদ মুসার প্লেন। কান্নার মত এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছিল ডোনার ম্লান ঠোঁটে। ঠোঁটের বাঁধন ডিঙিয়ে বেরিয়ে এসেছিল তার স্বগত উচ্চারনঃ ‘তুমি যাকে আমার কষ্ট বলছ, তা আমার কত আনন্দের, কত তৃপ্তির, কত প্রশান্তির সেটা তুমি কি বুঝ!’

কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ডোনা তার আব্বাকে বলেছিল, ‘ও আমাদের ক্যামেরুন যেতে নিষেধ করেনি।’

‘যেতে কি বলেছে?’ বলেছিল ডোনার আব্বা।

‘তার নিষেধ না করাটাই যেতে বলা আব্বা।’

‘হ্যাঁ, এটাও ঠিক।’ বলে মিষ্টি হেসেছিল ডোনার আব্বা।

‘আব্বা তুমি ইয়াউন্ডির ফরাসী দুতাবাসকে বলে দাও আমার ও এলিসার জন্যে একটা ভাল ব্যবস্থা করতে।’

‘ওখানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে আছেন আমার বন্ধু তোমার আংকেল ‘জিন মিশেল ব্রেন্ডার’। বাড়ির মতই থাকতে পারবে। কিন্তু তোমার আব্বাকে বাদ রাখছ কেন?’ হেসে বলেছিল ডোনার আব্বা।

‘লং জার্নিতে তোমার কষ্ট হবে আব্বা।’ বলেছিল ডোনা।

‘তার চেয়েও বেশী কষ্ট হবে মা কাছে না থাকলে।’ বলেছিল ডোনার আব্বা সস্নেহে হেসে।

ডোনা উঠে গিয়ে তার আব্বার পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রেখে বলেছিল, ‘ঠিক আছে তুমিও যাবে।’

বলে একটু হেসেছিল ডোনা। তারপর ধীরে ধীরে বলেছিল, ‘মাঝে মাঝে ভেবে আমার কষ্ট হয় আব্বা আমি তোমাকে বিরাট টেনশনে ফেলেছি।’

‘দুনিয়াতে অনেক টেনশন আছে, যা সুখ স্বপ্নের চেয়েও মধুর।’

‘ধন্যবাদ আব্বা। আমার আব্বা দুনিয়ার সেরা আব্বা।’ বলেছিল ডোনা তার আব্বার কাঁধে কপাল ঘষতে ঘষতে।’

ডোনারা ক্যামেরুন যাবার আগে সুমাইয়া, ডেবরা ও রালফের সাথে অনেক কথা হয়েছে তাদের। শুনেছিল ক্লাউডিয়া ও ডাঃ জিয়ানার আত্মত্যাগের কাহিনী। শুনে কেঁদেছিল ডোনা। তার মনে পড়েছিল আহমদ মুসার কাছে শোনা রুশ কন্যা তাতিয়ানার কাহিনী, কেঁপে উঠেছিল ডোনার মন। কত ভাঙা হৃদয়ের কত দাবী যে আহমদ মুসাকে ঘিরে আছে! ডোনার ছোট্ট হৃদয়ের দুর্বল দাবী কি অবশেষে তার প্রিয়তম ঠিকানা খুঁজে পাবে!’

ডোনার আব্বা ঠিক বলেছিল। ক্যামেরুনের ফরাসী রাষ্ট্রদূত জিন মিশেল ব্রেন্ডার ডোনাদেরকে পরম আত্মীয়ের মতই গ্রহন করেছে। এ্যামবেসির গেস্ট হাউসে তাদের থাকতে দেয়নি। বাড়ির একটা বিরাট অংশ ছেড়ে দিয়েছে এ্যামবেসেডর ডোনাদের জন্যে। জিন মিশেল ব্রেন্ডারের কুটনৈতিক জীবনের শুরু ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনীর পারসোনাল সেক্রেটারী হিসেবে।

ইয়াউন্ডিতে এসে খাওয়া দাওয়া শেষে দীর্ঘ ঘুম দেবার পর জরুরী কিছূ কেনা কাটা এবং শহর দেখার জন্যে ডোনারা বেরিয়েছিল।

মার্কেট থেকেই ফিরছিল তারা।

এ্যামবেসেডর জিন মিশেল একটা গাড়ি দিয়েছিল ডোনাদের স্বাধীনভাবে ব্যবহারের জন্যে। তার সাথে ডোনা চেয়েছিল ইয়াউন্ডির একটা রোড ম্যাপ। ড্রাইভারও দিয়েছিল। কিন্তু ডোনা ড্রাইভার নেয়নি। ডোনা দেখেছিল, যে মিশন নিয়ে সে ক্যামেরুনে এসেছে তাতে ড্রাইভার নিলে ঝামেলার সম্ভাবনা আছে। আহমদ মুসার সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত তাকেই তার দায়িত্ব বহন করার মত যোগ্যতা দেখাতে হবে।

গাড়ি ড্রাইভ করছিল ডোনা।

গাড়ি চলছিল ইয়াউন্ডির সেন্ট্রাল রোড ধরে।

বেলা তখন ৩টা।

ডোনা দেখল, রাস্তার পাশে একটা সুন্দর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুনী। ইউরোপীয়ান পোশাক। মেয়েটি কালোও নয় আবার সাদাও নয়। কালো ও সাদার মাঝখানে অব্যক্ত এক রঙের সুষমা তার দেহে।

মেয়েটি গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক চাইছে।

ডোনা গাড়িটির পাশাপাশি এসে ব্রেক কষল গাড়িতে। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফরাসি ভাষায় ডোনা জিজ্ঞেস করল, ‘গুড ইভনিং, কোন সমস্যা?’

‘গুড ইভনিং, গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না।’ বলল মেয়েটি বিব্রত কন্ঠে।

‘আমি কি চেষ্টা করে দেখতে পারি?’ বলল ডোনা।

‘ওয়েলকাম। আমি বাধিত হবো।’

ডোনা তার গাড়িটি রাস্তার পাশে নিয়ে দাঁড় করাল। বলল, ‘আব্বা, আমার মনে হচ্ছে মেয়েটি বিপদে পড়েছে। একটু দেখি।’

‘যাও দেখ।’ পেছনের সিট থেকে বলল ডোনার আব্বা।

ডোনা এবং এলিসা গ্রেস দুজনেই নামল গাড়ি থেকে।

ডোনা গিয়ে হ্যান্ডশেক করল মেয়েটির সাথে। বলল, ‘নামটা কি জানতে পারি?’

‘ভেনেসা রোসেলিন। আপনি?’

‘আমি মারিয়া জোসেফাইন। আর এ এলিসা গ্রেস।’

ডোনা প্রথমে ড্রাইভিং সিটে বসে সব কিছু চেক করে বলল, ‘দোষটা ইঞ্জিনে।’

বলে বেরিয়ে এল গাড়ি থেকে।

তারপর গাড়ির সামনে গেল ডোনা। রোসেলিন চাবি দিয়ে কভার আনলক করল এবং কভারটি তুলে ছিটকিনিতে ঠেস দিয়ে রাখল।

ইঞ্জিন পরীক্ষা করে রোসেলিন-এর দিকে মুখ তুলে বলল, ‘বড় কিছু ঘটেনি। আমি ঠিক করে দিচ্ছি।’

স্ক্রুড্রাইভার নিয়ে এল ডোনা নিজের গাড়ি থেকে। দু’মিনিটের মধ্যে ঠিক হয়ে গেল।

কাজ শেষ করে রোসেলিনকে বলল, ‘স্টার্ট দিয়ে দেখুন ঠিক আছে কিনা।’

রোসেলিন ড্রাইভিং সিটে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। মিষ্টি গর্জন করে জেগে উঠল ইঞ্জিন।

হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল রোসেলিন। বলল, ‘ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ। গাড়ির কিছু আমি বুঝি না। কি যে বিপদে পড়তাম আপনাকে না পেলে।’

বলে একটু থামল রোসেলিন। কিন্তু ডোনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, ‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি ফরাসি। তাই কি?’

‘ঠিক বলেছেন, আজ সকালেই আমরা ক্যামেরুন এসে পৌঁছেছি।’

‘কোথায় উঠেছেন?’ বেড়াতে এসেছন বুঝি?’

‘ফরাসি রাষ্ট্রদূতের অতিথি আমরা।’

‘তাহলে তো আমরা শহরের একই এলাকায় আছি। আমি কি আপনাদের চায়ের দাওয়াত করতে পারি?’

‘ধন্যবাদ। কেন নয়?’

রোসেলিন খুশীতে ডোনার সাথে হ্যান্ডশেক করল।

‘গাড়ির ফ্ল্যাগ স্টান্ডে একটা পতাকা ঢাকা দেখছি। কি পতাকা?’

রোসেলিন একটু সলজ্জ হাসল। বলল, ‘আমার আব্বা চিপ জাস্টিস তো। ওঁর গাড়ি। ওটা ক্যামেরুনের জাতীয় পতাকা।’

‘ও, ওয়ান্ডারফুল। সৌভাগ্য যে, আপনার সাথে পরিচিত হবার সুযোগ হলো।’ উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল ডোনা। তার মনে পড়েছিল ব্ল্যাকক্রস ডঃ ডিফরজিস্কে কিডন্যাপ করেছে এই চীফ জাস্টিসকে বাগে আনার জন্যে। খুশী হলো। ঘটনার একটা পক্ষের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ তো অন্তত হলো!

‘সৌভাগ্য আমারও।’ বলে হেসে রোসেলিন বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’

‘অবশ্যই।’ বলল ডোনা।

‘আপনাদের পোশাক, বিশেষ করে গায়ে মাথায় ওড়না – এ ধরনের পোশাক তো ফরাসীরা পরে না।’

‘ফরাসীরা সবাই পরে না তা নয়। মুসলিম ফরাসীরা পরে।’ হেসে বলল ডোনা।

‘তাহলে আপনারা মুসলিম?’ বিস্ময় মিশ্রিত কন্ঠে বলল রোসেলিন।

‘খুশী হননি বুঝি?’ বলল ডোনা।

হাসিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল রোসেলিনের। বলল, ‘আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মুসলিম।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগ-অনুরাগের একটা ঢেউ খেলে গেল রোসেলিনের মুখে।

ডোনা তাকিয়েছিল রোসেলিনের মুখের দিকে। সে বিস্মিত হলো রোসেলিনের মুখ ভাবের এই পরিবর্তনে। ডোনার মনে হলো রোসেলিন যেন কথা শেষ করেও করল না।

‘ও! নাইস! কি নাম আপনার বান্ধবীর?’ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল ডোনা।

‘লায়লা ইয়েসুগো। ইয়েসুগো রাজ পরিবারের মেয়ে। ইয়াউন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ক্লাসমেট।’

‘ইয়েসুগো রাজপরিবার ক্যামেরুনের?’ বলল ডোনা।

‘হ্যাঁ। ক্যামেরুনের একদম উত্তরে গারুয়া উপত্যকা থেকে ‘লেক চাঁদ’ পর্যন্ত এক সময় ওদের রাজত্ব ছিল।’

‘ও! খুশী হবো যদি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।’

‘অবশ্যই। ওরাও খুশী হবে।’

বলেই রোসেলিন পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে ডোনার দিকে তুলে ধরে বলল, আমার ‘নেম কার্ড’। যে কোন প্রয়োজনে টেলিফোন করবেন।

ডোনা কার্ড হাতে নিয়ে বলল, ‘আসুন আমার আব্বা গাড়িতে। তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।’

বলে রোসেলিনের একটা হাত ধরে এগুল সে তার গাড়ির দিকে।

ওদেরকে গাড়ির দিকে আসতে দেখে ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি গাড়ি থেকে নেমে এল।

‘আব্বা, এ ভেনেসা রোসেলিন। ক্যামেরুনের চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের মেয়ে।’

তারপর রোসেলিনের দিকে মুখ তুলে ডোনা বলল, ‘ইনি আমার আব্বা মিশেল প্লাতিনি লুই।’

দু’জন শুভেচ্ছা বিনিময় করছে, তখন ডোনা ড্যাশ বোর্ডের কার্ড কেস থেকে তার ‘নেম কার্ড’ নিয়ে এল।

কার্ড রোসেলিনকে দিয়ে বলল, ‘এতে এখানকার টেলিফোন নম্বারও আছে।’

‘ধন্যবাদ।’

বলে রোসেলিন ডোনার আব্বার দিকে চেয়ে বলল, ‘আংকেল, এখনকার মত চলি। আমি কিন্তু চায়ের দাওয়াত দিয়েছি।’

‘ঠিক আছে মা। আমরা খুশী হয়েছি।’ বলল ডোনার আব্বা।

তারপর রোসেলিন ডোনা ও এলিসা গ্রেসের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘চলি, মনে থাকে যেন চায়ের দাওয়াতের কথা। আমি টেলিফোন করব।’

রোসেলিন এবং ডোনার গাড়ি এক সাথেই ছাড়ল।

‘খাওয়ার সব ব্যবস্থা ঠিক-ঠাক আছে তো মা?’ চীফ জাস্টিস উসাম বাইক জিজ্ঞেস করলো রোসেলিনকে।

রোসেলিন ড্রইং রুমে প্রবেশ করছিল। সে এসে তার আব্বার পাশে বসতে বসতে বলল, ‘সব ঠিক-ঠাক আব্বা, কোন চিন্তা করো না।’

রোসেলিন ডোনাদের দাওয়াত দিয়েছিল চায়ের। কিন্তু চীফ জাস্টিস ডোনার আব্বার পরিচয় পেয়ে শুধু চায়ের দাওয়াত দিতে রাজী হয়নি। ডোনার কার্ড দেখেই চীফ জাস্টিস চিনতে পেরেছিল ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি ডি-বেরী লুইকে।

‘জানো তো মা, ফ্রান্সের সম্রাট লুই-এর পরিবারের লোক ওরা। রাজত্ব না থাকলেও ঐ পরিবারের মান একটুও কমেনি। ওদের রুচি তো জানি না।’ বলল চীফ জাস্টিস।

‘তুমি কিছু ভেবনা আব্বা। আম্মাও তো ফরাসী মেয়ে। সব তিনি দেখেছেন। আর সেদিন আমি আংকেলকে দেখেছি, মারিয়াদের সাথে কথা বলেছি। খুব খোলা-মেলা ওঁরা। রাজকীয় মেজাজ বা গাম্ভীর্যের চিহ্ন ওদের মধ্যে নেই। আমার খুব ভালো লেগেছে। বলত আব্বা, মিস মারিয়া তোমার ভাষায় রাজকুমারী হয়েও যেভাবে শ্রমিকের মত আমার গাড়ি ঠিক করে দিয়েছে, ক্যামেরুনের গাড়ির মালিক কোন মেয়ে কি এটা করতো?’

‘বড়দের বড় হৃদয় হওয়া উচিত। ওঁদের ওটা আছে।’

কাঁটায় কাঁটায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এল ডোনা, ডোনার আব্বা এবং এলিসা গ্রেস।

রোসেলিন, তার আম্মা এবং তার আব্বা চীফ জাস্টিস উসাম বাইক তাদেরকে স্বাগত জানালেন বাড়ির গেটে।

ডিনার হলো রাত আটটায়।

ডিনার শেষে চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি বসে আলাপ করছে ড্রইং রুমে।

তখন কথা বলছিল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক, হ্যাঁ, আমার জন্ম ক্যামেরুনে বটে, কিন্তু আমি মানুষ হয়েছি ফ্রান্সে। আমি তখন ১০ বছরের বালক। ডঃ ডিফরজিস আমাকে ফ্রান্সে নিয়ে যান। তাঁর বাড়িতে রেখে তিনি আমাকে লেখাপড়া শেখান। আইন শাস্ত্রে ডক্টরেট করার পর ২৫ বছর বয়সে আমি ক্যামেরুনে চলে আসি। ফ্রান্সে তিনি আমাকে বিয়েও করান।‘

‘কোন ডঃ ডিফরজিস? সাবেক কুটনীতিক এবং প্যারিস আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ ডিফরজিস? তিনি তো আমার বন্ধু।’

‘জি, হ্যাঁ, তিনিই।’

ডোনার আব্বা একটু দ্বিধা করল। কিন্তু শেষে বললই, ‘ডঃ ডিফরজিসের খবর কিছু জানেন?’

চমকে উঠল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক। বলল, তাঁর সম্পর্কে কিছু জানেন আপনি?

‘জানি।’

‘তাকে কিডন্যাপ করে ক্যামেরুনে আনা হয়েছে, জানেন আপনি?’

‘জানি। ব্ল্যাকক্রস ও ওকুয়া তাঁকে কিডন্যাপ করেছে।’

‘আর কিছু জানেন?’

‘মনে হয় সবটাই জানি। তাঁকে পণবন্দী করে আনা হয়েছে। চীফ জাস্টিসের কাছ থেকে কিছু আদায় করার জন্যে।’

‘কি আদায় করতে চায়, সেটাও কি আপনি জানেন?’

‘জানি। ওমর বায়ার জমি আত্মসাতকে তারা বৈধ করে নিতে চায়।’

‘আপনি সবই জানেন। এসব কি ডঃ ডিফরজিস কিংবা র‍্যালফ–এর কাছে আপনি শুনেছেন?’

‘এখানে আসার আগে কুমেটে র‍্যালফ, ডেবরা এবং আমরা এক রেস্ট হাউসে এক সাথেই ছিলাম। কিন্তু ওমর বায়ার ঘটনা আমি আগে থেকেই জানি।’

‘আগে থেকে?’

‘আপনি হয়তো জানেন, ব্ল্যাক ক্রস র‌্যালফ এবং ডেবরাকেও কিডন্যাপ করেছিল। পরে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে।’

চমকে সোজা হয়ে বসল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক। বলল, ‘তারাও কিডন্যাপ হয়েছিল? কেন?’

‘তাদেরকে কিডন্যাপ করে ডঃ ডিফরজিসকে তারা বাধ্য করতে চেয়েছিল যাতে তিনি আপনাকে বলে তাদের কাজটা করিয়ে দেন। কিন্তু র‌্যালফরা মুক্ত হওয়ায় তাদের উদ্দেশ্য বানচাল হয়ে যায়। তখন তারা খোদ ডঃ ডিফরজিসকেই পণবন্দী করে ক্যামেরুনে নিয়ে এসেছে।’

বিস্ময় ও বেদনায় চীফ জাস্টিসের চেহারা ভারি হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। কথা বলল অনেকক্ষণ পর। বলল, ‘এত কিছু ঘটেছে, কিছুই জানতে পারিনি আমি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। তিনি আপনার সাথে দেখা করিয়ে দিয়েছেন।’

‘আমি আরও কিছু জানি মিঃ চীফ জাস্টিস।’

ডোনার আব্বার কথা শেষ হতেই চীফ জাস্টিস বলল, ‘দেখুন আপনি আমার সবচেয়ে সম্মানিত গুরুজনের বন্ধু। আপনিও আমার গুরুজন। মিষ্টার বলে সম্বোধন করলে আমি দুঃখ পাব। আর এখানে চীফ জাস্টিস হিসেবে কথা বলছি না।’

একটু থামল চীফ জাস্টিস। তারপর বলল, ‘এ সম্পর্কে যা জানেন দয়া করে বললে বাধিত হবো।’

ডোনার আব্বা র‌্যালফদের উদ্ধারের কথা, ডঃ ডিফরজিসের কিডন্যাপ এবং তাকে ও ওমর বায়াকে উদ্ধার প্রচেষ্টার সব কাহিনী বর্ণনার পর বলল, ‘যিনি র‌্যালফদের উদ্ধার করেছিলেন এবং ডঃ ডিফরজিসদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন, তিনি এখন ক্যামেরুনে।’

‘ক্যামেরুনে? কে তিনি?’ চীফ জাস্টিসের চোখে একরাশ বিস্ময়।

‘তিনি একজন সমাজসেবী। যেখানে মানুষের বিপদ সেখানে তিনি।’

‘র‌্যালফ কি তাকে নিয়োগ করেছে?’

‘আসলে তিনি চেষ্টা করছেন ওমর বায়াকে উদ্ধার করতে। এখন তো ওমর বায়া এবং ডঃ ডিফরজিস এক হয়ে গেছেন।’

‘তাহলে লোকটি মুসলমান।’

‘হ্যা। কিন্তু আপনি বুঝলেন কি করে?’

‘কোন খৃষ্টান ব্ল্যাক ক্রস ও ওকুয়া’র বিরোধিতার মুখে ওমর বায়াকে সাহায্য করতে যাবে না বা যেতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, আপনারা তাকে চেনেন। আপনারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন এটা রোসেলিনের কাছে শুনেছি।’

‘আপনার অনুমান ঠিক।’

‘আপনার খবর আমার জন্যে পরম সুসংবাদ। কিন্তু তিনি একা কি করবেন বিরাট শক্তির বিরুদ্ধে!’

‘এটা বলা মুস্কিল। তবে তার অতীত হলো, ‘তিনি যেখানে যান একাই এক বিশ্ব হয়ে দাঁড়ান।’

‘তার সাফল্য কামনা করি। যে কাজ আমার করার ছিল, তা তিনি করছেন। জানেন, তিনি কোথায় কি করছেন?’

‘আপনার সবই জানা দরকার। আসলে আমরা এসেছি তাঁরই সন্ধানে। আমরা জানি না তিনি কোথায়।’

‘কিন্তু আপনাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক কি? আপনারা তাঁর খোঁজে কেন আসলেন?’

ডোনার আব্বা উত্তর দিল না তৎক্ষণা। একটু ভাবল। তারপর মুখ তুলে তাকাল চীফ জাস্টিসের দিকে। বলল, ‘একটু স্বার্থের সম্পর্ক আছে। মারিয়া (ডোনা) আমার একমাত্র মেয়ে। তার স্বার্থেই এসেছি।’

চীফ জাস্টিসের মুখে এক টুকরো প্রসন্ন হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘মাফ করবেন। আপনাদের পারিবারিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছি। কিন্তু একটা কৌতুহল আমি চেপে রাখতে পারছি না।’

‘বলুন।’

‘ঐ মুসলিম ছেলেটি কে, যার সাথে ‘লুই’ রাজকুমারীর বিয়ে হচ্ছে এবং যার জন্যে ‘লুই’ পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারীরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আর ছেলেটি কে যে, বিনা স্বার্থে অন্যের জন্যে এ ভাবে জীবনের ঝুঁকি নেয়।’

ডোনার আব্বা চুপ করে থাকল। কোন উত্তর দিলনা তৎক্ষণাৎ। পরে ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না, তার পরিচয়ের প্রকাশ, তার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্যে কল্যাণকর হবে কিনা।’

‘আমি এখানে আপনাদের সাথে আলোচনা করছি আপনাদের একজন এবং ডঃ ডিফরজিসের একজন দত্তক সন্তান হিসেবে, চীফ জাস্টিস হিসেবে কিংবা সরকারী কোন লোক হিসেবে নয়।’

‘ধন্যবাদ। আপনি কি আহমদ মুসার নাম শুনেছেন?’

চীফ জাষ্টিস ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘একটা নাম শুনেছি। মানে তার সম্পর্কে অনেক পড়েছি। সে তো একজন ভয়ানক বিপ্লবী। ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে অনেক দেশের অনেক পরিবর্তনের সাথে সে জড়িত। এর কথা বলছেন কেন?’

‘আপনি যে ছেলেটির পরিচয় জানতে চাচ্ছেন সেই ছেলেটিই আহমদ মুসা।’

ডোনার আব্বার শেষ দু’টি শব্দ বিদ্যুত শকের মত কাজ করল যেন চীফ জাস্টিসের উপর। তাঁর চেহারায় হতবাক ও হতবুদ্ধির ভাব ফুটে উঠল। অনেকক্ষণ সে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকল ডোনার আব্বার দিকে। অনেক সময় নিয়ে সে ধীরে ধীরে বলল, ‘আপনি কি সত্যি বলছেন? তাঁর মত বিপ্লবী কেন কোন কাজে এ ঘটনায় জড়াবে? লুই পরিবারই বা তাঁর সাথে জড়িয়ে পড়বার হেতু কি?’

‘সে এক দূর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যখন আহমদ মুসা স্পেনে কাজ করছিল, তখন সে আমার মেয়েকে অবধারিত কিডন্যাপ হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়। সেই থেকেই তার সাথে আমাদের পরিচয় ঐ সময়ই সে ওমর বায়ার সাথে পরিচিত হয় তাকে গুন্ডাদের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে।’

তারপর ডোনার আব্বা ওমর বায়ার সাথে আহমদ মুসার পরবর্তী সম্পর্কের বিষয় তুলে ধরে বলল, ‘আসলে আহমদ মুসার ব্যক্তি, দেশ ও জাতি প্রেম সবই অমূল্য।’

‘ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন। আপনার শেষ সুখবরটি শুনে আমি মনে বল পাচ্ছি, একটা বড় সংকট থেকে হয়তো আমি বাঁচবো এবং ডঃ ডিফরজিসেরও জীবন বাঁচবে। কিন্তু উদ্বেগ বোধ হচ্ছে, সে তো একা। অন্যদিকে ‘ব্ল্যাক ক্রস’, ‘ওকুয়া’ এবং ‘কোক’-এর মিলিত শক্তি তার বিরুদ্ধে।’

‘সে কোথায় জানি না। কি করছে জানি না। প্রার্থনা ছাড়া আমাদের আর কি করার আছে!’

‘তার যদি সন্ধান পাওয়া যেত।’

ডোনার আব্বা ও চীফ জাস্টিস উসাম বাইক যখন এই আলোচনা করছিল, তখন বাড়ির বাগান ঘেরা একটা ছোট্ট লনে ডোনা, রোসেলিন এবং এলিসা গ্রেসদের মধ্যে গল্প চলছিল।

ডোনা বলছিল, ‘রোসেলিন আপনার সাথে দেখা হয়ে কি যে ভালো লাগছে! কখনও কোন প্রয়োজন বোধ করলে আপনাকে টেলিফোন করা যাবে, ক্যামেরুন সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে আপনাকে টেলিফোন করা যাবে’।

‘আর আমাদের পরিবারের সাথে আপনাদের পরিচয় আমার জন্যে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত হয়েছে’।

‘কেমন করে?’ বলল ডোনা।

‘লুই’ পরিবারের উত্তরাধিকারীরা মুসলমান হয়েছে এটা আব্বার জানা এবং আপনাদের দেখা আব্বার প্রয়োজন ছিল।’

‘কেন? কেন?’ বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল ডোনা।

‘এ ‘কেন’-এর উত্তর অনেক বড়। আজ থাক।’ বলল রোসেলিন সলজ্জ হেসে।

‘কিন্তু আপনার জন্যে এটা আশীর্বাদ হলো কি করে, এর উত্তর আপনি এক বাক্যেও দিতে পারেন।’ বলল ডোনা।

কথা বলল না রোসেলিন। মুখ সে নিচু করল। তার ঠৌঁটে এক টুকরো সলজ্জ হাসি।

ডোনা এই হাসি দেখে লায়লা ইয়েসুগোর কথা বলতে গিয়ে সেদিন রোসেলিনের মুখে যে হাসি দেখেছিল তার কথা মনে পড়ল। অনুরাগরঞ্জিত সলজ্জ এই হাসি ডোনার অপরিচিত নয়।

‘আজ থাক, আরেকদিন বলব।’ নীরবতা ভেঙে বলল রোসেলিন।

‘দেখুন মিস রোসেলিন, আমি কুটনীতিকের মেয়ে। কথার কুটনীতি দিয়ে ঠিক বের করে ফেলব কথা।’ হেসে বলল ডোনা।

‘ঠিক আছে বের করুন। শুধু তো কুটনীতিক নয়, আপনি রাজারও মেয়ে।’ হাসতে হাসতে বলল রোসেলিন।

ডোনা একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘নিশ্চয় আপনার আব্বা কোন মুসলিমের সাথে আপনার সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখেন না বা দেখবেন না, এমন আশংকা আছে।’

রোসেলিনের মুখ ভরা হাসিতে একটু ভাটা পড়ল তার চোখের দৃষ্টিতে কিছুটা বিস্ময় ফুটে উঠল। ঠৌঁটে সেই সলজ্জ হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘এটুকু ঠিক আছে।’

‘নিশ্চয় সেই সম্পর্কের সাথে আপনার এবং আপনার আব্বার একটা স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত আছে।’ রোসেলিনের চোখে চোখ রেখে ব্যারিস্টারের মত প্রশ্ন করল ডোনা।

‘এমন প্রশ্ন করছেন কোন যুক্তিতে?’ মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে প্রশ্ন করল রোসেলিন।

‘না, আগে প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ উত্তর দিন। আপনার প্রশ্নের জবাব পরে দিচ্ছি।’ ঝানু উকিলের মত ডোনা চাপ দিল রোসেলিনকে।

রোসেলিন হেসে উঠল। বলল, ‘উত্তর ‘হ্যাঁ’।’

‘এখন আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। স্বার্থের সম্পর্ক না থাকলে আপনার আব্বা এমন আচরণ কেন করবেন যাতে আপনার আহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে? দ্বিতীয়ত বড় কোন স্বার্থের সম্পর্ক না থাকলে আপনার আব্বার মনোভাব পরিবর্তনের সম্ভবনাকে অবশ্যই আপনি আশীর্বাদ বলতেন না।’

রোসেলিন হেসে উঠল। বলল, ‘খুব সুন্দর যুক্তি। আপনার ব্যবসায় বা যুডিসিয়াল প্রফেশনে আসা উচিত। আমি আংকলকে বলব।’

‘ধন্যবাদ। আমার তৃতীয় প্রশ্ন হলোঃ ঐ স্বার্থের সম্পর্ক যার সাথে তিনি অবশ্যই লায়লা ইয়েসুগো কিংবা কোন মেয়ে নন’।

ডোনার এই প্রশ্নের সাথে সাথে রোসেলিনের মুখের হাসি বিব্রতকর লজ্জায় রুপান্তরিত হল। বলল, ‘এই প্রশ্ন কেন আসে?’

‘এ প্রশ্নেরও জবাব পাবেন। কিন্তু আগে উত্তর দিন ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।’

রোসেলিন নিচু হয়ে পড়া তার চোখ তুলে তাকাল ডোনার দিকে। তারপর একটু সলজ্জ হেসে বলল, ‘হ্যাঁ।’

মুখ টিপে হাসল ডোনা। বলল, ‘এবার আপনার প্রশ্নের উত্তর: কোন মেয়ের সাথে কোন মেয়ের স্বার্থের সম্পর্ক এমন হয় না যার বিরোধিতায় নামতে হবে আংকলকে এবং যে সম্পর্কের রক্ষাকে আপনি আর্শীবাদ মনে করবেন।’

উজ্জ্বল হাসিতে ভরে উঠল রোসেলিনের মুখ। বলল, ‘আপনি চমৎকার। এরপরের প্রশ্নে আপনি কি বলেন, দেখি।’

ডোনা হাসল, বলল, ‘এটাই শেষ প্রশ্ন। বলুন প্রশ্নটা করবো তো?’

‘অবশ্যই।’ রোসেলিনের মুখের হাসিতে এবার লজ্জা মেশানো।

‘ঠিক আছে, আমার দিকে তাকান।’ ডোনা বলল রোসেলিনকে। রোসেলিন তাকাল ডোনার দিকে।

ডোনা তার চোখে চোখ রেখে মুখ টিপে হেসে বলল, ‘মুসলিম ছেলেটি কে?’

রোসেলিন দু’হাতে মুখ ঢেকে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলুন যাই, আংকলরা একা আছেন।’

ডোনা উঠে দাঁড়াল। রোসেলিনকে কাছে টেনে নিল হাত ধরে। বলল,‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আপনি উত্তর দেবার জন্যে।’

‘আপনি শুনতে খারাপ লাগছে। আমরা তো বন্ধু।’ বলল রোসেলিন ডোনার একটা হাত আঁকড়ে ধরে।

ডোনা রোসেলিনের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ঠিক আছে বন্ধু। উত্তর দাও এবার প্রশ্নের।’

রোসেলিন ডোনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘প্লিজ আজ থাক। চল ওদিকে যাই।’

‘বেশ চল।’ বলে তিনজনই হাঁটতে লাগল ড্রইং রুমের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে এলিসা গ্রেস বলল, ‘মারিয়া আপার প্রশ্ন শেষ। আমি একটা প্রশ্ন করি?’

হাসল রোসেলিন। বলল, ‘ভয় করছি এখন প্রশ্নকে।’

‘খুব সহজ প্রশ্ন। মুসলিম ছেলেটা লায়লা ইয়েসুগোর কেউ?’

দৌড়ে পালাতে যাচ্ছিল রোসেলিন। ধরে ফেলল ডোনা। বলল, ‘ধরা পড়ে গেছ, আর পালিয়ে লাভ কি?’

দাঁড়িয়ে পড়ল রোসেলিন। লজ্জায় রাঙা গোটা মুখ। বলল, ‘কি বলব, বোধহয় একটা অসম্ভব সুখ স্বপ্ন দেখছি আমি।’ কথাগুলো শেষের দিকে ভারি হয়ে উঠল তার।

ডোনা রোসেলিনের পিঠে হাত দিয়ে কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘স্বপ্ন সফল হওয়ার আগে এমনটাই মনে হয়। নাম কি ছেলেটার? জানতে পারি না আমরা?’

রোসেলিন মুখ নিচু করল। ঠোঁটে লাজ-রাঙা হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো, লায়লার ভাই।’

বলেই রোসেলিন দৌড় দিল ড্রইংরুমের দিকে।

পেছনে পেছনে ছুটল ডোনা এবং এলিসা গ্রেস।

ইয়েসুগো প্যালেস।

ইয়াউন্ডির অন্যতম প্রধান সড়ক ‘নর্থ এ্যাভেনিউ’-এর পশ্চিম পাশে পূর্বমূখী হয়ে দাঁড়ানো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা বিশাল গেট। ইয়েসুগো রাজ পরিবার এই বাড়িটি তৈরী করে ক্যামেরুনে ফরাসি শাসনের মাঝামাঝি সময়ে, যখন ফরাসী শাসকদের ষড়যন্ত্রে ইয়েসুগো সালতানাতের উপর একের পর এক বিপদ নেমে আসতে থাকে। বাড়িটি তৈরী করা হয় রাজ-পরিবারের একটা বিকল্প বাসস্থান হিসেবে। লেখাপড়া উপলক্ষ্যে আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো এবং তার বোন লায়লা ইয়েসুগোর বসবাস এই বাড়িতে এখন প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে। ইয়েসুগো প্যালেসে ইয়েসুগো পরিবারের পারিবারিক একটা ড্রইংরুম। ঘরটা খুব বড় নয়, কিন্তু খুব ছোটও নয়। ঘরের গোটা মেঝে লাল কার্পেটে মোড়া। সোফা সেট দিয়ে সাজানো ড্রইংরুম। ড্রইংরুমের এক পাশে একটা বড় টিভি সেট। তার পাশে একটা রেডিও। সে পাশেরই এক কোনায় রয়েছে ছোট্ট একটা ফ্রিজ এবং অন্য কোণায় রয়েছে ছোট্ট একটা বুক সেলফ। বুক সেলফে আছে দেশি-বিদেশী ম্যাগাজিন।

টিভি’র ঠিক বিপরীত দিকে তিন সোফায় পাশাপাশি তিনজন বসে।

মাঝখানে আহমদ মুসা।

তার বাম পাশে মুহাম্মদ ইয়েকিনি। এবং ডান পাশে আরেকজন নব্য যুবক। চুল কোঁকড়া কিন্তু রং প্রায় ফর্সা। ঠোঁট পাতলা। তার চেহারায় আরবীয় একটা ভাব আছে।

এই যুবকই আবদুল্লাহ রাশিদি ইয়েসুগো।

সে ইয়েসুগো রাজপরিবারের ৭ম পুরুষ। ৫ম পুরুষ পর্যন্ত তাদের রাজত্ব টিকে ছিল। রাশিদির আব্বা আমীর আবদুল্লাহ ইয়েসুগো যখন যুবরাজ, তখন তাদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায়্

রাশিদি ইয়েসুগোর মা মিসরীয় এবং দাদিও মিশরীয় ছিলেন।

গতকাল আহমদ মুসা এসেছে।

তারপর থেকে শুধু গল্পই শুনছে রাশিদি ইযেসুগো আহমদ মুসার কাছ থেকে। অসীম তার উৎসাহ।

আজ ক্যামেরুনের সাধারণ ছুটির দিন। অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। আজ সকাল থেকেই রাশিদি ইয়েসুগো আহমদ মুসাকে নিয়ে বসেছে।

মাঝখানে তারা যোহরের নামায সেরেছে এবং লাঞ্চ করেছে। তারপর আবার এসে বসেছে সোফায়।

রাশিদি বলছিল, ‘বড় ভুল করেছি। কাল থেকে যদি রেকর্ডার কাছে রাখতাম, তাহলে একা ইতিহাস রেকর্ড হয়ে যেত।’

‘ঠিক বলেছেন, আহমদ মুসা ভাইয়ের ভয়েসও রেকর্ড হয়ে যেত।’

বলল ইয়েকিনি।

‘সত্যি বিরাট একটা লস হলো’ বলল ইয়েসুগো।

‘অতীতের কথা নয়, এস ভবিষ্যতের কথা ভাবি।’ বলল আহমদ মুসা।

‘আমার কাছে ভবিষ্যতের চেয়ে অতীতই বেশী প্রয়োজনীয়।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘কেন?’ বলল আহমদ মুসা।

‘ইতিহাস না জনালে ইতিহাস গড়াও যায়না। অতীত না জানলে ভবিষ্যত বুঝাও যায় না। আমরা অতীত জানি না, তাই আমাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে আমরা অসচেতন।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘তোমার কথা ঠিক। কিন্তু ইতিহাসের এই অতীত এবং একজনের কাহিনী এক জিনিস নয়।’ বলল আহমদ মুসা।

‘বিষয়টাকে এইভাবে দেখা আমি মনে করি ঠিক নয়। মুসলমানদের বিপ্লব ও পরিবর্তনের এই ঘটনাগুলোকে এক ব্যক্তি মূখ্য ছিলেন বটে, কিন্তু কাজটা ছিল মুসলিম জনগণের জন্যে আত্ববিশ্বাস ও প্রেরণার উৎস। আজ বেশীর ভাগ মুসলিম সমাজে অবস্থার স্রোতে গা ভাসিয়ে চলার দৃশ্য দেখা যায়। এর কারণ, অনেকের ধারণা অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়, চেষ্টা করে লাভ নেই। বিপ্লব ও পরিবর্তনের কাহিনী এদের জন্যে বিরাট শিক্ষকের কাজ করবে এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে এদের দেহে। সুতরাং আমার মতে এই কাহিনীগুলোর সংগ্রহ ও প্রচার খুবই জরুরী।’

‘ঠিক আছে, জাগরণ সৃষ্টির এটাও একটা পথ। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা জাগরণ নয় এ্যাকশন প্রোগ্রামে আছি।’

‘ঠিক। কিন্তু কি করণীয় তা মাথায় আসছে না।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘ব্ল্যাক ক্রস কিংবা ওকুয়ার সাক্ষাত না পেলে তো আমরা কাজ শুরুই করতে পারছি না।’ বলল ইয়েকিনি।

‘পথ বেরিয়ে যাবে। আজ একটু বেরুব। অন্ততঃ চীফ জাস্টিসের বাড়ি এবং সুপ্রীম কোর্ট দেখে আসব।’

বলে আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রাশিদি ইয়েসুগো ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’র সময় হয়ে এল। আর দশ মিনিট। টিভি’টা খুলে দাও।’

‘কিন্তু বললেন না ভাইয়া, FW টিভির আজকের অনুষ্ঠানের জন্যে এত উদগ্রীব কেন আপনি?’

আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘না শুনলেই আনন্দ পাবে বেশী। তোমার আনন্দ কমাতে চাই না।’

একটু থেমেই আবার বলল, ‘আজ তোমাদের পত্রিকাও দেরীতে বেরুচ্ছে।’

‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু ন্যাশনাল ডে’তে সকালের জাতীয় অনুষ্ঠানের খবর নিয়ে পত্রিকা বের হয় তো তাই এ রকম দিনে বিকেল তিনটায় বেরোয়। পরের দিন পত্রিকা বের হয় না বলেই এই ব্যবস্থা।’ বলল ইয়েসুগো।

‘বাইরের দৈনিক পত্রিকা ইয়াউন্ডিতে কি আসে?’

‘নিয়মিত পাওয়া যায় ফ্রান্সের ‘লা মন্ডে’ এবং মিসরের আল-আহরাম।’ বলল ইয়েসুগো।

আহমদ মুসা সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তুমি কাউকে পাঠিয়ে ঐ দু’টিসহ আজকের এখানকার পত্রিকাগুলো আনাও। ৩টা তো বেজে যাচ্ছে।’

‘পাঠাচ্ছি, বিশেষ কিছু কি থাকবে পত্রিকায়?’ বলল ইয়েসুগো।

‘আশা করি বিশেষ কিছু থাকতে পারে।’

‘কি?’

‘যদি থাকে। খুশী হবে। অপেক্ষা কর।’

রাশিদি ইয়েসুগো উঠে গিয়ে টিভি অন করে এসে আবার সোফায় বসল।

টেলিফোন বেজে উঠল এ সময়।

ইয়েসুগো উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরল।

‘হ্যাঁ, লায়লা?’

‘হ্যাঁ, ভাইয়া।‘

‘এসে গেছ? কোথায় তুমি?’

‘এই তো শহরে ঢুকলাম। গাড়ি থেকে টেলিফোন করছি। জরুরী কিছু? খবর দিয়েছ কেন?’

‘বড় ঘটনা ঘটেছে।’

‘কি?’

‘বলব না, আসলে চোখে দেখবে।’

‘আমার টেনশন হচ্ছে। বল, খারাপ কিছু না আনন্দের।’

‘আনন্দের, তবে তার সাথে উদ্ধেগের খবরও আছে।’

‘তুমি না বললেই ভাল করতে। এখন খারাপ লাগছে।’

‘আম্মা আসছেন তো?’

‘আসছেন কিন্তু একটু পরে পৌছবেন।’

‘ও. কে। ফি আমানিল্লাহ। আসসালামু আলাইকুম।’

‘ওয়া আলাইকুমসসালাম।’

ইয়েসুগো টেলিফোন রেখে তার জায়গায় ফিরে এল।

‘আহমদ মুসা ভাইয়ের কথা লায়লাকে বলেছ?’ বলল ইয়েকিনি।

‘না বলিনি।’

‘এখন বললে না?’

‘ওকে একটা সারপ্রাইজ দেয়া যাবে।’

ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’র প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেল। এই টিভির প্রোগ্রামে প্রথমে ৫ মিনিট আগের দিনের বিশ্ব সংবাদের প্রধান বিষয় গুলোর ফলোআপ হয় তারপর দিনের প্রো প্রোগ্রামের বিবরন দেয়া হয়।

খবর প্রায় শেষ সেই সময় একজন তরুণী প্রবেশ করল ড্রইং রুমে। ফুলহাতা পা পর্যন্ত নামানো আরবীয় স্টাইলের গাউন পরা। মাথায় একটা সাদা রুমাল বাঁধা। তার উপর দিয়ে পরেছে চাদর। তরুণীটির রংও ফর্সা। তরুণী ড্রইং রুমে প্রবেশ করে সালাম দিয়েই আহমদ মুসার উপর নজর পড়ল। অপরিচিত লোককে দেখে সংকুচিত হয়ে উঠল এবং মাথার ওড়নাটাকে কপালের উপর আরও টেনে দিল।

রশিদি ইয়েসুগো উঠে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটি আরও এগিয়ে এলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, ‘এই আমার সেই বোন।’ আর লায়লাকে আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি আমাদের সম্মানিত মেহেমান।’

‘নাম তো লায়লা ইয়েসুগো না? লায়লার আগে-পিছে তো আর কোন শব্দ নেই।’ বলল আহমদ মুসা।

কথা শেষ করেই রশিদি ইয়েসুগো বসে পড়েছিল। লায়লাকে ইংগিত করেছিল বসতে। লায়লা গিয়ে ওদের তিনজনের বিপরীত দিকে একটা সোফায় ভিন্ন হয়ে বসল।

‘বল লায়লা। তোমার পুরো নামটা।’ বলল রশিদি ইয়েসুগো।

রশিদির কথায় লায়লা মনে মনে বিরক্ত হলো। কপালটা কুঞ্চিত হলো অসন্তুষ্টির প্রকাশ হিসাবে। না চেনা, না জানা একজন লোকের তার নাম সংক্রান্ত প্রশ্নের তাকে জবাব দিতে হবে কেন? ভাইয়া নিজে না বলে তাকে জবাব দিতে বলল কেন? ভাইয়ার এই আচরন তার কাছে নতুন মনে হচ্ছে। অপরিচিত জনের সামনে এভাবে বসা তাদের ঐতিহ্যেই নেই। তার উপর তাকে অপরিচিত জনের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়ে।

লায়লা বিস্মিত দৃষ্টিতে একবার ভাইয়ার দিকে তাকাল। তারপর চকিতে একবার আহমদ মুসার দিকে চোখ তুলল। দেখল আহমদ মুসার মুখ নিচু। একবারই তার দিকে তাকিয়েছিল। আর সে তাকায়নি। লায়লা মনে হল মেহমানটি ভদ্র এবং ভালো। ক্যামেরুনের মুসলিম সমাজে চোখের পর্দা খুব কমই দেখা যায়। আসল পর্দা তো চোখের পর্দাই।

‘‘লায়লা’র পর একটি শব্দ আছে। আমার নাম ‘লায়লা নুর ইয়েসুগো’।’

‘ধন্যবাদ বোন’, মাথা না তুলেই বলা শুরু করল, ‘খুব ভাল নাম। লায়লা নুর অর্থ নুরের বা আলোর মত রাত। এই অর্থের দিক দিয়ে বিজয়ের রাত বা সফল্যের রাতও বলা যায়।’

‘আমিন। সামনের দিন গুলো আমাদের সাফল্যের হোক।’ বলল রশিদি ইয়েসুগো।

বিব্রত লায়লা কিছু বলতে যাচ্ছিল।

এই সময় ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভিতে দিনের পরবর্তী প্রোগামের বিবরণ দিতে শুরু করেছে।

সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা সবাইকে থামিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে বলল, ‘এস আমরা টিভি প্রোগামের দিকে মনযোগী হই।’

আহমদ মুসার আকস্মিক এবং নির্দেশমূলক আচরন লায়লার কাছে অসৌজন্যমুলক বলে মনে হলো। কিন্তু সবাইকে টিভির প্রতি মনোযোগী হতে বলে সেও টিভির দিকে তাকাল। লায়লার মনে প্রশ্ন জাগল। টিভিতে এমন কি প্রোগ্রাম আছে যে ওরা সবাই এভাবে টিভিমুখী হলো।

অনুষ্ঠানসুচির শুরুতেই ঘোষক বলল, ‘আজকের অনুষ্ঠানে নিউজ ফিচার পর্যায়ের শুরুতেই রয়েছে ক্যামেরুনের জাতিগত অবস্থার উপর একটা আনুসিন্ধান রিপোর্ট। এতে আপনারা শুনবেন দক্ষিণ ক্যামেরুনের মুসলিম জাতি গোষ্ঠী কি ধরণের নির্মূল অভিযানের শিকার হয়েছে।’

ঘোষনা শুনে রশিদি ইয়েসুগো সোজা হয়ে বসল। তার চোখে মুখে বিস্ময়ের একটা ঢেউ আছড়ে পড়ল। সে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘একি শুনছি মুসা ভাই। সত্যি শুনছি তো? আপনি কি এ প্রোগ্রামের কথাই বলেছিলেন?’

লায়লার চোখে-মুখেও প্রশ্ন।

‘হ্যাঁ, রশিদি। আমি এ প্রোগ্রামের কথাই বলছিলাম। এস দেখি, সব কথা ঠিক ভাবে এসেছে কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।

আহমদ মুসার কথার ধরনে বিস্মিত হলো লায়লা। কথায় মনে হচ্ছে টিভি অনুষ্ঠানটির সব আয়োজনই যেন মেহেমান লোকটি করেছে। কে লোকটি!

টিভি’র অনুষ্ঠানসুচি শেষ হলো। শুরু হলো ক্যামরুনের নিউজ ফিচারটি।

আহমদ মুসাদের আটটি চোখ টিভি পর্দার উপর স্থিরভাবে নিবন্ধ।

ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি (FWTV) তার দীর্ঘ দশ মিনিটের নিউজ ফিচারে যে রিপোর্ট পেশ করল তা সংক্ষেপে এইঃ

“আফ্রিকার কথিত অন্ধকারের আড়ালে জাতি নির্মূলের নীরব অভিযান চলছে। এই অভিযানের প্রধান চাপ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের মধ্যাঞ্চলে কেন্দ্রীভুত হয়েছে। দক্ষিণ ক্যামেরুন ইতিমধ্যেই এই নির্মূল অভিযানের পূর্ণ গ্রাসের মধ্যে এসে পড়েছে। পেছন থেকে এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে কিংডোম অব ক্রাইস্ট বা ‘কোক’। আর ‘কোক’-এর পেছনে রয়েছে জঙ্গি খৃষ্টান সংগঠন ‘ওকুয়া’।

কোক তার পুরনো কৌশল নিয়ে সামনে এগুচ্ছে। ওয়াকিফহাল মহলের বরাত দিয়ে আমাদের প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, দক্ষিণ ক্যামেরুনের সব জমি স্বেচ্ছা বিক্রয়, জবরদস্তি ক্রয় এবং ভুয়া দলিলের মাধ্যমে ‘কোক’ দখল করে নিয়েছে। দক্ষিণ ক্যামেরুনের ৪০লাখ একর মুসলিম মালিকানাধীন জমির মধ্যে মাত্র ২ লাখ একর জমি তারা মালিকের কাছ থেকে স্বেচ্ছা বিক্রয়ের মাধ্যমে কিনেছে। অবশিষ্ট জমির ষাট ভাগ তারা কিনেছে জবরদস্তি ক্রয়ের মাধ্যেমে। বাকি ৪০ ভাগ জমি তারা মালিকেদের উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দিয়ে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছে। গত পাঁচ বছরে ‘কোক’ দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে ১০ লাখ মুসলমানকে সম্পত্তি ও ঘর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে। খৃস্টান সংগঠন ‘কোক’ দৃশ্যের আড়ালে থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি এবং নানা নামের এনজিও-এর মাধ্যমে দক্ষিণ ক্যামেরুনে এই ভুমি দখলের কাজ সম্পন্ন করেছে। ‘কোক’ এর এই ভুমি দখল এবং মুসলিম নির্মল অভিযানে শত শত মুসলিম জীবন দিয়েছে, শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। কারন এরা আপোসে জমি তাদের হাতে তুলে দিয়ে নীরবে এলাকা ত্যাগ করতে রাজী হয়নি। ভুমি দখলে তারা কত বেপরোয়া তার দৃষ্টান্ত হিসাবে আমাদের প্রতিনিধি দক্ষিণ ক্যামেরুনের একটি মুসলিম পরিবারের মর্মান্তিক কাহিনী তুলে ধরেছেন।

সমগ্র দক্ষিণ ক্যামেরুনে একটি মাত্র মুসলিম পরিবার অবশিষ্ট ছিল। ওমর বায়ার পরিবার। ক্যম্পু উপত্যাকায় তাদের বাড়ি। উপত্যকায় একটি সম্মানিত পরিবার ছিল এটা। দশ হাজার একরের একটা প্লটের মালিক ছিল এই পরিবার। শুর থেকেই ‘কোক’ এর নজর পড়ে এই জমি খণ্ডের উপর। কিন্তু যখন ওরা বুজল ওমার বায়ার আব্বার কাছ থেকে এ জমি তারা হস্তগত করতে পারবেনা, পরিবারটিকে দুর্বল ও ভিত করার পথ হিসাবে কোক হত্যা করল ওমার বায়ার আব্বাকে।

পিতা নিহত হবার পর ওমার বায়ার উপর অব্যাহতভাবে চাপ দিতে থাকল তারা। আশে পাশের মুসলমানরা উচ্ছেদ হয়ে যাবার পর ওমর বায়ার পরিবার একা পড়ে গেল। বিপন্ন হয়ে উঠল তাদের জীবন। ওমর বায়া তার মা’কে নিয়ে জীবন বাঁচাবার জন্যে উত্তর ক্যামেরুনের কুম্বায় পালিয়ে গেল পালিয়ে গিয়েও তারা বাঁচতে পারল না। ‘কোক’ ও ‘ওকুয়া’র লোকেরা ওমর বায়াকে হত্যা প্রচেষ্টা চালায়। ওমর বায়া পালাতে সমর্থ হলেও নিহত হয় তার মা। কিন্তু এরপরও তার সম্পত্তি ওমর বায়া খৃস্টানদের হাতে ছেড়ে দিতে রাজী হয় না। ক্যামেরুনে থেকে তার জীবন বাঁচানো অসম্ভব হয়ে উঠল। অবশেষে ক্যামেরুনের একটা উচ্চ আদালতে তার সম্পত্তির ব্যাপারে একটা উইল রেজিস্ট্রি করে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পত্তি হস্তান্তর ও দখলের সকল পথ বন্ধ করে সে ফ্রান্সে পালিয়ে গেল।

কিন্তু রক্ষা পায়নি সে। জানা গেছে কয়েকদিন আগে ওমর বায়াকে কিডন্যাপ করে ক্যামেরুনে আনা হয়েছে। এখন তারা ওমর বায়াকে হাতে রেখে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারকের উপর চাপ প্রয়োগ করে ওমর বায়ার জমিটা হস্তগত করতে চায়। সংশ্লিষ্ট বিচারককে বাধ্য করার জন্যে তার এক অতি আপনজনকে কিডন্যাপ করেছে তারা।

আমরা যখন এই রিপোর্ট সম্পুর্ন করছি, তখন ইয়াউন্ডির কুন্তে কুম্বা এলাকার ভীতিকর একটা রিপোর্ট আমরা পেলাম। কুন্তে কুম্বা এলাকায় কোক জবরদস্তি জমি কেনা শুরু করেছে। ‘কোক’কে তার দাবীকৃত একটি ভূমিখন্ড দিতে রাজী না হওয়ায় কোক কুন্তে কুম্বার দু’জন লোককে হত্যা এবং সেখানকার মসজিদের সম্মানিত ইমামকে কিডন্যাপ করে। এছাড়াও কোক কয়েকবার ঐ এলাকায় হামলা চালায়। ৪ দিন আগে অনুরুপ একটি হামলা সংঘটিত হয়। দু’টি মাইক্রোবাসে বোঝাই পনের বিশ জনের একটি সশস্ত্র দল খুব ভোরে এই হামলা চালায়। স্থানীয় মুসলমানদের পক্ষ থেকে সব সময় এসব বিষয় পুলিশকে যথারীতি অবহিত করা হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে পুলিশ ‘কোক’-এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করে না। দক্ষিন ক্যামেরুনের ক্ষেত্রেও এটাই দেখা গেছে।

ক্যামেরুনের সরকার এবং বিশ্বের মানবতাবাদী সংস্থাসমুহের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হওয়া আবশ্যক। ‘কোক’-এর জাতি নির্মূল অভিযান অবিলম্বে বাদ এবং তাদের অতীত কৃতকর্মের প্রতিকার হওয়া উচিত।”

দশ মিনিটের প্রোগ্রামটি শেষ হলো ফ্রি ওয়াল্ড টিভি”র। আহমদ মুসা উঠে গিয়ে টিভি অফ করে দিয়ে এল।

টিভি প্রোগ্রাম শেষ হলেও রশিদি ইয়েসুগো এবং লায়লা টিভি স্ক্রিন থেকে তাদের চোখ সরায়নি। বিস্ময়ে যেন তারা পাথর হয়ে গেছে। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’তে ক্যামেরুনের মুসলমানদের এই বিবরন তাদের কাছে স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। কি করে সম্ভব হলো এটা। রাশিদি ভাবল, টিভি’তে এই প্রোগ্রাম আজ হবে আহমদ মুসা তা আগাম জানল কি করে!

এই সময় একটি অল্প বয়সের ছেলে কতগুলি খবরের কাগজ নিয়ে ড্রইংরুমে প্রবেশ করল।

রাশিদি ইয়েসুগো সেদিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, ‘যা বলেছিলাম, সব কাগজ পেয়েছ?’

‘পেয়েছি।’ বলল ছেলেটি।

ছেলেটি কাগজগুলো এনে রাশিদি ইয়েসুগোর কাছে খুব সম্মানের সাথে রেখে বেরিয়ে গেল।

লায়লা ছাড়া আহমদ মুসারা তিনজন সংগে সংগে টেবিল থেকে কাগজ তুলে নিল।

আহমদ মুসা তুলে নিয়েছিল ফ্রান্সের ‘লা-মন্ডে’। আহমদ মুসা প্রথম পাতার উপর একবার নজর বুলিয়েই বলল, ‘ইয়েসুগো লা-মন্ডে এই খবর প্রথম পাতায় ডাবল কলাম হেডিং-এ ছেপেছে।’

‘কোন খবর?’ পত্রিকা থেকে মুখ তুলে বলল ইয়েসুগো। সে আল আহরামের উপর নজর বুলচ্ছিল।

‘ক্যামেরুনের যে রিপোর্ট টিভিতে দেখলে সেই রিপোর্ট। ’

আহমদ মুসর কথা শেষ না হতেই ইয়েসুগো চিৎকার করে উঠল, ‘কি আশ্চর্য, টিভি’র এই খবর আল আহরাম প্রথম লিড আইটেম হিসাবে ছেপেছে।’

রাশিদি ইয়েসুগোর কথা শেষ না হতেই কথা বলে উঠল ইয়েকিনি। বলল, ‘দেখ দেখ, আমাদের ‘দি লিবার্টি’ও সিঙ্গল কলামে খবরটি ছেপেছে।’

দেখা গেল ক্যামেরুনের স্থানীয় অন্যান্য কাগজও সংক্ষেপে সিংগল কলামে হলেও খবরটি ছেপেছে। শুধু ‘কোক’-এর সিজার পত্রিকা ‘দিস ক্রস’ খবরটি ছাপেনি।

‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না কিভাবে এটা সম্ভব হলো? টিভি এবং খবরের কাগজে এক সাথে খবরগুলো এলো?’ বিস্মিত কন্ঠে বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

রাশিদি ইয়েসুগো, লায়লা, ইয়েকিনি সবার দুষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। লায়লা বুঝতে পারছেনা, তার ভাইয়া রাশিদি, ইয়াকিনি সবাই মেহমানকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে কেন? মেহমানের সামনে তাদের আচরনকে অনেকটা জড়োসড়ো বলে মনে হচ্ছে। কে এই মেহমান?

‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি যে, কাজটা পরিকল্পনা মোতাবেক হয়ে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।

‘পরিকল্পনা? কার পরিকল্পনা?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘ওমর বায়ার খবরটা পাঠিয়েছে ফ্রান্স থেকে আমাদেরই এক সাংবাদিক বোন।’

‘সে জানল কি করে?’

‘আমি তাকে নিউজটা করতে বলেছিলাম আর কুন্তে কুম্বা’র রিপোর্ট লিখেছে ইয়েকিনির বোন ফাতেমা মুনেকা। তোমাদের সামনেই তো গতকাল আমি তা পাঠালাম।’ বলল আহমদ মুসা।

‘কিন্তু টিভি ও নিউজ মিডিয়া রিপোর্ট পেলেই কি এভাবে প্রচার করে? কিভাবে এটা হলো?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘FWTV এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সী (WNA)-এর সাথে আমাদের সুসম্পর্ক আছে। এ ধরনের নিউজ প্রচার করা ওদের একটা দায়িত্ব।’

‘তার মানে সংস্থা দু’টি কি মুসলমানদের?’ বলল লায়লা। তার চোখে-মুখে বিস্ময়।

‘মুসলমানদের। কিন্তু বাইরে এ পরিচয় নেই। মুসলিম পুঁজি এ সংস্থা দু’টি গড়ে তুলেছে এবং পরিচালনা করছে। কিন্তু কাজ-কামে এর মুসলিম পরিচয়কে মূখ্য করা হয় না। এটা সম্পুর্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। মুসলিম স্বার্থের পক্ষে কাজ করে, কিন্তু সেটা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হয়।’ বলল আহমদ মুসা।

‘বুঝা গেল, আপনার পরিকল্পনাতেই এটা হয়েছে। কিন্তু কি লক্ষ আমরা অর্জন করতে চাচ্ছি এর দ্বারা?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘প্রথমত, নীরব জাতি নির্মূলের এই ঘটনা বিশ্ববাসীকে জানানো। চক্ষু লজ্জার খাতিরে হলেও বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখানে কি ঘটেছে তা এখন জানতে চেষ্টা করবে। দ্বিতীয়ত, ক্যামেরুন সরকারকে সক্রিয় করা, যাতে তারা মুসলমানদের অভিযোগগুলোর দিকে নজর দেয়। বিশ্বব্যাপী এই প্রচারের ফলে ক্যামেরুন সরকার নিজেদেরকে কিছুটা অপরাধী ভাবতে বাধ্য হবে এবং কিছুটা হলেও নিরেপেক্ষ হবার চেষ্টা করবে। তৃতীয়ত, ওমর বায়ার সম্পত্তি হস্তান্তরে একটা বাধার সৃষ্টি হবে।’

‘ঠিক বলেছেন। ব্যাপারটাকে কোনদিন তো আমরা এই ভাবে চিন্তা করিনি। এভাবে এক ঢিলে যে বহু পাখি মারা যায়, তা আমাদের কখনও মাথায় আসেনি।’

‘দেখ, আনবিক বোমার চাইতে মিডিয়া অস্ত্র অনেক বেশী পাওয়ারফুল। একটা আনবিক বোমা একটা শহরে বা একটা এলাকায় আগুন লাগাতে পারে, কিন্তু একটা মিডিয়া আগুন লাগাতে পারে গোটা দুনিয়ায়।’

‘FWTV’এবং ‘WNA’ কি এই লক্ষ্য সামনে রেখেই মুসলমানরা করেছে?’

‘অবশ্যই।’

‘কিন্তু আমরা তো জানি না।’

‘আজ জানলে। এভাবেই যাদের জানা উচিত তারা জানবে। এ সংস্থা দু’টি মুসলমানরা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করেছে। তা যদি সবাই জেনে ফেলে, তাহলে এ সংস্থা দু’টির ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হয়ে যাবে। সবাই এর বক্তব্যকে দলীয় ভাষ্য হিসেবে ভাববে।’

‘ঠিক। এই কৌশল যে আমারা নিতে পেরেছি, এ জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।’

লায়লা ইয়েসুগোর বিস্ময় তখন চরমে। কে এই মেহমান? দেখতে অনেকটা তুর্কিদের মত চেহারা। তাদের পরিবারের পরিচিত এমন তো কেউ নেই! মনে হচ্ছে সে অনেক জানে, অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তি তার!

লায়লা একটু পাশে ঝুঁকে রাশিদি ইয়েসুগোর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, মেহমানের পরিচয় দাওনি।’

রাশিদি ইয়েসুগো হেসে উঠল। বলল,‘স্যরি, লায়লা। তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে ওঁর পরিচয় রিজার্ভ রেখেছিলাম।’

বলে একটু থামল রাশিদি ইয়েসুগো। গম্ভীর হলো সে। বলল, ‘ইনি আমাদের অতি সম্মানিত ভাই বিশ্ব-বিশ্রুত আহমদ মুসা।’

শক খাওয়ার মত চমকে উঠল লায়লা। তার চোখ প্রথমে ছুটে গেল আহমদ মুসার দিকে। তারপর এসে নিবদ্ধ হলো রাশিদি ইয়েসুগোর উপর। বলল, ‘কি বলছ ভাইয়া! তিনি! তিনি ক্যামেরুনে! আমাদের এখানে।’

‘যখন ইয়েকিনি ওঁকে আমার এখানে নিয়ে এল, তখন ব্যাপারটা তার চেয়েও অবিশ্বাস্য ঠেকছিল আমার কাছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আল্লাহ আহমদ মুসাকে ক্যামেরুনে এনেছেন। তাঁর আসার সাথে সাথে আমাদের সৌভাগ্যের যাত্রাও আলহামদুলিল্লাহ শুরু হয়েছে। এই মাত্র ক্যামেরুনের উপর যে টিভি রিপোর্ট শুনলাম এবং সংবাদপত্রে যে রিপোর্ট দেখেছি, এগুলো তারই প্রমান। কুন্তে কুম্বায় আরও কি ঘটেছে ইয়েকিনির কাছে শুনবে। দেখবে কিভাবে রাতের অন্ধকার দিনের আলোতে রুপান্তরিত হয়েছে।’

থামল রাশিদি ইয়েসুগো।

লায়লা ইয়েসুগো সংগে সংগে উঠে দাঁড়াল। আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম। মাফ করবেন। আমি যা শুনলাম, আমি যা দেখছি সব আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে।’

আহমদ মুসা সালাম গ্রহন করে মুখ না তুলেই বলল, ‘কোন কাউকে অস্বাভাবিকভাবে বড় কল্পনা করলে বাস্তবে তার যখন সাক্ষ্য পাওয়া যায়, তখন এ রকমই হয়। তাই কোন কাউকে খুব বড় করে দেখা ঠিক নয়।’

‘বড়কে ছোট করে দেখাও বোধহয় ঠিক নয়।’ বলল লায়লা।

‘যে যা তাকে তাই ভাবা উচিত।’

‘সেটা ভাবতে গেলে তো ডিকশনারীতে যত বিশেষণ তার অধিকাংশই তো আপনার নামের আগে বসাতে হয়।’ বলল ইয়েকিনি।

‘থাক, এসব কথা। এস কাজের কথা ভাবি। আমার ক্যামেরুনে আসার চতুর্থ দিন আজ। কিন্তু এখনও আসল কাজ শুরু করতে পারিনি।’ বলল আহমদ মুসা।

‘মাফ করবেন। গতকাল থেকে ভাইয়ারা আপনার অনেক কাহিনী শুনেছেন। আমি কিন্তু বঞ্চিত হলাম।’ বলল লায়লা।

‘আমি আশা করি রাশিদি সব বলবে তোমাকে।’ বলল, আহমদ মুসা মুখ না তুলেই।

‘অবশ্যই বলব।’ এসব কাজে ওর খুব আগ্রহ বলেই তো জরুরী খবর দিয়ে নিয়ে এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি সত্বেও। বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘আপনার ক্যামেরুন মিশনের লক্ষ্য কি?’ বলল লায়লা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।

‘আমার ক্যামেরুন মিশনের লক্ষ্য ছিল ওমর বায়া এবং ড. ডিফরজিসকে উদ্ধার করা এবং ওমর বায়ার সম্পত্তি তার দখলে আনার ব্যবস্থা। করা কিন্তু ক্যামেরুন আসার পর, বিশেষ করে কুন্তে কুম্বায় দু’দিন কাটিয়ে যে ক্যামেরুনকে দেখলাম, তাতে লক্ষ্য আরও বড় হয়েছে।’

‘ক্যামেরুনের সৌভাগ্য এটা।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘এমন কিছু যদি ক্যামেরুনে না ঘটত, সেটাই হতো ক্যামেরুনের সৌভাগ্য।’ বলল আহমদ মুসা।

‘ঘটে গেছে বলেই তো আমরা দূর্ভাগ্যের শিকার। এখন আমরা সন্ধান করছি সৌভাগ্যের।’ বলল লায়লা।

‘এ সন্ধানকে আল্লাহ সফল করুন।’ আহমদ মুসা বলল।

‘আপনার সম্পর্কে আমাদের সীমাহীন কৌতুহল। কিছু প্রশ্ন করতে পারি?’ বলল লায়লা।

‘অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল।

‘আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন।’ বলল লায়লা।

‘আমার ব্যক্তিগত তেমন কিছু নেই, যা কিছু আছে বোন ফাতেমা মুনেকা মনে হয় সব কিছু জেনেছে। তুমি তাকে জিজ্ঞেস কর।’ বলল আহমদ মুসা।

‘আপনার বোন তো একটা নয়।’ বলল লায়লা।

‘তা হবে কেন। হাজারো বোন, হাজারো ভাই নিয়ে আমার পৃথিবী।’ বলল আহমদ মুসা।

‘আমার জানার খুব ইচ্ছা, এই কঠিন পথে আপনার যাত্রা কিভাবে?’

‘এ প্রশ্নের উত্তর আমার জন্য কঠিন। ফিলিস্তিনের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে সংঘাত-সংঘর্ষের মধ্যে বেড়ে উঠা একজন ফিলিস্তিনি বলতে পারবেন তার বিপ্লবী শুরু কিভাবে। আমার ব্যাপারটাও ঐ রকম। আমার চোখের সামনে আমার মা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আরও হাজারো জনের সাথে আব্বা ও ছোট ভাইয়ের দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়েছে বোমায়, ক্ষুধা-তৃষ্ণা-শীতে সাথীদের একে একে ঢলে পড়তে দেখেছি মৃত্যুর কোলে হিমালয়ের উপত্যকায়। তাদের সকলের একটা অপরাধ ছিল, তারা মুসলমান। এই বোধ কখন যে কিভাবে আমাকে দূর্ভাগা মুসলিম সমাজের একজন সেবকে পরিনত করেছে আমি জানিনা।’ আহমদ মুসা বলল।

‘আপনি সবচেয়ে খুশী হন কিসে?’ বলল লায়লা।

‘যখন কারো মুখে আমি নির্মল হাসি দেখি।’ বলল আহমদ মুসা।

‘সবচেয়ে দুঃখিত হন কিসে?’

‘যখন মানুষের চোখে অশ্রু দেখি।’

‘তাহলে মানুষকে কেন্দ্র করেই আপনার সব কিছু। মানুষকে এত ভালোবাসেন কেন?’

‘মানুষকে ভালোবাসলে আল্লাহ সবচেয়ে খুশী হন বলে।’

‘সত্যিই খুশী হন? কেন?’

‘মানুষকে দিয়েই তো আল্লাহর সব আয়োজন। এই দুনিয়া, এই মহা-বিশ্ব, সব কিছুই আল্লাহ করেছেন মানুষের জন্যেই।’

‘মানুষকে এই নির্বিচার ভলোবাসা কি সেকুলার ভালোবাসা নয়?’

হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মানুষকে নির্বিচারে ভালোবাসতে না পারলে পথভ্রষ্ট মানুষকে, দূর্ভাগা পাপীদের কিভাবে আলোর পথে, মুক্তির পথে নিয়ে আসবো?’

‘তাহলে মুসলিম এবং অমুসলিমকে ভালোবাসায় কোন পার্থক্য থাকবে না?’

‘মুসলিমরা তোমার দেহের অংগ, আর অমুসলিমরা তোমার আশ্রিত অসহায় জন। পার্থক্য বুঝেছ?’

‘বুঝেছি। বড় একটা বিভ্রান্তি আমার দূর হলো।’

‘লায়লার মধ্যে যে একটা ভ্রান্তি ছিল তার স্বীকৃতি অনন্ত পাওয়া গেল। কী বল ইয়েকিনি।’ বলল রাশিদি মুখ টিপে হেসে।

‘যাই বল আমি কিছু বলব না আজ। তবে ইয়েকিনিকে সাক্ষী মানা ঠিক হয় নি। ভুল স্বীকারকে সে কুইনাইনের চেয়েও তেতো মনে করে।’ বলল লায়লা।

‘দোষ করলে রাশিদি তুমি, লায়লা শোধ নিল আমার ওপর।’ বলল ইয়েকিনি। ‘নিরাপদ জায়গা কোনটা লায়লা চিনে।’

লায়লা কিছু বলতে চাচ্ছিল। তার আগে আহমদ মুসা বলল, ‘তোমাদের মধুর বিতর্ক আপাতত স্থগিত। আমার ঘুম পাচ্ছে। তোমাদের এখানে আরামের জীবন আমাকে অলস করে তুলল মনে হচ্ছে।’

‘স্যরি, না, ঠিক আছে। খাওয়ার পর একটু রেষ্ট নেওয়া প্রয়োজন।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘আরামের জীবন মানে কি অলস জীবন?’ বলল লায়লা।

‘আরামের জীবন মানে অলস জীবন নয়। তবে আরামের জীবন যদি লক্ষ্যহীনতা ও নিশ্চিন্ততায় আক্রান্ত হয়, তাহলে জীবন কাজ না পেয়ে অলস হয়ে দাঁড়াতে পারে।’

‘নিশ্চিন্ততা ও লক্ষ্যহীনতা দ্বারা আপনি কি বুঝতে চাচ্ছেন?’ লায়লা বলল।

‘মানব জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে উদাসিনতা এবং মানুষ হিসেবে নিজের দ্বায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে কোন চিন্তা না করা।’

‘মাফ করবেন। এক কথায় মানব জীবনের লক্ষ্যকে আপনি কিভাবে বর্ণনা করবেন?’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে লায়লা বলল।

‘মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্যে কাজ করা।’

‘সব মানুষের কল্যাণ সব মানুষের মুক্তির জন্য?’

‘অবশ্যই, আল্লাহর কোন বান্দা কি তোমার পর যে তার কল্যাণ ও মুক্তির কথা ভাববে না? তবে প্রথম ভাবতে হবে আয়ুর কথা, পরে আশ্রিত’দের কথা।’

‘আমার মনে হচ্ছে কি জানেন, আমাদের মত আপনার ভাই-বোনদের শিক্ষিত করার জন্যে গোটা দুনিয়ায় আপনার শিক্ষা কোর্স চালানো দরকার। আমরা অনেক কিছুই জানি না।’ লায়লা বলল, ইয়েসুগোদের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে।

সাংঘাতিক দামী কথা বলেছ লায়লা তুমি। বলল রাশিদী ইয়েসুগো।

‘রাশিদী তুমি আরও স্বীকার করবে, আমাদের মেয়েরা দামী কথাই বেশী বলে। আসলে ইসলামের প্রতি ওদের চিন্তা আন্তরিকই বেশী।’ বলল ইয়েকিনি।

‘আচ্ছা ইয়েকিনি, লায়লা তোমাকে অতবড় আঘাত করল, আর তুমি তাকে এত বড় সমর্থন দিলে?’ মুখ টিপে হেসে বলল রাশিদী।

‘সমর্থন নয়, সত্যের প্রতি স্বীকৃতি।’ বলল লায়লা। লজ্জার একটি ঢেউ তার মুখের ওপর দিয়ে বয়ে গেল।

ইয়েসুগো ও আহমদ মুসার পেছনে পাশাপাশি হাটছিল লায়লা এবং ইয়েকিনি।

কথা শেষ করেই লায়লা তাকাল ইয়েকিনির দিকে। ইয়েকিনি কিছু বলতে যাচ্ছিল। যেন মুখ ফস্কে বেরুচ্ছিল কিছু কথা।

লায়লা ঠোঁটে আঙ্গুল চাপা দিয়ে আহমদ মুসাদের দিকে ইংগিত করে কিছু না বলার জন্যে অনুরোধ করল।

লায়লার চোখে-মুখে রক্তিম লাজ-নম্রতা।

লায়লা কথা শেষ করার পর মূহুর্ত কয়েক নিরবতা। নিরবতা ভাঙল আহমদ মুসার কন্ঠ। বলল, ‘ইয়েকিনি ঠিকই বলেছে। প্রমাণিত হয়েছে প্রতিকূল পরিবেশে মেয়েরাই ইসলামকে ধরে রাখতে পারে বেশী। ইসলামের শিক্ষাও তাদের মাধ্যেমে বেশী সম্প্রসারিত হয়। সাবেক কম্যুনিষ্ট দেশগুলোতে এটা আমরা দেখেছি। আফ্রিকাতেও তোমরা এটা দেখবে।’

‘ব্যাস লায়লা, তোমার আর কি চাই, দলিল পেয়ে গেছ।’ পেছনে তাকিয়ে হেসে বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘দেখ ভাইয়া ধর্মের কল এভাবেই বাতাসে নড়ে।’

লায়লার কথায় হেসে উঠল ওরা তিনজন সকলেই এক সাথে।

ইয়াউন্ডির বাণিজ্যিক এলাকায় একটা চারতলা ভবন। ভবনের তিনতলার একটা প্রশস্ত কক্ষ। কক্ষের বড় একটা টেবিলকে সামনে রেখে এক চেয়ারে বসে আছে পিয়েরে পল। তার ডানপাশে ফ্রান্সিস বাইক, ওকুয়ার প্রধান।

তাদের সামনের টেবিল ঘিরে আরো অনেকগুলো চেয়ার।

টেবিল থেকে অল্পদূরে দেয়ালে আটা একটা টিভি স্ক্রীনে ফ্রি-ওয়াল্ড টিভি’র প্রোগ্রাম চলতে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু সেদিকে পিয়েরে পলের কোন খেয়াল নেই। তার চোখ-মুখ আগুনের মত লাল। ফ্রান্সিস বাইকের মুখ নিচু। আষাঢ়ের মেঘের মত ভারী। কথা বলছিল পিয়েরে পল ‘এতবড় ঘটনা কিভাবে ঘটল। ফ্রিওয়াল্ড টিভির মত একটা বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মিডিয়া ১০মিনিট ধরে মুসলিম উচ্ছেদ এবং ‘কোক’ এর কুকীর্তি বর্ণনা করল! এটা কি করে সম্ভব হলো? রীতিমত এটা মিডিয়া জগতে বিপ্লবের মত। ওমর বায়ার কাহিনী সর্বস্তরে বর্ণনা করেছে। কত লাখ একর জমি কিভাবে দখল হয়েছে তাও বলেছে। বলতে গেলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে। নিশ্চয় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে ও.আই.সি, রাবেতা সহ মুসলিম দেশ গুলো চিৎকার করবেই। পশ্চিমা অনেক মানবধিকার সংস্থা দেখবেন সোচ্চার না হয়ে পারবে না। এখানকার সরকারও এখন চাপের মুখে পড়বে। তাদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা আমরা পাচ্ছিলাম, ভবিষ্যতে তা পাওয়া আর আগের মত সহজ হবে না। সবচেয়ে বড় কথা ওমর বায়ার জমি হস্তান্তরের কাজটাও জটিলতায় পড়বে।’

থামল একটু পিয়েরে পল। সে আবার মুখ খোলার আগেই কথা বলে উঠল ফ্রান্সিস বাইক। বলল, ‘এ রকম কত নিউজ হয়। চীফ জাস্টিস কি তার কথা থেকে সরবেন? সরলে আমাদের অস্ত্র তো আছেই। চীফ জাস্টিস তার জীবনের চাইতেও ডঃ ডিফরজিসকে ভালবাসেন। সুতরাং………’

‘সুতরাং কাজটা সহজ হতেও পারে।’ ফ্রান্সিস বাইককে বাধা দিয়ে বলতে শুরু করল পিয়েরে পল, ‘কিন্তু সরকার যদি বাইরের চাপে এনিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে, তাহলে কাজটা কঠিন হতে পারে।’

‘তা হতে পারে। তাই চীফ জাস্টিস কে দিয়ে কাজটা আমাদের আগেই সেরে ফেলতে হবে। তাছাড়া সরকার চাপে পড়লেই যে সরকার সঙ্গে সঙ্গে গলে যাবে, ব্যাপার তা নয়। সরকারের দু’একজন মানবতাবাদী ছাড়া সকলেই আমাদের পক্ষে। সরকার চাপে পড়ে তদন্তের কথা বলতে পারে, কিন্তু সেটা লোক দেখানোই হবে। তাদের ভাই-ভাতিজা ও পুত্র-কন্যা-জামাইদের আমাদের এনজিওগুলো বড়বড় বেতন দিয়ে পুষছে।’

‘সুখবরের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশন কিংবা পশ্চিমের অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা সরেজমিন তদন্তের জন্যে আসতে পারে। বলা যায় আসবেই। ও. আই. সি. এবং মুসলিম দেশগুলো অবশ্যই এর ব্যবস্থা করবে।’

‘সেগুলো মোকাবিলার পথ করা যাবে। কাগজে কলমে কোথাও আমাদের কোন ত্রুটি নেই। দক্ষিণ ক্যামেরুনের কোথাও মুসলিম জনপদ ছিল তা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। কোন মসজিদই আস্ত রাখা হয়নি। ভেঙ্গে সেখানে গীর্জা তৈরী করা হয়েছে।’

একটু থামল ফ্রান্সিস বাইক। তারপর বলল, ‘অন্য একটা কথা ভেবে আমি বিস্মিত হচ্ছি, রিপোর্টের কোথাও ব্ল্যাক ক্রস-এর নাম নেই। ডঃ ডিফরজিস এবং চীফ জাস্টিস এর আদালতের উল্লেখ নেই। বোধহয় এ ব্যাপারগুলো পুরো জানেনা যে রিপোর্ট পাঠিয়েছে।’

‘আমার তা মনে হয় না। সংশ্লিষ্ট বিচারকের আত্মীয়কে ফ্রান্স থেকে কিডন্যাপ করে আনা হয়েছে, সে কথা রিপোর্টে বলেছে। এ তথ্য যারা জানে, তারা ঐসব ব্যাপারও জানে। আমার মনে হচ্ছে, যারা এখবর প্রচারের পেছনে আছে তারা খুব ঠান্ডা মাথার লোক। তারা গোটা রিপোর্টে সরকারের জন্যে সামনে এগুবার কোন ক্লু রাখেনি। চীফ জাস্টিস এবং ডঃ ডিফরজিসের নাম করলে সরকার ক্লু পেয়ে যেত। আমার মনে হয় যারা খবর প্রচারের পেছনে আছে তারা চাচ্ছে নিজেরাই ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করতে। তারা সরকারকে মনে হয় বিশ্বাস করে না।’

‘ঠান্ডা মাথার এ লোকটা কে হতে পারে, যে ফ্রিওয়ার্ল্ড কে দিয়েও নিউজ করিয়ে নিতে পারে।’

‘এটাই তো বুঝতে পারছিনা। এ ধরণের একজন লোক আহমদ মুসাই। কিন্তু সে কি বেঁচে আছে? অবশ্য দুয়ালা’য় যে লোকটি আমাদের পরাজিত করে পালাতে সমর্থ হয়, তার চেহারার যে বিবরণ পাওয়া গেছে তাতে আহমদ মুসার সাথে মিলে যায়। আবার আমাদের দুয়ালা ঘাঁটি থেকে আমরা চলে আসার পর যে লোকটি হানা দেয় তার চেহারাও আহমদ মুসার মতই। সব মিলিয়ে আমার মনে হচ্ছে লোকটি আহমদ মুসাই। কিন্তু ভাবছি, সে বাঁচল কি করে ধ্বংস হওয়া মটর থেকে।’

একটা ঢোক গিলল পিয়েরে পল। থামল একটু। শুরু করল আবার, ‘রিপোর্টে কুন্তে কুম্বা’র কি শুনলাম? কি ঘটেছে সেখানে?’

এই সময় ইন্টারকম কথা বলে উঠল, ‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক, ইদেজা থেকে লোক এসেছে। জরুরী মেসেজ।’

‘নিয়ে এস।’ ফ্রান্সিস বাইক বলে উঠল, ‘এখনি জানা যাবে সব কিছু। কুন্তে কুম্বার সবচেয়ে কাছের ঘাটি ইদেজা থেকে লোক এসেছে।’ ফ্রান্সিস বাইকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের পাশে রক্ষিত ইন্টারকমে একটা নীল বাতি জ্বলে উঠল। ফ্রান্সিস ইন্টারকমের দিকে মুখ নিয়ে বলল, ‘গেটে কে?’

ইন্টারকমেই উত্তরটা ধ্বনিত হলো। বলা হলো, ‘স্যার ইদেজার লোককে নিয়ে এসেছি।’

‘এস।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

দরজা খুলে গেল। প্রবেশ করল একজন শ্বেতাঙ্গ যুবক। খৃষ্টান ফাদারের পোশাক পরা।

‘মিঃ পিয়েরে পল, যুবকটি আমাদের ইদেজা গীর্জার একজন ফাদার এবং ‘কোক’-এর ইদেজা-ঘাঁটির ইনফরমেশন ডাইরেক্টর।’

যুবকটি টেবিলের সামনে এলে ফ্রান্সিস বাইক উঠে দাঁড়িয়ে যুবকটির সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘বসুন ফাদার জেমস।’

ফাদার জেমস পিয়েরে পলের সাথেও হ্যান্ডশেক করল। তারপর বসল।

ফাদার জেমস হ্যান্ডশেক করার সময় হাসার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হাসিটা কান্নার চেয়েও কাল হয়ে উঠেছিল।

‘বলুন ফাদার জেমস। নিশ্চয় ইদেজা’র কিছু দুঃসংবাদ আমাদের শুনাবেন।’

‘শুধু দুঃসংবাদ নয়, বিপর্যয় ঘটে গেছে।’ বলল ফাদার জেমস।

‘বিপর্যয়! কেমন বিপর্যয়?’

‘কুন্তে কুম্বার ওরা ইদেজা’র ‘কোক’ প্রধান জন স্টিফেনসহ আমাদের ১৬জনকে বন্দী করেছে এবং তাদের সাথের দু’জনকে হত্যা করেছে। পরে ইদেজা থেকে ওদের ইমামকে মুক্ত এবং ইদেজার ডেপুটি ‘কোক’ প্রধান ফ্রাসোয়া বিবসিয়ের’কে বন্দী করে নিয়ে গেছে।’ থামল ফাদার জেমস।

‘কি বলছ তুমি? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

মাথা নিচু করল ফাদার জেমস। বলল, ‘অবিশ্বাস্য বটে, কিন্তু যা বলেছি তাই ঘটেছে।’

‘ইদেজায় ওরা কয়জন লোক এসেছিল?’

‘তিনজন।’

‘কি বলছ? তিনজন লোক এসে আমাদের ঘাটিতে ঢুকে তাদের ইমামকে খুলে নিয়ে গেল। আর ফ্রাসোয়াকেও বন্দী করে নিয়ে গেল। তোমরা কি করছিলে?’

‘বাধা দিতে গিয়ে আমাদের দু’জন খুন হয়েছে ইদেজায়।’

‘এবং কুন্তে কুম্বায় দু’জন। ওদের কেউ মারা যায়নি?’

‘না। ওদের কেউ মারা যায়নি।’

‘আচ্ছা, বলত ঘটনা। শুনি কি করে ঘটতে পারল এই অসম্ভব ঘটনা।’

ফাদার জেমস কুন্তে কুম্বার সব ঘটনা এবং ইদেজাতে যেভাবে যা ঘটেছিল সবিস্তারে সব বর্ণনা করল।

ফাদার জেমস কথা শেষ করে থামতেই পিয়েরে পল বলে উঠল, ‘দেখা যাচ্ছে গোটা বিপর্যয়, ঘটেছে মাত্র একজন লোকের হাতে।’

‘তাই তো দেখছি। কিন্তু কুন্তে কুম্বা তো দুরে, ক্যামেরুনের কোথাও তো এ ধরণের লোক গত দশ বছরে আমাদের চোখে পড়েনি।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘লোকটিকে আপনি দেখেছেন?’ জিজ্ঞেস করল পিয়েরে পল ফাদার জেমস কে।

দেখেছি।

‘বলুন তো লোকটা কেমন?’ বল পিয়েরে পল।

‘লোকটা ফর্সা এশিয়ান। তুর্কিদের সাথেই তার চেহারার মিল বেশী।’

‘ঘন কাল চুল মাথায়?’ বলল পিয়রে পল।

‘হ্যাঁ।’

‘চুল কিছু কোকড়ানো?’

‘ঠিকই বলেছেন।’

‘মুখের চেহারায় কি শিশু সুলভ সহজ ভাব?’

‘হ্যাঁ।’ বলল জেমস।

পিয়েরে পল মুখ ঘুরিয়ে তাকাল ফ্রান্সিস বাইকের দিকে। বলল, ‘তাহলে আহমদ মুসা সেদিনের গাড়ি বিস্ফোরণে মরেনি। এই চেহারা নিঃসন্দেহে আহমদ মুসার। বুঝা যাচ্ছে, কুমেটে আমাদের ঘাটিতে সেদিন আহমদ মুসাই তাহলে হানা দিয়েছিল।’

‘আমি বুঝতে পারছিনা মিঃ পল এই ওমর বায়ার সাথে আহমদ মুসার কি সম্পর্ক? আহমদ মুসার সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নেই! তাহলে সে আমাদের পিছু ছাড়ছে না কেন?’

‘মিঃ ফ্রান্সিস বাইক আহমদ মুসাকে আপনি চিনতেই পারেননি। সে তো জাতির জন্যে কাজ করছে। ওমর বায়া তার জাতির একজন। আমরা ওমর বায়ার শত্রু মানে তার শত্রু।’ বলল পিয়েরে পল।

পিয়েরে পল আবার ফিরল ফাদার জেমসের দিকে। বলল, ‘ফ্রাসোয়া বিবসিয়ের’কে ওরা ইদেজা থেকে ধরে নিয়ে গেছে, দু’জনকে হত্যা করে গেছে, জন স্টিফেনসহ ১৬জনকে কুন্তে কুম্বায় বন্দী করে রেখেছে-এই বিষয়গুলো আপনারা পুলিশকে জানিয়েছেন তো?’

মুখটা ম্লান হয়ে গেল ফাদার জেমসের। বলল, ‘আমরা গিয়েছিলাম থানায় মামলা দায়ের করতে। কিন্তু দেখা গেল, তারা আগেই মামলা দায়ের করে গেছে।’

‘ওরা কি মামলা দায়ের করেছে?’ বলল পিয়েরে পল।

‘ওরা ঐদিন পরপর দুইটি মামলা দায়ের করেছে। প্রথমটিতে মূল অভিযোগ, জন স্টিফেন ও ফ্রাসোয়া বিবসিয়েরের নেতৃত্বে জনা বিশেক সশস্ত্র লোক কুন্তে কুম্বার উপর আক্রমণ চালায়। এলাকাবাসী চারদিক থেকে ছুটে এসে ওদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। প্রতিরোধের মুখে ওরা কয়েকটি লাশ সহ পালিয়ে গেছে। ওদের দুটি গাড়ি আটক করা হয়েছে। আর ২য় মামলায় বলেছে, ওরা ইদেজা থেকে কুন্তে কুম্বায় আক্রমণ করতে এলে সুযোগ পেয়ে ওরা কিডন্যাপ করে রাখা আমাদের ইমাম আলী ওকেচুকু ওদের দু’জন লোককে পরাভুত করে পালিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। আমরা তার নিরাপত্তাহীনতার ভয় করছি।’

‘তার মানে ওরা জন স্টিফেন সহ আমাদের ১৬জন লোককে যে বন্দী করে রেখেছে এবং ইদেজা ঘাটিতে এসে আমাদের দু’জনকে হত্যা করে ফ্রাসোয়া বিবসিয়েরকে ধরে নিয়ে গেছে সব অস্বীকার করছে।’ চিৎকার করে উঠল ফ্রান্সিস বাইক।

ফাদার জেমস কোন কথা বলল না।

‘সাংঘাতিক ব্যাপার। আপনারা ওদের মুক্ত করার জন্যে ওখানে আর অভিযান করেননি?’ বলল পিয়েরে পল।

‘আমরা লুলমডোর, ম্যালমায়া, ইবোলোয়া এবং ক্রিবি ঘাঁটির সাথে আলোচনা করেছি। তারা সব শুনে বলেছে, বড় ধরনের যুদ্ধ ছাড়া কুন্তে কুম্বায় এখন ঢোকা যাবে না। ওদের হাতে অনেকগুলো মেশিনগান, সাব মেশিনগান ও গোলা-গুলী চলে গেছে। এখন ওদের মোকাবিলা করতে গেলে বিরাট ক্ষয়-ক্ষতি হতে পারে। বড় ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়া এটা করা যাবে না। ইতিমধ্যে আমরা খবর পেলাম আপনারা ক্যামেরুন ফিরেছেন। ইয়াউন্ডি এসেছেন। তাই শুনেই এখানে ছুটে এলাম।’

‘কি মনে করেন, বন্দীদেরকে কি ওরা মেরে ফেলতে পারে? বন্দী করার কথা যখন ওরা গোপন করেছে, তখন মেরে ফেলাই ওদের জন্যে স্বাভাবিক।’ বলল পিয়েরে পল।

‘না মেরে ফেলেনি। ইতিমধ্যে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে স্যার। যার কারণে আরও বেশী ছুটে আসা এখানে?’ বলল ফাদার জেমস।

‘খারাপ কিছু? কি ঘটনা?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘কুন্তে কুম্বা থেকে ভায়া-মিডিয়া মেসেজ এসেছে, তাদের চারটি দাবী পূরণ হলে ওরা বন্দীদের ছেড়ে দেবে।’

‘চারটি দাবী কি?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘তাদের প্রথম দাবী ইয়াউন্ডি হাইওয়ে থেকে দক্ষিণে ইদেজা অঞ্চলে জবরদস্তি ও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে আত্মসাতকৃত সকল মুসলিম জমি ফেরত দিতে হবে। দুই, গত পাঁচ বছরে যাদেরকে এই অঞ্চল থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণসহ পূনর্বাসন করতে হবে। তিন, গোটা দক্ষিণ ক্যামেরুনে খৃষ্টানদের সত্যিকার মিশনারী সংস্থাগুলো থাকবে, কিন্তু সেবার নামে ষড়যন্ত্ররত এনজিও-দের তৎপরতা বন্ধ করে দিতে হবে। চার, ‘কোক’ কে তার সকল দুস্কর্ম লিখিতভাবে স্বীকার করতে হবে।’

‘দাবীগুলো ও প্রতিশ্রুতি কি তারা লিখিতভাবে দিয়েছে? আমাদের দলিল প্রয়োজন, যাতে প্রমাণ হয় স্টিফেনরা তাদের হাতে বন্দী আছে।’ বলল পিয়েরে পল।

‘ওরা লিখিত কিছু দেয়নি। একটা অডিও ক্যাসেটে জন স্টিফেন তাদের দাবীগুলো আমাদের শুনিয়েছে। তারপর ক্যাসেট তারা ফেরত নিয়ে গেছে।’ বলল ফাদার জেমস।

‘জন স্টিফেনকে দিয়ে ওরা কথা বলিয়েছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘আর কিছু বলেছে?’

‘পনের দিন ওরা সময় দিয়েছে। দাবী পূরণ না হলে বন্দীদের তারা কি করবে তা তারাই জানে।’

‘ওদের কাজগুলো নিখুঁত দেখছি। আইনের দিক দিয়ে ওদের ধরার কোন পথ তারা রাখেনি। শক্তি প্রয়োগ করতে গেলেও ঝুঁকি আছে। বন্দীদের ওরা খুন করে ফেলতে পারে।’ বলল পিয়েরে পল।

‘কিন্তু এমন বুদ্ধি ওরা কোথায় পেল? ক্যামেরুনে বহুদিন কাজ করছি। এমন তো ঘটেনি?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘ভুলে যাচ্ছ কেন, ওদের মাঝে এখন আহমদ মুসা। তারই কাজ এসব।’

‘আমরা এখন কি করব মিঃ পল?’

‘চিন্তা করতে হবে। তবে অন্য কিছুর দিকে মন দেবার আগে ওমর বায়ার সম্পত্তির ফয়সালা করে ফেলতে হবে। আহমদ মুসা কুন্তে কুম্বায় ব্যস্ত থাকতে থাকতে আমাদের এই কাজটা শেষ করতে হবে।’

‘ঠিক বলেছেন মিঃ পল।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

বলে ফ্রান্সিস বাইক ফাদার জেমসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জন স্টিফেনদের ওরা কোথায় আটকে রেখেছে?’

‘এটা জানার কোন উপায় নেই। ওদের এলাকায় এখন এমন পাহারা অপরিচিত কোন লোক সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না।’ বলল ফাদার জেমস।

‘পুলিশ পাঠানো যায় না?’

‘পুলিশের সাথে আলোচনা করেছি। তারা ওদের কম্যুনিটি সেন্টার মসজিদ পর্যন্ত যেতে পারে। পুলিশ বলেছে, ওদের এলাকা সার্চের কোন সুযোগ পুলিশের নেই। কারণ, কেস গেছে ওদের পক্ষে। ওরা বাদী।

‘বুদ্ধিতে আপনারা পরাজিত হয়েছেন। এখন তার মাশুল তো দিতেই হবে।’ তীব্র ক্ষোভ ঝরে পড়ল ফাদার ফ্রান্সিস বাইকের কন্ঠে।

একটু থেমে একটু শান্ত হয়ে ফ্রান্সিস বাইক বলল, ‘ঠিক আছে মিঃ জেমস আপনি যান। পরে কথা হবে আপনার সাথে।’

ফাদার জেমস চলে গেলে ফ্রান্সিস বাইক পিয়েরে পলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না ওমর বায়ার লোকরা এত বড় ‘মিডিয়া ক্যু’ করল কি করে?’

‘তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না পিয়েরে পল। শূন্য দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সীকে এ ধরনের নিউজ মাঝে মাঝেই করতে দেখা যাচ্ছে। এটা ওদের নিছক ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ না ওরা কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে তা দেখা প্রয়োজন। আপনি একটা ভালো বিষয়ের দিকে ইংগিত করেছেন। ও দু’টি সংবাদ মাধ্যমকে ভালো করে এক্স-রে করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমাদের ব্ল্যাক-ক্রস ইনটেলিজেন্স এবং ইসরাইলি ইনটেলিজেন্স এক সাথে কাজ করতে পারে। আমি এখনি আমাদের ইনটেলিজেন্স চীফ সাইরাস শিরাককে টেলিফোন করে দিচ্ছি।’

বলে টেলিফোন তুলল পিয়েরে পল।

সাইরাস শিরাক থাকেন প্যারিস। ‘হ্যালো, শিরাক।’ টেলিফোন সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে বলল পিয়েরে পল।

‘ইয়েস স্যার।’ ওপার থেকে বলল সাইরাস শিরাক।

‘আজকের FWTV দেখেছ?’

‘মনিটর করা হয়েছিল, আমি দেখলাম।’

‘কি বুঝলে?’

‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে তারা এটা প্রচার করেছে।’

‘তুমিও বলছ একথা?’

‘কেউ নিশ্চয় করিয়েছে এটা।’

‘কিন্তু সি এন এন কে দিয়ে কেউ করাতে পারে এটা?’

‘না পারে না।’

‘তাহলে কি বুঝছ?’

‘বুঝতে পারছি FWTV-তে ইসলামী মৌলবাদের জীবাণু ঢুকেছে।’

‘এই জীবাণু তোমাকে ধ্বংস করতে হবে।’

‘বুঝেছি।’

‘কাজ শুরু করে দাও। প্রথমে সন্ধান, তারপর চিহ্নিতকরণ এবং শেষ কাজ ধ্বংস করা।’

‘শুরু করছি। ওদিকের কি খবর?’

‘চীফ জাষ্টিসের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। কাজ হবে।’

‘খুশীর খবর স্যার।’

‘প্রভু যিশু সদয় হোন। রাখি।’

‘ও, কে স্যার।’

‘ও, কে। বাই।’

টেলিফোন রেখে ফ্রান্সিস বাইকের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমাদের শিরাক করিতকর্মা। সেও ব্যাপারটা ধরে ফেলেছে।’

‘ভালই হলো, সব দিকেই আমাদের নজর দেয়া দরকার।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘কিন্তু সবচেয়ে বেশী নজর রাখতে হবে রেডিও, টিভি, সংবাদ সংস্থা ও সংবাদপত্রের দিকে। এ চারটি সংবাদ মাধ্যমের আন্তর্জাতিক কোন চ্যানেলে মুসলমানদের ঢুকতে দেয়া যাবে না।

‘কিন্তু ওদের টাকার জোর তো কম নেই। আন্তর্জাতিক চ্যানেল তো ওরাও গড়তে পারে।’

‘পারে। কিন্তু সেগুলোকে বাঁচতে দেয়া হবে না। যেমন ওদের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক নিউজ এজেন্সী’ (IINA) এবং ওদের মক্কা ভিত্তিক ‘ভয়েস অব ইসলাম’ বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়।’

কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়াল পিয়েরে পল। বলল, ‘বসুন, আমি আসছি। চীফ জাষ্টিসের সাথে কথা বলতে হবে।’

চীফ জাষ্টিস উসাম বাইকের ড্রইং রুম।

পাশাপাশি দু’টি সোফায় বসেছিলেন চীফ জাষ্টিস এবং ল’সেক্রেটারী লাউস মেইডি।

ল’সেক্রেটারী নতুন নিয়োগ লাভের পর চীফ জাষ্টিসের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্যে এসেছে। লাউস মেইডি এর আগে ছিলেন স্বরাষ্ট্র সেক্রেটারী।

চা খেতে খেতে দু’জনে গল্প করছিলেন।

FWTV- এর প্রোগ্রাম শুরু হলে তাদের গল্প থেমে গেল। ক্যামেরুন সংক্রান্ত ফিচার নিউজের ঘোষণা শুনে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল।

পুরো ফিচার নিউজটি তারা দু’জনে সম্মোহিতের মত দেখল।

চীফ জাষ্টিসের মুখে একটা প্রবল উত্তেজনার ছাপ। আর ল’সেক্রেটারীর চোখ তো রীতিমত ছানাবড়া হয়ে উঠেছে।

নিউজ ফিচারটি শেষ হলে প্রথমে কথা বলল ল’ সেক্রেটারী লাউস মেইডি। বলল, ‘স্যার, ক্যামেরুনের মান-ইজ্জত সব ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। এ ভয়ানক রিপোর্ট তারা কোথায় পেল।’

চীফ জাষ্টিসের মনে তখন অন্য চিন্তার ঝড়। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠেছে পিয়েরে পলের মুখ এবং পণ-বন্দী হিসেবে আটক ডঃ ডিফরজিসের মুখ। তার মনে পড়ল পিয়েরে পলের সাথে তার কথোপকথন এবং ডঃ ডিপরজিসের মুক্তির জন্যে পিয়েরে পলের প্রস্তাবে তার মৌন স্বীকৃতির কথা। এই নিউজ তো সব লন্ড-ভন্ড করে দেয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করল, ভাবল সে। মিশেল প্লাতিনির কথা তার মনে পড়ল। মনে পড়ল আহমদ মুসার কথাও। ওরা কি ওমর বায়া ও ডঃ ডিফরজিসকে সথাসময়ে উদ্ধার করতে পারবে? পুলিশের সাহায্য নেয়ার কথাও তার মনে হলো। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, তাতে নিস্ফল হৈ চৈ বাড়বে এবং ডঃ ডিফরজিসের জীবন তাতে বিপন্ন হতে পারে। তার পিতৃপ্রতিম ডঃ ডিফরজিসের মুখ তার মনের আকাশে ভেসে উঠল। কেঁপে উঠল উসাম বাইকের হৃদয়। সে কোন ভাবেই তার প্রিয় এ লোকটির জীবন বিপন্ন হতে দিতে পারে না। আবার তার কাছে FWTV এর নিউজ যে সঙ্কট সৃষ্টি করল তাও বড় হয়ে উঠল। ‘কোক’ এবং খ্রিস্টান এনজিও’রা খ্রিস্টান স্বার্থে বেআইনি কিছু করেছে এটা তার অজানা নয়, কিন্তু তার প্রকৃত রুপ যে এত ভয়াবহ তা সে কোনদিন কল্পনাও করেনি।

ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডির প্রশ্নে চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের চিন্তায় ছেদ পড়ল।

লাউস মেইডি থামার পর সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল না চীফ জাস্টিস। একটু ভাবল। বলল তারপর, ‘এ ভয়ানক রিপোর্ট তারা কোথায় পেল তার চেয়ে বড় কথা হল, যা বলল তা সত্য কিনা। যদি সত্য হয়, তাহলে ইজ্জত আর আছে কোথায়?’

‘সব কথা সত্য বলাও কঠিন, মিথ্যা বলাও সম্ভব নয় স্যার।’

‘কেন?’

‘তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাবে না।’

‘স্পেসিফিক ঘটনার সত্য-মিথ্যা তদন্ত-সাপেক্ষে হতে পারে। কিন্তু মূল অভিযোগ সত্য কিনা? কোক দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে মুসলমানদের সমূলে উচ্ছেদ করেছে কিনা? জোর করে মুসলিম ভূমি ক্রয় ও আত্মসাৎ করেছে কিনা?’

‘এই মূল অভিযোগ সত্য স্যার। তিন বছর আমি স্বরাষ্ট্র বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। আমার অনেক সরেজমিন অভিজ্ঞতা রয়েছে।’

‘কিন্তু প্রশাসন এর প্রতিকার কি করেছে?’

‘স্যার অন্য কোন জায়গায় হলে বলতাম, প্রশাসন এর কাছে এসব ঘটনা আসেনি, প্রশাসন কি করবে? কিন্তু এ কথা আপনার কাছে বলতে পারি না। আসলে প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করেছে। এ না করে উপায়ও ছিল না।’

‘একথা কি আসলেই সত্য?’

‘স্যার, আমাদের দলে ও সরকারে ওরা সংখ্যা গরিষ্ঠ নয়, কিন্তু প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে নিরঙ্কুশ। তাছাড়া দেশের খ্রিস্টান এনজিও এবং সংস্থা-সংগঠনসমূহ গ্রাম ও শহরের অধিকাংশ ভোট নিয়ন্ত্রণ করেছে। সুতরাং এরা যা চায়, সরকার এবং দল তার বাইরে যেতে পারে না। দ্বিতীয়ত, বাইরের দাতা দেশ ও সংস্থা গুলো প্রায় সবই খ্রিস্টান। তারা খ্রিস্টান এনজিও ও সংস্থাগুলোকেই বেশি বিশ্বাস করে। সুতরাং সরকার ঘরে বাইরে সব দিকে থেকেই অব্যাহত চাপের শিকার, যা উপেক্ষা করার সাধ্য সরকারের নেই।’

‘এ সবের কিছু কিছু আমিও জানি। কিন্তু এখন ঐ পশ্চিমা দাতা দেশগুলো এবং তাদের সংস্থা-সংগঠনগুলোই তো মানবাধিকার এর স্লোগান তুলে সরকারের উপর চড়াও হবে। যে কারন আপনি শুরুতেই সরকারের ইজ্জতের ভয় করেছেন।’

‘না, পশ্চিম এর সবাই এটা নিয়ে হৈচৈ করবেনা। দেখুন না আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা পড়ল। তাতে কয়েকজন লোক মারা গেল, কিন্তু গায়ে কোন আঁচড় পড়ল না বিল্ডিং এর। এটা নিয়ে কি হৈচৈ। ঘটা করে অপরাধীর বিচার হল, শাস্তি হল। কিন্তু সেই আমেরিকায় ওকলাহোমার সিটি সেন্টারে বোমা পড়ল। লোক নিহত হল প্রায় শ-এর কাছাকাছি। বিল্ডিং এমন ক্ষতিগ্রস্ত হল যে, বহুতল বিশিষ্ট বিল্ডিং ধ্বসিয়ে দিতে হল। কিন্তু ঘটনার ঘটা করে তদন্তও হল না। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিচারও হল না। এরকমটা কেন হল? কারন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ঘটনায় আসামি ছিল মুসলমান এবং ওকলাহোমার ঘটনায় আসামি ছিল খ্রিস্টান। আমাদের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটবে। কথা, সমালোচনা কিছু হবে না তা নয়, কিন্তু সেটা হবে অনেকটা লোক দেখানো। তবে ভয় হল মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে। তারা অথবা তাদের সংস্থা-সংগঠনগুলো বিরাট রকমের হৈচৈ করবে। বিষয়টা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে উঠবে এবং জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনও সক্রিয় হয়ে উঠবে। তাদের সাথে সাথে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার প্রতিনিধিরাও ক্যামেরুনে ছুটে আসবে। আমি আমাদের বেইজ্জতির কথা বলেছি এসব ভেবেই।’

‘এই পরিস্থিতিতে কি ভাবছেন? দুটো বিষয় এখন আমাদের সামনে। একটা দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে মুসলিম উচ্ছেদের বিরাট অভিযোগ। অন্যটি ওমর বায়ার পরিবার সম্পর্কিত ঘটনা।’

‘আমাদের মাথা কিছু ঘামাতে হবে প্রথম বিষয়টা নিয়ে। ওমর বায়ার পরিবারের ব্যাপারটা ওরা রিপোর্টে বললেও আমাদের সামনে নেই। এব্যাপারে বন্দী হিসেবে কেউ আমাদের কাছে আসছে না। সুতরাং ঐ ব্যাপারে আমরা চুপ থাকতে পারি স্যার।’

চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক একবার ভাবল, ওমর বায়ার ঘটনা ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডিকে বলেই ফেলি। কিন্তু পরক্ষনেই তার মনে হল, এ নিয়ে সরকারিভাবে কোন তৎপরতা শুরু হলে ওরা ডঃ ডিফরজিসকে মেরেই ফেলবে। প্রশাসন শুধু হৈচৈ ছাড়া তাকে উদ্ধারের কিছুই করতে পারবে না। তার কাছে এখন ডঃ ডিফরজিসের উদ্ধারই সবচেয়ে বড়।

‘প্রথম বিষয়টা নিয়ে এখন কি করার আছে?’

‘প্রতিকারমূলক কিছু করার সুযোগ আমাদের কমই আছে। ইচ্ছা করলে কিছু করতে পারে কোক এবং অন্যান্য খ্রিষ্টান সংস্থাগুলো। আমরা উদ্বাস্তু সম্পর্কিত অভিযোগের খোঁজ-খবর নিতে পারি, ভুমি রেজিস্ট্রি রেকর্ড আমরা চেক করতে পারি এবং বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করতে পারি, অভিযোগ শুনতে পারি।’

‘তাছাড়া বিভিন্ন থানায় মুসলমানদের অভিযোগগুলোর খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা যেতে পারে।’

‘জি স্যার, এটাও আমরা পারি।’

‘আমার মনে হয়, এসব যদি আমরা করি, কোকসহ খ্রিষ্টান এনজিও এবং মিশনারিদের উপর একটা চাপ পড়বে। তারা এ ব্যাপারে আমাদের দোষ দিতে পারবে না। কারন তারা বুঝবে আমরা চাপে পড়ে করছি। অন্য দিকে এসব করে আমরা জাতিসংঘ ও মুসলিম দেশগুলোকেও একটা বুঝ দিতে পারবো।’

‘ঠিক বলেছেন স্যার।’

বলে লাউস মেইডী হাতের ঘড়ি দেখল। তারপর বলল, ‘স্যার আজকের মত উঠি।’

‘ঠিক আছে। খুব খুশি হলাম আপনি এসেছেন।’

দু’জনেই উঠে দাঁড়াল।

ল’সেক্রেটারি লাউস মেইডিকে বিদায় দিয়ে চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এসে তার স্টাডিতে ঢুকলেন। বসলেন পড়ার টেবিলে।

ঠিক এসময়েই তার টেলিফোন বেজে উঠল। কর্ডলেস টেলিফোন হাতে তুলে নিলেন তিনি।

টেলিফোনে পার্সোনাল সেক্রেটারির কণ্ঠ পেয়ে তিনি বললেন, ‘বল’।

‘স্যার, ফ্রান্স থেকে আসা সেই লোকটি কথা বলতে চায়।’ বলল চীফ জাস্টিসের পার্সোনাল সেক্রেটারি।

‘দাও লাইন।’

‘গুড ইভেনিং। আমি পিয়েরে পল মাই লর্ড। সেদিন আপনার বাসায় গিয়ে কথা বলেছিলাম।’

‘গুড ইভেনিং। বলুন।’

‘মাই লর্ড, আমি জানতে চাচ্ছি, আমরা কবে আমাদের কাজটা শেষ করতে পারি।’

‘FWTV আজ ক্যমেরুন এর উপর যে ফিচার নিউজ প্রচার করেছে, সেটা দেখেছেন?’

‘ইয়েস মাই লর্ড।’

‘এই নিউজে আমাকে, আমার আদালতকে টার্গেট করা হয়েছে বুঝতে পেরেছেন?’

‘কিন্তু তার চেয়ে বড় টার্গেট করা হয়েছে আমাদের।’

‘স্বার্থের কারনে সেটা আপনারা বরদাশত করতে পারছেন।’

‘মাই লর্ড স্বার্থ আমাদের নয়, স্বার্থ প্রভু খ্রিষ্টের, তাই সবার।’

‘আমি তর্ক করব না। তারপর বলুন।’

‘মাই লর্ড আমি বলেছি। কাজটা আমরা তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাই। ডেটটা কবে হতে পারে?’

‘FWTV এর আজকের নিউজের পর সত্তর কিছু করা যাবে না। অপেক্ষা করতে হবে।’ ‘কিন্তু আপনার পিতা ডঃডিফরজিসের মুক্তি তাতে বিলম্বিত হবে। তাছাড়া অনির্দিষ্ট ভাবে তাকে এইভাবে আমরা রাখতে চাই না। হয় আপনি তাড়াতাড়ি তাকে মুক্ত করবেন। না হলে আমরা তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়ে মুক্ত হবো।’

পিয়েরে পলের কথা শুনে কেঁপে উঠল চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের হৃদয়। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘তার ক্ষতি করে আপনারা কি লাভ করবেন?’

‘লাভ করার পথ বের করব। দেখুন, আপনি অত্যন্ত সম্মনিত বাক্তি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য অর্জনে আপনি বাঁধা দিলে সব ধরনের অসম্মানের কাজ আমরা করতে পারবো।’

আবার বুকটা কেঁপে উঠল চীফ জাস্টিসের। তার বুঝতে বাকি রইলনা পিয়েরে পল কি বলতে চাচ্ছে।

চীফ জাস্টিসের উত্তর দিতে একটু দেরি হল। কথা বলল আবার পিয়েরে পলই। বলল, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে এক ডঃ ডিফরজিস নয়, শত ডঃ ডিফরজিসকে কিডন্যাপ করতে পারি। আমার অনুরোধ মাই লর্ড, আপনি FWTV কি বলল সেটা একদম ভুলে যান।’

‘আমি ভুলে গেলেই তো বিষয়টা মিথ্যা হয়ে যাবে না। কিংবা যারা ওটা করিয়েছে তারা বসে যাবে না।’

‘ওসব নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই মাই লর্ড। আমাদের সমস্যা আপনি, আপনি ঠিক হয়ে গেলে আর কোন চিন্তা নেই।’

একটু থামল পিয়েরে পল। একটা ঢোঁক গেলার জন্য। পরক্ষনেই আবার শুরু করল, ‘কথা আর বাড়াতে চাই নি মাই লর্ড। আমরা কাজ শুরু করে দিচ্ছি। আমাদের লোকরা ওমর বায়ার পক্ষ থেকে তার মামলা প্রত্যাহার এবং উইল বাতিলের একটা দরখাস্ত দেবে। আমরা চাই আপনি সত্তর একটা ডেট দেবেন।’

কথা শেষ করে ‘থ্যাংস মাই লর্ড’ বলে চীফ জাস্টিসকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে টেলিফোন রেখে দিল।

অপমানে-উদ্বেগে পাথরের মত হয়ে গেলেন চীফ জাস্টিস।

টেলিফোনটা কানে যেভাবে ধরেছিল, সেভাবেই ধরে থাকল। চোখে-মুখে অসহনীয় অপমান ও প্রবল উদ্বেগের কালোছায়া।

চীফ জাস্টিসের মেয়ে রোসেলিন ঘরে প্রবেশ করল। সে তার পিতাকে দেখে ভীত হয়ে পড়ল।

সে দ্রুত এগিয়ে তার পিতার কাঁধে হাত রাখল। ডাকল, ‘আব্বা।’

চীফ জাস্টিসের হাত থেকে টেলিফোনটা পড়ে গেল। চমকে উঠে নড়ে-চড়ে বসল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।

রোসেলিন টেলিফোনটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে বলল, ‘তোমার কি হয়েছে আব্বা? অসুস্থ বোধ করছ?’ রোসেলিনের চোখে-মুখে উদ্বেগ।

চীফ জাস্টিস হাসতে চেষ্টা করে বলল, ‘না মা আমি ভাল আছি।’

‘তাহলে নিশ্চয় তুমি খারাপ টেলিফোন পেয়েছো?’

‘হ্যাঁ মা।’

‘সত্যি? কি সেটা? কোত্থেকে?’ আবার উদ্বেগ ঝরে পড়ল রোসেলিনের কন্ঠে।

মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলল, ‘কত রকম কেস করি মা। তুমি এসব নিয়ে ভেব না।’

‘তুমি ভাববে, আর আমি ভাবব না?’

‘মেয়ের ভাবনা তো তার পিতারাই ভাবেন মা।’

‘তা ঠিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্র আছে যখন মেয়েরা ভাবনার কিছু অংশ পাওয়ার দাবী করতে পারে।’

‘তুমি একটা সহযোগিতা আমাকে করবে মা?’

‘সেটা কি?’

চীফ জাস্টিস মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘তোমাকে একটু সাবধানে থাকতে হবে মা।’

‘কেমন সাবধানে?’

‘বাইরে একটু কম বেরুবে। বেরুলে রাতে বেরুবে না, সম্ভব হলে একা বেরুবে না। এই রকম।’

রোসেলিন পিতার দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, ‘তুমি খারাপ কিছু আশংকা করছ? কিন্তু তোমার আমার তো কোন শত্রু নেই!’

‘বললাম তো। কত রকম কেসের সাথে আমি জড়িত। আমি কাউকে শত্রু না ভাবলেও, কেউ আমাকে তার স্বার্থের শত্রু ভাবতে পারে।’

‘বুঝেছি আব্বা।’ ম্লান কন্ঠে বলল রোসেলিন।

‘ভেবনা মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

বলে একটু থামল চীফ জাস্টিস। তারপর বলল আবার, ‘মারিয়াদের সাথে এর মধ্যে কথা বলেছ? লাগাও তো টেলিফোন ওদের ওখানে। আমি মশিয়ে প্লাতিনির সাথে একটু কথা বলব।’

রোসেলিন বলল, ‘নাম্বারটা নিয়ে আসি আব্বা। আমি কালকেই কথা বলেছি মারিয়ার সাথে।’ বলে রোসেলিন ছুটে বেরিয়ে গেল স্টাডি রুম থেকে।

ইয়াউন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন।

ছোট, কিন্তু সুন্দর বাগানটি।

গোটা বাগান জুড়ে মাকড়সার জালের মত লাল সুড়কির রাস্তা। মাঝে মাঝে বেঞ্চ পাতা।

একটা বেঞ্চিতে বসে রোসেলিন, লায়লা ইয়েসুগো এবং ডোনা।

আজ বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। রোসেলিন ডোনাকে নিয়ে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তিনজন গল্প করছে।

ডোনা চোখ কপালে তুলে বলছিল, ‘বেনু নদীর তীরের গারুয়া শহর? সে তো আফ্রিকার বুকের গভীরে, চাদ হ্রদের তীরে প্রায়।’

‘প্রায় নয়, ‘লেক চাদ’-এর পশ্চিম তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ইয়েসুগো রাজবংশের রাজত্ব।’ বলল লায়লা ইয়েসুগো।

‘কিন্তু আফ্রিকার এত গভীরে একটি মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা কিভাবে হলো?’ বলল ডোনা।

‘লেক চাদ-এর তীরে ইসলামকে দেখে বিস্মিত হচ্ছেন? আমাদের ক্যামেরুনের দক্ষিণে, গ্যাবনের পুবে কাম্পুর উত্তরাংশ যেখানে সভ্যতার কোন আলোই এখনও পড়েনি, সেই ‘এনডোকি’ এলাকাতে গেলেও ‘আল্লাহ’ এবং ‘মুহাম্মাদ (সঃ)’-এর নাম (যদিও ভাঙা উচ্চারণে) আপনি শুনতে পাবেন। আমাদের গারুয়া উপত্যকা তো ভাগ্যবান। নাইজেরিয়ার ‘লাগোস’ এবং ‘বেনু’ নদীর পথে এবং উত্তর নাইজেরিয়ার ঐতিহাসিক মুসলিম মহানগরী ‘কানো’ থেকে নদী ও সড়ক পথে ইসলাম এখানে পৌঁছেছে।’

‘যাই বলুন। যতই ভাবছি, ততই বিস্মিত হচ্ছি, কিভাবে আফ্রিকার এই গভীরে, অকল্পনীয় দুর্গম অঞ্চলে ইসলাম প্রবেশ করল। আমি জানি আফ্রিকার এই অঞ্চলে ইসলামের বড় ধরনের কোন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাহলে ইসলাম কিভাবে, কিসের জোরে পাহাড়-জংগল-নদীর দুর্গম গভীরে পথ করে নিল?’

‘আমাদের এই আফ্রিকা অঞ্চলে কোন সাম্রাজ্য বা রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা তো নয়ই, এমনকি কোন মিশনারী সংগঠন বা পেশাদার মিশনারীদের দ্বারাও ইসলাম প্রচার হয়নি। স্ট্যানলি লেনপুলের বইতে আমি পড়েছি। ‘The Preaching of Islam’ বইতে তিনি বলেন, ‘ইসলাম প্রচারের জন্যে গঠিত কোন সংস্থা বা এই উদ্দেশ্যে তৈরী কোন প্রচারবিদের দ্বারা ইসলামের প্রচার কাজ পরিচালিত হয়নি। মুসলমানদের প্রত্যেকেই ছিলেন একজন করে সক্রিয় মিশনারী।’ বলল লায়লা ইয়েসুগো।

‘বিস্ময়টা আমার এই জন্যেই বেশী। এই অবস্থায় ইসলাম কি করে আফ্রিকার এই অঞ্চলে প্রবেশ করল।’ বলল ডোনা।

‘সেই কাহিনী লিখলে আমার মনে হয় পৃথিবীর বৃহত্তম মহাকাব্য রচিত হতো।’

বলে একটু দম নিল লায়লা। তারপর শুরু করল, ‘আরবী অশ্বারোহী সৈনিকের বিজয়ী পদক্ষেপ মরক্কো-মৌরতানিয়ায় এসে থেমে গিয়েছিল। আরও দক্ষিণে সেনেগালের বিজন জংগলে তারা প্রবেশ করেনি। পরবর্তীকালে সেনেগালের উপকূল ধরে ইসলামের যাত্রা শুরু হয় মুসলমানদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের আকারে। সুদান ও লিবিয়ার মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য-কাফেলার পথ ধরে যেভাবে স্থলপথে ইসলামের দক্ষিণ মুখী যাত্রা শুরু হয়, সেভাবে সেনেগাল থেকে উপকূলের পথ ধরে ইসলাম দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত হতে থাকে। সেনেগাল থেকে গাম্বিয়া, গাম্বিয়া থেকে গিনি বিসাউ, গিনি, তারপর সিয়েরা লিওন- এভাবে ধীরে ও নিরবে ইসলাম অগ্রসর হয়েছে এক জনপদ থেকে আরেক জনপদে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে।’

একটু থামল লায়লা ইয়েসুগো। একটু নড়ে বসল। তারপর বলল, ‘ব্যক্তি উদ্যোগে ইসলামের এই প্রচার কত যে অমর ঘটনা, কত যে অপরূপ কাহিনী এবং অশ্রু ভেজা কত যে গাঁথা সৃষ্টি করে। কিন্তু সবই হারিয়ে গেছে, তার সাথে হারিয়ে গেছে সংখ্যাহীন ত্যাগী মানুষের উজ্জ্বল জীবনচিত্র। আপনার মত আমারও ইচ্ছা করত এসব জানবার। অনেক বই ঘাটাঘাটি করেছি আমাদের ঐ মহান অতীতকে জানার জন্যে। যা পেয়েছি তা সামান্য ইংগিতমাত্র।’

‘সেটা কেমন?’ বলল ডোনা।

‘মুসলমানরা যখনই এ অঞ্চলে কোন নতুন ভূখন্ডে এসেছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কিংবা বসবাসের জন্যে, তারা প্রথমেই গেছে স্থানীয় গোত্র সরদারের কাছে। আবেদন করেছে তাদের প্রার্থনা গৃহ (মসজিদ) তৈরীর অনুমতি দানের। এইভাবে তারা মসজিদ গড়েছে, স্কুল তৈরী করেছে। শীঘ্রই তাদের সততা ও নিষ্ঠা এবং উন্নত সাংস্কৃতিক আচার-ব্যবহার স্থানীয় বিধর্মী নিগ্রোদের অভিভুত করেছে।’ এই কথাগুলো লিখেছেন, ‘Islam and Mission’ বইতে একজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিক। আর ‘Rise of British West Africa’ বইতে জর্জ ক্লাউডে যে বিবরণ দিয়েছেন তা হলোঃ ‘মুসলমানদের স্কুলগুলো ছিল স্থানীয় আফ্রিকানদের জন্যে বিস্ময়কর। স্কুলে যে সব বিষয় ও আচার-ব্যবহার শিক্ষা দেয়া হতো, তা মুগ্ধ ও অভিভুত করত তাদেরকে। আফ্রিকান ছাত্ররা এই শিক্ষা ও আচার-ব্যবহার ছড়িয়ে দিত, এখান থেকে সেখানে, এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। ইসলামের মেসেজ ছড়িয়ে পড়ে তার সাথে। ইসলামের আরও দু’টি বিষয় আফ্রিকার নিগ্রোদের সম্মোহিত করে। তার একটি হলো দাস ব্যবসার প্রতি মুসলমানদের বিরোধিতা। অন্যটি হলো আইন-শৃংখলার প্রতি মুসলমানদের গুরুত্ব দান। সে সময় উপকূল জুড়ে ছিল প্রচন্ড নৈরাজ্য। যার কারণে আফ্রিকান নিগ্রোরা তাদের উপকূল থেকে সব সময় দূরে থাকতে চেষ্টা করতো। মুসলমানরা যেখানেই গেছে এবং কিছুটা শক্তি অর্জন করতে পেরেছে, সেখানেই তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মানুষের নিরাপত্তা বিধান করেছে। এর ফলে নিগ্রো মানুষেরা ছুটে এসেছে শান্তি ও স্বস্তির সন্ধান পেয়ে। এভাবে মুসলমানদের ইমেজ বিধর্মী নিগ্রোদের মধ্যে এতটাই বেড়ে যায় যে গোত্র সর্দাররা মুসলমান না হয়েও মুসলিম নাম গ্রহণ করতে গৌরব বোধ করত। নাম গ্রহণ করার সাথে সাথে তারা ইসলামও গ্রহণ করে বসতো। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের শ্রেষ্ঠ নিগ্রো গোত্রগুলো যেমন ‘ফুলবি’, ‘ম্যানডিংগো’, ‘হাউসা’ এবং ‘ফুলানি’ ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেয় এইভাবে।’

থামল লায়লা ইয়েসুগো।

‘চমৎকার। বিস্ময়কর ইতিহাস।’ বলল ডোনা।

‘পশ্চিমা ঐতিহাসিক ‘ব্লাডেন’ এবং ‘ওয়াস্টারম্যান’ কি বলেছেন জানেন? বলেছেন, সেনেগাল এবং নাইজেরিয়ার উপকূল পর্যন্ত দু’হাজার মাইল উপকূল রেখায় এমন কোন শহর দেখা যেত না যা মসজিদের গম্বুজে শোভিত ছিল না। এই বিপ্লব সংঘটিত হয় উনিশ ও বিশ শতকে এবং গিজ গিজ করা খৃস্টান মিশনারীদের চোখের সামনেই।’

‘কি সর্বনাশা, এই বিপ্লব উনিশ-বিশ শতকের? পশ্চিমা আধিপত্যের কালে?’

‘অবশ্যই। আপনি শুনে বিস্মিত হবেন, উনিশ ও বিশ শতকের মাঝা-মাঝি সময় পর্যন্ত, মুসলমানদের রাজনৈতিক সৌভাগ্য সূর্য যখন অস্তমিত, যখন অধিকাংশ মুসলিম দেশ দুর্ভাগ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত, ঠিক তখনই আফ্রিকার এই অঞ্চলে কালো মানুষদের জীবনে সৌভাগ্য সূর্য দীপ্ত হয়ে উঠে। ইসলাম এই সময় কত দ্রুত বিস্তার লাভ করে তার একটা হিসেব দিচ্ছিঃ

দেশের নাম

উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম জনসংখ্যার হার

বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মুসলিম জনসংখ্যার হার

সেনেগাল

৪০%

৯৫%

গিনি বিসাউ

৩০%

৮০%

গিনি

১৫%

৬৫%

সিয়েরা লিওন

১০%

৮০%

লাইবেরিয়া

৫%

৪৫%

আইভরি কোস্ট

৫%

৫৫%

ঘানা

২%

৪৫%

টোগো

৩%

৫৫%

বেনিন

০%

১১%

নাইজেরিয়া

৩০%

৬৫%

ক্যামেরুন

১%

৫৫%

এই হিসেবে দেখা যাবে, উনিশ ও বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেনেগানল থেকে ক্যামরুন উপকূল পর্যন্ত একটা বিপ্লব ঘটে গেছে।’

‘কিন্তু কেন, কিভাবে?’ বলল ডোনা।

লায়লা ইয়েসুগো মুখ খোলার আগেই কথা বলে উঠল রোসেলিন। বলল, ‘আমার মনে হয় এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, পশ্চিমীরা এ সময় নিগ্রোদেরকে পশুতে পরিণত করেছিল দাস ব্যবসায়ের মাধ্যমে আর ইসলাম এসেছিল তাদেরকে মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে। আরেকটা কারণ হলো, যেটা লায়লা বলল, মুসলমানদের চরিত্র মাধুর্য এবং শান্তিপ্রিয়তা।’

‘কি রোসেলিন, তুমি খৃষ্টানদের বদনাম করছ আর মুসলমানদের প্রশংসা করছ তোমার মুখে?’ মুখ টিপে হেসে বলল ডোনা।

‘করবে না? রাশিদি ইয়েসুগো মুসলমান না?’ বলল লায়লা দুষ্টুমি হেসে।

‘তোমার মুহাম্মদ ইয়েকিনির কথা কেউ জানে না বুঝি?’

‘ঠিক আছে। সবাই জানুক। আমি তো অস্বীকার করছি না।’ বলল লায়লা।

‘মুহাম্মদ ইয়েকিনি কে রোসেলিন?’ বলল ডোনা।

‘ইয়াউন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কুন্তে কুম্বায় বাড়ি।’

এ সময় ওরা তাদের পেছন থেকে কাশির আওয়াজ পেল।

ফিরে তাকাল তিনজনেই।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে রাশিদি ইয়েসুগো।

রাশিদি ইয়েসুগোর দিকে ইংগিত করে লায়লা ডোনাকে বলল, ‘আমার ভাই রাশিদি ইয়েসুগো।’

বলেই লায়লা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘তোমরা একটু বস। আমি আসছি।’

লায়লা ছুটলো রাশিদির দিকে। সেখানে পৌছে বলল, ‘কিছু বলবে ভাইয়া?’

‘রোসেলিনকে একটু দরকার। কিন্তু নতুন মেয়েটা কে? এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কেউ নাকি?’ কিন্তু মাথায় ওড়না কেন?’

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ না ভাইয়া। ও ফ্রান্সের মেয়ে। কিন্তু মুসলমান। নাম মারিয়া। এখানকার ফরাসি রাষ্ট্রদূতের মেহমান। ওঁর আব্বাসহ বেড়াতে এসেছেন।’

‘মুসলমান জেনে খুশী হলাম। কিন্তু শোন, আহমদ মুসা সম্পর্কে একটি কথাও ওঁকে কিংবা রোসেলিনকে এক কথায় বাইরের কাউকেই বলবে না।’

‘এটা আমি জানি।’

বলে একটু থেমেই আবার বলল, ‘চল ওঁর সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেই।’

‘না উনি কিছু মনে করতে পারেন। পর্দা করেন মনে হচ্ছে।’

‘ঠিক আছে। একটু দাঁড়াও। রোসেলিনকে পাঠাচ্ছি।’ বলে এক দৌড়ে ফিরে গেল।

লায়লা রোসেলিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল, ‘রোসেলিন, যাও ভাইয়ার হুকুম।’

‘কি হুকুম? কোথায় যাব?’ বলল রোসেলিন।

‘ভাইয়া তোমাকে ডাকছেন।’

‘আমি কেন যাব। উনি তো আসতে পারেন।’

‘আসবেন না। আমি মারিয়া আপার কথা ভাইয়াকে বলেছি। আমি পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে আসতে বললে তিনি বললেন, মারিয়া নিশ্চয় এটা ভালোভাবে নিবেন না।’

‘কেন?’ বলল রোসেলিন।

‘কারণ, মারিয়া আপার গায়ে আমার মত চাদর দেখেই ভাইয়া বুঝেছেন মারিয়া পর্দা করেন।’

‘বুঝেছি।’ বলে উঠে দাঁড়াল রোসেলিন।

ধীরে ধীরে সে গিয়ে দাঁড়াল রাশিদি ইয়েসুগোর সামনে। বলল, ‘বল তোমার এত জরুরী বিষয়টা কি?’

‘আমি দুঃখিত রোসেলিন, তোমাদের জমজমাট গল্পের আসরে ছেদ টানার জন্যে। কিন্তু আমি কি জরুরী বিষয় ছাড়া তোমাকে ডাকতে পারি না।’

‘কোন দিন ডাক না। তুমি আমাকে এড়িয়ে চলতেই ভালবাস। ভাই বলছিলাম।’

‘এড়িয়ে চলি কথাটা ঠিক নয় রোসেলিন। কারণ এর মধ্যে উপেক্ষার ভাব আছে। তুমি কি বলতে পার আমি তোমাকে উপেক্ষা করি?’

‘না সেটা অবশ্যই নয়। কিন্তু তোমার আলগা চলার হেতু কি? সেদিন দেখ ডিপার্টমেন্টাল পিকনিকে সবাই কিভাবে সময় কাটাল, আর আমি-তুমি কিভাবে সময় কাটালাম। প্রায় সকলেই যখন জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়িয়েছে, তখন তুমি তাঁবুর পাশে গাছতলায় বসে বই পড়ে সময় কাটিয়েছ, আর আমি একটু দূরে একটা ঝোপের পাশে বসে তোমার দিকে তাকিয়ে সময় কাটিয়েছি। আমার কান্না পাচ্ছিল। কেন তুমি এমন নিষ্ঠুরতা কর?’ আবেগে কাঁপল রোসেলিনের গলা।

রাশিদি ইয়েসুগো একটু হাসার চেষ্টা করল। বলল, ‘তুমি ব্যথা পেয়েছ। আমি দুঃখিত রোসেলিন। তোমার কোন কষ্ট আমাকেও কষ্ট দেয়।’

রাশিদি ইয়েসুগো একটু থামল। গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘কিন্তু সমস্যা হলো রোসেলিন, আমাদের ধর্ম ইসলাম বিবাহ-পূর্ব এ ধরনের অবাধ মেলামেশার সুযোগ দেয় না এবং এই না দেয়াটা সবদিক থেকে যুক্তিসংগত।’

‘আমি জানি রাশিদি। আমার ভালো লাগে তোমাদের এই কালচার। কিন্তু ভুলে যাই, যখন হৃদয়ের এক সাগর অবুঝ তৃষ্ণা উন্মুখ হয়ে ওঠে।’

একটু থামল রোসেলিন। তারপর মুখে এক টুকরো হাসি টেনে বলল, ‘বল, কি বলতে ডেকেছ?’

রাশিদি ইয়েসুগো হেসে বলল, ‘তেমন কিছু না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ গেল। কেমন ছিলে তাই জানতে চাচ্ছিলাম।’

‘ভালই ছিলাম। তবে আমার বাইরে বেরুনোর ব্যাপার নিয়ে মনে হচ্ছে আব্বা খুব চিন্তিত।’

‘কেন? তিনি কিছু বলেছেন?’

‘আমাকে একটু সাবধানে থাকতে বলেছেন। একা একা আমাকে বাইরে বেরুতে বলা যায় নিষেধ করেছেন। দেখ না আজ আমার নতুন বান্ধবী মারিয়াকে নিয়ে এসেছি!’

‘কারণ কি?’

‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তরে বলেছেন, সময় ভালো যাচ্ছে না তো তাই।’

‘কিন্তু তেমন খারাপ কিছু তো দেখা যাচ্ছে না। তোমাদের পারিবারিক কিংবা কোর্টের কোন ঘটনার কারণে কোনো অসুবিধা নেই তো?’

‘না, পারিবারিক কোন সমস্যা নেই। তবে আব্বা কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ কথাও বলেছিলেন যে, তাকে কত রকম বিচারের সাথে জড়িত থাকতে হয়, বিচারে কত মানুষের কত স্বার্থের হানি ঘটে।’

রোসেলিনের শেষ কথায় রাশিদির মনকে চঞ্চল করে তুলল। সে ভাবল, পিয়েরে পল কিংবা তার লোকেরা চীফ জাস্টিসের সাথে তাহলে অবশ্যই যোগাযোগ করেছে। চীফ জাস্টিসের মত কি, প্রতিক্রিয়া কি তা জানার জন্যে তার মন আকুলি-বিকুলি করে উঠল। কিন্তু জানার উপায় নেই। বুঝা যাচ্ছে, রোসেলিনও কিছু জানে না। অবশ্য জানার কথাও নয়। চীফ জাস্টিস তার মেয়ের সাথে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন তা স্বাভাবিক নয়। যাক তবু এটুকু জানা গেল যে, পিয়েরে পলরা চীফ জাস্টিসের সাথে যোগাযোগ করেছে। এ খবরটা আহমদ মুসাকে এখনই জানানো দরকার। খুশী হলো রাশিদি ইয়েসুগো, আহমদ মুসার প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট পুরো না হলেও কিছুটা সমাধা করতে পেরেছে।

রোসেলিনই আবার কথা বলল, ‘মনে হচ্ছে তুমি কিছু ভাবছ?’

‘হ্যাঁ। তুমি তো একটা খারাপ খবর শোনালে।’

‘এ নিয়ে তুমি ভেব না। আমিও ভাবছি না।’

‘কিন্তু তোমার সাবধান থাকা দরকার।’

‘না থাকলে তোমার কোন ক্ষতি হবে?’ মুখ টিপে হেসে বলল রোসেলিন।

‘না, কিছু ক্ষতি হবে না।’ রাশিদিও হেসে জবাব দিল।

‘জান, কেউ আমাকে নিয়ে ভাবলে আমার খুব ভালো লাগে।’

‘এই ‘কেউ’ একজন না বহুজন?’

‘বলব না।’ হাসি চাপতে চাপতে বলল রোসেলিন।

কথা শেষ করেই ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আসি। ওদিকে লায়লা দুষ্টটা কত গল্প ফাঁদছে কে জানে।’

বলে দৌড় দিলে রোসেলিন।

আহমদ মুসা, রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মদ ইয়েকিনি যখন সুপ্রীম কোর্ট ভবনে পৌঁছল, তখন বেলা ১১ টা।

কোর্ট ভবনে নেমে আহমদ মুসা চীফ জাস্টিসের এজলাসের দিকে এগুলো। উদ্দেশ্য চীফ জাস্টিসকে একনজর দেখা। তবে তাদের লক্ষ্য চীফ জাস্টিসের রেজিস্টার অফিসে গিয়ে খোঁজ-খবর নেয়া।

রাশিদি ইয়েসুগোর কাছে রোসেলিনের কথা শুনেই আহমদ মুসা নিশ্চিত হয়েছিল পিয়েরে পলরা চীফ জাস্টিসের সাথে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এই যোগাযোগের ফলাফলটা যে কি তা রোসেলিনের কথায় বুঝা যায়নি, তবে চীফ জাস্টিস তার মেয়ের চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করায় বুঝা গেছে তিনি পিয়েরে পলদেরকে ভয় করছেন। কিন্তু ভয়টা পিয়েরে পলদের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা জনিত, না এটা কোন বাড়তি সাবধানতা তা পরিস্কার হয়নি। তবে আহমদ মুসা খুশী রোসেলিন রাশিদিদের পরিচিত হওয়ায়। প্রয়োজনে চীফ জাস্টিসের সাথে যোগাযোগের একটা মাধ্যম সে হতে পারে। আহমদ মুসার মনে প্রশ্ন জাগল, রোসেলিন ও রাশিদি ইয়েসুগোর মধ্যে প্রেম আছে এটা চীফ জাস্টিস জানেন কিনা? তিনি যদি মেয়ের এ সম্পর্ককে গ্রহণ করতেন, তাহলে বড় একটা লাভ হতো। চীফ জাস্টিস মুসলমানদের ভালবাসতেন।

আহমদ মুসা, রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মদ ইয়েকিনি পাশাপাশি হাঁটছিল। আহমদ মুসা রাশিদি ইয়েসুগোর দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, রাশিদি তোমার রোসেলিনের সম্পর্কের ব্যাপারটা চীফ জাস্টিস সাহেব জানেন?

প্রশ্ন শুনে রাশিদির চোখে-মুখে লজ্জার একটা আবরণ নেমে এল। রাশিদির ঠোঁটে এক টুকরো লজ্জা-পীড়িত হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘না উনি জানেন না।’

‘জানলে তার প্রতিক্রিয়া কি হবে তুমি অনুমান করতে পার?’

‘রোসেলিন বলে, ইয়েসুগো রাজ-পরিবার সম্পর্কে চীফ জাস্টিসের খুব সুধারণা আছে। এ ব্যাপারটা আমিও জানি। ‘ইয়েসুগো রাজ পরিবার বনাম রাষ্ট্র’ শীর্ষক একটা বড় মামলায় রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট বছর পাঁচেক আগে। রায়টা এসেছিল ইয়েসুগো রাজ পরিবারের পক্ষে। এই রায়ের ফলে গারুয়া উপত্যকায় বেনু নদী তীরের বিশাল এলাকা ইয়েসুগো রাজ পরিবার ফিরে পেয়েছে। হাইকোর্টের যে বেঞ্চ এই রায় দিয়েছিল, সে বেঞ্চের চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান চীফ জাস্টিস। তবে রোসেলিন বলেছে, একটা মুসলিম পরিবারে নিজের মেয়েকে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা চীফ জাস্টিস হয়তো সহজভাবে নেবেন না।’

‘এটা স্বাভাবিক।’

চীফ জাস্টিসের এজলাসের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিল আহমদ মুসা।

চীফ জাস্টিস তাঁর বেঞ্চসহ এজলাসে।

ক্যামেরুনে সুপ্রীম কোর্টে ‘ওয়ানম্যান বেঞ্চ’ বেঞ্চে বসে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়েই শুধু ফুল বেঞ্চ গঠিত হয়। আজ ফুল বেঞ্চ বসেছে। শাসনতান্ত্রিক একটা বিষয়ে তাদের রায় দিতে হবে।

প্রধান বিচারপতিকে চিনিয়ে দিল রাশিদি ইয়েসুগো। রঙে খাস আফ্রিকান নিগ্রো, চেহারায় নয়।

‘ওঁর স্ত্রী বোধ হয় ইউরোপীয়?’

‘হ্যাঁ, ওঁর স্ত্রী ফরাসী। কেন বলছেন এ কথা?’ জিজ্ঞেস করল রাশিদি।

‘রোসেলিনের যে বিবরণ তোমার কাছে শুনেছি, তাতে তার মা অবশ্যই শ্বেতাংগ বা নন-আফ্রিকান হবেন।’

কথা শেষ করেই আবার আহমদ মুসা বলল, চল রেজিস্ট্রার অফিসে যাওয়া যাক।

বেরিয়ে এল তারা চীফ জাস্টিসের কোর্ট রুম থেকে।

রেজিস্ট্রার অফিসে প্রবেশ করল তারা।

ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসল।

বসেই রাশিদি ইয়েসুগো আহমদ মুসাকে ফিস ফিস করে বললো, ‘ভাইয়া রিট সেকশনে ‘ক্যামেরুন ক্রিসেন্ট’-এর একজন ভাই আছেন। একজন সেকশন অফিসার সে। আমরা তার সাহায্য নিতে পারি না?’

‘অবশ্যই পার।’

‘তাহলে তার সাথে গিয়ে আলোচনা করি। তার সময় হলে তাকে নিয়ে আসি?’

‘হ্যাঁ, যাও।’

‘তাহলে আমি ও ইয়েকিনি একটু ঘুরে আসি। আপনি একটু বসুন।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল রাশিদি।

বেরিয়ে গেল ওরা দু’জন ওয়েটিং রুম থেকে।

ওয়েটিং রুমে বসেছিল আরও দু’জন। আহমদ মুসার পাশের সোফাতেই।

সামনে লম্বা একটা টিপয়।

টিপয়ের উপর কয়েকটা ম্যাগাজিন।

আহমদ মুসার পাশের দু’জন কৃষ্ণাংগ। বয়সে যুবক। একজন আহমদ মুসার কিছু বড় হবে, আরেকজন সমান সমান। আহমদ মুসার পাশে বসা লোকটির হাতে একটা কলম। সে কলমটা দিয়ে একটা ম্যাগাজিনের মলাটে লিখছিল, আঁচড় কাটছিল। দেখলেই বুঝা যায় সে উদ্দেশ্যহীন ভাবে এটা করছে। যেন সময় কাটাচ্ছে সে।

আহম্মদ মুসারও করার কিছু ছিল না। গল্প করার মত দু’জন ছিল, তাও চলে গেল।

আহমদ মুসা পাশের লোক দু’জনের দিকে তাকাল। তাদের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিতে পারল না আহমদ মুসা। হাতের পেশি, ঘাড়ের গঠন, মুখের চোয়াল, আর ঋজু শরীর দেখে মনে হলো যেন স্টিলের তৈরী কোন রোবট।

আহমদ মুসার মুগ্ধ দৃষ্টি একসময় পাশের লোকটির হাত বেয়ে নেমে গেল তার লেখার উপর।

তার লেখাগুলোয় চোখ বুলাতে গিয়ে একটা স্কেচের উপর নজর পড়তেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল আহমদ মুসা। কলমের কালি দিয়ে তৈরী মানুষের একটা স্কেচ। কালো কালি দিয়ে তৈরী কালো একটা মনুষ্য মূর্তি। মূর্তিটির বাম হাতে কালো কালির ক্রস। খুব সাধারণ একটা স্কেচ।

কিন্তু স্কেচটার উপর নজর পড়তেই আহমদ মুসার মনে পড়ল ‘ওকুয়া’র প্রতীক চিহ্নের কথা। একজন সৈনিকের ছবি, হাতে তার একটি ক্রস।

আহমদ মুসা দেখল, লোকটির কলম সৈনিকের সেই স্কেচটির উপর আবার উঠে এল। কালো কালির গভীর আঁচড়ে শীঘ্রই সৈনিকের স্কেচটি কালো সৈনিকে রূপ নিল। হাতে তার কালো ক্রস।

আহমদ মুসার কোন সন্দেহ রইল না, ওকুয়ার প্রতীক চিহ্ন এটা।

আহমদ মুসার বিস্মিত দৃষ্টি উঠে এল লোকটির মুখের উপর। লোকটি ওকুয়ার কেউ?

এ সময় তাদের দু’জনের ওপাশের জন উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘পাওল তুই বস। কাজটা কতদূর একটু খোঁজ নিয়ে আসি।’

বলে লোকটি রেজিস্ট্রার অফিসের ভেতরে ঢুকে গেল।

আহমদ মুসা ভাবল, লোকটি নিশ্চয় ‘ওকুয়া’র কেউ। আনমনে কাগজে আঁচড়াতে গিয়ে প্রিয় প্রতীক চিহ্ন সে এঁকে ফেলেছে। লোকটির চেহারাও বলে ওকুয়ার মত সংগঠনের সাথেই তাকে মানায়।

ওকুয়ার এই লোকরা নিশ্চয় ওমর বায়ার কেসের ব্যাপারে এসেছে! ওর সাথের লোকটা কি এই কাজেই ভেতরে গেছে?

ঠিক এ সময় সেই লোকটা বেরিয়ে এল।

আহমদ মুসার পাশের লোকটাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘পাওল, রেজিস্ট্রার সাহেব দুইদিন পরে একবার খোঁজ নিতে বললেন। আমাদের ব্যাপারটা চীফ জাস্টিসের আগামী পরশুদিনের কর্মসূচীতে উঠেছে। পরদিন এলেই ডেট জানা যাবে। চল।’

আহমদ মুসার পাশের লোকটিও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চল।’

ওরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

মন চঞ্চল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। এখন কি করবে সে? ‘ওকুয়া’র লোককে তো ছাড়া যায় না। মোক্ষম একটা সুযোগ। ওদের ফলো করে নিশ্চয় ওকুয়া’র কোন এক ঠিকানায় পৌঁছা যাবে। তার ফলে ওমর বায়া ও ডঃ ডিফরজিসের সন্ধান পাওয়া অথবা উদ্ধার করার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে।

কিন্তু রাশিদিরা দু’জন নেই, ভাবল আহমদ মুসা।

লোক দু’জন কক্ষের বাইরে চলে গেছে।

আর চিন্তা করতে পারলো না আহমদ মুসা।

আহমদ মুসা দ্রুত উঠে দাঁড়াল।

বেরিয়ে এল কক্ষ থেকে। দেখল, ওকুয়ার ওরা দু’জন পাশা-পাশি হেঁটে এগোচ্ছে সিঁড়ির দিকে।

আহমদ মুসা পিছু নিল ওদের।

ওদের অনুসরণ করে আহমদ মুসা নিচে লনে নেমে এল।

সুপ্রীম কোর্টের গাড়ি বারান্দা থেকে বেরুলেই হাতের বাম দিকে বিশাল পার্কিং প্লেস।

অনেকগুলো গাড়ি পার্ক করা আছে।

ওকুয়া’র ওরা দু’জন গাড়িগুলোর দিকে এগুচ্ছে। আহমদ মুসা বুঝল, ওরা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে এসেছে।

আহমদ মুসার হাতে রাশিদির গাড়ির চাবি। সেদিকে একবার তাকিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা। গাড়ি না থাকলে ওদের পিছু নেয়া মুস্কিল হতো। রাশিদির গাড়ি আহমদ মুসা ড্রাইভ করেছিল বলে চাবিটা তার হাতেই রয়ে গিয়েছিল।

ওরা তাদের গাড়ির কাছে গিয়ে থামলে আহমদ মুসা চাবির রিংটা আঙুলে নাচাতে নাচাতে আনমনাভাবে গুণ গুণ করে গাড়ির দিকে এগুলো।

ওদের গাড়ি লন পেরিয়ে যখন গেটের কাছাকাছি পৌঁছল, তখন আহমদ মুসার গাড়ি স্টার্ট নিল।

ওদের পিছু পিছু বেরিয়ে এসে রাস্তায় পড়ল আহমদ মুসার গাড়ি।

সুপ্রীম কোর্ট লন থেকে বেরিইয়ে ওদের গাড়ি ‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার’ ধরে দক্ষিণে এগিয়ে চলল।

‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার’কে রাজধানী ইয়াউন্ডির ‘মাদার রোড’ বলা হয়। রোডটি ইয়াউন্ডিকে চারটি বৃত্তে ভাগ করেছে। চারটি বৃত্ত শহরের কেন্দ্রে এসে মিলিত হয়েছে। এই কেন্দ্রেই সুপ্রীম কোর্ট। বৃত্তগুলো থেকে দু’পাশে ডজন ডজন রোড বেরিয়ে রাজধানী শহরকে মাকড়শার জালের মত ভাগ করেছে। বৃত্ত চারটিকে এ, বি, সি, ডি- এই চার নামে চিহিৃত করা হয়েছে। বৃত্ত থেকে বের হওয়া বাইরোডগুলোকে এক, দুই, তিন- এইভাবে নামকরন করা হয়েছে।

আহমদ মুসা রাস্তার রোড সাইন দেখে বুঝল তারা ‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার সি’ ধরে এগিয়া চলছে। ‘ওকুয়া’র গাড়িটি তার দু’শ গজ সামনে।

প্রায় পনের মিনিট চলার পর ওকুয়ার গাড়ি বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে একটা বাইরোডে প্রবেশ করল। রোড সাইনে দেখল ‘সি-৭’, অর্থাৎ সি নম্বর বৃত্তের সাত নম্বর বাইরোড।

মিনিট পাঁচেক চলার পর সামনের গাড়িটি হঠাৎ দাড়িয়ে পড়ল।

বিপদে পড়ল আহমদ মুসা। তারা কি তার গাড়িকে সন্দেহ করছে? নাকি কোন প্রয়োজনে তারা দাঁড়িয়েছে। যেখানে সামনের গাড়িটি দাঁড়িয়েছে, সেটা একটা রাস্তার মুখ, সি-৭ থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে চলে গেছে।

সে কি দাঁড়াবে, ভাবল আহমদ মুসা। দাঁড়ানো ঠিক মনে করল না। তারা যদি সন্দেহ করেই থাকে, তাহলে দাঁড়ানোর অর্থ তাদের সন্দেহ পাকাপোক্ত করা।

সুতরাং আহমদ মুসা না দাঁড়িয়ে একি গতিতে গাড়ি চালিয়ে ‘ওকুয়া’র গাড়ি পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়া দু’শ গজের মত গিয়ে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়ল।

দাঁড়িয়েই পেছনে ফিরে তাকাল। ‘ওকুয়া’র গাড়িটি তখনও দাঁড়িয়ে।

আধা মিনিটও গেল না। ‘ওকুয়া’র গাড়িটি দক্ষিন গামী সেই রাস্তায় ঢুকে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা তার গাড়িটি ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটল সেই রাস্তার দিকে।

আহমদ মুসা লক্ষ্য করল না, তার গাড়িটি দাঁড়াবার পর পরই আরেকটা নীল রঙের গাড়ি তার গাড়িকে পাশ কাটিয়ে দু’শ-আড়াইশ গজ দূরে একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। গাড়িতে দু’জন আরোহী। তারা চোখ রাখছিল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসা যখন তার গাড়ী নিয়ে ছুটল ‘ওকুয়া’র গাড়ী যে রাস্তার ঢুকেছে সে রাস্তার দিকে, তখন দু’জনের মুখেই একটা ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। একজন বলল, ভাব দেখেই বুঝা গিয়েছিল বেটা ফেউ হবে। এখন আর সন্দেহ রইল না। ও ঐ গাড়িকেই ফলো করছে। আহমদ মুসার গাড়ি চলতে শুরু করার পর তারা আহমদ মুসার গাড়ির পিছু নিল।

ওকুয়ার গাড়িটি বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছিল। আগের চেয়ে গতিটা এখন অনেক বেশি।

প্রায় দশ মিনিট চলার পর বেশ প্রশস্ত রাস্তায় উঠে এল গাড়ি। রাস্তাটি ইয়াউন্ডি সার্কুলার সি-র অপর একটি অংশ।

ওকুয়া’র গাড়ি ‘ইয়াউন্ডি সার্কুলার সি’-কে পাশ বরাবর ক্রস করে আরেকটি বাইরোডে প্রবেশ করল।

আহমদ মুসার গাড়িও সেই বাইরোডে প্রবেশ করল। রোড় সাইন দেখে আহমদ মুসা বুঝল বাই রোডটি ‘সি-৪১’। আহমদ মুসা লক্ষ্য করল না সেই নীল গাড়িটিও বিড়ালের মত তার পিছু পিছু প্রবেশ করছে ‘সি-৪১’ বাইরোডে।

আরও দশ মিনিট চলল গাড়ি।

একটানা একই গতিতে এগিয়ে চলছিল ওকুয়ার গাড়ি। এই রাস্তায় গাড়িও কম। আহমদ মুসা নিশ্চিন্তে অনুসরন করছিল ওকুয়ার গাড়িটার। এই নিশ্চিন্ততায় আনমনা হয়ে পড়েছিল সে।

সামনের গাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনমনা ভাবটি মুহুর্তে কেটে গেল। হার্ড ব্রেক কষল আহমদ মুসা। তবু তার গাড়িটা গিয়ে ‘ওকুয়া’র গাড়ির ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো।

দ্রুত আহমদ মুসা নজর বুলালো সামনে-ডাইনে-বামে।

রাস্তার দু’পাশে জংগল। চারপাশের পরিবেশটা কোন পরিত্যক্ত এলাকার মত বিশৃংখল। শহরের কোন মসৃণতা নেই।

ভ্রু কুঞ্চিত হল আহমদ মুসার। ওকুয়ার গাড়িটা এখানে এল কেন? এতো লোকালয়হীন পরিত্যক্ত এক শহরতলী!

ঠিক এই সময়ই পেছনের নীল গাড়িটি আহমদ মুসার গাড়ির পেছনে এসে দাঁড়াল। আহমদ মুসা সেই গাড়িটাকে দেখল।

হঠাৎ করেই প্রচন্ড এক চিন্তার ঝলক নামল আহমদ মুসার দেহে।

সে কি ট্র্যাপে পড়েছে? তাকে কি পরিকল্পনা করে এই নির্জন শহরতলী এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে?

মূহুর্তেই শক্ত হয়ে উঠল আহমদ মুসার দেহ। অজান্তেই তার হাতটা ছুটে গেল পকেটে রাখা পিস্তলের বাটে। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে সে সময় সে দেখল পেছনের নীল গাড়ীর দু’পাশের দু’দরজা দিয়ে দু’জন নেমে ছুটে আসছে তার গাড়ীর দিকে।

দ্রুত আহমদ মুসার হাত রিভলবার সমেত পকেট থেকে বেরিয়ে এল।

গাড়ী থেকে বেরুবার জন্য আহমদ মুসা মুখ ফিরাতেই দেখল, তার গাড়ীর দু’পাশের দুই দরজায় দু’জন তার দিকে রিভলবার তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই ওদের চিনতে পারল আহমদ মুসা সুপ্রীম কোর্ট থেকে এ দু’জন লোককে অনুসরন করেই সে আসছে।

ডান হাতে রিভলবার ধরে রেখে ওদের একজন একটানে গাড়ীর দরজা খুলে ফেলল। হেসে উঠল হো হো করে। বলল, ‘ও! তোমাকেই তো বসে থাকতে দেখেছিলাম সুপ্রীম কোর্টে আমাদের পাশে। তুমিই ফলো করছ তাহলে আমাদের!’

‘পাওল চেন একে?’ পেছনের নীল গাড়ী থেকে আসা দুজনের একজন বলল।

‘না, চিনি না, আজ একবার দেখেছি। সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্ট্রার অফিসে আমাদের পাশে বসেছিল।’

চারটি রিভলবারই আহমদ মুসার দিকে তাক করা। নীল গাড়ী থেকে নেমে আসা পুর্বের সেই লোকটিই আবার বলল, ‘তাহলে ব্যাটা টিকটিকি নাকি? আমরা যদি পেছনে পাহারায় না থাকতাম, ধরাই হয়তো পড়তনা ব্যাটা। ফাদারকে ধন্যবাদ যে, তিনি বুদ্ধিটা করেছিলেন। পিছনে নজর রাখতে হবে এমন কথা আমাদের চিন্তাও আসেনি।’

নীল গাড়ীর সেই লোকটি পকেট থেকে ওয়াকিটকি বের করল। বলল, ‘তোমরা একটু দাঁড়াও, ফাদারের সঙ্গে কথা বলে নেই।’

বলে লোকটি ওয়াকিটকির বোতাম টিপে মুখের কাছে তুলে ধরল।

ওয়াকিটকি থেকে কন্ঠ ভেসে এল ‘আমি পল’।

‘গুড ইভেনিং স্যার। আমি ‘অপারেশন সুপ্রীম’-এর রজার।

ফাদারকে চাচ্ছিলাম।’

‘ফ্রান্সিস বাইক ইদেজা গেছেন। আমাকে বল। আমি তোমাদের কলের অপেক্ষা করছি।’

‘ধন্যবাদ স্যার, কোর্ট থেকে আমাদের ফলো করে আসছিল একজন, আমরা তাকে ধরেছি।’

‘ধরেছ? ব্রাভো! ব্রাভো! টিকটিকি নাকি?’

‘তাই মনে হচ্ছে স্যার’

‘সর্বনাশ তাহলে চীপ জাস্টিস উসাম বাইক আমাদের পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছে।’

‘তাই মনে হচ্ছে, চীপ জাস্টিসেরই টিকটিকি এ। কোট রুম থেকে আমাদের ফলো করছে।’

‘ঠিক আছে। চীপ জাস্টিসের কপাল মন্দ। আমাদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। আমরা এর প্রতিশোধ নেব।’

‘হ্যাঁ, প্রতিশোধ নিতে হবে স্যার। আমরা এখন কি করব স্যার?’

‘তোমরা ওকে আটকে রাখ। কাল সকালে ফ্রান্সিস বাইক ফিরবে। দু’জন একসাথে টিকটিকির পেটটাকে একবার সাফ করব। কি কথা আছে ওর পেটে দেখব। তারপর…’

‘তাহলে কাল সকালে ফাদার ফ্রান্সিস বাইক ফেরা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে স্যার।’

‘হ্যাঁ’, বলে একটু থেমে গুড ইভেনিং বলে লাইন কেটে দিল ওপাশ থেকে।

এই আকস্মিক কথা বন্ধে রজার লোকটা আহত হল মনে হয়। হঠাৎ তার কপালটা কুঞ্চিত হল। অস্ফুটে তার মুখে উচ্চারিত, ‘ব্যাটা শ্বেতাংগের বাচ্চা, গুড ইভেনিংটাও দিতে দিল না।’

বলে এন্টেনা গুটিয়ে রেখে ওয়াকিটকি পকেটে রাখল।

উদ্যত রিভলবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা ওয়াকিটকিতে কথা বলা শুনতে পেল। খুব লো ভয়েসে কথা বলছিল না তারা।

আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো যে, তাকে ওরা টিকটিকি অর্থাৎ সরকারী গোয়েন্দা মনে করছে।

আহমদ মুসা চিন্তা ভেঙে পড়ল কথার শব্দে।

ওয়াকিটকিওয়ালা বলছিল, ‘পাওল টিকটিকি ব্যাটার পকেট সার্চ করে ওর হাত-পা বেঁধে গাড়িতে তোল।’

ওয়াকিটকিওয়ালা ওয়াকিটকি পকেটে রেখে রিভলবার হাতে তুলে নিল।

‘পাওল’ নামের লোকটি তার ডান হাতের রিভলবার আহরদ মুসার পিঠে ঠেকিয়ে তার বাম হাত দিয়ে আহমদ মুসার পকেট সার্চ করল। একটা রিভলবার ছাড়া আর কিছুই পেল না আহমদ মুসার পকেটে।

তারপর আহমদ মুসাকে বেঁধে আহমদ মুসার গাড়িতে তুলল।

আহমদ মুসার পাশে ‘পাওল’ নামের লোকটি বসল হাতে রিভলবার নিয়ে। আর এ গাড়ির সিটে বসল ওয়াকিটকি ওয়ালা ‘রজার’ নামের লোকটি।

গাড়ি স্টার্ট নিয়ে চলতে শুরু করল।

তিনটি গাড়িই একসাথে চলল।

ভাবছিল আহমেদ মুসা। ‘ওকুয়া’র বুদ্ধিমত্তা ও সতর্কতার ব্যাপারে আহমেদ মুসার নিম্নমানের ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক মিনিটের ঘটনাগুলো থেকে আহমেদ মুসার পুর্বের ধারণা পাল্টে গেল। ওরা যথেষ্ট সতর্ক ও বুদ্ধিমান। তাকে ঘিরে ফেলা থেকে শুরু করে বেঁধে গাড়িতে তোলা পর্যন্ত কোন ভুল বা অসতর্কতা ছিল না।

কো্থায় নিয়ে যাচ্ছে আহমেদ মুসাকে ওরা? এই বিপদের মাঝেও আহমেদ মুসার মনে আনন্দ। এভাবে সে নিশ্চয় ‘ওকুয়া’র কোন ঘাটিতে পৌছতে পারবে। ওদের কাছে পৌছা খুব প্রয়োজন।

‘টিকটিকি মহাশয় আপনার নাম কি?’ আহমদ মুসাকে পাশের লোকটা প্রশ্ন করল।

‘টিকটিকি।’ নির্বিকার কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।

আহমদ মুসার কথা শেষ হতেই ‘পাওল’ নামের লোকটি গভীর দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘সাহস তো খুব দেখছি। আমাদের যতটা ভদ্র দেখাচ্ছে, তার এক ভাগ ভদ্রও আমরা নই। কিন্তু কি করব, ফাদার বাইকের শিকারে তো আর আমরা হাত দিতে পারি না।’

‘পাওল টিকটিকিকে বলে দে, কোন টিকটিকি আমাদের পিছু নিলে তার একটাই শাস্তি- মৃত্যুদন্ড।’ ড্রাইভিং সিট থেকে বলল রজার।

‘কিন্তু এক টিকটিকি মরলে আরেক টিকটিকি আসবে। টিকটিকি মেরে শেষ করা যায় না।’ বলল আহমদ মুসা।

‘তুমি বোধ হয় নতুন রিক্রুট। তাই জাননা যে তোমাদের বস’রা আমাদের নেতাদের ড্রইংরুমে একটু বসতে পারলে কৃতার্থ হন। তোমরা মত দশটা মরলেও তারা রা করবে না।’

‘বস’রা শেষ কথা নয়, সরকারও আছে।’

হো হো করে হেসে উঠল পাওল ও রজার দু’জনেই। পাওল বলল, ‘টিকটিকি সব খবর রাখ, এ খবর রাখ না যে, আমাদের এনজিওগুলোর আশীর্বাদ ও অর্থ না হলে সরকার সরকার হতে পারবে না, সরকার সরকার থাকবে না।’

শহরের পূর্ব প্রান্তে শহরতলীর একটা পুরনো বাড়ির সামনে গিয়ে তিনটা গাড়ি দাঁড়াল।

প্রাচীর ঘেরা বিশাল এলাকার মধ্যে দু’তলা একটা বাড়ি। বেশ বড়।

বাড়িতে প্রবেশের একটা মাত্র গেট।

সিংহ দুয়ারের মত বিশাল। বন্ধ।

সামনের গাড়ি যে ড্রাইভ করছিল সে নেমে দরজা খুলে দিল। এর অর্থ এ বাড়িতে গেটের দরজা খুলে দেবার কেউ নেই।

গেট দিয়ে প্রবেশ করল তিনটি গাড়ি।

ভেতরটা আরও বেশী অপরিষ্কার।

এক সময়ের পাথর বিছানো রাস্তাটা ধুলা-ময়লায় একদম ঢেকে গেছে।

তিনটি গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল বাড়িটির সামনে। একটা সিংহ দরজার মুখে।

‘আপনাদের বস ফাদার বাইক এই পোড়ো বাড়িতে থাকে?’ প্রশ্ন করল আহমদ মুসা।

হো হো করে হেসে উঠল ‘পাওল’ নামের পাশের লোকটা। বলল, ‘টিকটিকি মশায়, এটা কোর্ট ও বন্দীখানা। এখানে বিচার হয় এবং শাস্তি বাস্তবায়ন হয়।’

‘বন্দীখানা, কিন্তু লোক তো দেখছি না। পাহারাদার কোথায়? এত ময়লা-আবর্জনা কেন?’

‘যখন প্রয়োজন পাহারাদার থাকে। প্রদর্শনীর জন্যে কোন পাহারাদার রাখা হয় না।’

পায়ের বাঁধন খুলে আহমদ মুসাকে ওরা গাড়ি থেকে নামাল।

আহমদ মুসা যতই বাড়িটা দেখছে স্তম্ভিত হচ্ছে। চুন-কাম, প্লাষ্টার খসে পড়েছে বাড়িটির, ইটও অনেক জায়গা থেকে খসে গেছে। কিন্তু বাড়িটার নির্মাণ শৈলী অপরূপ। মনে হচ্ছে সে যেন স্পেনের কোন ভাঙা প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে।

দেয়ালের ইট দেখে আহমদ মুসার মনে হলো এক বা একাধিক শতাব্দীর বেশী বয়স হবে বাড়িটার।

অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে সিংহ দরজার সামনে প্রশস্ত উঠানে গিয়ে দাঁড়ালো তারা। সিঁড়ি দেখে আহমদ মুসা বুঝল দামী পাথর লাগানো ছিল সিঁড়ির ধাপগুলোতে। খুলে নেয়া হয়েছে সেগুলো। সিংহ দরজা ও দেয়ালের চেহারা দেখেও আহমদ মুসা বুঝল এক সময় সেগুলোতেও দামী পাথর লাগানো ছিল।

দরজায় নক করল রজার।

কয়েক বার একরাশ ভয়ংকর গর্জন শোনা গেল। তারপরই দরজা খুলে গেল।

দরজায় দেখা গেল নেড়ে মাথা পর্বতাকৃতি একজনকে। কয়লার মত কালো গায়ের রং। তিনটি ভীষণাকৃতির ব্লাক-হাউন্ড তার সাথে। কুকুরগুলো চেন দিয়ে বাঁধা। চেনগুলো গরিলা-লোকটির হাতে।

তিনটি ব্লাক-হাউন্ডের চোখই আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। চোখে আগুন তাদের। আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মত পোঁজ তাদের।

কুকুরগুলো টেনে নিয়ে প্রশস্ত করিডোরের এক পাশে সরে দাঁড়াল গরিলা লোকটা।

গরিলা লোকটি মাথা ঝুকিয়ে অভিবাদনের জবাবে রজার বলেছিল ‘ব্ল্যাক-বুল তোমার আরেকটা শিকার নিয়ে এলাম। তবে বিচার এখনো হয়নি, কাল ফাদার আসবেন।’

বলে ভেতরে প্রবেশ করল ওরা আহমদ মুসাকে নিয়ে।

বাইরের থেকে বাড়ির ভেতরের অবস্থা ভাল। পাথর তুলে নেয়ায় দেয়ালের গা ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু অধিকাংশ জায়গায় প্লাস্টার টিকে আছে।

করিডোর আরেকটা বড় দরজার সামনে নিয়ে গেল। দরজার দিকে তাকাতে গিয়ে দরজার অনেকখানি উপরে ভেন্টিলেটরে আটকে গেল আহমদ মুসার চোখ। ভেন্টিলেটরটায় লতা-পাতার সুন্দর জ্যামিতিক ডিজাইন। ডিজাইনের কেন্দ্রে একটা অর্ধচন্দ্র। অর্ধচন্দ্রের পেটে একটা ভাঙা ডিজাইন। যাকে একটা গম্বুজের অর্ধাংশ বলে মনে হচ্ছে।

চমকে উঠল আহমদ মুসা। ক্রিসেন্ট এল কোথেকে এখানে?

আনমনা হয়ে পড়ায় চলার গতি কমে গিয়েছিল আহমদ মুসার।

পেছন থেকে পাওলের রিভলবারের বাঁট আহমদ মুসার মাথা সামনের দিকে ঠেলে দিল।

সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার চলতে শুরু করল সে।

দরজাটা পেরুলেই দেখা গেল ডিম্বাকৃতির একটা বিরাট হলঘর। ডিম্বাকৃতি হলঘরের দৈর্ঘ্যের একটা প্রান্ত শুরু হয়েছে এই দরজা থেকে। দরজায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে নাক বরাবর সোজা আরেক প্রান্তে একটা বড় সিংহাসন। আর সিংহাসনের সামনে হল ঘরের দুই প্রান্ত দিয়ে ধনুকের মত সারিবদ্ধ গদী আঁটা আসন। কিন্তু সিংহাসন কিংবা এসব আসনের সবগুলোই ক্ষত-বিক্ষত, কংকাল মাত্র।

হল ঘরটিকে আহমদ মুসার একটা দরজার কক্ষ বলে মনে হলো। সিংহাসনের উপর নজর বুলাতে গিয়ে আহমদ মুসা আবার সেই বিস্ময়ের মুখোমুখি হলো। সিংহাসনের শীর্ষে সে একটা অর্ধচন্দ্র খোদিত দেখল।

আগে আগে হাঁটছিল আহমদ মুসা। পেছনে রজার, পাওল এবং তাদের সাথী দু’জন ও ব্ল্যাক বুল নামের লোকটি তার পিছনে তিনটি কুকুর হাতে।

আহমদ মুসা হলঘরের মাঝামাঝি পৌঁছতেই পেছন থেকে রজার বলল, ‘বাঁয়ের বড় দরজা দিয়ে।’

আহমদ মুসা বাঁয়ে ঘুরে দরজার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল। দরজাটি একটা সিঁড়ির মুখে। সিঁড়িটা নেমে গেছে নিচের দিকে, ভূগর্ভে।

আহমদ মুসা দাঁড়ালো সিঁড়ি মুখে।

পেছন থেকে রজার বলে উঠল, ‘ব্ল্যাক বুল টিকটিকির হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে রেখে এসো নিচে।’

এগিয়ে এল ব্ল্যাক বুল। প্রথমে সে লোহার বেড়ি পরিয়ে দিল আহমদ মুসার পায়ে। তারপর হাতের বাঁধন খুলে হাতে লোহার বেড়ি পরিয়ে দিল।

আহমদ মুসা বিস্মিত। হাত-পায়ের বেড়িগুলোর প্রাচীন ডিজাইন, কিন্তু তাতে মডার্ন তালা সিস্টেম।

হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে ব্ল্যাক বুল লোকটি খেলনার মতই আহমদ মুসাকে কাঁধে তুলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামল নিচে।

সিঁড়ির দু’টি বাঁক ঘুরে ব্ল্যাক বুল মেঝেয় নামল, লক্ষ্য করল আহমদ মুসা। তার মনে হলো তারা পনের ফুট নিচে নেমেছে।

মেঝেতে নেমেই ব্ল্যাক বুল কাঁধ থেকে আহমদ মুসাকে ছুঁড়ে দিল মেঝেতে।

আহমদ মুসা এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শক্ত মেঝের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষারও কোন উপায় ছিল না।

কাত হয়ে আঁছড়ে পড়েছিল শক্ত মেঝের উপর। শেষ মুহূর্তে শ্বাস বন্ধ করে আঘাত সামলে নেবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তবু ঘাড় ও পাঁজরটা তার যেন থেঁতলে গেল। আঘাতের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠল।

ধীরে ধীরে মাথাটা সে মেঝের উপর রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আঘাতটা হজম করার চেষ্টা করলো।

‘তুই বিদেশী কি করে টিকটিকি হলি?’ ভাঙা ফরাসীতে বলল ব্ল্যাক বুল।

আহমদ মুসা কোন জবাব দিল না। চোখ বুজে ছিল সে।

ব্ল্যাক বুল তার থামের মত পা দিয়ে আহমদ মুসার শরীরটাকে বলের মত গড়িয়ে বলল, ‘রেষ্ট নে, কাল তো যমের বাড়ি যেতে হবে!’

আহমদ মুসা হতাশ হয়ে পড়েছিল। তার আশা বন্দী হবার পর ওকুয়ার কোন ঘাটিতে যাবার সুযোগ হবে এবং ওমর বায়াদের মুক্ত করার একটা পথ সে পাবে। কিন্তু এটা ওকুয়া’র কোন ঘাটি নয়। মনে হচ্ছে এ পোড়ো বাড়িটা ওদের নিকৃষ্ট ধরনের কোন বন্দী খানা এবং এ ধরনের বন্দীখানায় ওমর বায়া এবং ডঃ ডিফারজিসকে তারা রাখবে না। ব্ল্যাক বুল-এর কথা আহমদ মুসার চিন্তায় নাড়া দিল। ব্ল্যাক বুলের মত মোটা বুদ্ধির লোকের কাছ থেকে কিছু কথা বের করা যেতে পারে।

এসব চিন্তা করে আহমদ মুসা ব্ল্যাক বুলের কথার জবাবে বলল, ‘যম বুঝি তোমাদের বলে গেছে?’

‘এই অন্ধ কুঠরিতে ঢোকার পর কেউ এখান থেকে বের হয়নি। এখান থেকে গেছে সোজা যমালয়ে।’

‘মনে হচ্ছে মিছিল করে মানুষ এখানে আসে যমালয়ে যাবার জন্যে!’

‘এই অন্ধ কুঠরিতে কংকাল ও নরমুন্ডের মিছিল দেখলেই সেটা বুঝতে পারবে।’

আহমদ মুসা চারদিকে তাকাল।

অন্ধ কুঠরিটি বিশাল। দু’প্রান্তের শেষটা বেঁকে গেছে বলে দেখা যাচ্ছে না।

মেঝের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে নরকংকাল এবং মানুষের মাথার খুলি।

অন্ধ কুঠরির বাতাস নাকে লাগতেই একটা তীব্র গন্ধ পেয়েছিল আহমদ মুসা। এখন সে বুঝতে পারল গন্ধের উৎস কি।

আহমদ মুসার কাছে পরিষ্কার হলো, খুনে ‘ওকুয়া’ এই পুরানো বাড়িটাকে অতীতে রাজা-বাদশাহদের মতো বধ্যভুমি হিসাবে ব্যবহার করছে। যাকে তারা হত্যা করবে তাকে এখানেই নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদ বা নির্যাতেনর পর তাদের হত্যা করা হয় বা তিলে তিলে তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়।

‘এত লোককে তোমরা হত্যা করেছ?’ ব্ল্যাক বুলের কথার জবাবে বলল আহমদ মুসা।

‘এ আর কত! বড় ও বিপজ্জনক শিকার ছাড়া এখানে কাউকে আমরা আনি না।’

‘বড় ও বিপজ্জনক বন্দী এখন তাহলে তোমাদের নেই দেখছি, আমি একা এখানে!’

‘নেই কেন? আছে অন্য জায়গায়।’

‘আরও জায়গা তোমাদের আছে?’

‘অবশ্যই আছে।’

‘এই ইয়াউন্ডিতেই?’

‘এত প্রশ্ন করছ কেন? ও, তুমি তো টিকটিকি। আচ্ছা কত বেতন পাও যে, এভাবে মরতে এসেছ? সরকারের বেশীর ভাগ লোকই তো ‘ওকুয়া’কে ঘাটায় না। তোমার ভীমরতি হলো কেন?’

‘মনে কর কি যে, তোমরা ঠিক কাজ করছ?’

‘অবশ্যই। আমরা খৃষ্টের সৈনিক।’

‘কিন্তু তোমরা একজন বিখ্যাত ফরাসী লোককে পণবন্দী করে রেখেছো। অথচ সে নির্দোষ-নিরপরাধ। এটা কি খৃষ্টের সৈনিকের কাজ?’

‘এটা নেতাদের ব্যাপার। তাঁরা যা করেন খৃষ্টের জন্যেই করেন।’

‘ফরাসি ঐ ভদ্রলোককে তোমরা নিশ্চয় আমার মত করে রাখনি।’

‘তুমি তো দেখি সাংঘাতিক লোক, যমের বাড়ির দুয়ারে দাঁড়িয়ে অন্যকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ।’

‘কেন তুমিও কি মানুষ নও? তোমার মন নেই? মানুষের দুঃখ তোমার মনকে নাড়া দেয় না?’

‘দেখ ওসব কিছু আমরা বুঝি না। চৌদ্দ পুরুষ ধরে আমাদের পেশা খুন করা।’

‘বাপের মত ছেলে হয় না। চৌদ্দ পুরুষের কথা বলছ কেন?’

হো হো করে হেসে উঠল ব্ল্যাক বুল। বলল, ‘আমাদের ক্ষেত্রে ওসব নীতিকথা খাটে না। খুন আমাদের বিজনেস। তাই আমরা সব সময় শক্তিমানের হাতে থাকি। একটা গল্প বলি শোন। এই বাড়ির যিনি নির্মাতা ও মালিক, তিনি আমার দাদাকে নিয়েছিলেন বডি গার্ড হিসেবে। ফরাসীরা এলে তারাই শাসনের মালিক হয়। আমার দাদা তাদের একটা মিশনারী পক্ষের সাথে যোগ দিয়ে এই বাড়ি লুট করায় এবং বাড়ির বৃদ্ধ মালিক ও তার স্ত্রীকে হত্যা করে। এই ঘর তাদের ছিল ধন ভান্ডার। পরে ফরাসী দেশীয় মিশনারী ঐ সংস্থা দাদাকে দিয়ে ঐ বৃদ্ধ ও তার স্ত্রীকে খুন করায়। সেই থেকে আমরা ঐ মিশনারী পক্ষের পেশাদার খুনি।’

‘তোমার এ মিশনারী পক্ষের নাম কি?’

‘তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি এখানে আসিনি। তুমি মর, আমি চললাম।’ বলে ব্ল্যাক বুল ঘুরে দাঁড়াল চলে যাওয়ার জন্যে।

আহমদ মুসা বলল, ‘মিঃ ব্ল্যাক বুল প্রশ্নের উত্তর দিও না ঠিক আছে। কিন্তু তুমি তোমার দাদা ও আব্বার মত নও। হলে দাদার ঐ গল্প তুমি করতে না।’

ব্ল্যাক বুল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

তার চোখ দু’টি নিবদ্ধ হলো আহমদ মুসার দিকে।

চোখ দু’টি শান্ত। কয়লার মত কালো মুখে পাপের কুৎসিত আবরণ ভেদ করে নিষ্পাপ বিষ্ময়ের একটা আভা ফুটে উঠল।

একইভাবে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে।

অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে ধীর কন্ঠে বলল, ‘তুমি টিকটিকি নও, তুমি কে?’

‘কেন? এ প্রশ্ন কেন?’

‘টিকটিকিদের আমি চিনি। ওরা তোমার মত করে কথা বলে না। তোমার কথায় সংষ্কারকের কন্ঠ, তোমার চোখে সংস্কারকের দৃষ্টি। বল তুমি কে?’

‘তার আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও।’

হো হো করে হেসে উঠল ব্ল্যাক বুল। কিন্তু তার শুকনো হাসিকে একটা জমাট বিদ্রুপ বলে মনে হলো। বলল সে, ‘দাদা ও আব্বা মিলে যত খুন করেছে, আমি তার দ্বিগুণ খুন করেছি। সুতরাং বুঝতেই পারছ তোমার কথা সত্য নয়।’

‘পেশা এবং মন আলাদা হতে পারে মিঃ ব্ল্যাক বুল।’

‘রক্তের সাগর সে মনকে রাখেনি, চাপা দিয়েছে। যাক। তোমার জন্যে দুঃখ হচ্ছে। তুমি কে?’

‘আমি টিকটিকি নই। আমি বাইরে থেকে এসেছি দু’জন লোককে বন্দীদশা থেকে উদ্ধারের জন্যে।’

‘কিন্তু এদের পিছু নিয়েছিলে কেন?’

‘এদের হাতেই ওঁরা দু’জন বন্দী আছেন।’

‘আমার মনে হচ্ছে, তুমি একজন ভাল মানুষ। কিন্তু তোমার ভাগ্য খারাপ। তোমাকে হত্যা করতে আমার কষ্ট হবে।’

‘তাহলে আমার কথাই ঠিক। তোমার পেশা এবং মন আলাদা।’

ব্ল্যাক বুল বসে পড়ল। তার চোখে শুন্য দৃষ্টি। বলল, ‘সত্যি বলছ আমার মন নামক কিছু আছে?’ তার কথা খুব ভেজা শোনাল।

‘কেন মন তোমার নেই মনে কর?’

‘না নেই। আমার দাদার ছিল না, আব্বার ছিল না, আমারও নেই।’

‘আবার তুমি পেশা এবং মনকে এক করে দেখছ।’

‘তুমি সব জান না। লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা, নেমকহারামি ইত্যাদি পেশা হতে পারে না। তাহলে শোন।’

বলে একটু থামল ব্ল্যাক বুল। তারপর শুরু করল, ‘আমার পিতৃপুরুষের বাসভূমি ছিল মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের ‘সলো’ শহরে। সংঘ নদীর তীরে ছিল আমাদের বাড়ি। আমার দাদু ‘কমন্ড কাল্লা’ তখন নব্য যুবক। কুস্তিগীর হিসেবে বিখ্যাত। সংঘ নদী তখন দাস ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এক ভোরে আমাদের নদী তীরের বাড়ি আক্রান্ত হলো দাস ব্যবসায়ীদের দ্বারা। ওদের বন্দুকের কাছে আমাদের তীর এবং বর্ষার প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকল না। দাদুর আব্বা-আম্মা নিহত হলো। আর বন্দী হলেন দাদু। হাত-পা বেঁধে দাদুকে আরও অনেকের সাথে নৌকার খোলে ফেলে রাখা হলো। সংঘ নদী বেয়ে তাদের আনা হলো কংগোর ‘ওয়েসু’ শহরে। দাস-ব্যবসায়ীদের বড় কেন্দ্র ছিল এটা।

নিয়ম ছিল, দাস ব্যবসায়ের জন্যে বন্দীদের না খাইয়ে রেখে দুর্বল করে ফেলা হতো।

দাদুরা যখন ‘ওয়েসু’তে পৌঁছলেন, তখন তারা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় জর্জরিত। মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের ‘সলো’ থেকে ‘ওয়েসু’ পর্যন্ত এক সপ্তাহের পথ এসেছে। সাত দিনের মধ্যে মাত্র একদিন একবেলা খেতে দিয়েছে। পানি খেতে দিয়েছে প্রতিদিন একবার।

দাদুরা যখন ‘ওয়েসু’তে পৌঁছল, তখন তারা শয্যাশায়ী।

ওয়েসু’তে আসার পর দাস ব্যবসায়ীরা মনে হয় কিছু সদয় হলো বন্দীদের প্রতি। ওদের খেতে দেয়া হলো এবং খোলের বাইরে মুক্ত বাতাসে নিয়ে আসা হলো তাদেরকে। পায়ের বেড়ি খুলে দেয়া হলো খোলের উপর হাঁটাহাঁটি করার জন্যে।

নৌকার দুই প্রান্তে দুইজন রাইফেলধারী তাদের পাহারা দিচ্ছিল।

দাদু মুক্তির জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এইটুকু সুযোগও তিনি নষ্ট করলেন না। নৌকা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি পানিতে।

দাদু সাঁতরে নদীর উত্তর পাড়ে ওঠার জন্যে ছুটেছিলেন। ওদের দু’জনও পানিতে ঝাঁপিয়ে দাদুর পিছু নিলেন। পরে একটা ছোট বোটও দাদুকে ধরার জন্যে ছুটল।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাঁতারু ছিলেন দাদু। সুতরাং সাঁতারে ওরা পারল না দাদুর সাথে।

তীরে উঠার পর দৌঁড়েও তারা পারল না দাদুর সাথে। নদীর তীর ধরে পশ্চিম দিকে পাগলের মত ছুটছিলেন দাদু।

দৌঁড়ে ওরা যখন দাদুর সাথে পেরে উঠল না, তখন গুলী করল। গুলী গিয়ে বিদ্ধ হলো দাদুর পায়ে।

সামনেই একটা মোটর বোট বাঁধা ছিল ঘাটে। দাদু গুলীবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন নৌকার সামনের তীরটায়।

ওরা ছুটে গিয়ে গুলী বিদ্ধ যন্ত্রণা কাতর দাদুকে ঘিরে দাঁড়াল।

এই সময় বোট থেকে নেমে এলেন মধ্য বয়সী একজন ভদ্রলোক। ভদ্রলোকটি কৃষ্ণাংগ, কিন্তু ঠিক নিগ্রো নয়। নাক খাড়া, চুল সরল, মুখে এশিয়ান বা ইউরোপীয় চেহারা।

ভদ্রলোক বোট থেকে নেমে চারজন শ্বেতাংগকে একজন গুলী বিদ্ধ কৃষ্ণাংগকে ঘিরে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন এবং পরিষ্কার ফরাসী ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ব্যাপার? কি ঘটেছে?’

দাস ব্যবসায়ী শ্বেতাংগরা তার কথার দিকে কর্ণপাত না করে দাদুকে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল।

ভদ্রলোক ছুটে এসে ওদের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন।

ওদের একজন বলল, ‘পথ ছেড়ে দিন। এ আমাদের ক্রীতদাস।’

‘আমি ওকে জিজ্ঞেস করব, ও ক্রীতদাস কিনা। তোমরা ওকে কোথা থেকে কিনেছ, ও বলুক।’

দাদু চিৎকার করে উঠল, ‘ওরা ধরে এনেছে আমাকে আমার আব্বা-আম্মাকে হত্যা করে।’

সঙ্গে সঙ্গে ওরা পিস্তল তুলল ভদ্রলোককে লক্ষ্য করে। ভদ্রলোকের হাতে ছিল ষ্টেনগান। বিদ্যুত গতিতে তা উঠে এসে গুলী বৃষ্টি করল।

এ রকমটা ওরা ভাবেনি। কোন কৃষ্ণাংগ শ্বেতাংগকে এইভাবে গুলী ছুড়তে সাহস পাবে তা তারা চিন্তা করেনি। সম্ভবত পিস্তল তুলেছিল ভয় দেখাবার জন্যে। গুলীতে ওদের চারজনের দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেল।

ভদ্রলোক দাদুকে পাঁজাকোলা করে তুলে বোটে নিয়ে এল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ষ্টার্ট দিল বোট। বলল, ‘খবর পাবার পর ‘ওয়েসু’ থেকে দাস ব্যবসায়ী শয়তানরা এক জোট হয়ে ছুটে আসবে।’

‘কিন্তু কোথায় পালাবেন। নদী পথে কি ওদের হাত থেকে বাঁচা যাবে?’ জিজ্ঞেস করেছিল ক্রু।

‘আমি সংঘ নদী দিয়ে যাব না। আমি ক্যামেরুনের দিজা নদীতে ঢুকব। দিজার মত ছোট ও দুর্গম নদীতে ওরা ঢুকবে না’।

এই ভাবেই দাদু ভদ্রলোকটির আশ্রয় লাভ করলো। ভদ্রলোক দীর্ঘ পনের দিন এ নদী সে নদী বেয়ে ইয়াউন্ডিতে এসে হাজির হলেন। যেদিন তিনি ইয়াউন্ডিতে পৌঁছিলেন, সেদিনই পনের ষোল বছরের তাঁর একমাত্র ছেলে মারা গেল।

ছেলেটির কবর দেয়া হলো ইয়াউন্ডিতে। কবর দেয়ার সময় আমার দাদু বুঝলেন ভদ্রলোকটি মুসলমান।

ভদ্রলোকের গন্তব্য ছিল নাইজেরিয়ার লাগোস অথবা ‘কানো’ শহর এবং সেখান থেকে হজ্জে চলে যাওয়া এবং হজ্জ শেষে মদিনায় স্থায়ী হওয়া।

কিন্তু ছেলে মারা যাওয়ার পর একেবারে ভেঙে পড়লেন ভদ্রলোক। নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ঠিক করলেন, ছেলের কবরের পাশেই গড়ে তুলবেন স্থায়ী নিবাস। দাদুকে বললেন, তুমি সম্পূর্ণ মুক্ত। বাড়িতে ফিরে যাও। কিংবা তোমার যেখানে ভালো লাগে যেতে পার।

দাদু বললেন, বাড়িতে আমার কেউ নেই। আপনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আপনার ধর্মও আমার ভালো লেগেছে। আমি ইসলাম গ্রহণ করে আপনার পায়ের কাছেই থাকতে চাই।

ভদ্রলোক দাদুকে সন্তান হিসেবে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। এবং একমাত্র মেয়ে আয়েশাকে বিয়ে দিয়েছিলেন দাদুর সাথে।’

থামল ব্ল্যাক বুল।

‘কিন্তু তোমার এ কাহিনীতে কি বুঝা গেল?’ বলল আহমদ মুসা।

‘শেষ করতে দাও।’ বলে আবার শুরু করল ব্ল্যাক বুল, ‘আসল কাহিনী শুরুই হয়নি। ভদ্রলোক ছিলেন মহৎ হৃদয় এক রাজপুত্র। তার নাম ছিল যায়দ রাশিদি। উত্তর ক্যামেরুনের মারুয়া উপত্যাকায় এদের রাজত্ব ছিল। পার্শ্ববর্তী চাদ ও নাইজেরিয়ারও কিছু এলাকা ছিল এই রাজত্বের অধীন। পিতার মৃত্যুর পর যায়দ রাশিদি রাজ্যের সুলতান হন। কিন্তু রাজত্বের অভিলাসী ছোট ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে ছোট ভাইকে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে পরিবার সমেত নিরুদ্দেশ হন। প্রথমে যান চাদে, তারপর মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের দুর্গম অঞ্চল ‘বোমাসায়’ বসবাস করতে থাকেন। সংঘ নদী তীরবর্তী ‘বোমাসা’ বন্দরটি ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র ও কংগোর সংগম স্থলে। দীর্ঘ ২০ বছর এখানে বসবাস করার পর হজ্জের উদ্দেশ্যে ‘বোমাসা’ ত্যাগ করেন। তারপর ‘ওয়েসু’তে অবস্থান কালে দাদুর সাথে তার সাক্ষাত হয়।’

থামল ব্ল্যাক বুল।

‘থামলে কেন। চমৎকার তোমার কাহিনী। কিন্তু তুমি কি বলতে চাও এখনো বুঝিনি।’ বলল আহমদ মুসা।

‘বলছি। এর পরের কাহিনী আমার দাদুর বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী। যায়দ রাশিদি ইয়াউন্ডির বিশাল এলাকা কিনে অল্পদিনেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন এবং ব্যবহার ও বদান্যতার গুণে তিনি স্থাণীয় লোকদের হৃদয় জয় করেছিলেন। কিন্তু তার এই জনপ্রিয়তা তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ায়। ক্যামেরুনে পশ্চিমী শাসকদের সাথে খৃষ্টান মিশনারী সংগঠন সমূহেরও আগমন ঘটে। যায়দ রাশিদি তাদের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়। আমার দাদু খৃষ্টান মিশনারীদের প্রলোভনের শিকার হয়ে পড়েন। অর্থ বিশেষ করে নারী দিয়ে ফাঁদে ফেলে তাকে সম্পূর্ণ বশীভূত করা হয়। খৃষ্টান মিশনারীদের টার্গেট ছিল যায়দ রাশিদির ধর্ম প্রচার বন্ধ করা এবং তাঁর অর্থ ও সম্পত্তি আত্মসাত করা। দাদুকে দিয়ে অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে এ কাজটি আঞ্জাম দেয়া হয়।

একদিন ভোরে প্রার্থনারত অবস্থায় যায়দ রাশিদি ও তার স্ত্রীকে হত্যা করেন দাদু ছুরি দিয়ে নিজ হাতে।

চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে প্রার্থনারত দাদী প্রার্থনা ছেড়ে ছুটে আসেন। পিতা-মাতার রক্তে ভাসমান দেহ এবং দু’হাতে ছুরি নিয়ে দাদুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।

যায়দ রাশিদি ও তার স্ত্রীর হত্যার পর বাড়ি ও সমগ্র সম্পত্তি দখল করে খৃষ্টান মিশনারীরা। এবং দাদীকে বন্দী করে রাখা হয় এই অন্ধ কুঠরীতে। তার উপর নির্যাতন চলে দিনের পর দিন।

যায়দ রাশিদির সব সম্পদ-সম্পত্তিই খৃষ্টান মিশনারীরা পেয়ে যায়, কিন্তু যায়দের স্বর্ণ মুদ্রার বিশাল বাক্সটি কোথাও পাওয়া যায় না। ঐ বাক্সটির সন্ধানে সবগুলো ঘরের মেঝে এবং দেয়ালের সন্দেহজনক সব জায়গা খুড়ে ও ভেঙ্গে দেখা হয়। এই অন্ধ কুঠরীর মেঝে কয়েকবার খুঁড়ে দেখা হয়। কিন্তু কোথাও সেই বাক্স খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই বাক্সের সন্ধানেই দাদীর উপর নির্যাতন চলে।

দাদী সেই যে জ্ঞান হারিয়েছিলেন, তারপর তিনি যেন একদম বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। কথা বলতেন না। তাঁর উপর নির্যাতন চলার প্রথম দিকে একদিন একটি মাত্র বাক্য দাদুর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি গলায় ক্রস পরেছ, ঐ অর্থ ক্রিসেন্টের জন্য, ক্রসের জন্যে নয়।’

এই কথাটুকুর পর দাদী আবার বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। তার উপর নির্যাতন চালাত দাদু এবং দাদুর সাথী ফ্লোরেন্স নামের মিশনারীদের একটি মেয়ে। শত নির্যাতনেও দাদী আর মুখ খোলেননি। শুধু আব্বাকে দেখলে ডুকরে কেঁদে উঠতেন। আব্বা তখন সাত-আট বছরের ছেলে। আব্বাকে দাদীর কাছে আনা হতো টোপ হিসেবে, যাতে তিনি কথা বলেন। দাদী কাঁদতেন, কিন্তু কথা বলতেন না। একদিন ফ্লোরেন্স মেয়েটি কথা বলতে দাদীকে বাধ্য করার জন্যে আব্বার গলায় ছুরি ধরেছিল। দাদী চিৎকার করে চোখ বুজেছিলেন, কিন্তু মুখ খোলেননি।

নির্যাতন, রোগ-শোক এবং অনাহারে দাদী এই অন্ধ কুঠরিতেই একদিন প্রাণ ত্যাগ করেন।

দাদুও পরবর্তীকালে সুস্থ ছিলেন না। দাদীর মৃত্যুর পর ফ্লোরেন্স ও মিশনারীদের কাছে দাদুর প্রয়োজন আর থাকে না। দাদু পরিণত হন তাদের চাকরে। ধীরে ধীরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

এই বাড়ি ও এই অন্ধ কুঠরি পরিণত হয় খৃষ্টান মিশনারীদের বধ্যভূমিতে। আর দাদু পরিণত হন তাদের অসহায় এক জল্লাদে।

জল্লাদি করে আব্বাও প্রায়শ্চিত্ত করে গেছেন দাদুর পাপের। আমিও করছি। এ পাপ আমাদের ঘাড় থেকে কখনই নামবে না। পেশা এবং পাপক্লিষ্ট মন আমাদের এক হয়ে গেছে। তুমি পেশা ও মনকে আলাদা করছ, আমাদের ক্ষেত্রে এটা সত্য নয়।’

একটু থামল ব্ল্যাক বুল। শেষ দিকে তার মুখে ফুটে উঠেছিল কান্নার মত হাসি।

পরে গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ। বলল, ‘জানো, আমি আমার পেশা নিয়ে খুশি আছি। কারণ এই বাড়ি ছাড়তে চাই না। যায়দ রাশিদির এই বাড়ি আমার কাছে স্বর্ণের টুকরার চেয়েও মূল্যবান। আর এই অন্ধ কুঠরী ঘর আমার সবচেয়ে বেশী প্রিয়। এখানে এলে আমি দাদীর গন্ধ পাই, কথা শুনি।’

বলে উঠে দাঁড়াল ব্ল্যাক বুল।

আহমদ মুসা কাহিনী শুনে নিজেই যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল। হৃদয়ের গভীরে একটা ব্যথা চিন চিন করে উঠেছিল তার। যায়দ রাশিদির সেই অতীত তার কাছে ভেসে উঠতে চাচ্ছিল।

ব্ল্যাক বুলের উঠে দাঁড়ানো দেখে সম্বিত ফিরে পেল আহমদ মুসা।

একটু নড়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘তোমার এই কাহিনী বলা, এই বাড়ি এবং এই অন্ধ কুঠরীকে তোমার ভালোবাসা প্রমাণ করে, তোমার কাছে তোমার পেশার চেয়ে তোমার মন বড়। যাক সে কথা। তোমার মত করে এই বাড়ি এবং এই অন্ধ কুঠরীকে যে আমিও ভালোবেসে ফেললাম!’

‘কেন? বিদ্রুপ করছ?’ বলল ব্ল্যাক বুল।

‘না, বিদ্রুপ করিনি। তোমার হতভাগ্য যায়দ রাশিদি এবং তোমার হতভাগ্য দাদী তো আমার ভাই-বোন!’

‘কি বলছ তুমি?’

‘হ্যাঁ। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সেই হিসেবে তারা আমার ভাই-বোন।’

‘তুমি মুসলমান?’ চোখে একরাশ বিষ্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল ব্ল্যাক বুল।

মুহূর্তকাল থামল। তারপর সেই বিষ্ময় নিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি মুসলিম, তুমি টিকটিকি নও। তাহলে তুমি আমাদের লোকদের পিছু নিয়েছিলে কেন?’

জবাব দিতে মুহূর্তকাল দেরী করল আহমদ মুসা। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘তোমার সংগঠন ‘ওকুয়া’ আমার এক মুসলিম ভাই এবং নিরপরাধ এক ফরাসী ভদ্রলোককে বন্দী করে রেখেছে। তাদের মুক্ত করার জন্যে ‘ওকুয়া’র ঘাটির সন্ধানে আমি ওদের পিছু নিয়েছিলাম।’

‘কেন ওদের বন্দী করেছে?’

‘যায়দ রাশিদির মতই ওমর বায়াকে ওরা বন্দী করেছে তার দশ হাজার একর সম্পত্তি আত্মসাত করার জন্যে।’

‘এটা ওদের খুব সাধারণ একটা কৌশল। কিন্তু ওদের বাধা দিয়ে কেউ কোনদিন সফল হতে পারেনি। যারা বেশী বেয়াড়া, তাদের এই অন্ধ কুঠরীতে আনা হতো। আর তাদের জীবন যেত আমার হাতে। কিন্তু কোন বুদ্ধিতে তুমি একা এদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছ?’

‘একা নই। সাথে আল্লাহ আছেন। এবং আরও অনেকে আছেন। যাক একথা। তুমি কি বলতে পার ওদের কোথায় আটকে রাখা হয়েছে?’

‘আমি এই বাড়িটা ছাড়া ওদের কিছুই চিনি না, কিছুই জানি না।’

বলেই উঠে দাঁড়াল ব্ল্যাক বুল। বলল, ‘এই প্রথম কোন বন্দীর জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে। মনে হচ্ছে জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে সাহায্য করি। কিন্তু জীবন দিয়েও এখান থেকে তোমাকে মুক্ত করতে পারবো না। ওরা চারজন পাহারায় আছে। কাল দুই সাহেব আসার পর তোমার বিচার করবে। আমাকে দিয়ে তোমাকে খুন করাবে। তারপর যাবে।’

‘আমার জন্যে তুমি ভেবনা। একটা কথা বল, যায়দ রাশিদির এই বাড়ি এবং তার সকল সম্পত্তির বৈধ মালিক যে তুমি, একথা তোমার মনে জাগে না?’

‘জাগে। আরও জাগে, আমার দেহে মুসলিম রক্ত আছে। কিন্তু পাপের জগদ্দল পাথর ঠেলে তা বেরিয়ে আসতে পারে না। আমি একজন পাপিষ্ঠ।’

‘পাপ যেমন হয়, পাপ তেমনি মোচনও হয়।’

‘কিন্তু আমার পাপ?’

‘সব পাপই মোচন হয়।’

‘আমি মানুষের মধ্যে গণ্য হতে পারব বলে তুমি মনে কর?’

‘তোমার চেয়ে বড় পাপী শুধু মানুষ হওয়া নয়, মহামানুষও হতে পারে।’

‘সত্যি পারব?’

বলে ব্ল্যাক বুল এগিয়ে এল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘এখন আমার মনে হচ্ছে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব।’

ব্ল্যাক বুল তার পকেট থেকে চাবী বের করে আহমদ মুসার হাত ও পায়ের বেড়ি খুলে দিল।

ঠিক এই সময়েই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

আহমদ মুসা এবং ব্ল্যাক বুল দু’জনেই সেদিকে চোখ ফিরাল। দেখল, ব্ল্যাক ক্রসের সেই চারজনের দু’জন উদ্যত রিভলবার হাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তাদের চোখে আগুনের ফুলকি।

ব্ল্যাক বুল ওদের দিকে তাকিয়ে যেন পাথর হয়ে গেছে। আহমদ মুসাও উঠে দাঁড়িয়েছে। তারও স্থির দৃষ্টি ওদের দিকে।

ওরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। দাঁড়াল আহমদ মুসা ও ব্ল্যাক বুলের মাঝখানে।

ওদের একজনের রিভলবার ব্ল্যাক বুলের দিকে এবং আরেকজনের আহমদ মুসার দিকে।

ব্ল্যাক বুলের দিক হয়ে দাঁড়ানো লোকটি চিৎকার করে উঠল, ‘জান বিশ্বাসঘাতকতার কি শাস্তি এখানে? দেখা মাত্র হত্যা করা। ঈশ্বরের নাম নাও। তিন গোণা পর্যন্ত সময় পাবে।’

বলে সে এক….. দুই….. করে গোণা শুরু করল।

আহমদ মুসা বুঝতে পারছিল ওরা ফাঁকা ভয় দেখাচ্ছে না। আফ্রিকার গোত্রীয় ঐতিহ্য সে জানে, বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি তাদের সর্বোচ্চ এবং তাৎক্ষণিক। ওরা ব্ল্যাক বুলকে হত্যা করবে।

আহমদ মুসার মনে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তার দিকে রিভলবার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দিকে।

ব্ল্যাক বুলের দিকে বন্দুক উঁচানো লোকটি যখন এক….. দুই…. গুনছিল, তখন আহমদ মুসার সামনের লোকটি সম্ভবত অপ্রতিরোধ্য কৌতূহল বশতই ব্ল্যাক বুলের অবস্থা দেখার জন্যে মুখ ঘুরিয়েছিল মুহূর্তের জন্যে।

এমন একটি সুযোগের জন্যেই অপেক্ষা করছিল আহমদ মুসা।

লোকটি তার মুখ ঘুরিয়ে নেবার সাথে সাথেই আহমদ মুসা তার হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘রিভলবার ফেলে দাও, হাত তুলে দাঁড়াও।’

আহমদ মুসার হুকুম তামিল হলো না।

যার রিভলবার আহমদ মুসা কেড়ে নিয়েছিল, সে তার মুখ ঘুরিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল আহমদ মুসার উপর। আহমদ মুসার লক্ষ্য তখন ব্ল্যাক বুলের সামনের রিভলবারধারী লোকটি। এই সময় রিভলবারধারী লোকটিও রিভলবার ফেলে না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল।

আহমদ মুসাও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল।

তার হাতের রিভলবার চোখের পলকে দু’বার অগ্নিবৃষ্টি করল। যে লোকটি আহমদ মুসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, সে গুলী খেয়ে উল্টে পড়ে গেল। আর ব্ল্যাক বুলের কাছের যে লোকটি আহমদ মুসার দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছিল তার রিভলবার, সে মাথায় গুলী খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ব্ল্যাক বুলের পায়ের কাছে।

আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় কঠোর একটি কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘হাত থেকে রিভলবার……..।’

প্রথম শব্দ শোনার সাথে সাথেই আহমদ মুসা বিদ্যুৎ গতিতে মাথা তুলেছিল। দেখল, স্টেনগান হাতে সেই চারজনের অবশিষ্ট দু’জন রজার এবং পাওল সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে। সামনে আছে রজার তার স্টেনগানটি আহমদ মুসার দিকে উদ্যত।

আহমদ মুসার চোখ ওদের উপর পড়ার সংগে সংগেই উঠে এসেছিল তার রিভলবার। রজারের কথা শেষ হবার আগেই আহমদ মুসা দু’বার ট্রিগার টিপল তার রিভলবারের। দু’টি গুলী পর পর গিয়ে বিদ্ধ করল রজার ও পাওলকে। দু’জনের দেহই গড়িয়ে পড়ল সিঁড়ি দিয়ে নিচে।

‘ব্ল্যাক বুল চল আমরা যাই।’ বলল আহমদ মুসা।

ব্ল্যাক বুল তখন রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। মনে হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর বস্তুর সামনে সে যেন দাঁড়িয়ে। ধীরে ধীরে সে বলল, ‘থ্রি মাসকেটিয়ারের গল্প আমি শুনেছি, আমেরিকার বিখ্যাত পিস্তলবাজদের গল্পও আমি জানি। কিন্তু মনে হচ্ছে তোমার মানে আপনার কাছে তারা শিশু। এত দ্রুত রিভলবার তুলে লক্ষ্যভেদ করা যায়, না দেখলে আমার বিশ্বাস হতো না। এখন স্বীকার করছি, ‘ওকুয়া’ এর সাথে আপনি লড়তে পারবেন।’

‘থাক এসব কথা। চল আমরা যাই।’

‘কোথায়?’

‘আমি যেখানে যাব।’

‘কিন্তু এই বাড়ি তো আমি ছাড়ব না।’

‘ওকুয়া, কোকদের তুমি আমার চেয়ে ভাল চেন। এখানে আর এক মুহূর্ত তুমি নিরাপদ নও।’

‘তা জানি। কিন্তু…..’

‘কিন্তুটা বুঝেছি। বাপ, দাদা, দাদীদের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি তুমি ছাড়তে চাও না।’

‘এই বাড়িতে টিকে থাকা হৃদয়হীন পেশাটা গ্রহণের একটা বড় কারণ।’

‘আমরা এ বাড়িটা ছাড়ছি না। আবার ফিরে আসব। ইয়াউন্ডিতে এটাই আমার মনে হয় প্রথম মুসলিম বসতি। সুতরাং এ বাড়িটার ঐতিহাসিক মূল্যও আছে। সেই অতীত সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানতে চাই।’

বলে আহমদ মুসা সামনে পা বাড়িয়ে বলল, ‘এসো।’

‘জানতে চান? তাহলে তার কিছু বইপত্র আছে দেখতে পারেন।’ বলল ব্ল্যাক বুল।

‘কোথায়?’

‘এই সিঁড়ির নিচে একটা ট্রাংকে ঢুকিয়ে রেখেছি। চলুন দেখবেন।’

ট্রাংক খুলে বই বের করতে করতে বলল, ‘সব বই ওরা পুড়িয়ে ফেলেছে। একটা সুযোগ পেয়ে এ কয়টা আমি সরিয়ে রেখেছি।’

আহমদ মুসা এক এক করে সবগুলো বই দেখল। অধিকাংশই আরবী ভাষায়। অবশিষ্ট কয়েকটি ফরাসী ভাষায় লেখা। আর দু’টি সুহাইলী ভাষায় লেখা। বইগুলো ইতিহাস, কোরআন, হাদীস, ভ্রমণ কাহিনী ইত্যাদি বিষয়ক। ডাইরীর মত একটা নোট বুক দ্রুত তুলে নিল আহমদ মুসা।

পাতা উল্টিয়ে দেখল, প্রথম পাতায় আরবী ভাষায় লেখা নাম: যায়দ রাশিদি। তার নিচে লেখা: মারুয়া খিলাফত।

তারপর আরও পাতা উল্টাল আহমদ মুসা। দেখল, স্মৃতি কথা ধরনের একটা দিনপঞ্জী। আরবী ও সুহাইলী এই দুই মিশ্র ভাষায় লেখা।

আগ্রহ হলো আহমদ মুসার নোট বুকটি পড়ার। আফ্রিকার এ অঞ্চলের অনেক কছুই জানা যেতে পারে একজন মুসলিমের লেখা এই দিনপঞ্জী থেকে।

শেষ পাতাটিতে নজর বুলাতেই চমকে উঠল আহমদ মুসা। চমকে উঠার কারণ লেখার একটি শিরোনাম। যার অর্থ হলোঃ ‘যিনি এই ডায়েরিটি পড়বেন তার প্রতি।’

শিরোনামের নিচের লেখাও পড়ল আহমদ মুসা। ছোট একটা অনুচ্ছেদে লেখাঃ

“বুক ভরা অভিমান নিয়ে মারুয়া খিলাফত থেকে চলে আসার সময় আমার ন্যায্য পাওনা কিছু স্বর্ণমুদ্রা সাথে নিয়ে এসেছিলাম। যা আমার কোন প্রয়োজনে খরচ করিনি। আমার সাধ ছিল, আমার স্বর্ণ মুদ্রা আল্লাহর ঘর কাবা এবং নবীর মসজিদের রং ও রূপ বৃদ্ধিতে কাজে লাগাব। কিন্তু তা হলো না। তারপর ভেবেছিলাম, এ দেশীয় দুঃখী মুসলমানদের স্বার্থে এ স্বর্ণমুদ্রা কাজে লাগাব। তারও সুযোগ পেলাম না। নাসারা মিশনারীরা যেভাবে এগুচ্ছে তাতে আমি এবং আমার অর্থ সবই গিয়ে তাদের গ্রাসে পড়বে আশংকা করছি। এই আশংকায় আমার অর্থগুলো হেফাজতের একটা চেষ্টা করে গেলাম। আমার একান্ত আশা, যিনি ডাইরির এই অংশ পাঠ করবেন তিনি একজন দায়িত্বশীল মুসলিম হবেন। তিনি নিম্নলিখিত নক্‌শা অবলম্বনে মাটির তলা থেকে ৩ বর্গ ঘনফুট আয়তনের স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি বাক্সটি উদ্ধার করবেন। স্বর্ণমুদ্রার মালিক তিনি হবেন এবং তার বিবেকের রায় অনুসারে স্বাধীনভাবে খরচ করবেন।”

অনুচ্ছেদটির নিচে একটা বৃত্ত আঁকা। তার মাঝখানে একটা পাখির বাসা। সে পাখির বাসার ডানে অল্প দূরে একটা বর্গক্ষেত্র। তার মাঝখানে পাখির প্রাণহীন একটা ছানা। পাখির ছানাটির ঠোঁটের কাছে একটা গোলাপ ফুল। মনে হচ্ছে যেন ফুলটি ছানাটির ঠোঁটে ছিল, পড়ে গেছে।

কথিত নক্‌শা এটুকুই।

নক্‌শাটির উপর একবার নজর বুলিয়েই মুখে হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার। ভাবল, যায়দ রাশিদি এত সহজ ধাঁ ধাঁ’র চাবী দিয়ে তার অর্থ লুকিয়ে রেখেছেন।

আহমদ মুসা নোট বুক বন্ধ করল। বলল ব্ল্যাক বুলের দিকে তাকিয়ে, ‘এটা তোমার দাদীর আব্বার ডাইরী। আমরা সাথে নিতে পারি?’

‘ডাইরি কেন সব বই-ই নিতে পারেন।’

‘সবই নেব। আবার যখন ফিরে আসব তখন।’

‘সত্যিই তাহলে ফিরে আসবেন?’

‘অবশ্যই ফিরে আসতে হবে।’

কথা শেষ করেই আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল। বলল , ‘চল।’

আহমদ মুসার গাড়ি অন্য দু’টি গাড়ির সাথে বাইরেই ছিল। গাড়িতে উঠল তারা দু’জন।

ওরা দু’জন বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।

বেরিয়ে আসার আগে ব্ল্যাক বুল তিনটি কুকুরের গলা থেকে চেন খুলে নিয়ে ওদের গা নেড়ে আদর করে বলল, ‘তোরা স্বাধীন চলে যা।’

কিন্তু কুকুর তিনটি চলে না গিয়ে অবাক হয়ে তাকাল ব্ল্যাক বুলের দিকে। যেন চেন খুলে নিয়ে স্বাধীনতা দেয়ার তারা বিস্মিত হয়েছে।

ককুর তিনটিকে আবার আদর করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেক

রাশিদি ইয়েসুগোর ড্রইং রুমে রাশিদি, মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ও লায়লা ইয়েসুগো বসে।

তাদের সবার মুখ মলিন। মুখে উদ্বেগের ছাপ।

‘উনি জরুরী প্রয়োজনে হঠাৎ যদি কোথাও যেয়ে থাকেন, তাহলে এতক্ষণ কি আসবেন না?’ চিন্তান্বিত কণ্ঠে বলল লায়লা ইয়েসুগো।

‘কিন্তু তার নিজস্ব প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে তিনি যাবেন কোন কিছু না বলে, তা আমি মনে করতে পারছি না।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘আমারও তাই মনে হয়।’ বলল ইয়েকিনি।

‘তাহলে তিনি কি কোন শত্রুর কবলে পড়েছেন?’ তাঁর তো শত্রু চারদিকেই।’ বলল লায়লা।

‘তা হতে পারে। কিন্তু গাড়ি? শত্রু তাকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু গাড়ি কোথায় গেল?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘হয়তো শত্রু আগে থেকেই ফলো করছিল। সে গাড়িও দেখেছিল।’ বলল লায়লা।

‘কিন্তু এটা কি সম্ভব যে, আহমদ মুসার মত মানুষকে ঐ কক্ষ থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে ধরে এনে গাড়িতে তুলে হাইজ্যাক করে নিয়ে যাবে?’ বলল রাশিদি ইয়োসুগো।

‘সম্ভব নয়, কিন্তু সমস্যার সমাধান কি ভাইয়া? বলল লায়লা।

রাশিদি ইয়োসুগো কোন জবাব দিল না।

কথা বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি। বলল, ‘আমি আহমদ মুসাকে যতটুকু চিনেছি, তাতে আমার মনে হয়, তিনি স্বেচ্ছায় কোথাও গিয়েছেন। এবং আমাদের জানিয়ে যাবার তাঁর সময় ছিল না।’

‘স্বেচ্ছায় কোথায় যাবেন, ‘আপনার অনুমান কি?’ বলল লায়লা ইয়েসুগো।

‘অনুমান করা মুষ্কিল। তবে আমার মনে হয় তিনি কিছু দেখে বা কিছু শুনে তার পিছু ছুটছেন। বলে যাবার মত সময় তাঁর ছিল না।’ বলল ইয়েকিনি।

‘সেই কিছু’টা কি হতে পারে?’ লায়লা বলল।

‘ওমর বায়ার কথা হতে পারে। ডঃ ডিফরজিসের কোন তথ্য হতে পারে।’ বলল ইয়েকিনি।

‘হতে পারে। কিন্তু তবু প্রশ্ন জাগে তিনি যদি স্বেচ্ছায় গিয়ে থাকেন, তাহলে খবর জানিয়ে যাবার মত দুই মিনিট সময় পাবেন না কেন?’ লায়লা বলল।

‘লায়লা, আমাদের রুটিনে বাধা শান্তির জীবন দিয়ে আহমদ মুসার জীবনকে বিচার করছ বলেই এমন প্রশ্ন জাগছে। আসলে প্রয়োজন নামের চাবুক একজন বিপ্লবীকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তার কাছে অন্যসব বিবেচনাই গৌণ হয়ে যায়।’

দরজায় এসে দাঁড়াল গার্ডদের একজন। তার চোখে-মুখে আনন্দের স্ফুরণ। বলল, ‘বড় সাহেব এসেছেন।’

‘মেহমান বড় সাহেব।’

বাড়ির আর সবাই আহমদ মুসাকে বড় সাহেব বলে ডাকে। কেউ তাদেরকে একথা বলে দেয়নি। তারা সম্ভবত সবার কাছে আহমদ মুসার সম্মান ও প্রতিপত্তি দেখেই তাকে বড় সাহেব নাম দিয়েছে।

‘কি বলছিস? আমাদের মেহমান? কোথায় তিনি?’

‘বাইরে দাঁড়িয়ে।’

‘বাইরে কেন?’

‘সাথে ইয়ামোটা একজন লোক এবং তিনটি কুকুর।

‘সাথে একজন লোক এবং তিনটি কুকুর!’

রাশিদি সবার আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। রাশিদি চলতে শুরু করে দিয়েছিল। এই সময় ঘরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।

রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে।

‘টেনশনে আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি। কি ঘটনা ঘটেছিল? আপনি ভাল আছেন তো?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘হঠাৎ করেই ‘ওকুয়া’র দু’জন লোককে চিনে ফেলি।’ তারা চলে যাচ্ছিল। ওদের ঘাটির ঠিকানা জানার উদ্দেশ্যে ওদের ফলো করেছিলাম। তোমাদের জানানোর সুযোগ হয়নি। দুঃখিত।’

‘দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জা দেবেন না। আমাদের কোনই কষ্ট হয়নি। আমরা উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম আপনাকে নিয়ে।’

কথা শেষ করেই রাশিদি ইয়োসুগো আহমদ মুসাকে সোফার দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘তার পর কি হলো বলুন।’

আহমদ মুসা রাশিদি ইয়োসুগোকে বাধা দিয়ে সোফার দিকে না এগিয়ে বলল, ‘আমি ওদের হাতে আটকা পড়েছিলাম। সব বলছি। কিন্তু তার আগে চারজন মেহমানের ব্যবস্থা করতে হবে।’

‘সব ব্যবস্থা করছি। কিন্তু চারজন কোথায়? শুনলাম তো একজন!’ বলল রাশিদি।

‘একজন মানুষ আছে এবং তিনটি কুকুর।’ বলল আহমদ মুসা।

লাললাসহ সবাই হেসে উঠল আহমদ মুসার কথা বলার ভংগিতে।

আহমদ মুসা, ইয়োসুগো, ইয়েকিনি বাইরে গেল। ব্ল্যাক বুল ও কুকুরগুলোকে ভেতরে নিয়ে এল। তাদের সব ব্যবস্থা করে দিয়ে ঘ্টা খানেক পর আহমদ মুসা, রাশিদি ইয়োসুগো এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ড্রইং রুমে আবার ফিরে এল।

ইতিমধ্যেই ব্ল্যাক বুলকে নিয়ে নাস্তার কাজও তারা সেরেছে।

আহমদ মুসা সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘ওকুয়া’র লোকদের পিছু নেবার পর যা যা ঘটেছে সব তো তোমাদের শোনা হয়ে গেছে। ওকুয়া’র কোন ঘাটির সন্ধান পাইনি বটে, তবে ব্ল্যাক বুলকে উদ্ধার করেছি। তার সাথে হারিয়ে যাওয়া থেকে একটা ইতিহাসকে উদ্ধার করেছি।’

‘ইতিহাস উদ্ধার করেছেন? সেটা কি?’ বলল রাশেদি ইয়েসুগো।

‘ব্ল্যাক বুল সম্পর্কে তোমরা যেটুকু জেনেছ, তা তার পরিচয়ের সবটুকু নয়। যে ইতিহাসের কথা বলছি, ব্ল্যাক বুল সে ইতিহাসের অংশ।’ বলল আহমদ মুসা।

‘তার পরিচয় কি?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘শুনলে বিস্মিত হবে ‘ওকুয়া’র কশাই ব্ল্যাক বুলের দেহে মুসলিম রাজরক্ত রয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।

‘মুসলিম রাজরক্ত?’ সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল রাশিদি ইয়োসুগো।

‘হ্যাঁ মুসলিম রাজরক্ত।’

একটু থামলো আহমদ মুসা। তারপর বলল আবার, ‘মারুয়া’ খিলাফতের কথা জান রাশিদি?’

‘হ্যাঁ, জানি, মানে শুনেছি। কিন্তু এ প্রশ্ন কেন? আমাদের ইয়েসুগো পরিবারেরই এ ব্রাঞ্চ ‘রাশিদি পরিবার’ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে আমাদের গারুয়া সালতানাত দ্বিখন্ডিত করে, মারুয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘মারুয়া খিলাফত তোমাদের বংশেরই?’ আহমদ মুসার কণ্ঠে বিস্ময়।

‘হ্যাঁ। তবে তাদের সাথে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক প্রথম দিকে ভাল ছিল না। কিন্তু পরে ভাল হয়। শেষে আবার খারাপ হয়ে যায়। এখন বলুন মারুয়া খিলাফতের কথা কি বলছিলেন?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘যায়দ রাশিদিকে চেন?’

‘মারুয়া খিলাফতের?’

‘হ্যাঁ।’

‘চিনি। রাশিদি পরিবারের সবচেয়ে ভাল মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে আবেগ প্রবণ। তার কাহিনী বড় করুণ।’

‘ব্ল্যাক বুল তার মেয়ের একমাত্র নাতি।’

‘কি বলছেন আপনি। ব্ল্যাক বুল যায়দ রাশিদীর মেয়ের নাতি!’ বিস্ময়ে সোজা হয়ে উঠল ইয়োসুগো।

‘হ্যাঁ। তাঁর একমাত্র ছেলে কিশোর বয়সে এই ইয়াউন্ডিতে এসেই মারা যায়। অবশিষ্ট থাকে একটি মাত্র মেয়ে আয়োশা। আয়েশার নাতি ব্ল্যাক বুল। বড় করুণ কাহিনী যায়দ রাশিদীর এবং তার পরিবারের।’

‘তিনি ভাইয়ের উপর অভিমান করে সিংহাসন ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর কোন খবর আর পাওয়া যায়নি। এটুকুই আমরা শুনেছি।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘তার পরের কাহিনী শুন।’ বলে আহমদ মুসা ব্ল্যাক বুলের কাছ থকে শোনা এবং ডাইরী থেকে পড়া কাহিনী বর্ণনা করল।

অদম্য আবেগ আর বিস্ময় নিয়ে রাশিদি ইয়োসুগো এবং ইয়েকিনি এই কাহিনী শুনল। লায়লাও এসে হাজির হয়েছিল। সেও শুনল।

কাহিনী শেষ হলো আহমদ মুসার।

কিন্তু রাশিদি ইয়োসুগো এবং লায়লা কারও মুখেই কোন কথা নেই। বেদনা এবং বিস্ময়ে তারা যেন পাথর হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘চলুন ভাইয়া ব্ল্যাক বুলের কাছে’ -বলে সে চলতে শুরু করল। বলল, ‘আল্লাহর হাজার শোকর যে, মরহুম যায়দ রাশিদির উত্তরসূরীকে তিনি আমার ঘরে এনেছেন। মারুয়ার রাজপরিবার এবং আমাদের পরিবার কত যে খুঁজেছে যায়দ রাশিদিকে। কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি। অথচ এত কাছে তারা ছিলেন। বিপর্যয়ের এত সাইক্লোন তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে।’ বলতে বলতে ইয়েসুগোর গলা আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেল।

আহমদ মুসা এবং ইয়েকিনিও উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। তারাও চলতে শুরু করেছে ইয়েসুগোর পিছু পিছু।

লায়লা উঠে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আবার সে বসে পড়ল সোফায়। চোখের প্রান্ত পর্যন্ত নামিয়ে দেয়া মাথার চাদর সরিয়ে নিয়ে শিথিল বসনা হয়ে একটু গা এলিয়ে বসল সে সোফায়।

ড্রইং রুমের দরজা পেরুবার আগে ইয়েকিনি একবার পেছন ফিরে চাইল। হয়তো বিনা কারণেই। তার চোখ গিয়ে পড়ল লায়লার উপর।

লায়লা তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে কাপড় ঠিক করে মাথার চাদর আবার টেনে নিল। মুখে ফুটে উঠল তার লজ্জা রাঙা একটা কৃত্রিম ক্রোধ। ডান হাতের মুষ্টি উঠিয়ে শাসন করল সে ইয়োকিনিকে।

ইয়েকিনি সলজ্জ মিষ্টি হেসে জোড় হাতে মাফ চাওয়ার ভংগি করে ঘুরে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার পিছু পিছু চলা শুরু করলো।

ইয়েকিনির চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল লায়লা। হারিয়ে গেল তার মন ইয়েকিনির মধ্যে। অন্তরে একটা অস্বস্তিও জেগে উঠল। এমন করে ভাবা কি পাপ? আবার সে ভাবল, ইয়েকিনিকে নিয়ে সে ভাবে, তাকে জীবন সংগী হিসেবে পেতে চায় বটে। কিন্তু কোন সীমা লংঘন তো সে করেনি।

আবার সোফায় গা এলিয়ে দিল লায়লা ইয়েসুগো।

‘চীফ জাস্টিস উসাম বাইক তাহলে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে?’ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘তাই তো প্রমাণ হচ্ছে, হাইকোর্টের রেজিস্টার রুম থেকেই টিকটিকি পিছু নিয়েছে আমাদের লোকদের। ওমর বায়ার কেসের ব্যাপার নিয়ে আমাদের লোকরা যাবে, এটা চীফ জাস্টিসই জানতেন। তিনি গোপনে লোক লাগিয়ে আমাদের ঠিকানা যোগাড় করে ডঃ ডিফরজিসকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন।’ বলল পিয়েরে পল।

‘এটা পরিস্কার। চীফ জাস্টিস একটা শয়তান। এখন কি করা যায় বলুন তো?’

‘আগে চলুন টিকটিকির কাছে আরও কি জানা যায় দেখা যাক। তারপর ওটার ব্যবস্থা করে চীফ জাস্টিসের কেস হাতে নেয়া যাবে।’

ফ্রান্সিস বাইক ওয়াকিটকি তুলে নিল হাতে।

নির্দিষ্ট চ্যানেলে রজারের সাথে যোগাযোগ করল ফ্রান্সিস বাইক। কিন্তু রজারের কাছ থেকে কোন সাড়া পেল না। বার বার চেষ্টা করল। না উত্তর নেই।

‘কি ব্যাপার রজাররা কোন জবাব দিচ্ছে না যে?’

‘হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে কিংবা টয়লেটে গেছে।’

‘না, টয়লেটে গেলে ওয়াকিটকি সাথে নেবার কথা।’

‘তাহলে ঘুমিয়েছে নিশ্চয়।’

‘ফ্রান্সিস বাইক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, না এই বেলা দশটায় কোন সময়ই ঘুমানোর কথা আমাদের অভিধানে নেই।’

একটু থামল ফ্রান্সিস বাইক। তারপর বলল, ‘ওদের সাথে সর্বশেষ কখন আপনার যোগাযোগ হয়েছে?’

‘আমি ওদের সাথে যোগাযোগ করিনি। ওরাই গতকাল মধ্যাহ্নের পর যোগাযোগ করে। কথা হয় টিকটিকিকে ওরা বন্দী করে রাখবে। আপনি সকালে এলে খোজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা করা হবে। তারপর ওরা কিংবা কেউ আর যোগাযোগ করেনি।’

‘কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। এই দীর্ঘ সময়ে ওরা যোগাযোগ করবে না, এটা বিস্ময়কর। চলুন দেখা যাক।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

ফ্রান্সিস বাইক উঠে দাঁড়াল। তার সাথে পিয়েরে পলও উঠল। গাড়ি তাদের ছুটে চলল ‘ওকুয়া’র সেই জেলখানার উদ্দেশ্যে।

ব্ল্যাক বুলের বাড়ির সেই ভাঙা গেট দিয়ে প্রবেশ করেই ফ্রান্সিস বাইক বাড়িতে প্রবেশের মূল গেটটাকে খোলা দেখতে পেল। চমকে উঠল ফ্রান্সিস বাইক।

গোটা বাড়ি ওরা খুঁজল। শেষে আন্ডার গ্রাউন্ড কক্ষে গিয়ে চারজনের লাশ পেল।।

‘টিকটিকির হাতেই এরা খুন হয়েছে। এদের খুন করেই সে পালিয়েছে।’ বলল পিয়েরে পল।

‘কিন্তু কি করে এটা সম্ভব হলো? ব্ল্যাক বুল কোথায় গেল?’ ফ্রান্সিস বাইক বলল।

‘আমার মনে হয় টিকটিকির শক্তির ওরা অবমূল্যায়ন করেছিল। তারই সুযোগ গ্রহণ করেছিল টিকটিকি। আর ব্ল্যাক বুলকে আমার মনে হয় ওরা ধরে নিয়ে গেছে, কথা বের করার জন্যে।’

‘চীফ জাস্টিস জঘন্যভাবে বিশ্বাস ভংগ করেছে মিঃ পল।’

‘অবশ্যই। তাকে শিক্ষা দিতে হবে এবং এখনই।’

দু’জনে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে।

গাড়িতে উঠতে উঠতে ফ্রান্সিস বাইক বলল, ‘কি করা যায় এখন?’

‘আপনার সাহসী লোকজন কেমন আছে?’

‘সব কাজ করার মত লোক আমাদের আছে।’

‘তাহলে এই মুহূর্তেই চলুন, আপনার লোকদের নির্দেশ দিন চীফ জাস্টিসের পরিবারের একান্ত আপনজন কাউকে কিডন্যাপ করতে হবে এবং আজই করতে হবে।’

ফ্রান্সিস বাইকের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ঠিক আছে মিঃ পল। তার টিকটিকি লেলিয়ে দেবার উপযুক্ত জবাব এটাই। কিন্তু চীফ জাস্টিসকে কিডন্যাপ করি না কেন? তাকে দেখিয়ে দেয়া যেত বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি?’

‘আমাদের লক্ষ্য তাকে শাস্তি দেয়া এবং সেই সাথে কাজও উদ্ধার। চীফ জাস্টিসকে কিডন্যাপ করলে তো আমাদের কাজ উদ্ধার হবে না, শাস্তি হয়তো পাবে। আর তার মেয়েকে কিডন্যাপ করলে তাকে শাস্তিও দেয়া যাবে, কাজও করিয়ে নেয়া যাবে।’

ওরা পৌছল ‘ওকুয়া’র অফিসে।

ফ্রান্সিস বাইকের বিশাল টেবিলের পাশে ওরা বসল দু’জন।

টেলিফোনে প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে এবং নির্দেশাবলী দিয়ে পিয়েরে পলের দিকে ঘুরে বসে বলল, ‘সব ঠিক-ঠাক মিঃ পল। এখনই ওরা কাজ শুরু করবে।’

‘কি কাজ শুরু করবে?’

‘কেন, চীফ জাস্টিসের পরিবারের ডসিয়ার আমাদের কাছে আছে। প্রতি ‘উইক এন্ড’-এ (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) চীফ জাস্টিস তার মেয়েকে নিয়ে ইন্ডিপেনডেন্স পার্কে গিয়ে দু’ঘন্টা সময় কাটান। ঠিক দশটায় যান, বারটায় চলে আসেন। তাদের সাথে থাকে মাত্র একজন আরদালি।’

পিয়েরে পল খুশী হয়ে উঠল। বলল, ‘ধন্যবাদ ফ্রান্সিস বাইক। চমৎকার সুযোগ। আপনাদের পরিকল্পনা কি?’

‘ঠিক বারোটায় ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের গেটে ওরা যখন গাড়িতে উঠতে যাবে, ঠিক সেই সময় কিডন্যাপ করা হবে চীফ জাস্টিসের মেয়েকে।’

‘গেটে পুলিশ থাকে না?’

‘দু’জন পুলিশ থাকে। তার মধ্যে একজন ট্রাফিক পুলিশ। ওদের আগেই ম্যানেজ করা হবে।’

‘ওয়ান্ডারফুল।’ বলে ঘড়ির দিকে তাকাল পিয়েরে পল। বলল, ‘এখন এগারটা। তাহলে সুখবরের জন্যে আমাদের আরও সোয়া ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।’

‘হ্যাঁ। যিশু আমাদের সহায় হোন।’ বলে ফ্রান্সিস বাইক তার ইন্টারকমের দিকে মুখ ঘুরাল। বলল, ‘দেখি ওরা বেরোল কিনা।’

‘আজই এমনটা ঘটবে বলে আশংকা করছেন ভাইয়া?’ বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।

‘আমি ওদের কথা শুনে যতটা বুঝেছি, তাতে আজ সকালে ফ্রান্সিস বাইক কোথাও থেকে ফিরে আসবে। তারপরই ওরা আমার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিত। কিন্তু আজ সকালে যখন ওরা দেখবে, আমি নেই, তার সাথে ওদের চারজন নিহত এবং ব্ল্যাক বুলকে আমরা ধরে নিয়ে এসেছি, তখন ওরা ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে যাবে।’

ব্ল্যাক বুল ওরফে ‘আবদুলল্লাহ রাশিদি’কে আমরা ধরে নিয়ে এসেছি বুঝবে কি করে ওরা?’

ব্ল্যাক বুল-এর পিতৃদত্ত নাম ছিল ‘জর্জ রাশেদি’। ‘ওকুয়া’র কসাই পদ পাওয়ার পর ওরা তার নামকরণ করা হয় ব্ল্যাক বুল। আহমদ মুসা তার ‘জর্জ’ নাম পাল্টিয়ে করেছে আবদুল্লাহ। তার সাথে ‘রাশিদি’ মিলে হয়েছে ‘আবদুল্লাহ রাশেদি’। ব্ল্যাক বুল নামটি সানন্দে গ্রহণ করে বলেছে, ‘আমি খৃষ্টানও ছিলাম না, মুসলিমও ছিলাম না। কিন্তু গৌরব বোধ করতাম আমাদের দাদীর জন্যে। তার ধর্ম ইসলাম আমার কাছে আপন বলে মনে হতো।’ ব্ল্যাক বুল মহা খুশী হয়েছে রাশিদি ইয়েসুগোর পরিচয় পেয়ে। তার এখন মনে হচ্ছে সে নতুন মানুষ। সে সব ফিরে পেয়েছে- তার ধর্ম, তার পরিবার- সবকিছু। তার সাথে তার মনে হয়েছে ‘ওকুয়া’র মত খৃষ্টান সংগঠন তার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তার দাদীর আব্বা যায়দ রাশিদির হত্যা প্রতিশোধ নেবার দায়িত্ব এসে বর্তেছে তার উপর।

আহমদ মুসা বলল, ‘ওরা নিশ্চিত, আবদুল্লাহ রাশিদি পালাতে পারে না। ওকে না পাওয়ার অর্থই আমরা তাকে ধরে এনেছি।’

‘ওরা যে ক্ষেপা কুকুর হবেই। ওরা প্রতিশোধ নেবে বললেন। কি প্রতিশোধ নিতে পারে?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘ওদের যতটা চিনেছি, তাতে চীফ জাস্টিসের পরিবারের কাউকে কিডন্যাপের চিন্তাই প্রথমে করবে।’

‘কিডন্যাপ? চীফ জাস্টিসকে? তাহলে তো সাংঘাতিক হবে।’

‘না চীফ জাস্টিসকে কিডন্যাপ করলে তাদের আসল উদ্দেশ্যই ভন্ডুল হয়ে যাবে। ওমর বায়ার সম্পত্তি হস্তান্তর তাহলে কাকে দিয়ে করাবে?’

‘তাহলে?’

‘আমার মনে হয় চীফ জাস্টিসের সবচেয়ে প্রিয় কাউকেই তারা কিডন্যাপের চেষ্টা করবে।’

বৈঠক খানায় তাদের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছিল লায়লা। সে বলল, ‘ভাইয়া আমি রোসেলিন-এর কাছে শুনেছি তাকে তার আব্বা একা চলা ফেরা করতে নিষেধ করেছে। রোসেলিন এখন একা চলাফেরা করেনা।’

‘ঠিক, রোসেলিন আমাকেও এ ধরনের কথা বলেছে। বলতে ভুলে গেছি আহমদ মুসা ভাইকে।’ বলল রাশিদি।

‘রোসেলিন কে?’

‘চীফ জাস্টিসের মেয়ে এবং ভাইয়ার….।’

লায়লা কথা শেষ করতে পারলনা। রাশিদি ইয়েসুগো তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল। বলল, ‘ওসব কথার সময় বুঝি এটা!’

আহমদ মুসার ঠোটে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘লায়লা অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলেনি। সে রোসেলিনের পরিচয় সম্পূর্ন করতে চেয়েছিল মাত্র।’

থামল আহমদ মুসা। মুখটা তার গম্ভীর হয়ে উঠল। শুরু করল আবার, ‘তাহলে বুঝা যাচ্ছে চীফ জাস্টিস আগেই সন্দেহ করেছেন।’

‘নিশ্চয় ব্ল্যাক ক্রস ও ওকুয়া তাকে ভয় দেখিয়েছে এবং তিনি মেয়ে রোসেলিনের নিরাপত্তা সম্পর্কেই উদ্বিগ্ন ছিলেন বেশী।’

‘আমারও মনে হচ্ছে, চীফ জাস্টিসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থান তার মেয়ে। সুতরাং ওকুয়া ও ব্ল্যাক ক্রস চীফ জাস্টিসকে শাস্তি দেবে এবং তাকে বাগে আনার জন্য রোসেলিনের গায়েই হাত দিবে।’

রাশিদি ইয়েসুগোর চোখে-মুখে নেমে এল উদ্বেগ। বলল, ‘ওরা যা করবে, দ্রুতই করবে মনে হয়।’

‘অবশ্যই। কিন্তু আমি জানি না কোন সুযোগ তারা নেবে কিংবা কোন পথে তারা এগুবে। আমাদের এটা একটা সুযোগ। আমরা চীফ জাস্টিসের বাড়ী এবং বাড়ির সদস্যদের উপর নজর রাখি, তাহলে ওকুয়া এবং ব্ল্যাক ক্রস-এর লোকদের সাক্ষাত আমরা পেতে পারি এবং তাদের মাধ্যমে আমরা পৌছাতে পারি তাদের ঘাটিতে।’

‘তাহলে এখনি আমাদের কিছু করার দরকার। আমরা যেতে পারি চীফ জাস্টিসের বাসার দিকে। নজর রাখতে পারি তাদের বাড়ির উপর।’ বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।

‘হ্যা, আমরা যেতে পারি। চেন তুমি তাদের বাসা?’

‘চিনি।’

‘তাহলে উঠ, চল যাই।’

আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘রাশিদিকে সাথে নিচ্ছিনা।’

‘কেন?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো। ‘তোমাকে ওদের কেউ কেউ চিনে। তোমাকে ঘুর ঘুর করতে দেখলে, তার অন্য অর্থ হতে পারে।’

রাশিদি কিছু বলল না। তার মুখটা মলিন হয়ে গেল।

লয়লা মুখ টিপে হাসল। বলল, ‘বড়ই দুঃখের কথা। রাজপুত্র যেতে পারবে না রাজকন্যাকে রক্ষার অভিযানে।’ বলেই লায়লা এক দৌড়ে পালিয়ে গেল ড্রইং রুম থেকে।

লজ্জায় রাশিদি ইয়েসুগোর মুখ লাল হয়ে উঠল। মুখ নিচু করে বলল, ‘লায়লাটা বড় দুষ্টু হয়ে গেছে ভাইয়া।’

‘ও কিছু না, একটু আনন্দ করছে।’

‘না, ওকে বিদায় করতে হবে।’

‘বিদায় করবে? কোথায়?’

‘এটা ইয়েকিনি জানে।’

ইয়েকিনির মুখে বিব্রত ভাব আর ঠোঁটে সলজ্জ হাসি ফুটে উঠল। মুখ নিচু করল। কিছু বলল না।

আহমদ মুসা ইয়েকিনির পিঠ চাপড়ে হেসে বলল, ‘মুহাম্মাদ ইয়েকিনি খুব ভাল ছেলে। তোমার বিপদে সে না দেখে পারেনা।’

কথা শেষ করেই ইয়েকিনিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘চল ইয়েকিনি।’

‘চলুন।’ বলল ইয়েকিনি।

দু ‘জন বেরিয়ে এল।

রাশিদি ইয়েসুগোর গাড়ি প্রস্তুত ছিল। ড্রাইভিং সিটে বসল আহমদ মুসা। মুহাম্মাদ ইয়েকিনি তার পাশের সিটে।

‘পথ বলে দিও। সংক্ষিপ্ত পথে যাব।’

‘সংক্ষিপ্ত পথটায় খুব বেশী ট্রাফিক পয়েন্ট আছে। আর সময়টাও খুব জ্যাম-এর সময়। তার চেয়ে আমরা যদি ইয়াউন্ডি নদী তীরের হাইওয়ে ধরে ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের পাশ দিয়ে যাই, তাহলে পথ একটু লম্বা হবে কিন্তু ট্রাফিক ও জ্যামের হাত থেকে বাঁচব। পৌছতেও পারব আমরা অনেক আগে।’

‘এটাইতো চাই।’ বলে আহমদ মুসা গাড়িতে স্টার্ট দিল।

ছুটে চলল গাড়ি।

ইয়াউন্ডি নদীর তীর ঘেঁষে পরিকল্পিতভাবে লাগানো গাছের সারি। তার পাশ দিয়ে প্রশস্ত হাইওয়ে। হাইওয়ের অন্য পাশ দিয়েও সারিবদ্ধ গাছের লাইন।

‘চমৎকার রাস্তা ইয়েকিনি।’

‘একে ট্যুরিস্ট রোড বলে ভাইয়া।’

‘সার্থক নাম।’

‘নদীর ধার দিয়ে ১৫ মাইল রাস্তা এইভাবে গেছে। মাঝখানে রয়েছে ইন্ডিপেনডেন্স পার্ক।’

‘ইন্ডিপেনডেন্স পার্ক আর কতদূর?’

‘প্রায় এসে গেছি।’

ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের কাছে এসে হাইওয়েটি বেঁকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের তিন প্রান্ত ঘুরে আবার নদীর তীর ঘেঁষে সামনে এগিয়ে গেছে।

আহমদ মুসার গাড়ি ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের প্রান্ত দিয়ে এগিয়ে চলেছে।

ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের প্রধান গেটের পাশ দিয়েই এগিয়ে গেছে হাইওয়েটি।

ইন্ডিপেনডেন্স পার্কের প্রধান গেট অতিক্রম করছে আহমদ মুসার গাড়ি।

নারী কণ্ঠের একটা চিৎকার শুনতে পেল আহমদ মুসা গেটের দিক থেকে।

একটা হার্ড ব্রেক কষল আহমদ মুসা।

ইয়েকিনি গাড়ির ড্যাশ বোর্ডের উপর মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। তার দু’টি হাতের প্রানান্ত প্রচেষ্টা তাকে রক্ষা করেছে।

আহমদ মুসা তাকিয়েছে চিৎকার লক্ষ্য করে। দেখল, দু’জন লোক একজন তরুণীকে টেনে পাশে দাঁড়ানো গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর একজন ষ্টেনগান ধরে আছে মূর্তির মত দাঁড়ানো দু’জন লোকের দিকে। লোক দু’টির পরণে পুলিশের পোষাক। মাথায় হ্যাট। কপাল ঢেকে গেছে হ্যাটে। আর একজন লোককে দেখা গেল গাড়িটির ড্রাইভিং সিটে, যে গাড়িটির দিকে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমেছে এই সময় একটা গুলীর শব্দ হলো।

গুলীর শব্দ লক্ষ্যে তাকিয়েছিল আহমদ মুসা। দেখল, হ্যাট পরা পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক দু’জনের পেছনে একটু দূরে দাঁড়ানো একটি মেয়ে গুলী করেছে। মেয়েটার গায়ে-মাথায় ওড়না।

মেয়েটি গুলী করেছে ষ্টেনগানধারীকে। ষ্টেনগানধারী গুলী খেয়ে পড়ে গেছে। ছিটকে পড়েছে তার হাত থেকে ষ্টেনগান।

গুলীর শব্দ শুনেই যে দু’জন লোক তরুণীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তাদের একজন মেয়েটিকে টেনে নিয়ে ঢাল হিসেবে সামনে ধরে বিদ্যুত গতিতে ঘুরে দাড়ালো। তার হাতে রিভলবার। সে রিভলবার তুলল রিভলবারধারী মেয়েটিকে লক্ষ্য করে। মেয়েটির হাতে উদ্যত রিভলবার। কিন্তু তার গুলী করার পথ বন্ধ। কারণ গুলী করলে সে গুলি সামনে ধরে রাখা তরুনীটির বুক এফোঁড় ওফোঁড় করবে।

রিভলবাধারী মেয়েটিকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠেছিল আহমদ মুসা। একি সম্ভব। কিন্তু চিন্তার তার সময় ছিল না। লোকটি ট্রিগার টিপছে।

আহমদ মুসার হাতে রিভলবার উঠে এসেছিল আগেই। উদ্যত ছিল তার রিভলবার। খুব সাবধানে বিপজ্জনক গুলীটা করল আহমদ মুসা।

পর পর দু’টি গুলী বের হলো আহমদ মুসার রিভলবার থেকে।

প্রথম গুলীটা গিয়ে বিদ্ধ করল রিভলবারধারী লোকটির ঠিক কানের উপর। কিন্তু তার সাথে সাথেই লোকটির রিভলবারও গর্জন করে উঠেছিল। শেষ মূহূর্তে তার হাতটি কেঁপে গিয়েছিল। তার কাঁপা হাতের গুলী কিছুটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বিদ্ধ হলো রিভলবারধারী মেয়েটির বাম বাজুতে।

আর আহমদ মুসার দ্বিতীয় গুলীটা গিয়ে বিদ্ধ করেছিল যে লোকটি তরুণীটিকে ধরে গাড়ীতে উঠাচ্ছিল তার পৃষ্ঠদেশকে।

গুলী বিদ্ধ দু’জনই সামান্য টলে উঠে মাটিতে আছড়ে পড়েছিল।

ওড়না পরা গুলীবিদ্ধ মেয়েটি আর্ত চিৎকার করে ডান হাতে বাম বাজুটি চেপে ধরে বসে পড়েছিল।

আহমদ মুসা ছুটে গিয়েছিল মেয়েটির দিকে। মেয়েটির মাথা থেকে উড়না সরে গিয়েছিল।

মেয়েটি যে সত্যিই ডোনা, তা এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা নিয়ে হাজির হলো আহমদ মুসার কাছে।

আহমদ মুসার হাতে তখনও রিভলবার।

আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে হাটু গেড়ে বসল ডোনার সামনে। বলল, ‘কি দেখছি আমি! ডোনা তুমি! কোথায় লেগেছে?’

‘গুলী গুলী’ বলে চিৎকার করে উঠল ডোনা। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল হাইজাক কারীদের গাড়ির দিকে।

তার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে আহমদ মুসা দেখল, হাইজাকারদের গাড়ী থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসেছে। তার হাতের রিভলবারটি উঠে এসেছে তাদের লক্ষ্যে।

আহমদ মুসা মাথা না ঘুরিয়ে সেই অবস্থাতেই বাম হাতে ডোনাকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটি গুলী ছুটে গেল তাদের উপর দিয়ে।

আহমদ মুসার ডান হাতে রিভলবার ধরাই ছিল। সে শুয়ে পড়েই গুলী চালাল সেই রিভলবারধারী লোকটিকে লক্ষ্য করে। অব্যর্থ লক্ষ্য। লোকটি দ্বিতীয় বার লক্ষ্য ঠিক করার আগেই গুলী বিদ্ধ হয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ল গাড়ির উপরে।

ডোনা ছিটকে এসে পড়েছিল আহমদ মুসার বাম কাঁধের উপর।

পড়ে থাকা অবস্থাতেই ডোনা মুখ ঘুরিয়ে ছিল। তার মুখটা এসে পড়েছিল আহমদ মুসার কানের কাছে। ডোনা বলল, ‘তুমি কি আহত? তোমার কিছু হয়নি তো?’

আহমদ মুসা সে কথার কোন জবাব না দিয়ে ডোনাকে নিয়েই উঠে বসল।

ডোনার শরীরের বাম দিকটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।

আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি ডোনার গাউন এর হাতাটা ছিড়ে ফেলে ডোনার ওড়নাতেই গজের মত বানিয়ে তাঁর বাম বাজুটা বাঁধতে লাগল। ইতিমধ্যে সেই তরুণী এবং হ্যাটধারী দুই ভদ্রলোক ও মুহাম্মাদ ইয়েকিনী, তাদের চারদিকে এসে দাঁড়াল।

তরুণীটি রোসেলিন, হ্যাটধারীদের একজন চিফ জাস্টিস উসাম বাইক, অন্যজন ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি।

ডোনার আব্বা রাজ্যের আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, ‘বাবা তুমি! ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’

আহমদ মুসা ডোনার হাত বাঁধতে বাঁধতে বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে আমি এখনও স্বপ্ন দেখছি। আপনারা আসবেন তা কল্পনাতেও ভাবিনি।’

রোসেলিন বসে পড়ে ডোনাকে জড়িয়ে ধরেছে। আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে আর্তস্বরে বলল, ‘খুব সিরিয়াস কি?’

আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে রোসেলিনের দিকে মুখ তুলল। বলল, ‘খুব ব্লিডিং হচ্ছে। ওকে তাড়াতাড়ি ক্লিনিকে নেয়া দরকার।’

রোসেলিন তাদের আবদালির দিকে মুখ তুলে বলল, ‘গাড়ী রেডি?’

‘হ্যাঁ ম্যাডাম।’ বলল আবদালি।

বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। আহমদ মুসা ইয়েকিনির দিকে মুখ তুলে বলল, ‘মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ওদের সকলের পকেট এবং গাড়ী খুঁজে দেখ কোন প্রকার কাগজ পাও কিনা।’

ছুটল ইয়েকিনি।

ইয়েকিনির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো রোসেলিন। এতক্ষণে সে খেয়াল করেছে তাকে। রাশিদি ইয়েসুগোর বন্ধু ইয়েকিনিকে সে চেনে।

আহমদ মুসা পাঁজাকোলা করে তুলে নিল ডোনাকে। চলল গাড়ির দিকে।

ডোনা মুখ গুঁজল আহমদ মুসার বুকে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

‘খুব কষ্ট হচ্ছে ডোনা।’ বলল আহমদ মুসা।

ডোনা চোখ বুজে ছিল। চোখ খুলল। বলল ফিসফিসিয়ে, ‘একটুও না। তোমাকে এমনভাবে পেলে আমি শতবার আহত হতে পারি।’ ডোনার চোখে অশ্রু আর ঠোঁটে একটা পরিতৃপ্তির হাসি।

গাড়ির কাছে এসে গিয়েছিল।

গাড়ির পেছনের সিটে ডোনাকে শুইয়ে দিল আহমদ মুসা। রোসেলিন আহমদ মুসাকে সাহায্য করল। সে আহমদ মুসার পাশে পাশেই ছিল। সে দেখেছে ডোনার কান্না, শুনতে পেয়েছে ডোনার কথা। রোসেলিন বিস্ময় ও কৌতুহল ভরা দৃষ্টি নিয়ে দেখছে আহমদ মুসাকে। তাঁর বিস্ময় আরও এ কারণে যে, আহমদ মুসা যেভাবে তিনজন অপহরণকারীকে, বিশেষ করে শেষ জনকে হত্যা করল, সেটা তাঁর কাছে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।

চিফ জাস্টিস ওসাম বাইক পুলিশের সাথে কথা বলে গাড়ির কাছে ছুটে এসেছিল। বলল রোসেলিনকে, ‘সামরিক হাসপাতাল তুমিতো চেন, ওখানে নিয়ে যেতে হবে। ওখানে নিরাপত্তাও পাওয়া যাবে।’

তারপর ঘুরল চিফ জাস্টিস আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘গাড়িতে পুলিশ দেব?’

‘না দরকার হবে না।’

‘ধন্যবাদ।’ বলে তার পাশে দাঁড়ানো ডোনার আব্বাকে বলল, ‘চলুন আমরা গাড়িতে উঠি।’ বলে সে হাটা শুরু করল।

ডোনার আব্বা আহমদ মুসার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘বাবা তুমি যাও ডোনার পাশে বস। তাকে দেখ। ওর কি খুব কষ্ট হচ্ছে?’

এতক্ষণে ডোনার আব্বার কণ্ঠ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

আহমদ মুসা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘মারাত্মক কিছু ঘটতে পারত, তা হয়নি। বাহুর একটি অংশ ছিড়ে নিয়ে গুলী বেরিয়ে গেছে মনে হচ্ছে। কোন চিন্তা করবেন না।’

বলে আহমদ মুসা ইয়েকিনীর দিকে তাকিয়ে উচ্চ কণ্ঠে বলল, ‘তুমি এস আমাদের সাথে। ওদের গাড়ির নম্বরটাও নিয়েছ তো?’

‘জি, নিয়েছি।’ বলল ইয়েকিনী।

মিশেল প্লাতিনি চলে গিয়েছিল চিফ জাস্টিস উসাম বাইক এর সাথে।

আহমদ মুসা গাড়িতে উঠে ডোনার মাথার কাছে বসল।

রোসেলিন নির্দেশ দিল ড্রাইভারকে গাড়ী ছাড়ার জন্য।

গাড়ির সিটের সাথে বামপাশটা ঠেস দিয়ে ঈষৎ কাত হয়ে শুয়ে আছে ডোনা। তার আহত বাম বাহুটাকে তার গায়ের উপর যেভাবে রেখেছিল, সেভাবেই আছে।

ডোনার আহত বাম হাতটি কাঁপছে।

মাথার চুল তার এলোমেলো হয়ে গেছে। কয়েক গুচ্ছ চুল গিয়ে পড়েছে কপাল পেরিয়ে মুখের উপর। চোখ দু’টি বোজা ডোনার। বোঝাই যাচ্ছে দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা হজম করার চেষ্টা করছে।

আহমদ মুসা ধীরে ধীরে ডোনার মুখ থেকে চুল সরিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে ডোনা?’

ডোনার ডান হাতটা ধীরে ধীরে উঠে এল। হাত রাখল আহমদ মুসার হাতে। চেপে ধরে থাকল অনেকক্ষণ। তারপর সে ধীরে ধীরে আহমদ মুসার হাত নামিয়ে আনল মুখের উপর। ডোনার অশ্রুর উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করল আহমদ মুসা তার হাতে।

ইচ্ছে করেই আহমদ মুসা তার হাত সরিয়ে নিল না। কাঁদছে ডোনা।

ডোনার চোখের পানিতে ভিজে গেল আহমদ মুসার হাত।

রোসেলিন বসে ছিল সামনের সিটে।

আহমদ মুসা একবার রোসেলিনের দিকে চাইল। কেউ না বললেও আহমদ মুসা বুঝছে মেয়েটি রোসেলিন। বলল, ‘মিস রোসেলিন, হাসপাতাল আর কত দূরে?’

‘আর অল্প।’ বলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার নাম রোসেলিন জানলেন কি করে?’

‘অনুমান করেছি।’

‘অনুমান করা নাম বলা সম্ভব নয়।’

‘আমি রাশিদী ইয়েসুগোর মেহমান। লায়লার কাছে এ নাম শুনেছি।’

ডোনা তার মুখ থেকে আহমদ মুসার হাত সরিয়ে নিল। অশ্রু ধোয়া চোখ আহমদ মুসার দিকে টেনে দুর্বল কণ্ঠে বলল, ‘তুমি লায়লাকে চেন? তুমি লায়লাদের ওখানে ছিলে? তাহলে ওরা কিছু বলেনি কেন?’

আহমদ মুসা বলল, ‘তুমি চেন লায়লাকে?’

‘খুব ভাল মেয়ে লায়লা। আমার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে।’

‘আপনার পরিচয় তো পেলাম না!’ আহমদ মুসাকে লক্ষ করে বলল রোসেলিন।

এ সময় গাড়ির গতি স্লো হয়ে এসে থেমে গেল। গাড়ী পৌঁছে গেছে হাসপাতালে।

গাড়ী থামতেই গাড়ী থেকে লাফ দিয়ে নামল রোসেলিন।

পেছনের দুটি গাড়ীও এসে দাড়িয়ে পড়েছিল।

চিফ জাস্টিসের গাড়ী থেকে তার আবদালী নেমেই ছুটল ইমার্জেন্সির ডিউটি রুমে। তার পেছনে পেছনে রোসেলিন।

কয়েক মুহূর্ত পরেই ডিউটিরত ডাক্তারও ছুটে এল।

চিফ জাস্টিস গাড়ী থেকে নেমেছে তখন।

ডাক্তার তাকে অভিবাদন করে বলল, ‘স্যার সব ব্যবস্থা করছি স্যার। আপনি দয়া করে ভেতরে বসুন।’

ডাক্তারের পেছন পেছনেই প্যাশেন্ট ট্রলি নিয়ে ছুটে এসেছিল চারজন।

আহমদ মুসা ডোনাকে গাড়ী থেকে নামিয়ে শুইয়ে দিল ট্রলিতে।

ট্রলি চলতে শুরু করতেই ডোনা আহমদ মুসার হাত চেপে ধরে বলল, ‘তুমি থাকবে আমার পাশে।’

‘চল আমরা সবাই থাকব। ভয় নেই ডোনা।’

ট্রলি ছুটে চলল। তার সাথে আহমদ মুসা, রোসেলিন এবং ডাক্তার। পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করল চিফ জাস্টিস ওসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনি।

মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ওদের বলেছিল, ‘স্যার আমি গাড়ির কাছে আছি।’

‘ঠিক আছে বাবা। এটা দরকার।’ বলেছিল চিফ জাস্টিস উসাম বাইক।

হাঁটতে হাঁটতে চিফ জাস্টিস মিশেল প্লাতিনির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না মিশেল প্লাতিনি। এই বিস্ময়কর ছেলেটা কে? এমন ক্ষিপ্র, এমন নিপুণ, এমন নির্ভীক মানুষ এবং এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা শুধু সিনেমাতেই দেখা যায়। মনে হচ্ছে ছেলেটার সাথে আপনারা ঘনিষ্ঠ?’

হাসি ফুটে উঠল মিশেল প্লাতিনির মুখে। বলল, ‘এই ছেলেটার কথাই তো আমি আপনাকে বলেছিলাম। এইতো সেই কিংবদন্তির আহমদ মুসা।’

থমকে দাঁড়াল চিফ জাস্টিস। বিস্ময়-বিমূঢ়তায় তার মুখ যেন শক্ত হয়ে উঠেছে।

দাঁড়াল মিশেল প্লাতিনিও। হেসে বলল, ‘কল্পনার আহমদ মুসা এবং বাস্তবের আহমদ মুসা মিলছেনা না?’

‘মিলছে। তবে চেহারায় এতটা সুশীল, সুন্দর হবে ভাবিনি। ধারণা ছিল, চোখের দৃষ্টি হবে তীক্ষ্ন, শরীর হবে শক্ত, পেটা এবং আচরণ হবে দারুণ ভারিক্কি ও রহস্যময়তায় ভরা।’

‘ঠিক বলেছেন। এই দিকগুলো বিচার করলে সে বিপ্লবীদের তালিকায় পড়ে না।’

‘আমি সৌভাগ্য বোধ করছি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ঈশ্বরের কাছে। হয়তো তার মত ব্যাক্তি এসে হাজির না হলে আমার মেয়েকে দুর্দান্ত দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করা যেত না।’

‘আমার মেয়েও চিরতরে হারিয়ে যেত। দুর্বৃত্তটি গুলী খাওয়ার মুহূর্তে গুলী করায় গুলী কিছুটা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়েছে। তা না হলে গুলীটা ঠিক বক্ষ ভেদ করতো। আল্লাহ ঠিক সময়েই সাহায্য পাঠিয়েছেন।’

হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে উঠল দু’জন।

ইমার্জেন্সী ওয়ার্ডের প্রশাসনিক অফিসার স্বাগত জানাল চীফ জাস্টিসকে। বলল, ‘স্যার প্যাশেন্টকে অপারেশন কক্ষে নেয়া হয়েছে। আসুন আপনারা বসুন।’

চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনি প্রবেশ করল বিশেষ ড্রইং রুমটিতে।

ডোনার জন্যে সামরিক হাসপাতালে বিশেষ কেবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ্যাটেনড্যান্টের বিছানাসহ সোফা-ফ্রিজে সুসজ্জিত রুম।

ডোনা তার বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। এ্যাটেনড্যান্টের বিছানায় হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে রোসেলিন। মিশেল প্লাতিনি সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে।

চীফ জাস্টিস উসাম বাইক টয়লেট থেকে বেরিয়ে এসে সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘আহমদ মুসা কোথায়?’

রোসেলিন ইতিমধ্যে আহমদ মুসার পরিচয় পেয়েছে। অপারেশনের আগে এক সুযোগে ডোনা আহমদ মুসার পরিচয় বলেছে রোসেলিনকে। খবরটা শুনে হঠাৎ শক পাওয়া রোগীর মত অনেকক্ষণ আহমদ মুসার সাথে স্বাভাবিকভাবে রোসেলিন কথা বলতে পারেনি। বিস্ময়ের ধাক্কা কাটার পর রোসেলিন গৌরব বোধ করেছে এই ভেবে যে, তাকে আজ বাঁচাবার মাধ্যমে এবং ইয়েসুগোর মেহমান হয়ে এই বিশ্ববিপ্লবী তাদের জীবনের সাথে মিশে গেছে।

পিতার প্রশ্নের জবাব রোসেলিন সংগে সংগেই দিল, ‘উনি মুহাম্মদ ইয়েকিনির খোঁজে বাইরে গেছেন।’

‘সাথের ঐ ছেলেটা কি মুহাম্মদ ইয়েকিনি? তুমি চেন তাকে?’ বলল রোসেলিনের আব্বা।

‘জি, আব্বা। ও তো রাশিদি ইয়েসুগোর বন্ধু।’

‘আহমদ মুসা রাশিদির মেহমান হলো কি করে?’

‘শুনিনি আব্বা।’

‘ঈশ্বরের অনেক দয়া যে, ওরা ঠিক সময়ে এসে পড়েছিল।’

‘ঘটনা তো বাস্তবে ঘটেছে। তবু আমার কাছে এখনও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। তিনজন হাইজ্যাককারী চোখের পলকে নিহত হলো, আমি মুক্ত হয়ে গেলাম।’

‘আরেকজনকে তো মারিয়া মা শেষ করেছে। সত্যি আমাদের মারিয়া মা’র সাহস আছে।’

‘থাকবে না, আহমদ মুসার কিছু গুণ তো মারিয়ার মধ্যে থাকতে হবেই।’ বলেই কিন্তু লজ্জা পেল রোসেলিন। মুখ নিচু করল।

‘ডোনা কি মারিয়ার ডাক নাম প্লাতিনি?’ প্রসঙ্গটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।

‘ঠিক ডাক নাম নয়। ‘মারিয়া জোসেফাইন লুই’ ওর অফিসিয়াল নাম। কিন্তু ফ্যামিলি নাম হয়ে গেছে ওর ‘ডোনা জোসেফাইন লুই।’ বলল মি: মিশেল প্লাতিনি।

‘দু’টোই সুন্দর নাম।’

‘শুধু নাম সুন্দর নয় আব্বা, ওর সব সুন্দর।’

ডোনা এদিকে তাকিয়েছিল। ডোনার দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বলে রোসেলিন মুখ টিপে হাসল।

লজ্জা পেল ডোনা। বোধহয় প্রসংগ ঘুরিয়ে নেবার জন্যেই ডোনা বলল, ‘তুমিই এখন মেজবান রোসেলিন, মেহমানরা কোথায় খোজ নেবার দায়িত্ব তোমার।’

‘জো হুকুম’ বলে মুখ টিপে হাসল রোসেলিন। উঠে দাঁড়াল বাইরে যাবার জন্যে। কয়েক পা এগিয়ে ছিল।

ঠিক এ সময়ে কেবিনে এসে প্রবেশ করল আহমদ মুসা এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।

রোসেলিন আহমদ মুসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘মারিয়া আপা বললেন, ‘আমি প্রধান মেজবান। অতএব আপনাদের খোঁজ-খবর নেবার দায়িত্ব আমার। তাই যাচ্ছিলাম।’

আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ধন্যবাদ রোসেলিন। উনি ঠিকই বলেছেন। আপনি মহামান্য চীফ জাস্টিসের মা। সুতরাং প্রধান মেজবান তো হবেনই।’

রোসেলিন ডোনার দিকে মুখ ঘুরিয়ে কৃত্রিম রাগের সাথে বলল, ‘মারিয়া আপা, ওনাকে বলে দাও ছোট বোনকে কেউ ‘আপনি’ বলে না।’

ডোনা হাসল।

হাসল আহমদ মুসাও। বলল, ‘ধন্যবাদ বোন, তুমি বস।’

বলে আহমদ মুসা চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনি পাশাপাশি যে দুটো সোফায় বসেছিলেন, তার বিপরীত সোফার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি বসতে পারি জনাব?’

‘ও শিয়র। অবশ্যই বসবে, বস বাবা।’ বলল চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক।

মুহাম্মদ ইয়েকিনি দাঁড়িয়েছিল সোফার পেছনে।

রোসেলিন তার দিকে ঘুরে বলল, ‘তুমি বস ইয়েকিনি। লায়লা ভাল আছে?’

‘থ্যাংকস। ভাল আছে।’ বলে ইয়েকিনি গিয়ে আহমদ মুসার পাশের সোফায় বসল।

রোসেলিন গিয়ে বসল ডোনার বিছানায়, ডোনার পাশে।

আহমদ মুসা উসাম বাইক এবং মিশেল প্লাতিনির দিকে চেয়ে নরম ভাষায় বিনয়ের সাথে বলল, ‘আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই জনাব।’

‘বল বাবা।’ বলল ওসাম বাইক।

‘আমার মনে হয় আপনি সব জানেন কারা এই কিডন্যাপের চেষ্টা করেছিল এবং কেন করেছিল। আমি মনে করি, তাদের এই ব্যর্থতা ও লোক ক্ষয়ের পর তারা আরও হিংস্র হয়ে উঠবে এবং প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে।’

‘তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু কি ধরনের প্রতিশোধ নেবার তারা চেষ্টা করবে বলে মনে কর?’

‘কিডন্যাপ, হত্যা ইত্যাদি যে কোন পথই তারা বেছে নিতে পারে।’

চীফ জাস্টিস উসাম বাইকসহ সকলের চোখে-মুখেই একটা উদ্বেগের ছায়া পড়ল।

আহমদ মুসাই আবার কথা বলল, ‘আপনি কি পুলিশকে কিছু জানিয়েছেন?’

‘না জানাইনি। ওদের বিরুদ্ধে পুলিশ খুব কার্যকরী হয়তো হবে না। তাছাড়া ভয় হলো, পুলিশকে জানালে ডঃ ডিফরজিসের ক্ষতি হতে পারে।’

‘ঠিক বলেছেন। আমিও মনে করি, গোটা বিষয়টা পুলিশকে জানানোর প্রয়োজন নেই। তবে এই কিডন্যাপের প্রচেষ্টার কথা বলে বাড়িতে বিশেষ পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করুন।’

‘বাড়ি পর্যন্ত তারা হামলা চালাতে পারে বলে তুমি মনে কর?’

‘তারা এটা করতে পারে। এই ঘটনার পর তাদের অবস্থা ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হবার কথা।’

‘তোমার আর কি পরামর্শ?’

‘রোসেলিনের কয়েকদিন বাড়ি থেকে বের না হওয়াই ভাল। আর সম্ভব হলে আপনি এক সপ্তাহের ছুটি নিন।’

‘নিলাম। কিন্তু তারপর কি হবে?’

আহমদ মুসা একটু হাসল। বলল, ‘ভবিষ্যৎ আমরা কেউ বলতে পারি না। তবে আমি মনে করি এ সময়ের মধ্যে পরিস্কার হয়ে যাবে তখন আমাদের কি করণীয়।’

‘সুন্দর বলেছ।’

‘ডোনা সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত হলো। সে এখানে থাকবে, না বাড়িতে যাবে?’ একবার চীফ জাস্টিসের দিকে আরেকবার ডোনার আব্বার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।

‘তোমার কি পরামর্শ?’ বলল ডোনার আব্বা।

‘ডাক্তার ছাড়তে চাইলে বাসায় নিয়ে যাওয়াই ভাল।’

‘তুমি কি কিছু আশংকা কর এখানে?’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।

‘হাসপাতালে যতই পাহারা থাক, এখানে যা ইচ্ছা তাই করা সম্ভব।

‘ঠিক বলেছ। মারিয়া মাকে বাসায় নিয়ে যাওয়াই উচিত।’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।

‘তাহলে তো এখনি ওদের জানাতে হয়, কখন ওরা রিলিজ করতে পারবে।’ বলল ডোনার আব্বা।

‘যদি রিলিজ তাড়াতাড়ি করে, তাহলে আমরা পৌছে দিয়ে যেতে পারতাম। আমাদেরও একটু তাড়া আছে।’ বলল আহমদ মুসা।

‘কোথাও যাবে তুমি?’ বলল ডোনার আব্বা।

‘আমরা ওদের গাড়িতে দু’টি ঠিকানা পেয়েছি। একটা গাড়ির ব্লু বুকে, আরেকটা একজনের পকেটে পাওয়া লন্ড্রীর একটা স্লীপে। এর কোন একটা ‘ওকুয়া’র কোন ঘাটির হতে পারে, কিংবা ঐ দু’টো ঠিকানার সূত্র ধরে ওদের ঘাটির সন্ধান পেতে পারি। এই সন্ধানেই আমরা বেরুব।’

‘তোমরা কারা যাবে?’ জিজ্ঞেস করল মি: প্লাতিনি।

‘প্রথমত, আমি একাই যাব।’

‘কিভাবে? ‘ওকুয়া’ বা ‘কোক’- এর ঘাটিতে কেউ কিভাবে একক অভিযান চালাতে পারে?’ বলল চীফ জাস্টিস।

‘শত্রু এতটা শক্তিশালী যে দলবদ্ধ ও প্রকাশ্য অভিযান করে ওদেরে সাথে পারা যাবে না।’

‘একা কি করে পারা যাবে? বলল চীফ জাস্টিস।

শক্তিতে নয় কৌশলে ওদের উপর জয়ী হতে হবে। ছোট বা একক গোপন অভিযান এ জন্যেই প্রয়োজন।’

‘ব্যাপারটা বাজি ধরার মত। জয় অথবা পরাজয় যে কোন একটা হবে। উদ্ধারের জন্যে ওমর বায়া এবং ডঃ ডিফরজিসকে পাবে কিনা এই অনিশ্চয়তা নিয়ে এত বড় ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবেনা।’ বলল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।

‘চীফ জাস্টিস সাহেব ঠিকই বলেছেন।’ বলল ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি।

আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘ঝুঁকি না নিলে এসব ক্ষেত্রে কোন কাজই হয় না, করা যায় না। এ ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে চললে ডঃ ডিফরজিসদের উদ্ধার করা যাবে না কোন দিনই। আমরা উদ্ধার করতে চাইলে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।’

‘পুলিশের সাহায্য নেয়া যায়।’ বলল রোসেলিন।

‘তাতে লাভ নেই। মাঝখানে নিহত হবেন ডঃ ডিফরজিসরা।’ বলল চীফ জাস্টিস।

‘তুমি চীফ জাস্টিস হয়ে এই কথা বলছ আব্বা?’

হাসল চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক। বলল, ‘বলছি কারণ, এমন এবং এরচেয়েও ভয়াবহ হাজারো ঘটনা ঘটেছে আমি জানি।’

‘তাহলে তোমার জাস্টিস কোথায় থাকে আব্বা?’

‘জানা এবং প্রমান করতে পারা এক জিনিস নয়। বিচারের জন্যে প্রমাণের দরকার হয় মা।’

আহমদ মুসা প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘তাহলে আমরা এখন উঠতে চাই।’

‘কিন্তু আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে।’ বলল চীফ জাস্টিস।

‘আমার কৌতুহল হচ্ছে, তোমরা কিভাবে কোথেকে ঠিক সময় সেখানে এসে পড়েছিলে?’

‘আমরা আপনার বাসার দিকে যাচ্ছিলাম।’

‘আমার বাসার দিকে? কেন?’

‘আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আপনার পরিবারের রোসেলিন বা গুরুত্বপূর্ণ কাউকে ওরা কিডন্যাপ করবে।’

‘তোমরা জানতে?’

‘ঠিক জানা নয়। অনুমান করেছিলাম।’

‘কিভাবে?’

‘গতকাল আমরা সুপ্রিমকোর্টে এসেছিলাম ওদের সন্ধানে।’

‘সুপ্রিমকোর্টে ওদের সন্ধানে কেন?’

‘বাধ্য হয়ে আপনি ওদের কাজ করে দিতে রাজী হলেও সুপ্রিমকোর্টে ওদের আসতে হবে কেসটা তোলার জন্যে।’

‘বুঝেছি। বল।’

‘সুপ্রিম কোর্টে ওদের দু’জনের সুন্ধান পাই এবং ওদের ঘাটির সন্ধানে ওদের অনুসরণ করতে গিয়ে বন্দী হই। বন্দী অবস্থায় সব জানতে পারি।’

‘গতকাল তুমি ওদের হাতে বন্দী হয়েছিলে?’ চোখ কপালে তুলল মিশেল প্লাতিনি।

‘কিভাবে ছাড়া পেলেন, কিভাবে বন্দী হলেন? খুব জানতে ইচ্ছে করছে।’ বলল রোসেলিন।

আহমদ মুসা হাসল। চাইল ডোনার দিকে।

ডোনা চেয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে। তার চোখে বেদনার প্রশ্রবণ।

‘দুঃখের কথা শোনায় কি আনন্দ আছে?’ বলল আহমদ মুসা।

‘দুঃখের কথা ওটা নয়, জয়ের কথা, বীরত্বের কথা।’

আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘জয়, এখনও অনেক দূরে। বলতে পার, আমি বেঁচে এসেছি। আজ সকালে আমার প্রাণদন্ড হবার কথা ছিল। তা হয়নি।’

‘প্রাণদন্ড দিয়েছিল?’ সভয়ে বলল রোসেলিন।

‘হ্যাঁ। আমাকে রেখেছিল ওদের মাটির নীচের এক বধ্যভূমিতে। ওখানে যারা যায়, আর বের হয় না। আজ সকালে ‘ওকুয়া’ এবং ‘ব্ল্যাক ক্রস’ নেতারা ওখানে যাওয়ার কথা প্রাণদন্ড অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে।’

ডোনার মুখে নেমে এসেছিল অন্ধকার। আর রোসেলিনের মুখটা ভরে উঠেছিল উদ্বেগে।

ওরা কেউ কিছু বলল না।

আহমদ মুসা আবার কথা বলা শুরু করল। বলল গোটা কাহিনী।

গোগ্রাসে গেলার মত করে কাহিনী শুনল ওরা চার জন।

আহমদ মুসা থামল।

আহমদ মুসা থামলেও অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না। নীরবতা ভাঙল চীফ জাস্টিস উসাম বাইক। বলল, ‘অপরূপ এক রূপকথা শুনলাম। রহস্য, রোমাঞ্চ, আনন্দ, অশ্রু, সবই এর মধ্যে আছে। লিখলে এক অমর উপন্যাস হবে।’

‘কিন্তু এই কাহিনী শোনার পর আমার ভয় আরও বেড়ে গেল।’ বলল ডোনার আব্বা।

‘কেন?’ বলল চীফ জাস্টিস।

‘এবারও আহমদ মুসা আগের মতই একা যাচ্ছে।’

‘এ ধরনের অভিযানে আশংকা ও ভয় সব সময়ই থাকে। তবে এ সবকে প্রশ্রয় দিলে সামনে এগুনো যায় না।’ বলল আহমদ মুসা।

‘আমরা সাধারণরা এভাবে এগুনোর কথা কল্পনা করতেও পারি না।’ বলল চীফ জাস্টিস।

‘এ জন্যেই দুনিয়াতে আহমদ মুসাদের সংখ্যা মাত্র দু’চারজনই থাকে।’ বলল রোসেলিন।

‘আমরা স্বীকার করি।’ বলে চীফ জাস্টিস উঠে দাঁড়াল এবং মিশেল প্লাতিনিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘চলুন মারিয়াকে কখন ছাড়তে পারে খোঁজ নিয়ে আসি।’

ইয়েকিনি এবং রোসেলিন প্রায় এক সংগেই বলে উঠল, ‘আপনারা বসুন আমি খোঁজ নিয়ে আসছি।’

‘ঠিক আছে যাও। আমরা তাহলে ততক্ষণ একটু ঘুরে ফিরে দেখি।’

বলে চীফ জাস্টিস উসাম বাইক এবং ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি বেরিয়ে গেল।

ইয়েকিনি এবং রোসেলিনও উঠে দাঁড়িয়েছে।

‘রাশিদি আসেনি কেন ইয়েকিনি।’ জিজ্ঞেস করল রোসেলিন।

‘রাজ কুমারীকে রক্ষার অভিযানে রাজ কুমারের আসার কথা ছিল। কিন্তূ আহমদ মুসা ভাই তার ইচ্ছে পূরণ হতে দেয়নি।’

মুখে-চোখে লজ্জার ছাপ নেমে এল রোসেলিনের। আহমদ মুসার দিকে এক পলক চেয়ে ইয়েকিনিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘রাজ কুমারের দুর্ভাগ্য, তার ভাগ্যে কোন রাজ কুমারী নেই।’ বলে রোসেলিন পা বাড়াল বাইরে যাবার জন্যে।

ইয়েকিনিও পা বাড়ালো।

রোসেলিন দরজা দিয়ে বেরুতে বেরুতে বলল, ‘মারিয়া আপা হাসপাতালের দরজা খোলা রাখা যায় না। বন্ধ করে গেলাম।’

লজ্জা মিশ্রিত একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল ডোনার মুখে।

‘মেয়েরা এ রকম দুষ্টুই হয়।’ বলল আহমদ মুসা।

‘ছেলেরা বুঝি হয় না? ইয়েকিনি খোঁচা মারেনি রোসেলিনকে?’ বলল ডোনা।

কিছুক্ষণ নীরবতা। দু’জনেরই চোখ নীচু। নিজের চোখে নিজের উপরই নিবদ্ধ।

অনেকক্ষণ পর আহমদ মুসা চোখ নীচু রেখেই ধীরে কন্ঠে বলল, ‘আজ পার্কের-গেটে তোমাকে দেখার মত বিস্মিত জীবনে কখনও হইনি।’

‘ক্ষমা করেছ আমরা অপরাধকে?’ চোখ নীচু রেখেই বলল ডোনা।

‘অপরাধ কোথায় করলে?’

‘তোমার পিছু নিয়ে এই ক্যামেরুন পর্যন্ত এলাম।’

‘মারিয়া জোসেফাইনের যা করা উচিত ছিল তাই করেছে।’

‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তুমি এ কথা বলছ।’ মুখে হাসি ডোনা জোসেফাইনের।

‘সত্যি বলছি। ক্যামেরুনে আসার অনুমতি চাইলে আমি তোমাকে অনুমতি দিতাম না। কিন্তু তোমাকে ক্যামেরুনে পেয়ে খুশী হয়েছি।’

‘কথা দু’টি কিন্তু বিপরীত মুখী হলো।’

‘বিপরীত মুখী নয়। একটা অতীতে কি ঘটতো সেই কথা, অন্যটা বর্তমানের কথা।’

‘সময়ের পরিবর্তনে নীতিগত অবস্থানের কি পরিবর্তন ঘটে?’

‘মৌল-নীতির ক্ষেত্রে ঘটে না। যে সব নীতিগত অবস্থান অবস্থা নির্ভর, সে সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন অবশ্যই ঘটে থাকে।’

‘ধন্যবাদ। আজ আমর বুক থেকে ভয়ের একটা পাথর নেমে গেল।’ চোখ বুজে বলল ডোনা।

‘এত ভয় নিয়ে অত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলে কেমন করে?’

‘কিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বলতে পারি না।’

‘এলিসা গ্রেসকে নিয়ে আসার তোমার সিদ্ধান্ত খুবই ভাল হয়েছে। আমি তোমাকে অভিনন্দিত করছি।’

‘আমি জানতাম ওমর বায়ার হাতে তাকে তুলে দিতে পারলে তুমি খুশী হবে।’

‘ধন্যবাদ। আমার মারিয়া জোসেফাইন যে দায়িত্ব পালন করার তাই করেছে।’

নিচু করে রাখা চোখ দু’টি বুজে গেল ডোনার। পরিতৃপ্তির একটা আনন্দ ফুটে উঠল মুখে। ‘ধন্যবাদ তোমাকে। তোমার মারিয়ার প্রতি তোমার অনেক অনুগ্রহ।’

‘তোমাকে অনুগ্রহ করেছি বলছ?’

ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল মুখে। চোখটা একটু খুলে আহমদ মুসার দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘কি বলব একে তাহলে?’

‘তুমি জান না?’

মুখ লাল হয়ে উঠল ডোনার লজ্জা ও অনুরাগের লাল রঙে দু’হাতে মুখ ঢাকল ডোনা। কোন উত্তর দিল না।

আহমদ মুসা হাসল। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তূ রাগও করেছি ডোনা?’

মুখ থেকে দু’টি হাত সরিয়ে আহমদ মুসার দিকে এক পলক তাকিয়ে দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘কেন রাগ করেছ?’

‘তোমার হাতে রিভলবার উঠেছে। রিভলবার ব্যবহার করেছ।’

‘আত্মরক্ষার জন্য রিভলবার রাখার তো আনুমতি আছে।’

‘কিন্তু বিপজ্জনক একটি ক্ষেত্রে তুমি রিভলবার ব্যবহার করেছ।’

‘না করে কি উপায় ছিল?’

‘তোমার বুলেট একজন শত্রুকে শেষ করেছে এজন্য তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। কিন্তু আমার উদ্বেগ কি ঘটতে যাচ্ছিল তা নিয়ে। যে গুলীটা তোমার বাহুতে লেগেছে সেটা তো বুকে লাগার কথা ছিল।’

‘আল্লাহ তো রক্ষা করেছেন। যথা সময়ে তোমাকে পাঠিয়েছেন। আর এমন ঘটনা না ঘটলে তোমার দেখা হয়ত পেতাম না।’

‘আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি রক্ষা করেছেন। কিন্তু ডোনা তুমি জান, আমি বারুদের গন্ধ থেকে তোমাকে দূরে রাখতে চাই।’

‘নিজেকে বারুদের গন্ধে ডুবিয়ে রেখে তা কি তুমি পারবে?’

‘আমার এটা আকাঙ্ক্ষা। বারুদের গন্ধ-মুক্ত একটা শান্তির গৃহাঙ্গণ আমি চাই।’

‘জানি আমি। তোমার এ আকাঙ্ক্ষা আমাকে কষ্ট দেয়। সংগ্রামের যে জীবন তুমি বেছে নিয়েছ, সে জীবন থেকে আমি বিচ্ছিন্ন থাকব কেমন করে?’ ভারি কণ্ঠস্বর ডোনার। তার চোখের কোণা ভিজে উঠেছে।

‘বিচ্ছিন্ন থাক, আমি চাই না। কিন্তু সংগ্রামের ক্ষেত্র তো আরও আছে। কলমের সংগ্রাম, বুদ্ধির সংগ্রাম। আজ এগুলো অস্ত্রের সংগ্রামের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

‘জানি, আমি মানি। কিন্তু সংগ্রামের সে পথ তোমার মারিয়ার জন্য নয়। তোমার পথ থেকে তার পথ বিচ্ছিন্ন হবে কি করে? যে আগুনে তুমি পা দাও, সে আগুন তাকে স্পর্শ করবেই।’

‘জানি আমি, ডোনা। কিন্তু তারপরও সেটা আমার প্রিয় আকাঙ্ক্ষা।’

এ সময় দরজায় শব্দ হল।

আহমদ মুসা মনে করল রোসেলিনরা ফিরে আসছে।

কিন্তু শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা এক ঝটকায় খুলে গেল।

ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল দু’জন লোক, তাদের হাতে ভয়ানক আকারের দু’টি মেশিন রিভলবার।

দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দু’জনের হাতের মেশিন রিভলবার দু’টি উদ্যত।

ওদের দেখার সাথে সাথেই আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছে।

ওদের একজন চিৎকার করে উঠল, ‘কোথায় শালার চিফ জাস্টিস, কোথায় তার মেয়ে?’

‘ওরা একটু বাইরে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।

‘তোমরা কে?’ বলল দু’জনের একজন।

‘আমি একজন এশিয়ান তরুণ, আর ও ফরাসী তরুণী।’ আহমদ মুসার কথায় বিদ্রুপ।

আহমদ মুসা দাঁড়িয়েছিল একটি লম্বা ‘টিপয়’-এর ধারে। আর ডোনা শুয়েছিল কম্বল মুড়ি দিয়ে। তার দু’হাতই কম্বলের ভেতরে।

বালিশের তলায় ডোনার রিভলবার। কম্বলের ভিতরে ডোনার ডান হাতটা অতি সন্তর্পণে এগিয়ে রিভলবারটা স্পর্শ করল।

ওদের দ্বিতীয়জন বলল, ‘চিনেছি এদের। এরা শয়তান চীফ জাস্টিসের সাথে ছিল। এরাই হত্যা করেছে আমাদের…।’

তার কথা শেষ হতে পারল না। একটা গুলীর শব্দ হলো। গুলী বিদ্ধ হয়ে লোকটি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

কম্বলের তলা থেকে ডোনার ডান হাত গুলী করেছিল লোকটিকে।

গুলীর শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম লোকটি তার মেশিনগান ঘুরিয়ে নিচ্ছিল ডোনার দিকে।

সেই মুহূর্তে আহমদ মুসার ডান পা’টা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। চোখের পলকে ‘টিপয়’ টা বুলেটের মত গিয়ে আঘাত করল মেশিন রিভলবার সমেত প্রথম লোকটিকে।

লোকটি আঘাতটা সামলাবার জন্য পেছনের দিকে বেঁকে গিয়েছিল। তার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল মেশিন রিভলবার।

আঘাত সামলে নিয়ে লোকটা সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ততক্ষণে আহমদ মুসা ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার উপর।

লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেয় আছড়ে পড়ল। তার সাথে আহমদ মুসাও।

আহমদ মুসা গিয়ে পড়েছিল লোকটির উপর। পড়ে স্থির হবার সঙ্গে সঙ্গেই আহমদ মুসা দুইটি ঘুষি চালাল লোকটির চোয়ালে।

তারপর তার শার্টের কলার ধরে তাকে মাটি থেকে তুলল।

মাটিতে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ লোকটি এক হাতে বুক চেপে ধরে মাথা তুলেছে। তার মেশিন রিভলবার উঠে এসেছে আহমদ মুসার লক্ষ্যে।

ডোনার দৃষ্টি ছিল আহমদ মুসার দিকে।

শেষ মুহূর্তে লোকটির উদ্যত রিভলবার দেখতে পেল ডোনা এবং আহমদ মুসা দু’জনেই।

আহমদ মুসা মাটি থেকে টেনে তোলা লোকটির গলায় হাত পেঁচিয়ে তার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তার গলা সাঁড়াশির মত চেপে ধরল নিজের দেহের সাথে।

অন্যদিকে রিভলবার তুলেছিল ডোনাও।

প্রায় একসঙ্গেই দু’টি গুলীর শব্দ হলো।

ডোনার গুলী মাথা গুড়িয়ে দিল মাটিতে পড়ে থাকা লোকটির। আর এ লোকটির মেশিন রিভলবারের কয়েকটি গুলী গিয়ে ঝাঁঝরা করে দিল আহমদ মুসার ধরে থাকা লোকটির দেহ।

আহমদ মুসা লোকটিকে ছেড়ে দিল। পড়ে গেল লোকটি মেঝের উপর।

বাইরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথমেই ঘরে এসে প্রবেশ করল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি এবং রোসেলিন। তারপর দু’জন গার্ড পুলিশ এবং ডোনার আব্বা ও রোসেলিনের আব্বা চীফ জাস্টিস প্রবেশ করল ঘরে। এরপরে হাসপাতালের একদল স্টাফ।

মুহাম্মাদ ইয়েকিনি, রোসেলিন, চীফ জাস্টিস এবং ডোনার আব্বা, সকলের চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া। তাদের মুখে নিদারুণ উদ্বেগের ছাপ।

সব শুনে গার্ডদের একজন টেলিফোন করল পুলিশ স্টেশনে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ এসে হাজির হলো।

তারা ঘটনার বিবরণ রেকর্ড করে দু’টি লাশ নিয়ে গেল। পুলিশ অফিসার সবিনয়ে দুঃখ প্রকাশ করল যে, পুলিশের সংখ্যা আরও বেশি না করে এবং আরও সতর্ক না থেকে তারা ভুল করেছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক অফিসার এসেও ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং ডোনাকে অন্য কক্ষে অবিলম্বে সরিয়ে নেবার নির্দেশ দিল।

চীফ জাস্টিস উসাম বাইক প্রশাসনিক অফিসারকে জানাল, ‘ডাক্তার সম্মত হয়েছেন, আমরা মিস মারিয়াকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।’

‘স্যার তাহলে এক ভ্যান পুলিশকে সাথে যাবার অনুমতি দেবেন।’, বলল পুলিশ অফিসারটি।

‘ঠিক আছে।’, বলল চীফ জাস্টিস।

‘স্যার, আপনার বাড়িতেও মোতায়েন কৃত পুলিশের সংখ্যা বাড়াবার নির্দেশ হয়েছে।’, বলল পুলিশ অফিসারটাই আবার।

‘ধন্যবাদ’, বলল চীফ জাস্টিস।

ডোনাকে ইতিমধ্যে রিলিজ করে নেয়া হয়েছিল। গাড়িও রেডি ছিল।

রোসেলিন ডোনাকে ধরে তুলে নিয়ে চলল।

আহমদ মুসাও তাদের পাশে পাশে চলছিল।

‘আমাকে পৌঁছে দিবে না?’ চলতে চলতে বলল ডোনা।

‘অবশ্যই।’

‘আবার পিস্তলের ব্যবহার করেছি। রাগ করেছ?’ ডোনার ঠোঁটে হাসি।

আহমদ মুসা কিন্তু হাসল না। বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ, সঠিক সময়ে তুমি রিভলবারের সঠিক ব্যবহার করেছ।’

একটু থামল আহমদ মুসা। তারপর বলল, ‘আমি তো বলেছি ওটা আমার আকাঙ্ক্ষা, আদেশ নয়।’

ডোনা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আব্বাকে দাঁড়াতে দেখে ঠোঁট আর খুলল না ডোনা।

কাছাকাছি ডোনার আব্বা আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বাবা, তুমি আমাদের সাথে যাচ্ছ তো?’

‘জ্বি, আমরা পৌঁছে দিয়ে যাব।’

ডোনাদের গাড়ির পেছনের সিটে উঠল ডোনা এবং রোসেলিন।

ড্রাইভিং সিটে বসল আহমদ মুসা। আর তার পাশের আসনে ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি।

ক্যামেরুনের ফরাসী দূতাবাস ডোনাদের ব্যবহারের জন্য একটা গাড়ি দিয়েছে। এই গাড়ি ডোনাই ড্রাইভিং করে এসেছিল পার্কে।

তিনটি কার ও একটি পুলিশভ্যানের একটা গাড়ি বহর এগিয়ে চলল চীফ জাস্টিসের বাড়ির দিকে। ঠিক হয়েছে ডোনা সুস্থ না হয়ে ওঠা পর্যন্ত চীফ জাস্টিসের ওখানে রাসেলিনের সাথে থাকবে।

চীফ জাস্টিসের গাড়ি বারান্দায় সকলে নামার পর চীফ জাস্টিস উসাম বাইক আহমদ মুসাকে বলল, ‘আমার বাড়িতে পাঁচ মিনিট বসে এক কাপ কফি খেলে আমি নিজেকে খুব ধন্য মনে করব।’

রোসেলিন ডোনাকে ধরে নিয়ে এগিয়ে চলল। তার পেছনে সকলে।

রোসেলিনের ফ্যামিলি ড্রয়িংরুম।

ডোনা ছাড়া সবাই বসে।

কথা বলছিল তখন চীফ জাস্টিস, ‘আহমদ মুসা, তোমার আশংকা এবং তোমার কথা যে আমরা হাসপাতালে থাকতে থাকতেই ফলে যাবে, তা ভাবতে বিস্ময় বোধ হচ্ছে।’

‘আমাদের খুঁজতেই এসেছিল। আমি ও আব্বা থাকলে কি ঘটত তা ভাবতেও ভয় করছে।’, বলল রোসেলিন।

‘যা ঘটেছে এটাই ঘটতো।’ বলল আহমদ মুসা।

‘মারিয়া আপার দারুণ সাহস ও বুদ্ধি। সেখানেও একজনকে মেরেছে, এখানেও একজনকে।’, বলল রোসেলিন।

‘সত্যি, ডোনা ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।’, বলল আহমদ মুসা।

বলেই কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে কফির পেয়ালা টেবিলে রেখে বলল, ‘আমি এখন উঠি।’

আহমদ মুসার কথার দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে রোসেলিনের আব্বা চীফ জাস্টিস ওসাম বাইক বলল, ‘আমার প্রতি তোমার আর কি পরামর্শ? পুলিশকে কি সব জানাব?’

‘পুলিশকে জানিয়ে খুব লাভ হবে না, বরং ক্ষতি হতে পারে। আপনার সাথে যদি ‘ওকুয়া’র কথা হয়, তাহলে আপনি আপনার তরফ থেকে কথা ভঙ্গ হয়নি, পুলিশকে আপনি বলেননি, এই কথাই ওদের বলবেন। বলবেন যে, আপনি আগের কথার উপরই আছেন। ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি’ (FWTV) এবং ‘ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সী’ (WNA)- এর নিউজের বরাত দিয়ে আপনি তাদের জানাবেন যে, নিশ্চয় তৃতীয় কোন পক্ষ তাদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। এই ভাবে আপনি তাদের কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় করতে পারবেন। তাতে নিরুপদ্রব আরও কিছু সময় পাওয়া যাবে।’

‘তোমাকে ধন্যবাদ বাবা। চমৎকার পরামর্শ তুমি দিয়েছ। কিন্তু তারা কি টেলিফোন করবে?’ বলল চীফ জাষ্টিস ওসাম বাইক।

‘নিশ্চয় করবে। কাজ উদ্ধার তাদের টার্গেট। আপনার উপর চাপ সৃষ্টির জন্যেই তারা এসব কিছু করছে।’ আহমদ মুসা বলল।

আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি চলি।’

রোসেলিনও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মারিয়া আপা অসুস্থ, ওকে বলে যাবেন……’

রোসেলিন কথা শেষ করার আগেই আহমদ মুসা বলল, ‘ও কোথায়?’

‘আমার ঘরে, আসুন।’

বলে রোসেলিন ঘুরে দাঁড়িয়ে উপরে উঠার সিঁড়ির দিকে চলল।

রোসেলিন ডোনাকে নিয়ে নিজের ঘরে একেবারে নিজের খাটে জায়গা দিয়েছে। তার পাশে ক্যাম্প খাট পেতে নিজের থাকার ব্যবস্থা করেছে।

ডোনা এতে আপত্তি করেছিল। রোসেলিন বলেছিল, ‘ফ্রান্সের রাজকুমারী, সেই সাথে আহমদ মুসার বাগদত্তা- এমন দূর্লভ মানবীর ছোঁয়া যদি আমার বেড পায়, সেটা হবে সারা জীবন স্মরণ করার মত আমার সৌভাগ্য। আমি এ সুযোগ ছাড়ব কেন?’

রোসেলিন ও আহমদ মুসা যখন রোসেলিন-এর ঘরে পৌঁছল, তখন ডোনা কম্বল মুড়ি দিয়ে চোখ বুঁজে শুয়ে ছিল।

‘মারিয়া আপা দেখ কাকে নিয়ে এসেছি।’ বলল রোসেলিন।

ডোনা চোখ খুলল।

কথা শেষ করেই একটা চেয়ার বেডের পাশে টেনে আহমদ মুসাকে বসতে দিয়ে বলল, ‘আমার ঘরে এই দূর্লভ দৃশ্য স্মরণীয় করে রাখার জন্যে আমার ক্যামেরা নিয়ে আসি। আপনি বসুন।’

বলে রোসেলিন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, ‘এখন কেমন বোধ করছ ডোনা?’

‘ভাল। তুমি বস।’

‘না, আর বসব না। অনেক দেরী হয়ে গেছে।

‘না, তোমার সময় নষ্ট করব না। এখানে তোমার মিশন কি, জানতে ইচ্ছা করছে।’

আহমদ মুসা বসল। বলল, ‘ওমর বায়া ও ডক্টর ডিফরজিসকে ওদের হাত থেকে উদ্ধার করা এবং খৃষ্টান সংস্থা-সংগঠনের হাত থেকে মুসলমানদের বিষয়-সম্পত্তি উদ্ধার করে তাদের বাড়ি-ঘরে তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা।’

‘প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয় কাজটা অনেক বেশী কঠিন। কিভাবে এই অসাধ্য সাধন করবে?’

‘ওকুয়া ও কোক-এর মত সংগঠনের ঘৃণ্য কাজের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করে এবং ঐ খৃষ্টান সংগঠনগুলোকে বাধ্য করে।’

‘বুঝেছি জনমতকে সচেতন করার কাজ FWTV ও WNA-এর মাধ্যমে করছ। কিন্তু ওদের বাধ্য করবে কিভাবে?’

‘কোক-এর কয়েকজন আঞ্চলিক বড় নেতাকে আমরা বন্দী করে রেখেছি, মাথার ক’জন হাতে পেলেই এ কাজটা আমরা করতে পারব।’

‘এতটুকুতে কাজ হবে?’

‘হবে। কারণ ইতিমধ্যেই ক্যামেরুন সরকার চাপের মধ্যে পড়েছে। তাদেরকে বাধ্য হয়ে তদন্তে নামতে হচ্ছে। আর আমরা আশা করছি, চীফ জাষ্টিসের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়ের সাহায্য আমরা পাব। আইন মন্ত্রী এবং আইন সচিব দু’জনই তার ঘনিষ্ঠ মানুষ।’

‘ধন্যবাদ’। অনেক এগিয়েছ তুমি।

‘আল-হামদুলিল্লাহ। উঠি তাহলে?’

‘একটা কথা দাও।’

‘কি?’

‘নিজের নিরাপত্তার প্রতি সবচেয়ে বেশী খেয়াল রাখবে।’

‘কিন্তু নিজের কথা এত ভাবলে অন্যের ভাবনাটা যে গৌণ হয়ে যায়।’

‘কিন্তু তুমি নিজে ঠিক না থাকলে অন্যকে সাহায্য করবে কেমন করে?’

‘এদিকে আমার নজর অবশ্যই আছে ডোনা।’

‘তাহলে বল একা কোন অভিযানে যাবে না।’

‘এমন কথা আমার কাছ থেকে আদায় কর না ডোনা। রক্ষা করতে পারবো না।’

‘আমি কি উদ্বেগে থাকি তুমি বুঝবে না।’ ডোনার দু’চোখের কোণ থেকে দু’ফোটা অশ্রু নেমে এল।

‘আমি দুঃখিত ডোনা, আমি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি। কিন্তু কি করব আমি! আমরা গোটা মুসলিম জাতি একটা বিপজ্জনক সময় অতিক্রম করছি।’

‘না, তুমি কষ্ট দাওনি। আমি আমার অবুঝ মন নিয়ে কষ্ট পাচ্ছি। হয়তো তোমার ক্ষতি করছি।’

‘না ডোনা, তোমার এই উদ্বেগ, হৃদয় নিঙড়ানো তোমার এই শুভ কামনা, অসীম ভালবাসার অশ্রু ভেজা তোমার দু’চোখের অপেক্ষমান দৃষ্টি আমার শক্তি ও সাহসের একটা উৎস-বাঁচারও একটা প্রেরণা।’ আবেগে ভারী হয়ে উঠেছে আহমদ মুসার কন্ঠ।

ডোনা দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল, ‘আমার চেয়ে সৌভাগ্যবতী দুনিয়ায় কেউ নেই।’

‘আল্লাহ তোমার কথা গ্রহণ করুন।’ বলে আহমদ মুসা একটু থেমেই বলল, ‘ডোনা তাহলে উঠি।’

ডোনা দু’হাত সরাল মুখ থেকে। তার চোখ ও গন্ড চোখের পানিতে সিক্ত।

ঘরে প্রবেশ করেছে রোসেলিন। ক্যামেরা হাতে। দু’টি স্ন্যাপ নিয়েছে সংগে সংগেই। বলল, ‘আমি দুঃখিত অসময়ে প্রবেশের জন্যে। কিন্তু একটা ঐতিহাসিক ছবি তুলেছি।’

ডোনা চোখ মুছল।

আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।

আহমদ মুসা রোসেলিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু ‘ঐতিহাসিক’ ছবিটি যেন তোমার বাইরে না যায়।’

‘আমি সেটা জানি। আহমদ মুসার সাথে কয়েক ঘন্টা থেকে অনেক বুদ্ধি আমার হয়েছে।’ বলল রোসেলিন।

‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা। তারপর চলে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াবার আগে সালাম দিল ডোনাকে। ডোনা সালাম গ্রহণ করে দ্রুত কন্ঠে বলল, ‘ওদের ঘাঁটির যে দু’টি ঠিকানা পেয়েছ, তা কি আমাকে দেবে?’

আহমদ মুসা থমকে দাঁড়িয়ে ভাবল। তারপর বলল, ‘দেব। কিন্তু এই শরীর নিয়ে বাইরে বেরুবে না কথা দিতে হবে।’

‘কথা দেয়ার দরকার নেই। তোমার ইচ্ছার আদেশই আমার জন্যে যথেষ্ট।’

‘ধন্যবাদ।’

‘ধন্যবাদ। ইয়েকিনিকে বলব সে রোসেলিনকে ঠিকানা দু’টি দিয়ে যাবে।’

আবার সালাম দিয়ে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল।

বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

তার সাথে সাথে রোসেলিন।

ডোনার তৃষ্ণার্ত চোখ দু’টি অনুসরণ করল আহমদ মুসাকে।রাশিদি ইয়েসুগোর ড্রইং রুমে রাশিদি, মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ও লায়লা ইয়েসুগো বসে।

তাদের সবার মুখ মলিন। মুখে উদ্বেগের ছাপ।

‘উনি জরুরী প্রয়োজনে হঠাৎ যদি কোথাও যেয়ে থাকেন, তাহলে এতক্ষণ কি আসবেন না?’ চিন্তান্বিত কণ্ঠে বলল লায়লা ইয়েসুগো।

‘কিন্তু তার নিজস্ব প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে তিনি যাবেন কোন কিছু না বলে, তা আমি মনে করতে পারছি না।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘আমারও তাই মনে হয়।’ বলল ইয়েকিনি।

‘তাহলে তিনি কি কোন শত্রুর কবলে পড়েছেন?’ তাঁর তো শত্রু চারদিকেই।’ বলল লায়লা।

‘তা হতে পারে। কিন্তু গাড়ি? শত্রু তাকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু গাড়ি কোথায় গেল?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘হয়তো শত্রু আগে থেকেই ফলো করছিল। সে গাড়িও দেখেছিল।’ বলল লায়লা।

‘কিন্তু এটা কি সম্ভব যে, আহমদ মুসার মত মানুষকে ঐ কক্ষ থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে ধরে এনে গাড়িতে তুলে হাইজ্যাক করে নিয়ে যাবে?’ বলল রাশিদি ইয়োসুগো।

‘সম্ভব নয়, কিন্তু সমস্যার সমাধান কি ভাইয়া? বলল লায়লা।

রাশিদি ইয়োসুগো কোন জবাব দিল না।

কথা বলল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি। বলল, ‘আমি আহমদ মুসাকে যতটুকু চিনেছি, তাতে আমার মনে হয়, তিনি স্বেচ্ছায় কোথাও গিয়েছেন। এবং আমাদের জানিয়ে যাবার তাঁর সময় ছিল না।’

‘স্বেচ্ছায় কোথায় যাবেন, ‘আপনার অনুমান কি?’ বলল লায়লা ইয়েসুগো।

‘অনুমান করা মুষ্কিল। তবে আমার মনে হয় তিনি কিছু দেখে বা কিছু শুনে তার পিছু ছুটছেন। বলে যাবার মত সময় তাঁর ছিল না।’ বলল ইয়েকিনি।

‘সেই কিছু’টা কি হতে পারে?’ লায়লা বলল।

‘ওমর বায়ার কথা হতে পারে। ডঃ ডিফরজিসের কোন তথ্য হতে পারে।’ বলল ইয়েকিনি।

‘হতে পারে। কিন্তু তবু প্রশ্ন জাগে তিনি যদি স্বেচ্ছায় গিয়ে থাকেন, তাহলে খবর জানিয়ে যাবার মত দুই মিনিট সময় পাবেন না কেন?’ লায়লা বলল।

‘লায়লা, আমাদের রুটিনে বাধা শান্তির জীবন দিয়ে আহমদ মুসার জীবনকে বিচার করছ বলেই এমন প্রশ্ন জাগছে। আসলে প্রয়োজন নামের চাবুক একজন বিপ্লবীকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তার কাছে অন্যসব বিবেচনাই গৌণ হয়ে যায়।’

দরজায় এসে দাঁড়াল গার্ডদের একজন। তার চোখে-মুখে আনন্দের স্ফুরণ। বলল, ‘বড় সাহেব এসেছেন।’

‘মেহমান বড় সাহেব।’

বাড়ির আর সবাই আহমদ মুসাকে বড় সাহেব বলে ডাকে। কেউ তাদেরকে একথা বলে দেয়নি। তারা সম্ভবত সবার কাছে আহমদ মুসার সম্মান ও প্রতিপত্তি দেখেই তাকে বড় সাহেব নাম দিয়েছে।

‘কি বলছিস? আমাদের মেহমান? কোথায় তিনি?’

‘বাইরে দাঁড়িয়ে।’

‘বাইরে কেন?’

‘সাথে ইয়ামোটা একজন লোক এবং তিনটি কুকুর।

‘সাথে একজন লোক এবং তিনটি কুকুর!’

রাশিদি সবার আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। রাশিদি চলতে শুরু করে দিয়েছিল। এই সময় ঘরে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।

রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি গিয়ে জড়িয়ে ধরল আহমদ মুসাকে।

‘টেনশনে আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি। কি ঘটনা ঘটেছিল? আপনি ভাল আছেন তো?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘হঠাৎ করেই ‘ওকুয়া’র দু’জন লোককে চিনে ফেলি।’ তারা চলে যাচ্ছিল। ওদের ঘাটির ঠিকানা জানার উদ্দেশ্যে ওদের ফলো করেছিলাম। তোমাদের জানানোর সুযোগ হয়নি। দুঃখিত।’

‘দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জা দেবেন না। আমাদের কোনই কষ্ট হয়নি। আমরা উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম আপনাকে নিয়ে।’

কথা শেষ করেই রাশিদি ইয়োসুগো আহমদ মুসাকে সোফার দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘তার পর কি হলো বলুন।’

আহমদ মুসা রাশিদি ইয়োসুগোকে বাধা দিয়ে সোফার দিকে না এগিয়ে বলল, ‘আমি ওদের হাতে আটকা পড়েছিলাম। সব বলছি। কিন্তু তার আগে চারজন মেহমানের ব্যবস্থা করতে হবে।’

‘সব ব্যবস্থা করছি। কিন্তু চারজন কোথায়? শুনলাম তো একজন!’ বলল রাশিদি।

‘একজন মানুষ আছে এবং তিনটি কুকুর।’ বলল আহমদ মুসা।

লাললাসহ সবাই হেসে উঠল আহমদ মুসার কথা বলার ভংগিতে।

আহমদ মুসা, ইয়োসুগো, ইয়েকিনি বাইরে গেল। ব্ল্যাক বুল ও কুকুরগুলোকে ভেতরে নিয়ে এল। তাদের সব ব্যবস্থা করে দিয়ে ঘ্টা খানেক পর আহমদ মুসা, রাশিদি ইয়োসুগো এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি ড্রইং রুমে আবার ফিরে এল।

ইতিমধ্যেই ব্ল্যাক বুলকে নিয়ে নাস্তার কাজও তারা সেরেছে।

আহমদ মুসা সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘ওকুয়া’র লোকদের পিছু নেবার পর যা যা ঘটেছে সব তো তোমাদের শোনা হয়ে গেছে। ওকুয়া’র কোন ঘাটির সন্ধা

ইয়াউন্ডির বাণিজ্যিক এলাকায় ‘ওকুয়া’র সেই ঘাঁটি।

পিয়েরে পল এবং ফ্রান্সিস বাইক সোফায় পাশাপাশি বসে।

কথা বলছিল ফ্রান্সিস বাইক, ‘টেলিফোনে সব কথা বলা যাবে না বলে আপনাকে বিশ্রাম থেকে তুলে এনেছি এখানে। আমি দুঃখিত।’

‘ধন্যবাদ বাইক’ বলুন। আপনাকে খুব বিষণ্ন মনে হচ্ছে। অভিযানের কোন খবর এসেছে?’ বলল পিয়েরে পল।

‘এসেছে সেটা বলার জন্যেই তো ডেকেছি।’

‘বলুন। খারাপ কিছু?’ উদগ্রীব কন্ঠ পিয়েরে পলের।

‘খুবই খারাপ। চীফ জাষ্টিসের মেয়েকে কিডন্যাপ করার জন্যে যে চারজনকে আমরা পাঠিয়েছিলাম, তারা সবাই খুন হয়েছে।’

‘খুন হয়েছে! চারজনই?’ সোজা হয়ে বসল পিয়েরে পল। তার চোখে বিস্ময়।

‘হ্যাঁ, চারজনই খুন হয়েছে।’

‘পুলিশের হাতে? তুমিতো বলেছিলে পুলিশ আমাদেরই সহযোগিতা করবে!’

‘পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করেছে। তারা সরেছিল এলাকা থেকে। মেয়েটিকে ধরে গাড়িতে ওঠাবার সময় তার চিৎকারে রাস্তা দিয়ে চলমান একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই গাড়ি থেকে একজন যুবক নেমে এসে সব ভন্ডুল করে দেয়। আমাদের চারজন লোককে হত্যা করে। চীফ জাষ্টিসের মেয়ের একজন শ্বেতাংগ বান্ধবী মাত্র আহত হয়েছে, আমাদের লোকদের গুলিতে।’

‘একজন যুবক গাড়ি থেকে নেমে এসে এ কান্ড ঘটাল, কি করছিল আমাদের লোকেরা?’

‘একটু দূরে মোতায়েন করা আমাদের লোকদের কাছে যা শুনেছি তা উদ্বেগজনক।’

‘কি সেটা?’

‘মনে হচ্ছে যে লোকটি দুয়ালা, কুম্ভে কুম্বা এবং ইদেজা’য় আমাদের সর্বনাশ করেছে, এ যুবকটি সেই লোক ছিল।’

‘আমাদের লোকেরা তার চেহারার কথা কি বলেছে?’

‘ফর্সা এশিয়ান।’

‘তাহলে এখানেও আহমদ মুসা? ঘটনাস্থলে সে কি করে এল? চীফ জাস্টিসের সাথে তার কোন যোগ আছে? সেদিন তোমাদের বন্দীখানায় যে চারজন মারা গেল, সেটাও কি তাহলে আহমদ মুসার কীর্তি?’

‘হতে পারে। তবে চীফ জাস্টিসের সাথে আহমদ মুসার কোন যোগ আছে, তার কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের লোক এবং পুলিশের মতে এশিয়ান যুবকটির গাড়ি মেয়েটির চিৎকার শুনে তার সাহায্যের জন্যে থেমেছিল, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।’

‘এখন কি ভাবছ?’

ফ্রান্সিস বাইক সোফায় ঠেস দিয়ে বসল। তারপর বলল, ‘আহত শ্বেতাঙ্গ মেয়েটিকে নিয়ে ওরা সবাই চলে যায় সামরিক হাসপাতালে। হাসপাতাল থেকে আমাদের লোক জানায়, সেখানে চীফ জাস্টিস, তার মেয়ে, সেই এশিয়ান যুবক সবাই আছে।’

‘এশিয়ান যুবকটি কেন?’

‘সেই-ই আহত শ্বেতাঙ্গিনীকে তুলে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়েছে। সাথেও গিয়েছিল।’

একটু থেমে ফ্রান্সিস বাইক আবার শুরু করল, ‘হাসপাতাল থেকে আমাদের লোক আরও জানায়, অপারেশনের পর শ্বেতাঙ্গ মেয়েটিকে এক নম্বর ভিআইপি কেবিনে তুলেছে। সেখানে চীফ জাস্টিস ও তার মেয়েও রয়েছে। গেট ছাড়া তেমন কোন পাহারা নেই। আমি সংগে সংগে গেটের দু’জন গার্ডকে ম্যানেজ করার নির্দেশ দিয়ে ইয়াউন্ডির খোদ অপারেশন কমান্ডার এবং তার সহকারীকে হাসপাতালে পাঠিয়েছি চীফ জাস্টিসের নাকের ডগার উপর দিয়ে তার মেয়েকে ধরে আনার এবং সেই এশিয়ান যুবককে দেখার সাথে সাথে হত্যা করার জন্যে।’

‘তোমার এই ত্বরিৎ এ্যাকশনের জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ। কিন্তু দু’জন লোক কি কম হয়নি অভিযানের জন্যে?’

‘গেটের গার্ড ম্যানেজ হয়ে যাবার পর সেখানে আর কোন ভয় নেই। তাছাড়া যে দু’জনকে পাঠিয়েছি তারা দু’জন দু’ডজনের সমান।’

‘চমৎকার। ধন্যবাদ তোমাকে। যিশু আমাদের সহায় হোন।’

‘আমিন।’

এই সময় ইন্টারকমে ফ্রান্সিস বাইকের একান্ত সচিবের কন্ঠ শোনা গেল।

ফ্রান্সিস বাইক দ্রুত উঠে টেবিলে গেল। চেয়ারে বসে বলল, ‘বল শুনছি।’

‘স্যার এইমাত্র হাসপাতাল থেকে জানাল…’

‘কি জানাল?’

‘জানাল আমাদের দু’জন লোক নিহত হয়েছে।’

কথা শোনার সাথে সাথে ফ্রান্সিস বাইকের চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল। কথা যোগাল না কিছুক্ষন।

একটু সময় নিয়ে বলল, ‘কিভাবে নিহত হলো? কার হাতে নিহত হলো?’

‘এক এশিয়ান যুবকের হাতে।’

‘এশিয়ান যুবকের হাতে?’

‘জি স্যার। যে সময় আমাদের দু’জন লোক এক নম্বর ভিআইপি রুমে প্রবেশ করে, তখন সে ঘরে শুধু এশিয়ান যুবক এবং আহত মেয়েটি ছিল। আমাদের দু’জনেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে।’

আর কোন কথা না বলে ফ্রান্সিস বাইক টলতে টলতে এসে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। সোফায় মাথাটা ঠেস দিয়ে চোখ বুজে দু’হাতে মাথা চেপে ধরল।

‘কি বলল, ওরা দু’জনই এশিয়ান যুবকটির হাতে মরেছে?’

চোখ না খুলেই ফ্রান্সিস বাইক বলল, ‘হ্যাঁ। সব তো শুনলেন। কি সাংঘাতিক ঐ লোকটি!’

‘বিস্মিত হচ্ছ ফ্রান্সিস বাইক! তুমি তো জান ফ্রান্সে ‘ব্ল্যাক-ক্রস’ এর অর্ধশতেরও বেশী লোক ওর হাতে মারা গেছে। বলতে গেলে আমাদের কার্যকরী জনশক্তি ও নিঃশেষ করে দিয়েছে।’

‘আমাদের ও সেই অবস্থা হতে যাচ্ছে। আমাদের যে দশজন লোক এই দু’দিনে মারা গেল, তারা ছিল ‘ওকুয়া’র হাত পা। তাদের মানের একজনও আর ক্যামেরুনে নেই।’

‘এখন কি ভাবনা হওয়া উচিত আমাদের?’

‘দেখছি ঐ যুবকটিই আমাদের পথে এখন প্রধান বাধা। তাকে সরাতে না পারলে বোধ হয় আমরা এগুতে পারবো না।’

‘ঠিক বলেছ। তবে আমি চীফ জাস্টিসের সাথে একটু আলোচনা করে দেখি আহমদ মুসা বা এশিয়ান যুবকটির সাথে তার কোন যোগ আছে কিনা। থাকলে ভয় দেখিয়েও তাকে দিয়ে এমন কিছু করা যাবে না।’

‘কিভাবে বুঝবেন যোগ আছে কিনা?’

‘তার সাথে কথা বললেই বুঝা যাবে। তার কথা যদি সহযোগিতামূলক হয়, তিনি যদি তার আগের কথার উপর থাকেন, তাহলে বুঝব আহমদ মুসার সাথে তার কোন যোগাযোগ হয়নি। আর যদি তাকে শক্ত দেখা যায় এবং সহযোগিতা করতে তিনি যদি রাজি না হন, তাহলে পরিস্কার বুঝা যাবে তিনি আর আমাদের হাতে নেই।’

‘তার মেয়েকে কিডন্যাপের চেষ্টার কথা যদি তিনি তোলেন?’

‘বলব, ওটা আমাদের কাজ নয়। কোন নারীলোভীদের চেষ্টা ওটা। আমরা কিছূ করলে তা ঠেকাবার ক্যামেরুনে কেউ নেই।’

হাসি ফুটে উঠল ফ্রান্সিস বাইকের ঠোঁটে। বলল, ‘ভাল যুক্তি। তাকে যদি বুঝানো যায়, তাহলে তো আমরা আমাদের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে পারি। আর এই সাথে এশিয়ান যুবকটির উপরও চোখ রাখতে পারি।’

‘হ্যাঁ আমরা তাই করব।’

ফ্রান্সিস বাইকের ইন্টারকম কথা বলে উঠল। তার একান্ত সচিব জানাল, ‘ইদেজা থেকে ফাদার জেমস এসেছেন।’

‘পাঠিয়ে দাও।’ ফ্রান্সিস বাইক জানাল একান্ত সচিবকে।

মিনিট খানেকের মধ্যেই ফাদার জেমস প্রবেশ করল ঘরে।

ফ্রান্সিস বাইক এবং পিয়েরে পল দু’জনেই উঠে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাল। হ্যান্ডশেক করতে করতে পিয়েরে পল বলল, ‘আপনি তো খারাপ খবর নিয়ে আসেন। আজ কি এনেছেন?’

ফাদার জেমস পাশের সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘দুর্ভাগ্য আমার, আজকের খবরটাও খারাপ।’

‘অসময়ে এবং কোন খবর না দিয়ে হঠাৎ আসাতেই বুঝতে পেরেছি খবর খারাপই হবে। বলুন সেটা কি? খারাপ খবর শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘কুন্তে কুম্বার প্রস্তাবে আমাদের ইদেজা নেতৃবৃন্দ রাজী হয়েছেন।’

‘কারা রাজী হয়েছে বললেন?’

‘ইদেজার নেতৃবৃন্দ।’

‘ইদেজার নেতৃবৃন্দ কারা?’

‘কেন জন স্টিফেন, ফ্র্যাঁসোয়া বিবসিয়েররা।’

‘কুন্তে কুম্বার কি প্রস্তাবে তারা রাজী হয়েছেন?’

‘সেদিন তো আমি বলে গিয়েছিলাম। লিখেও পাঠিয়েছি।’

‘সেগুলো ফাইলে অবশ্যই আছে। কুন্তে কুম্বার প্রস্তাব মনে হচ্ছে, মনে রাখা উচিত ছিল। বলুন প্রস্তাব গুলো।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘সংক্ষেপে প্রস্তাবগুলো হলো, ইয়াউন্ডি হাইওয়ের দক্ষিনে ইদেজা পর্যন্ত সকল মুসলিম ভূ-খন্ড তাদেরকে ফেরত দেয়া, গত পাঁচ বছরে উচ্ছেদকৃত মুসলমানদের পূনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ দান, সত্যিকার খৃস্টান মিশনারীরা থাকবে, কিন্তু এন.জি.ওদের ষড়যন্ত্রমূলক কাজ বন্ধ করতে হবে এবং ‘কোক’কে লিখিতভাবে তার অপরাধের স্বীকৃতি দিতে হবে।’

‘এ প্রস্তাবগুলো জন স্টিফেন এবং বিবসিয়েররা মেনে নিয়েছেন?’

‘জি নিয়েছেন।’

‘কি করে নিশ্চিত হলেন?’

‘আমার সাথে তাদের দেখা হয়েছে।’

‘দেখা হয়েছে! আপনার সাথে?’

‘হ্যাঁ, আমার সাথে দেখা হয়েছে।’

‘অসম্ভব ব্যাপার! কিভাবে দেখা হলো?’

‘গতকাল সকালে স্টিফেন-এর চিঠি পেলাম। তাতে তিনি লিখেছিলেন, জরুরী কথা আছে। পত্র বাহকের সাথে এসে আমার সাথে দেখা করবেন। আমি গিয়েছিলাম।’

‘ভয় করেনি? আপনাকেও যদি আটকে রাখতো?’

‘আমি আমার সন্দেহের কথা পত্রবাহককে বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমরা যদি আপনাকে আটকাতে চাই, কিডন্যাপ করতে চাই, যে কোন সময়ে তা করতে পারি। এর জন্যে কোন ছলনার প্রয়োজন হয় না। আমি তার কথা বিশ্বাস করেছিলাম।’

‘কোথায় আটকা আছে, আপনি জেনেছেন তাহলে।’

‘না জানতে পারিনি। চোখে টেপ এঁটে গগলস পরিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’

‘স্ট্রেঞ্জ! আপনি এতে রাজি হয়েছিলেন?’

‘রাজি হয়েছি স্টিফেনের সাথে সাক্ষাতের স্বার্থে।’

‘জায়গাটা কোথায় কতদুর কিছুই বুঝতে পারেননি?’

‘সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জীপ গাড়িতে চলার পর আমি সেখানে পৌঁছি। যেখানে নিয়ে আমার চোখ খোলা হয়, সেটা একটা কক্ষ। একটাই মাত্র দরজা। ঘরটি পরিপাটি করে সাজানো। আরামদায়ক বসবাসের মত সবকিছুই সেখানে রয়েছে।’

‘জায়গাটা কি কুন্তে কুম্বার কোন স্থানে হবে?’

‘না। কুন্তে কুম্বার ডাবল দুরত্বে আমি গিয়েছি।’

‘কুন্তে কুম্বার রাস্তা পাকা, তুমি যে পথে গিয়েছ সেটা কেমন ছিল?’

‘অধিকাংশই কাঁচা।’

‘বল দেখা হওয়ার পর কি হলো? সেখানে কে কে ছিল?’

‘জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের।’

‘কি কথা হলো?’

‘প্রথমে স্টিফেন আপনাদের কথা জিজ্ঞেস করেছেন। বাইরের পরিস্থিতি কি জানতে চেয়েছেন। তার পর বললেন, ‘আমরা অনেক ভেবে দেখলাম ওদের প্রস্তাবে রাজি হওয়া ছাড়া কোন পথ নেই।’ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কি একথা বললেন?’ তারা উত্তরে বলেছিলেন, ‘না তা নয়।’ তারপর তারা জানতে চেয়েছিলেন, আমরা FWTV-এর প্রোগ্রাম এবং WNA-এর নিউজ দেখেছি কিনা। আমি হ্যাঁ বলেছিলাম। তারা বলেছিলেন, ‘এধরনের প্রোগ্রাম এবং নিউজ আরও আসবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন, উদ্বাস্তু কমিশন এবং দুনিয়ার মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে তথ্য প্রমাণ সহ লবীং করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ক্যামেরুন সরকার এসব সংস্থার কাছ থেকে চিঠি পাওয়া শুরু করেছে। আমরা কিছু চিঠির কপি দেখেছি। ফলে ক্যামেরুন সরকার বাধ্য হবে তদন্তে নামতে। আমরা জানতে পেরেছি, মুসলিম উদ্বাস্তুদের একত্র করা হচ্ছে তাদের জমি-জমার দলিল-দস্তাবেজ সহ। তারা ইয়াউন্ডিতে বিশাল মিছিল ও দাবীনামা দেবার ব্যবস্থা করবে। আমরা মনে করি, এসব হলে ‘কোক’ এবং ‘ওকুয়া’র বদনাম হবে। সব গোমর ফাঁস হয়ে যাবে। তার ফলে শুধু ক্যামেরুন নয়, পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশ, এক কথায় গোটা আফ্রিকায় আমাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এ ক্ষতি এড়ানোর জন্যে যদি ওঁদের চার দফা মেনে নেই তাতে ক্ষতির পরিমাণ আমাদের কম হবে এবং পৃথিবী জোড়া বদনাম এবং ভেতরের ঘটনা ফাঁস হওয়া থেকে আমরা রক্ষা পাব। আমি তাদের এ কথার উত্তরে বলেছিলাম, তাদের দাবী খুব ছোট নয়। জবাবে তারা বলেছিলেন, কিছু দরকষাকষি করার সুযোগ আছে। যেমন তারা দাবী জানিয়েছে, ইয়াউন্ডি হাইওয়ের দক্ষিণের সব মুসলিম ভুখন্ড ফেরত দিতে হবে। এখানে আমি বলেছি, যেসব জমির হস্তান্তর সন্দেহ যুক্ত সেসব জমি ফেরত দেয়া হবে এবং যাদের জমি ফেরত দেয়া হবে না তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হবে। চার দফা দাবীর সংশোধনীর একটা প্রিন্টেড কপি আমি তোমাকে দেব। সব কিছু বিচার করে তাদের চার দফা দাবী আমাদের মেনে নেয়া উচিত।’ কথা শেষে স্টিফেন থেমেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘আমার এ প্রস্তাব তুমি আমাদের নেতৃবৃন্দকে জানাবে!’

‘স্যার আমি সেই জানাবার দায়িত্ব পালনের জন্যেই এসেছি।’ থামল ফাদার জেমস!

কথা বলল ফ্রান্সিস বাইক! বলল, ‘তোমাদের মধ্যে যখন কথা হয়, তখন সেখানে ওদের কেউ ছিল?’

‘না ছিল না। আমাকে পৌছে দিয়েই ওঁরা চলে গেছে। যদি আড়ি পেতে থাকে, কিংবা কোনভাবে কথা যদি রেকর্ড করে থাকে সেটা ভিন্ন কথা।’

‘জন স্টিফেনরা তাহলে ওদের অনুপস্থিতিতেই এসব কথা বলেছে। তাদের চোখে-মুখে, কথা-বার্তায় কোন ভয়ের চিহ্ন ছিল? মানে, আমি বলতে চাচ্ছি কথাগুলো তাদের আন্তরিক, না শেখানো?’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘কথাগুলো তাদের আন্তরিক বলেই মনে হয়েছে।’

‘আপনার মত কি এ সম্বন্ধে?’

‘একক মতামতের কি প্রয়োজন। দরকার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত।’

‘তবু আপনি কি ভাবছেন এ নিয়ে? সকলের ভাবনা নিয়েই তো সিদ্ধান্ত হবে।’ বলল ফান্সিস বাইক।

‘আমার মনে হয় স্টিফেনরা ঠিকই বলেছে। শত্রুরা আঁট-ঘাঁট বেধেই কাজ শুরু করেছে। ওদের দাবী মেনে না নিলে বড় ধরনের কেলেংকারীর মধ্যে আমরা পড়তে পারি।’

‘দাবী মেনে নিলে কি কেলেংকারী এড়ানো যাবে? আর ঐ চারটি দাবী মেনে নিলেই কি তাদের দাবী শেষ হয়ে যাবে?’ ফ্রান্সিস বাইক বলল।

‘কুন্তে কুম্বার দাবী তো এটুকুই!’

‘কিন্তু কুন্তে কুম্বাকে যারা বুদ্ধি ও শক্তি দিচ্ছে, তাদের দাবী কিন্তু এটুকুই নয়। তাদের লক্ষ্য সমগ্র দক্ষিণ ক্যামেরুনের সকল মুসলিম ভুখন্ড ফেরত নেয়া এবং তাদের পুনর্বাসন করা।’ ফান্সিস বাইক বলল।

‘আমি একথা স্টিফেনকে বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, সে দাবী এখনো উঠেনি। যদি তা উঠেই যুক্তি-প্রমাণ সহকারে, তাহলে আমরা তা অস্বীকার করতে পারবো না।’

‘এটা তার কথা, সকলের কথা নয়।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক।

‘তাহলে বলুন, এখন কি করণীয়?’

‘করণীয় হলো, এক শয়তান এশিয়ান প্রবেশ করেছে ক্যামেরুনে তাঁকে ধ্বংস করা।’

‘কে সে? তাকে ধ্বংস করলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে?’

‘আপনি জানেন না কুন্তে কুম্বাকে সেই জাগিয়েছে। কুন্তে কুম্বা যা করেছে সবই তার পরামর্শ। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি, ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সী যে সংবাদ প্রচার করেছে তাও তারই গোপন হাতের কারসাজি। সর্বোপরি, এ পর্যন্ত প্রায় ২০ জনের মত লোক তার হাতে নিহত হয়েছে।’

‘অবিশ্বাস্য কথা বলছেন। এমন বিশ্বকর্মা কে সে?’

‘হ্যাঁ তাকে বিশ্বকর্মা বলতে পার। গোটা বিশ্বেই সে কাজ করছে। কিন্তু একশ ভাগ নিশ্চিত না হয়ে তার নাম আমরা বলব না।’

কয়েক মুহুর্ত চুপ থাকল ফাদার জেমস। তারপর বলল, ‘আমি তাহলে কি জানাব মিঃ স্টিফেনদের?’

‘জানাবেন তাদের প্রস্তাবে কেউ রাজি নন। আরও জানাবেন, কি করতে হবে না হবে তা মুক্তরা ঠিক করবে, বন্দীরা নয়।’

‘এইভাবে কথা বলা কি ঠিক হবে? আমরা তাদের মুক্তির জন্যে কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।’

‘সব সময় সবকিছু সহজে করা যায় না। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে হয়। মুক্ত হতে পারছি না বলে জাতিকে বিক্রি করে দিয়ে মুক্ত হতে হবে তা ঠিক নয়।’

‘ওরা কিন্তু নিজের মুক্তির জন্যে এ কথা বলেনি, জাতির স্বার্থেই এটা ছিল ওদের সুচিন্তিত অভিমত।’

উত্তর দিতে যাচ্ছিল ফ্রান্সিস বাইক। কিন্তু তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ পরে মুখ খুলল পিয়েরে পল। বলল, ‘বিষয়টা যদিও আপনাদের সংগঠনের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তবু বিষয়টা যেহেতু জাতীয়, তাই কথা না বলে পারছি না।’

বলে একটু থামল পিয়েরে পল। তারপর আবার শুরু করল, ‘পশ্চাতাপসরণকে জাতীয় স্বার্থ বলছেন ফাদার জেমস! জাতীয় স্বার্থ সামনে অগ্রসর হওয়ার মধ্যে। যিশুর ক্রস দক্ষিণ ক্যামেরুন থেকে ক্রিসেন্টকে বিতাড়িত করেছে। এখন ‘ক্রস’ – এর টার্গেট উত্তর ও পূর্ব ক্যামেরুনকে ক্রিসেন্ট এর স্পর্শ থেকে মুক্ত করা। এরপর ক্রস অগ্রসর হবে নাইজেরিয়া ও চাদ হয়ে আরও উত্তরে, আরও পুবে।’

টেবিল চাপড়ে ফ্রান্সিস বাইক বলল ‘ফাদার জেমস মিঃ পিয়েরে পল যে কথা বলেছেন, এটাই জাতির কথা, জাতির স্বপ্ন। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের আমরা সৈনিক। আমরা কোন নীতি-দুর্নীতির পরোয়া করি না। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে, স্বপ্ন সার্থক করার জন্যে যা করা দরকার তা করেছি এবং করব।’

‘আমি মনে করি স্টিফেনরাও এটাই, মনে করেন স্যার। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ কেবল সামনেই অগ্রসর হয় না। কৌশলগত কারণে তাকে অনেক সময় পিছাতেও হয়। স্টিফেনরা এই কৌশলের কথাই বলেছেন।’

‘যুক্তি হিসেবে আপনার কথা ভাল। কিন্তু পিছানোর কৌশল নেয়ার সময় এসেছে বলে আমি মনে করি না। বলতে গেলে লড়াই এখন একজনের সাথে। একজনের ভয়ে আমরা পিছু হটব, এটা কি সুস্থ পরামর্শ হতে পারে মিঃ জেমস?’ বলল পিয়েরে পল।

‘একজন কিংবা কয়জন সেটা বোধ হয় বিবেচ্য বিষয় নয় স্যার। বিবেচ্য বিষয় হলো, আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় দিক দিয়েই প্রথম বারের মত এমন এক সংকটে আমরা পড়েছি যা সত্যিই আমাদের বিপদে ফেলতে পারে।’

একটু দম নিল ফাদার জেমস। তারপর বলল, ‘দেখুন স্যার, জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের আফ্রিকায় খৃষ্টের সৈনিক-বাহিনীর সবচেয়ে আত্ম-নিবেদিত, নিঃস্বার্থ এবং সাহসী সেনাধ্যক্ষ। সেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ক্রসের যে অগ্রাভিযান শুরু হয়েছে, তাতে মিঃ জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের সব সময় অগ্র-বাহিনী পরিচালনার ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। স্যার আমরা জানি ইদেজা এখন ক্রসের উত্তর ও পুবমুখী যাত্রার অগ্রবর্তী ঘাঁটি এবং এ ঘাঁটির দায়িত্বে রয়েছেন জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়ের। সুতরাং আমি মনে করি, তাদের মতামতের একটা মুল্য আছে।’

চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে পিয়েরে পলের। তাতে অসন্তুষ্টির একটা বিস্ফোরণ। বলল সে, ‘জবাব দিন ফাদার ফ্রান্সিস বাইক।’

ফ্রান্সিস বাইকের মুখ গম্ভীর। সে বলল, ‘আরও একটা কথা বলেননি ফাদার জেমস। সেটা হলো, আপনি অগ্রবর্তী ইদেজা ঘাঁটির তথ্য প্রধান। অতএব আপনার মতামতেরও মূল্য আছে।’

একটু থামল ফ্রান্সিস বাইক।

ফ্রান্সিস বাইকের কথায় ফাদার জেমস এর চোখ-মুখও লাল হয়ে উঠেছে। তার চোখে-মুখে অপমানিত হওয়ার চিহ্ন।

ফ্রান্সিস বাইক আবার শুরু করল, ‘দেখুন ফাদার জেমস, আমরা জন স্টিফেন এবং ফ্রাঁসোয়া বিবসিয়েরকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু আমরা বন্দীদের কথায় পরিচালিত হতে পারি না। বন্দী হওয়ার পর তারা আর আপনার কিংবা কারো নেতা নন। সুতরাং আমরা তাঁদের মতামতের কানা-কড়ি মূল্য দিতে রাজী নই। কথাটা আপনার কাছে পরিষ্কার?’

‘জি স্যার।’ মুখ নিচু করে বলল ফাদার জেমস।

‘এখন থেকে আপনার নেতৃত্বে চলবে ইদেজা ঘাঁটি। আর আমাদের না জানিয়ে কোন কথা বলবেন না জন স্টিফেনদের সাথে। ঠিক আছে?’

‘ঠিক আছে স্যার।’ মুখ না তুলেই বলল ফাদার জেমস। মুখ তুললে দেখা যেত, তার মুখে প্রবল অসন্তুষ্টির চিহ্ন। একটা পুরানো ঝড় তার মনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেঃ ‘আমরা কি সত্যই খৃষ্টের আধ্যাত্ম-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি, না ভুমি-লিপ্সা বা সাম্রাজ্য লিপ্সা চরিতার্থ করছি!’

কিছু বলতে যাচ্ছিল ফাদার জেমস। এই সময় মুখ খুলল ফ্রান্সিস বাইক। বলল, ‘মিঃ পিয়েরে পল, বসে থাকা তো যায় না। আমরা এখন কি করতে পারি?’

‘শয়তানটাকে খুঁজে বের করা এখন প্রধান কাজ।’

‘কিন্তু কিভাবে? তার কি কোন ফটো আছে?’

‘আছে। ফ্রান্সে।’

‘আপনি তো দেখেছেন।’

‘ফটো দেখেছি। কিন্তু সমস্যা হলো এক পোশাকে এবং এক মুখাবয়বে সে থাকে না।’

‘তবু আমরা মোটামুটি একটা বর্ণনা সহ একজন এশিয়ানের সন্ধানে লোক লাগাতে পারি।’

‘হ্যাঁ, তাই করতে হবে।’

কিছু বলতে যাচ্ছিল ফ্রান্সিস বাইক।

তার আগেই ইন্টারকম কথা বলে উঠল, ‘নাস্তা রেডি। মেহমান নিয়ে আসুন।’

ফ্রান্সিস বাইক এবং পিয়েরে পল উঠে দাঁড়াল। তার সাথে ফাদার জেমসও।

রোড ম্যাপ অনুসরণ করে আহমদ মুসা যখন ‘লা-ফ্যাংগ’ রোডে পৌছল তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা।

রাশিদি ইয়েসুগোর বাড়ি থেকে মাগরিবের নামায পড়ে ‘ওকুয়া’র গাড়ি থেকে পাওয়া ঠিকানা নিয়ে আহমদ মুসা বেরিয়েছে ওকুয়া অথবা কোক-এর ঘাঁটির সন্ধানে। আহমদ মুসা নিশ্চিত নয় যে ঠিকানা সে পেয়েছে তা ওকুয়া না কোক-এর ঘাঁটি, না তাদের কোন লোকের ঠিকানা ওটা।

আহমদ মুসার ইচ্ছা ছিল দিনের আলোতে ‘লা-ফ্যাংগ’ রোডে পৌছা, যাতে ঠিকানা খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু চীফ জাস্টিসের বাড়ি থেকে ফিরে গোসল করে খেয়ে রেষ্ট নিতে গিয়ে আহমদ মুসা ঘুমিয়ে পড়েছিল।

রাশিদি ইয়েসুগো ইচ্ছা করেই তাকে ডাকেনি। লায়লা ইয়েসুগো স্মরণ করিয়ে দিলে সে বলেছিল, ‘ঘুম তার প্রয়োজন বলেই এসেছে। যে ধকল গেছে গত কয়েক ঘন্টায়, ওর বিশ্রাম দরকার।’

‘কি মজা না ভাইয়া, মারিয়া জোসেফাইন আহমদ মুসার বাগদত্তা!’ বলেছিল লায়লা ইয়েসুগো।

‘ডাক নাম তো ডোনা জোসেফাইন, না?’

‘হ্যাঁ ভাইয়া, ফরাসী রাজকুমারী বলে নয়, তিনি আহমদ মুসার সত্যিই উপযুক্ত সঙ্গিনী।’

‘এত কিছু জেনে ফেলেছিস তুই?’

‘কেন, মুহাম্মাদ ইয়েকিনির কাছে তুমিও তো শুনলে! শুনলে না যে, তিনি আহমদ মুসার সন্ধানে একক সিদ্ধান্তে ফ্রান্স থেকে ক্যামেরুন চলে এসেছেন। শুনলে না, আজকের দু’টি ঘটনায় কি সাংঘাতিক পরিস্থিতিতে মারিয়া জোসেফাইন ‘ওকুয়া’র দু’জন লোককে হত্যা করেছে। কত বড় সাহস থাকলে এটা পারে বলত।’

‘কিন্তু তুই তো পিস্তল চালাতেও পারিস না।’

‘এর জন্যে তোমরা দায়ী। ইয়েসুগো পরিবারের মেয়েদের কাজ করা, পরিশ্রম করা তোমরা নিষিদ্ধ করে রেখেছ। কিন্তু আজ তোমাকে বলছি ভাইয়া, আমি শুধু পিস্তল নয়, মেশিন গানও চালাতে জানি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুটিং ক্লাবের সদস্য।’

‘তোকে অভিনন্দন লায়লা। ঐ নিষিদ্ধের কাজটা আমি করিনি। সংগ্রামের যে সময় এসেছে, তাতে ঐ অতীত ঐতিহ্য আর মানা যাবে না। ইসলামের সোনালী যুগে মেয়েরাও যুদ্ধ করেছে।’

‘ধন্যবাদ ভাইয়া’, বলে একটু থেমেছিল লায়লা। বলেছিল তারপর, ‘আমরা সত্যিই ভাগ্যবান ভাইয়া, কিংবদন্তির আহমদ মুসা আমাদের মেহমান এবং তার বাগদত্তা মারিয়া জোসেফাইন আমরা বন্ধু’।

‘তা বটে। তবে সত্যিকার আনন্দ আমাদের তখনই হবে, যখন তিনি বিজয়ী হবেন, মিশন যখন তার সফল হবে, যে সংগ্রামের মিশন নিয়ে তিনি ক্যামেরুনে এসেছেন।’

‘ক্যামেরুনে মুসলিম জাতির অস্তিত্ব যে বিনাশের মুখে, এ বিষয়টা তো আমরা এমন করে ভাবিনি যেমন করে ভেবে ছুটে এসেছেন আহমদ মুসা।’

‘ভেবেছি হয়ত আমরা। কিন্তু এ পরিণতি আমরা মেনে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এভাবে ধ্বংস হওয়াটাই আমাদের ভাগ্য, করার কিছু নেই।’

‘কিন্তু আহমদ মুসা তা ভাবেননি। তিনি জয়ের কথা ভেবেছেন, বিজয়ের জন্যেই তিনি ছুটে এসেছেন।’

‘এখানেই আহমদ মুসার সাথে আমাদের পার্থক্য।’

‘কিন্তু ভাইয়া, কিভাবে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করবেন?’

‘সামনে কি হবে আল্লাহই জানেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই তিনি যা ঘটিয়েছেন, তাতে সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। তুই তো শুনেছিস, কুন্তে কুম্বার চার দফা প্রস্তাব ইন্দেজার বন্দী নেতারা মেনে নিয়েছেন। তাদের নেতারা এটা মানবেন কিনা জানি না। তবে তারা এখন আক্রমণাত্বক অবস্থান থেকে রক্ষণাত্মক ভূমিকায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে।’

আহমদ মুসা যখন বাদ মাগরিব রাশিদি ইয়েসুগোর বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল, তখন সেখানে রাশিদি এবং ইয়েকিনি হাজির ছিল। রাশিদি ইয়েসুগো মুখ ভার করে বসেছিল, ‘আপনার যুক্তি খন্ডন করার সাধ্য আমাদের নেই। কিন্তু একা বের হচ্ছেন অভিযানে, আমার খুব খারাপ লাগছে আপনাকে একা ছেড়ে দিতে।’

‘ধন্যবাদ’ দিয়ে কোন কথা না বলে হেসে বিদায় নিয়েছিল আহমদ মুসা।

‘লা-ফ্যাংগ’ রোডের মাঝামাঝি জায়গায় নেমে গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছিল আহমদ মুসা।

‘লা-ফ্যাংগ’ ইয়াউন্ডির পুরানো এলাকার রাস্তা হলেও বেশ প্রশস্ত এবং সুন্দর সাজানো গুছানো।

মধ্য ক্যামেরুনের বিখ্যাত ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের নাম অনুসারে এই রাস্তার নামকরণ। শহরের এই অঞ্চলে ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের নিবাস।

আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির ভাড়া চুকিয়ে দিতে যাচ্ছে, এমন সময় সমবেত কন্ঠের হৈ চৈ ও চিৎকার শুনতে পেল। তাকিয়ে দেখল, পনের বিশজন লোক মহা হৈ চৈ-এর সাথে একজন লোককে তাড়া করছে। সবাই কৃষ্ণাংগ।

যাকে তাড়া করেছে সে পাগলের মত প্রাণপণে ছুটছে বাঁচার জন্যে। কিন্তু পারছে না। আক্রমণকারীদের সাথে তার দূরত্ব কমে আসছে।

কাছাকাছি এলে আহমদ মুসা দেখল, লোকটি আহত। কপাল দিয়ে নেমে আসা রক্তের ধারা মুখ প্লাবিত করে গড়িয়ে পড়ছে।

হৃদয়টা কেঁদে উঠল আহমদ মুসার।

ভাড়ার টাকাটা পকেটে রেখে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ফরাসী ভাষায় বলল, ‘দাঁড়াও তোমরা।’

আহমদ মুসার কথা শুনে পলায়নরত লোকটি আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়েই ছুটে এল এবং আহমদ মুসার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে ফরাসী ভাষায় বলল, ‘আমাকে বাঁচান। মেরে ফেলবে ওরা আমাকে।’

আক্রমণকারী লোকেরা মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়িয়েছিল। তারপরেই ওরা সমবেতভাবে এগুলো আবার আহমদ মুসার পায়ের কাছে পড়ে থাকা লোকটির দিকে। লোকগুলোর কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে ছোরা।

আহমদ মুসা পায়ের কাছে এসে পড়া লোকটিকে বাঁ হাত দিয়ে টেনে তুলে পাশে দাঁড় করাল। লোকটি দাঁড়িয়ে আহমদ মুসার পেছনে সরে এল।

আহমদ মুসা তার দিকে অগ্রসরমান লোকদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তোমরা আর এক পা এগুবে না। এভাবে তোমরা আইন হাতে তুলে নিতে পার না।’

কিন্তু ওরা আহমদ মুসার কথা শুনল না। আগে কয়েকজন এগিয়ে আসছিল, এবার সকলেই এগিয়ে আসতে শুরু করল।

আহমদ মুসা তার জ্যাকেটের পকেট থেকে মেশিন রিভলবার বের করে তাদের দিকে তাক করে কঠোর কন্ঠে বলল, ‘আর এক পা এগুলে গুলী চালাব। সবাইকে লাশ বানাব।’

এবার থমকে গেল ওদের এগিয়ে আসা।

ওদের মধ্যে একজন ফরাসী ভাষায় চিৎকার করে বলল, ‘ওকে আমাদের হাতে ছেড়ে দাও। ও আমাদের মেয়েকে কিডন্যাপ করেছে।’

‘একে তোমরা চেন?’

‘চিনি’, ওদের একজন বলল।

‘নাম জান?’

‘জানি।’

‘ঠিকানা জান?’

‘জানি।’

‘তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নাও। তোমাদেরকে আইন হাতে তুলে নিতে দেব না।’

কথা শেষ করেই আহমদ মুসা আহত লোকটিকে গাড়িতে উঠতে বলল এবং নিজেও পিছু হটে গাড়ির দিকে চলল।

আহমদ মুসারা চলে যাচ্ছে দেখে আক্রমণকারী লোকরাও এগিয়ে আসতে লাগল সতর্কতার সাথে।

আহত লোকটি আগেই গাড়িতে উঠে বসেছিল। আহমদ মুসাও উঠে বসল।

ওরা ছুটে এসে গাড়ি ঘেরাও করতে অগ্রসর হলো।

আহমদ মুসা গাড়ি ছাড়তে বলল ট্যাক্সিওয়ালাকে।

‘স্যার ওরা ‘ফ্যাংগ’ গোষ্ঠী। আমার গাড়ির নাম্বার দেখে ফেলেছে। পরে আমাকে ধরবে।’ গাড়ি স্টার্ট না দিয়েই বলল একথাগুলো।

‘দেখ আমি কাউকে দুইবার নির্দেশ দেই না। তোমার দোষ হবে কেন? তুমি নির্দেশ পালন করছ মাত্র।’ শান্ত অথচ কঠোর কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।

ট্যাক্সিওয়ালা আহমদ মুসার দিকে একবার চেয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল।

ইতিমধ্যেই গাড়িতে লাথি ও লাঠির বাড়ি এসে পড়তে শুরু করেছে।

কিন্তু সহজেই ওদের ঘেরাও ভেদ করে গাড়ি বেরিয়ে গেল।

আহমদ মুসা আহত লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কি?’

‘অগ্যাস্টিন ওকোচা।’

‘বল, তুমি কোথায় যাবে?’

‘লা-ফ্যাংগ’ রোডের মুখে ‘ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউ’তে আমার বাড়ি।’

‘ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউতে নিয়ে চল ড্রাইভার’, ট্যাক্সিওয়ালার দিকে চেয়ে বলল আহমদ মুসা।

‘ওরা যে অভিযোগ করল, সেটা সত্য কিনা ওকোচা?’ আহত লোকটির দিকে চেয়ে আহমদ মুসা বলল।

‘ওরা মিথ্যা কথা বলেছে। আমি কিডন্যাপ করিনি। আমরা পরস্পরকে বিয়ে করেছি।’

‘তাহলে ওদের ওরকম কথা বলা এবং সাংঘাতিক ক্রোধের কারণ কি?’

‘কারণ ওরা ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের এবং আমি ‘ওয়ান্ডি’ গোত্রের।’

‘শত্রুতা কিসের দুই গোত্রের মধ্যে?’

‘শত্রুতা নয়, আত্মসম্মানের প্রশ্ন।’

‘আত্মসম্মানের প্রশ্ন?’

‘এই দুই গোত্র অন্য গোত্রের মেয়ে নেয়াকে বিজয়ের এবং মেয়ে দেয়াকে পরাজয়ের মনে করে। আমরা শিকার হয়েছি এই মর্যাদা-সংকটের। আমার গোত্র আমার বিয়েকে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু ‘ফ্যাংগ’ গোত্র মেয়েটিকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। ব্যর্থ হওয়ায় আমাকে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছে।’

‘এ ধরনের সব বিয়েতেই কি এমন হয়?’

‘এতটা হয় না। আমার স্ত্রী ‘ফ্যাংগ’ গোত্রের সরদারের মেয়ে। তাদের গোত্র ও সরদারের অপমানে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। আপনি আশ্রয় না দিলে ওরা আজ আমাকে হত্যা করত।’ বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ওকোচা।

‘এই যখন অবস্থা তুমি সাবধান হওনি কেন?’

ওকোচা চোখ মুছে বলল, আমি সব সময় সাবধান। ‘ফ্যাংগ’ এরিয়ায় আমি আসি না। ফ্যাংগ গোত্রের আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মৃত্যু শয্যায়। গোপনে তাকে দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা প্রকাশ হয়ে পড়ায় আমি বিপদে পড়ে যাই।’

‘দুই গোত্রের মধ্যেকার এই বিরোধ বা ভুল বুঝাবুঝির সমাধান কি?’

‘শিক্ষিত হওয়া এবং সামাজিক রীতি-নীতির কিছু পরিবর্তন হওয়া।’

‘দুই গোত্র কোন ধর্মের অনুসারী?’

‘ফ্যাংগ গোত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের গোত্র ধর্মের অনুসারী। কিন্তু ওয়ান্ডী গোত্রের অর্ধেকই খৃস্টান। বাকি অর্ধেকের তিন ভাগের দুই ভাগ গোত্র ধর্মের এবং এক ভাগ মুসলমান। কিন্তু ফ্যাংগ গোত্রে খৃস্টানদের সংখ্যা খুবই নগন্য। সে গোত্রে গোত্র ধর্মের বাইরে যারা আছে তাদের চার ভাগের তিন ভাগই মুসলমান। তবে ফ্যাংগ গোত্রের খৃস্টানরা সংখ্যায় নগণ্য হলেও তারা শিক্ষিত বিত্তবান এবং প্রভাবশালী।’

‘ফ্যাংগ গোত্রে খৃস্টানের সংখ্যা কম এবং ওয়ান্ডি গোত্রে খৃস্টানের সংখ্যা বেশি কেন?’

‘ফ্যাংগ গোত্রের সাথে উত্তরের মুসলিম প্রধান ফুলানি গোত্রের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে যে কারণে খৃস্টানরা উত্তরের ফুলানী গোত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি, সে কারণেই সম্ভবত ফ্যাংগ গোত্রের উপর খৃস্টানদের প্রভাব কার্যকর হয়নি।’

আহমদ মুসার বুঝতে বাকি রইল না ওয়ান্ডি গোত্র পুরোপুরিই খৃস্টান প্রভাবিত, ফ্যাংগ গোত্র তা নয়। কিন্তু আহমদ মুসা ওকুয়া’র যে দুটি ঠিকানা নিয়ে এসেছে তার একটি ‘ফ্যাংগ’ রোডে, অন্যটি ‘ওয়ান্টি’ এ্যাভেনিউতে। খৃস্টান প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে তো ‘ফ্যাংগ’ রোডে ওকুয়া’র কোন ঘাঁটি থাকার কথা নয়। আহমদ মুসার মনে পড়ল ‘ওকোচা’র কথা। ‘ফ্যাংগ’ গোত্রে খৃস্টানদের সংখ্যা কম হলেও কম সংখ্যক খৃস্টান যারা আছে তারা বুদ্ধিমান, বিত্তবান ও প্রভাবশালী। সুতরাং তাদের আশ্রয়ে ‘ওকুয়া’র ঘাঁটি গড়ে উঠতেই পারে।

‘ওয়ান্ডি’ এ্যাভেনিউ-এর বিশাল বাড়ির গেটের সামনে আহমদ মুসার গাড়ি দাঁড়াল।

‘ওকোচা’ গাড়ি থেকে মুখ বের করে একটা সংকেত দিল। সংকেতটাকে আহমদ মুসার কাছে গেরিলার বন্ধু বৎসল ডাক-এর মত মনে হলো।

ওকোচা’র সংকেতের সাথে সাথেই গেটের দরজা খুলে গেল।

আহমদ মুসা বলল, ‘ভেতরে যাবার তো প্রয়োজন নেই।’

‘একটু কষ্ট করুন।’ বলল ওকোচা।

গাড়ি গিয়ে গাড়ি বারান্দায় প্রবেশ করল।

গাড়ি থেকে নামল ওকোচা।

গাড়ি ঘুরে এসে আহমদ মুসার দরজা খুলে ধরে ওকোচা বলল, ‘দয়া করে একটু নামুন।’

‘ওকোচা, আমি জরুরী কাজে বেরিয়েছি। আমি সময় নষ্ট করতে পারবো না। আমাকে মাফ কর।’

‘তুমি বলে সম্বোধন করে আমাকে ছোট ভাইয়ের মর্যাদা দিয়েছেন, আমার বাড়িতে একটু পদধুলি দিয়ে আমাকে ধন্য করুন।’

আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে।

ওকোচা আহমদ মুসাকে নিয়ে প্রবেশ করল ড্রইংরুমে।

ততক্ষনে রক্তাক্ত ওকোচার খবর বাড়ির ভেতরে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যস্তভাবে বাড়ির সকলেই এসে প্রবেশ করল ড্রইংরুমে।

একজন মাঝ বয়সী মহিলা আর্তনাদ করে জড়িয়ে ধরল ওকোচাকে। আরেকজন তরুণী, এক বাক্যেই যাকে ব্ল্যাক বিউটি বলা যায়, তাকিয়ে ছিল উদ্বেগ ও বেদনা পীড়িত দৃষ্টি নিয়ে ওকোচার দিকে। আরও অনেকের মধ্যে সর্বাগ্রে এসে দাড়িয়েঁছিল অটুট স্বাস্থ্যের একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক। আহমদ মুসার বুঝতে অসুবিধা হলো না, মাঝ বয়সী মহিলাটি ওকোচার মা, তরুণীটি স্ত্রী এবং প্রৌঢ় ভদ্রলোক তার আব্বা।

‘ওকোচা ঘটনা কি, আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।’ উদ্বেগ মেশানো গম্ভীর কণ্ঠে বলল ভদ্রলোকটি।

ওকোচা তার মা’কে শান্ত করে তার আব্বার দিকে তাকাল এবং আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ‘আব্বা, এই ভদ্রলোককে আমি জানি না, তার নামও এখনো আমি শুনিনি। কিন্তু তিনি দেবদূতের মত আর্বিভূত হয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন। তিনি বাঁচাতে এগিয়ে না এলে এখন আমার লাশ পড়ে থাকতো ‘লা ফ্যাংগ’ রোডে।’

‘কেন? ব্যাপার কি? ফ্যাংগ’রা তোমাকে . . ..

‘হ্যাঁ, আব্বা। ওরা টের পেয়ে যায় যে, আমি বন্ধুর বাড়িতে গেছি। ওরা পনের বিশ জন আমাকে আক্রমণ করে ফেরার পথে ওবাড়ি থেকে বের হবার পরই। আহত অবস্থায় আমি দৌড়ে পালাচ্ছিলাম। ইনি বিদেশী বলেই বোধ হয় সাহায্য করতে আসেন। এঁর হাত থেকেও ওরা আমাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। ইনি রিভলবার বের করে ওদের মাথা গুঁড়িয়ে দেবার হুমকি না দিলে আমাকে ছিনিয়েই নিয়ে যেত।’

চোখ লাল হয়ে উঠল ওকোচার আব্বার। ভয়ংকর হয়ে উঠল তার কাল মুখ। বলল, ‘তুমি চেন তাদের?’

‘কয়েকজনকে চিনি।’

‘তাদের বাড়ি?’

‘আমার বন্ধু ‘সেবজী’র বাড়ির পাশের ওরা।’

‘আজ রাতেই এর প্রতিশোধ আমি নেব।’ হুংকার দিয়ে উঠল অগাষ্টিন ওকোচার আব্বা।

বলে সে কয়েক ধাপ সামনে এগিয়ে এসে আহমদ মুসার সামনে দাড়িয়ে তার একটা হাত তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে বলল, ‘আমরা আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। তুমি একটু বসো বাবা। আমি একটু বেরুব।’

আহমদ মুসা দেখল ওকোচার আব্বা শান্তভাবে কথা বলতে চেষ্টা করলেও তার মুখের ভয়ংকর ভাব যায়নি এবং তার চোখে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে।

আহমদ মুসা বুঝল সে কোথায় যাচ্চে। বাইরে যাচ্ছে দল গুছাতে। তারপরই যাবে অভিযানে।

‘আমি একটা কথা বলতে পারি আপনাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে?’ ওকোচার আব্বার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।

‘অবশ্যই বলবে।’ ওকোচার আব্বা চলতে শুর করেও থমকে দাঁড়িয়ে বলল।

‘আমার মত হলো এ ধরণের পাল্টা অভিযানে না যাওয়াই ভালো।’

‘কেন?’

‘এতে বিরোধ আরও বিস্তৃত হবে।’

‘তা হবে। কিন্তু আমার প্রতিশোধ নেয়া হযে যাবে।’

‘আইনের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়া যায়। ওদের চেনেন। ওদের বিরুদ্ধে মামলা দিন।’

হাসল ওকোচার আব্বা। বলল, ‘তুমি সভ্য দেশের মানুষ, জংগলের আইন জান না। এখানে শক্তি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, আইন দিয়ে নয়।’

‘কিন্তু এরপরও আমি বলব, যে ইস্যু নিয়ে এই বিরোধ, তাতে এই বিরোধ মিটিয়ে ফেলার মধ্যেই কল্যাণ আছে।’

‘আমি এটাই চেয়েছিলাম। কিন্তু ফ্যাংগরা আজ বুঝিয়ে দিয়েছে তারা বিরোধ চায়, রক্তারক্তি চায়। আমি আজ রাতেই ওদের শতজনকে হত্যা করে ওদের চাওয়া পূরন করতে চাই। আমি অনেক ধৈর্য ধরেছি। আমি চাইলে ফ্যাংগদের মাথা অনেক আগেই গুড়িয়ে দিতে পারতাম। এবার তাই করব।’

‘আমার একটা প্রস্তাব আছে।’

‘কি প্রস্তাব?’

‘আপনি যদি এই মূহুর্তে কিছু করতেই চান, তাহলে সশস্ত্র অভিযানে না গিয়ে সশস্ত্রভাবে সোজা ফ্যাংগদের সর্দার অর্থাৎ ওকোচার শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে উঠুন এবং ওকোচার রক্ত মাখা শার্ট ওকোচার শ্বশুরকে উপহার দিন। কোন কথা তাকে বলবেন না। শুধু জানাবেন ‘ফ্যাংগদের আক্রমনে আহত ওকোচার শার্ট।’ ফেরার সময় পারলে একটা সাদা গোলাপ পা দিয়ে মাড়িয়ে আসবেন।’

শেষের বাক্যটা বলতে গিয়ে হাসল আহমদ মুসা।

কিন্তু আর কেউ হাসল না। ওকোচার আব্বা, ওকোচা, তার তিন বড় ভাই, ওকোচার মা ও স্ত্রী সকলেই স্তম্ভিত আহমদ মুসার কথায়। যেন তারা অবিশ্বাস্য কোন দৃশ্য দেখছে, এইভাবে তাকিয়ে আছে আহমদ মুসার দিকে।

চোখভরা বিস্ময় নিয়ে ওকোচার আব্বা দু’ধাপ এগিয়ে এল আহমদ মুসার একদম মুখোমুখি। তারপর ডান হাত দিয়ে আহমদ মুসার মুখ ঈষত তুলে ধরে বলল, ‘তুমি কে বাবা? এমন অদ্ভুত চিন্তা তোমার মাথায় এল কি করে? আমার মনে হচ্ছে, শতজনকে হত্যা করার চাইতেও এটা তৃপ্তিদায়ক হবে।’

কথা শেষ করেই সে ঘুরে দাঁড়াল এবং ছেলেদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমি এখনি যাব। সকলকে খবর দাও। তিনটি গাড়িতে যাব। সবাই সব রকমের অস্ত্রসজ্জিত হবে।’

ওকোচার আব্বা কথা শেষ করতেই আহমদ মুসা বলল, ‘আমাকে এবার বিদায় দিন।’

ওকোচার দিকে চেয়ে বলল, ‘চলি আমি।’

ওকোচার আব্বা কথা শুনেই হৈ চৈ করে উঠল। বলল, ‘যাবে মানে? তুমি তো বসোইনি। মেহমানদারী কিছুই হয়নি।’

বলেই সে তাড়া দিল সেই মাঝ বয়সী মহিলা ও তরুণীটিকে। কিন্তু পরক্ষণেই বলল, ‘দাঁড়াও দাঁড়াও, কারো সাথেই তো পরিচয় হয়নি।’

ওকোচার আব্বা একে একে স্ত্রী, পুত্রবধু এবং ওকোচার তিন ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।

পরিচিত হবার পর ওকোচার মা বলল, ‘বাছা, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুক।’ আর ওকোচার স্ত্রী বলল, ‘আমরা আপনার কাছে ঋণী থাকব চিরদিন।’

আহমদ মুসা তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে ওকোচার আব্বার দিকে চেয়ে হাত জোড় করে বলল, ‘মাফ করুন আজ আমি যাই। জরুরী কাজ আছে।’

‘তাহলে যাবেই? কথা দাও আসবে আরেকদিন।’

‘কথা দিতে পারবনা। যদি সম্ভব হয় আসব।’

বলে আহম্মদ মুসা সকল কে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করল।

তার পাশাপাশি হাঁটতে লাগল ওকোচা।

ওকোচার আব্বাও ড্রইং রুমের দরজা পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দিল।

ওকোচা আহমদ মুসার গাড়ির দরজা খুলে ধরে বলল, ‘কোথায় যাবেন?’

আহমদ মুসা গাড়িতে ঢোকার জন্যে নিচু হয়েও আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।

হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বন্ধুদের একটা আড্ডায় যাব।’

বলে আহমদ মুসা ঢুকে গেল গাড়িতে।

ওকোচা গাড়ির জানালায় মুখ রেখে বলল, ‘ভাইয়া কবে আশা করব আপনাকে আমাদের বাড়িতে?’

‘গড নোজ।‘ হেসে বলল আহমদ মুসা।

গাড়ি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল।

ওকোচা হাত নেড়ে বিদায় জানাল।

গাড়ি চলে গেলেও ওকোচা দাড়িয়ে ছিল।

তার আব্বা এসে তার পাশাপাশি দাঁড়াল। বলল, ‘ওকোচা, নাম কি পরিচয় কি জেনেছ?’

ওকোচা ঝট করে ঘুরে দাড়াল তার পিতার দিকে। দুঃখিত কণ্ঠে বলল, ‘কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি। নাম কি, কি পরিচয়, কোথায় উঠেছেন, কিছুই জানি না।’

‘ভুল আমাদের হয়েছে। আমরা কিছু জিজ্ঞেস করলাম না কেন?’

‘এ যে কত বড় ভুল, উনি কি মনে করবেন ভাবতে আমার লজ্জা লাগছে।’

‘ওর সম্পর্কে যা শুনলাম তোমাকে বাঁচাবার ব্যাপারে এবং যা বুঝলাম অল্প সময়ে, ও কোন সাধারণ ছেলে নয়। কিছুই মনে করবে না। কিন্তু ওর পরিচয় ও নাম জানা একটা সাধারণ সৌজন্যের জন্যেও প্রয়োজন ছিল।’

‘সত্যি খুব খারাপ লাগছে আব্বা। বলতে গেলে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে উনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।’

‘কোথায় গেল জান?’

‘বন্ধুদের আড্ডায়, ঠিকানা বলেননি।’

‘চাইলে সেও তার নাম ও পরিচয় জানাতে পারত কিন্তু সে ইচ্ছা তার ছিল না।’

বলে একটু থামল। তারপর বলল, ‘চল ভেতরে। ডাক্তার এখনি এসে পড়বে।’

দুজনেই আবার ড্রইং রুমে প্রবেশ করল।

ওকোচার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আহমদ মুসা ভাবল তার তো ইচ্ছা ছিল লা ফ্যাংগ রোডের ওকুয়া’র ঘাটিতে প্রথম হানা দেয়া। কিন্তু ঘটনাচক্র তাকে নিয়ে এসেছে ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউতে। সুতরাং ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউর ওকুয়া’র ঠিকানায় প্রথম যাবে সে।

৭০ নম্বর ওয়ান্ডি এ্যাভেনিউ আহমদ মুসার টার্গেট, কিন্তু গাড়ি থেকে নামল ৬৫ নম্বরে।

ট্যাক্সিওয়ালাকে ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা ফেল্ট হ্যাটটা মাথায় তুলে ধীরে ধীরে এগুলো ৭০ নাম্বারের দিকে।

৭০ নাম্বার একটি বড় চার তলা বিল্ডিং। উত্তর মুখী বাড়িটির পূর্ব পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ওয়ান্ডি এভেনিউ থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে।

বাড়িটির দিকে একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে আহমদ মুসা বাড়ির সামনে দিয়ে একবার হেঁটে গেল। দেখল বাড়িটার পশ্চিম পাশে দিয়েও একটা গলি দক্ষিণ দিক থেকে এসে ফুটপাতে মিশেছে। দেখেই বুঝা যায় গলিটা গাড়ি-ঘোড়া চলার জন্যে নয়, মাত্র পায়ে হাঁটার পথ।

আরও দেখল বাড়িটার সামনে একটা লন। লনের দু’পাশে গাড়ি দাড়ানো। লনটা প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীর চার ফুটের মত উচু। তার উপর তিন ফুটের মত গ্রিলের প্রাচীর।

বিশাল গেট পেরিয়ে লনে প্রবেশ করতে হয়। গেট পুরু ইস্পাতের প্লেট দিয়ে ঢাকা।

গেটের এক পাশে গার্ড রুম।

লন থেকে প্রশস্ত সিড়ির প্রায় ৬টির মত ধাপ পেরিয়ে তবেই এক তলার মেঝেতে উঠা যায়।

বাড়িটির দিকে তাকিয়েই আহমদ মুসার মনে হলো এটা একটা অফিস বিল্ডিং।

আহমদ মুসা বাড়িটার পশ্চিম পাশের লেন দিয়ে বাড়ির পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকটা ঘুরে এল। দক্ষিণ দিকের গলি পথটা আসলে একটা সুয়ারেজ প্যাসেজ।

আহমদ মুসা ফুটপাতে দাড়িয়ে এখন কি করবে তা ভাবতে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। সবে সাড়ে ৭টা।

কিন্তু পরক্ষনেই সে ভাবল। কি করবে তা ভাবার আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে এই বাড়িটা সত্যিই ওকুয়া’র কোন ঘাঁটি বা তাদের কোন লোকের বাড়ি বা অফিস কিনা।

জানার উপায় কি?

গেটে জিজ্ঞেস করা নিরাপদ নয়। ওকুয়া ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে আছে। সব বিদেশী, বিশেষ করে এশিয়ানকে তাদের সবাই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে।

আহমদ মুসার মনে পড়ল ওকোচার কথা। তাকে এঠিকানার কথা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয় জানা যেত। কিন্তু যা গত হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে আর লাভ নেই।

বাকি থাকে বাড়িতে প্রবেশ করে জানা। বাড়িতে প্রবেশ করার কথাই ভাবল আহমদ মুসা।

কিন্তু পরক্ষনেই ভাবল গেটম্যানকে একবার বাজিয়ে তো দেখা যায়।

ভাবনার সাথে সাথেই আহমদ মুসা পকেটে থেকে একটা কাঁচা-পাকা গোঁফ বের করে পরে নিল। এবং পকেট থেকে ফোল্ডেড লাঠি বের করে লাঠি বানিয়ে স্বাস্থ্যসন্ধানী সন্ধ্যা ভ্রমণকারী সাজলো।

ধীরে ধীরে এগুলো ফুটপাত ধরে গেটের দিকে। তার হাতের লাঠি ফুটপাতের শক্ত বুকে ঠক ঠক শব্দ তুলল।

গেটে গিয়ে সে দাড়াল।

গেট এলাকা উজ্জ্বল আলোতে প্লাবিত।

আহমদ মুসা গেটের মুখোমুখি হয়ে গোটা গেটের উপর চোখ বুলালো। যেন সে সাইনবোর্ড সন্ধান করছে।

গেটের গার্ড রুমের একটি জানালা বাইরের দিকে।

জানালা দিয়ে গার্ড মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘মশায় কি খুঁজেন?’

‘অফিসের সাইনবোর্ড নেই?’

‘না, এটা অফিস নয়। কোন অফিস খুঁজছেন?’

‘কিংডম অব ক্রাইস্ট কে চেনেন? একজন বলেছিল এখানে কোথাও তার অফিস।’

‘চিনি। কিন্তু এখানে কোথাও তো তাদের অফিস নেই। কত নম্বর বলেছিল?’

‘যতদূর মনে পড়ে ৭০ নম্বর বলেছিল।’

‘না এটা কিংডম অব ক্রাইস্ট এর অফিস নয়। কে ঠিকানাটা দিয়েছিল?’

‘গির্জার একজন ভাল খৃস্টান কর্মীর কাছ থেকে পেয়েছিলাম। খৃস্টের জন্য আমি কিছু উইল করে যেতে চাই।’

‘গার্ড উত্তরে তৎক্ষনাৎ কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপর বলল উনি কিছুটা ঠিকই বলেছিলেন। এটা কিংডম অব ক্রাইস্ট (কোক) এর অফিস নয়, তবে ঐ সংস্থার বন্ধুরা এখানে থাকেন। তাদেরকে বললেই আপনার কাজ হয়ে যাবে। সব ব্যবস্থা করে দেবেন তারা। কালকে একবার আসুন।’

‘কেন সন্ধ্যায় ওঁরা থাকেন না?’

‘থাকেন, আছেন কিন্তু রাতে দেখা হবে না।’

‘ও আচ্ছা। কখন এলে পাওয়া যাবে? এটা কি ওদের বাড়ি?’

‘বাড়ি না ঠিক। কালকে আসুন। বলে গার্ড সরে গেল জানালা থেকে।’

ও চলে গেলে ক্ষতি নেই আহমদ মুসার। যা জানবার তা জানা হয়ে গেছে। এটা ওকুয়া’র একটা ঘাঁটি তাতে কোন সন্দেহ নেই এখন আহমদ মুসার। আরো একটা জিনিস মনে হল, চার তলা বাড়ির বিশালত্ব প্রমান করে এটা ওকুয়া’র কোন ছোটখাট ঘাঁটি নয়।

আহমদ মুসা সরে এল বাড়িটার সামনে থেকে। তারপর সিদ্ধান্ত নেবার জন্য দাড়াল ফুটপাতের এক প্রান্তে।

বাড়িটাতে প্রবেশ করা দরকার দুইটা কারনে। ওমর বায়াকে ওরা কোথায় বন্ধি করে রেখেছে তা জানার একটা পথ হতে পারে। অথবা ওমর বায়াদের পেয়েও যেতে পারে।

সময় সম্পর্কে চিন্তা করল আহমদ মুসা। এ ধরনের অভিযানের জন্যে দুইটা সময় ভাল। এক হলো সন্ধ্যা রাত, দুই গভীর রাত। আহমদ মুসা সন্ধ্যা রাতকেই পছন্দ করল।

চোখ বন্ধ করে বাড়ির চার দিকের দৃশ্যটা সামনে এনে বাড়িটিতে ঢুকার পথ সম্পর্কে চিন্তা করল।

বাড়িটার দুই পাশে এবং পেছনের দিকে কোন ব্যালকনি নেই। পেছনে চাকর-বাকরদের একটা দরজা থাকে, সেটাও নেই। বেয়ে উপরে উঠার মত পানির পাইপও নেই।

দুইটা পথই মাত্র খোলা আছে বাড়িতে ঢোকার, ছাদের কার্নিশে হুক আটকিয়ে কর্ড বেয়ে ছাদে উঠা অথবা সামনে একদম সদর দরজা পথে।

সন্ধ্যা রাতে কর্ড বেয়ে ছাদে উঠা বিপজ্জনক। সুতরাং পথ একটাই খোলা সামনে দিয়ে সদর দরজা পথে।

চোখ বন্ধ করে বাড়ির সামনেটা আবার সামনে নিয়ে এল আহমদ মুসা।

সামনে দিয়ে প্রবেশের দুইটা পথ। গেটের গার্ডকে পরাভূত করে তার পোশাক পরে বাড়িটে প্রবেশ করা। দ্বিতীয় গার্ডের চোখ এড়িয়ে পুব অথবা পশ্চিম দিকের প্রাচীর যেখানে একতলার বারান্দার সাথে মিশেছে সেখান দিয়ে প্রবেশ করা। অবশ্য এ জায়গায় প্রাচীরের উচ্চতা সাত ফিটের মত এবং তার উপর চার ফিট গ্রিলের বেড়া। এখানে বারান্দা থেকে প্রাচীরের শীর্ষ দেশ মাত্র চার ফুটোর মত উঁচু। অর্থাৎ চার ফিটের গ্রীলের বাধা পার হলেই বারান্দা। আরেকটা সুযোগ হলো, গ্রীলের ফাঁক দিয়ে আহমদ মুসা দেখেছে রেলিং-এর ধার ঘেঁষে বারান্দায় ফুলের টব সাজানো। অনেক টবে পাতা ওয়ালা বেশ বড়-সড় গাছও আছে,যা আড়াল হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রাচীরের শীর্ষদেশ পর্যন্ত ওঠা সহজ। লাফ দিয়ে উঠে প্রাচীরের গ্রীল ধরতে পারলে নিমিষেই বারান্দায় চলে যাওয়া যাবে।

সামনে দিয়ে প্রবেশের এই দ্বিতীয় পথটাই পছন্দ করল আহমদ মুসা।

হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ৮টা।

আহমদ মুসা ধীরে ধীরে এগুলো পশ্চিম প্রাচীরের সেই দক্ষিন প্রান্তের দিকে। বাড়ির পশ্চিম দিকের লেনটাতে দু’একজন লোক ক্বচিত দেখা যায়।

কোন দেয়ালের গা বেয়ে পাঁচ সাত ফিট লাফিয়ে ওঠা আহমদ মুসার কাছে নস্যি।

আহমদ মুসার কোনই কষ্ট হলো না প্রাচীরের গা বেয়ে লাফিয়ে উঠে গ্রিল ধরে বারান্দায় গিয়ে নামতে।

বারান্দায় টবের পাশে বসে তাকাল গেটের দিকে এবং বারান্দার দিকে। দেখল গেট রুমের কোন দরজা বা জানালা দক্ষিন দিকে নেই। বুঝল, একটাই জানালা উত্তর দিকে আর দরজা পশ্চিম পাশে গেটের পাশাপাশি।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচল আহমদ মুসা। দেখল বারান্দায়ও কেউ নেই।

টবের পাশে নিজেকে গুটিয়ে রেখে ভেতরে প্রবেশের উপায় সম্পর্কে চিন্তা করল।

তার সামনে পুব-পশ্চিম লম্বা বারান্দা।

বারান্দা থেকে ভেতরে প্রবেশের তিনটি দরজা। মাঝ বরাবর একটি। দু’প্রান্তে দুটি।

আহমদ মুসা লক্ষ্য করল তার প্রান্তে যে দরজা রয়েছে, তার লক পয়েন্টে বড় ধরনের একটা লাল বিন্দু জ্বল জ্বল করছে। কিন্তু অন্য দু’টি দরজায় তা নেই। তার বদলে ঐ দু’টি দরজার লক পয়েন্টে রয়েছে জ্বলজ্বল সবুজ চোখ।

আহমদ মুসার কাছে এই আলোক সংকেতের সরলার্থ দাঁড়ায়, লাল সংকেতের দরজায় নক করা যাবে না, প্রবেশের জন্যে এ দরজা নয়। সবুজ চিহ্নিত দরজা দু’টি প্রবেশের।

গেটের দিক থেকে শব্দ পেয়ে আহমদ মুসার চিন্তায় ছেদ পড়ল। তাকাল আহমদ মুসা গেটের দিকে।

দেখল, একটা গাড়ি ঢুকছে গেট দিয়ে।

গাড়িটি এসে দাঁড়াল বারান্দার সিঁড়ির গা ঘেঁষে।

গাড়ি থেকে নামল তিনজন লোক, একজন স্বেতাংগ, দু’জন আফ্রিকান কৃষ্ণাংগ।

তারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল বারান্দায়।

আহমদ মুসার হাতে রিভলবার আগে থেকেই ছিল। আশংকিত হবার চেয়ে খুশী হলো সে ওদের দেখে। ওরা কিভাবে দরজা খোলে দেখা যাবে।

আহমদ মুসা পকেট থেকে মাইক্রো দূরবীণ বের করে হাতে নিল। আহমদ মুসা লক্ষ্য করল, ওরা তিনজন বারান্দায় আহমদ মুসার প্রান্তের দিকে এগিয়ে আসছে।

বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। তার মেশিন পিস্তলের ট্রিগারে আঙুল রাখল সে।

কিন্তু ওরা তিনজন গিয়ে দাঁড়াল লাল সংকেতওয়ালা আহমদ মুসার প্রান্তের দরজার সামনে।

আহমদ মুসা মাইক্রো দূরবীণ তার চোখে লাগাল।

মাইক্রো দূরবীণ একটি বিশেষ আধারে স্থাপিত একটা ক্ষুদ্র কাঁচ খন্ড। পেন্সিল কাটারের মত এ ক্ষুদ্র দূরবীণ দিয়ে পাঁচ ফিট থেকে সিকি মাইল দূর পর্যন্ত স্থানের আলপিনের মরিচাও সুস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।

তিনজনের মধ্যকার শ্বেতাংগ লোকটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লাল সংকেতের ঠিক উপরে দরজার গায়ে তর্জনি দিয়ে টোকা দিল ছয়টি।

আহমদ মুসা পরিস্কার দেখতে পেল, লাল সংকেতের ঠিক উপওে দরজার রঙের সাথে মিশানো আয়াতকার একটা ছক। তাতে শূন্য থেকে নয় পর্যন্ত অংকগুলো ক্রমিকভাবে সাজানো। অংকগুলোও ঠিক দরজার রঙের। সতর্ক দৃষ্টি না হলে খুঁজে পাবার কথা নয়। আহমদ মুসা আবারও দেখল, শ্বেতাংগ লোকটির তর্জনি তিন, ছয় ও নয়-এর উপর ক্রমিকভাবে দুইবার ঘুরে এল। একবার উর্ধ ক্রমিক, একবার নিম্ন ক্রমিক।

শ্বেতাংগ লোকটির ছয়টি টোকা সম্পন্ন হবার সাথে সাথে লাল সিগন্যালটি নিভে গেল। সেখানে জ্বলে উঠল সবুজ সংকেত। আর তার সাথে সাথেই খুলে গেল দরজা।

ওরা তিনজন ভেতরে ঢুকে গেল।

বিস্ময়ের সাথে আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করল আহমদ মুসা, এ দরজার লাল আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথে মাঝের দরজার সবুজ সংকেত নিভে গিয়ে লাল সংকেত জ্বলে উঠল। অল্পক্ষণ পরে পূর্ব প্রান্তের দরজাটিরও সবুজ সংকেত নিভে লাল সংকেত জ্বলে উঠল। পরে সবগুলো সংকেতই একে একে তার সাবেক অবস্থায় ফিরে এল।

ঐ দুই দরজার রং পরিবর্তনের খেলা আহমদ মুসা কিছুই বুঝল না।

ওরা তিনজন চলে যাবার পর আহমদ মুসা মিনিট দশেক অপেক্ষা করল। তারপর গেটের দিকে তাকাল। দেখল দরজা বন্ধ। গার্ড রুমের দরজা খোলা। কিন্তু গার্ডকে দেখা যচ্ছে না।

বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা দ্রুত বেরিয়ে এল টবের আড়াল থেকে। কয়েক ধাপে পৌঁছে গেল দরজার সামনে। দ্রুত হাতে সে লাল সংকেতের উপরের ছকটায় শাহাদাত আঙুলি দিয়ে আঘাত করল উল্লেখিত তিনটি নম্বরে, যেমন সে দেখেছিল।

সংগে সংগেই লাল সংকেতের জায়গায় জ্বলে উঠল সবুজ সংকেত।

খুলে গেল দরজা।

আহমদ মুসা প্রবেশ করল ভেতরে।

পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ভেতরটা দেখেই অবাক হয়ে গেল আহমদ মুসা। লিফট রুমের মত একটা কক্ষ। তার তিন দিকেই দেয়াল, পেছনে বাইরে যাবার দরজা।

মনে চিন্তা উদয় হলো আহমদ মুসার, সে কি তাহলে ফাঁদে পড়ল!

পরক্ষণেই ভাবল, জ্বলজ্যান্ত তিনজন লোক এই মাত্র ঢুকল, তারা চলে গেছে, নিশ্চই এর আরো দরজা আছে।

চারদিকে তীক্ষ্মভাবে নজর বুলাতে গিয়ে আহমদ মুসা পুব দিকের দেয়ালে ৪ ফুটের মত উচ্চতায় কাঠ রঙা দুই অংকের একটা ছক খুঁজে পেল। অংক দু’টি হলো তিন এবং ছয়।

খুশীতে মনটা নেচে উঠল আহমদ মুসার। দরজা খোলারই ‘কি’ বোর্ড এটা। কিন্তু দুইটা অংক কেন?

হঠাৎ আহমদ মুসার মনে এ চিন্তা উদয় হলো যে, তিন কোড সংকেতের একটি ‘নয়’, এখানে নেই। তাহলে ‘নয়’ কে বাদ দিয়ে অন্য সিস্টেম কি এখানে রাখা হয়েছে?

চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা অংক দু’টিতে ঠিক আগের মতই একবার উর্ধ ক্রমিক, একবার নিম্ন ক্রমিকে টোকা দিল।

সাথে সাথেই খুলে গেল দরজা। দরজার পরে যে কক্ষে আহমদ মুসা প্রবেশ করল, তা আগের ন্যায়ই লিফট রুমের মত একটা কক্ষ।

হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল বাইরে পরের দু’টি দরজার সবুজ সংকেত লাল হয়ে যাওয়া ও পরে তা আবার সবুজ হয়ে যাবার কথা। বুঝল আহমদ মুসা, বাইরের তিনটি দরজার পেছনেই তিনটি লিফট রুমের মত কক্ষ আছে যাতে রয়েছে বাইরের মতই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত দরজা। প্রথম দরজা যখন সবুজ সংকেত জ্বলে, তখন দ্বিতীয় দরজায় লাল সংকেত জ্বলে ওঠে। প্রথম কক্ষ থেকে যখন দ্বিতীয় কক্ষে প্রবেশ করা হয়, তখন বাইরে দ্বিতীয় সবুজ সংকেত জ্বলে ওঠে, আর তৃতীয় দরজায় জ্বলে লাল সংকেত। যখন দরজা খুলে তৃতীয় কক্ষে প্রবেশ করা হয় তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দরজায় সবুজ সংকেত জ্বলে ওঠে।

প্রথম কক্ষের মতই দ্বিতীয় কক্ষের পুব দিকের দেয়ালের ঠিক একই স্থানে এক অংকের একটা ছক খুঁজে পেল আহমদ মুসা। সে অংকটা ‘তিন’। হিসাবে ‘তিন’-ই হওয়া উচিত। ‘তিন’ না হলেই বিপদে পড়ত আহমদ মুসা।

‘তিন’ অংকটি তর্জনি দিয়ে পুর্বের রীতি অনুসারে দুই বার টোকা দিল আহমদ মুসা।

দরজা খুলে গেল আগের মতই সংগে সংগে। তৃতীয় কক্ষে প্রবেশ করল আহমদ মুসা।

কিছুক্ষণ দাঁড়াল কক্ষটির মাঝখানে। সে নিশ্চিত এই কক্ষেরই ভেতরে প্রবেশের পথ আছে।

আহমদ মুসা কক্ষটির বিশেষ করে দক্ষিণ দেয়ালের উপর সতর্ক দৃষ্টি বুলাল। আহমদ মুসার ধারণা ভেতরে যাবার দরজা এই দেয়ালেই থাকবে। ভাগ্যবান আহমদ মুসা, দেয়ালের ঠিক মাঝখানে সেই চার ফুট উপরে কাঠ রংয়ের একটা ‘শূন্য’ খুঁজে পেল।

খুঁজে পেয়ে খুশী হলো আহমদ মুসা। কিন্তু চিন্তায় পড়ল ‘কোড’ ভাঙা নিয়ে । দরজা খোলার জন্যে ‘শূন্য’ অংকে কয়টা টোকা দিতে হবে? যুক্তি বলে, আগের তিন দরজার ক্রমিক অনুসারে হয় একটা টোকা দিতে হবে, নয়তো সর্বোচ্চ নয়টি টোকা দিতে হয়।

আহমদ মুসা প্রথমে শূন্য অংকে একটা টোকা দিল। তারপর অপেক্ষা করল। না, দরজা খোলার নাম নেই। পরে গুনে গুনে শূন্যের উপর নয়টি টোকা দিল। এবার অপেক্ষা করতে হলো না। শেষ টোকা পড়ার সাথে সাথেই সামনে থেকে কক্ষের গোটা দক্ষিণ দেয়ালটাই সরে গেল।

কিন্তু দেয়াল সরে যাওয়ায় যা তার চোখে পড়ল, তাতে একরাশ বিস্ময় এসে তাকে ঘিরে ধরল।

প্রায় অর্ধ ডজন স্টেনগান তার দিকে ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে। তারা গোটা ঘরে অর্ধ বৃত্তাকারভাবে দাঁড়িয়ে।

বৃত্তের মাঝখানে দু’জন লোক। একজন শ্বেতাংগ, আরেকজন কৃষ্ণাংগ। তাদের হাতে একদম লেটেস্ট মডেলের মেশিন রিভলবার। দু’টিই উদ্যত তার দিকে।

আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়া আহমদ মুসার দিকে চেয়ে হো হো করে হেসে উঠল শ্বেতাংগ লোকটি। বলল, ‘ওয়েলকাম আহমদ মুসা তোমার জন্যে আমরা অপেক্ষা করছি।’

বলেই আবার হো হো করে হাসল সে। শুরু করল আবার, ‘তোমার প্রশংসা করছি আহমদ মুসা। পৃথিবীতে তোমার তুলনা শুধু তুমিই। আমাদের চারটা দরজার যে কোড তুমি পানির মত ভেঙে বেরিয়ে এলে তা ভাঙবার সাধ্য আর কারও নেই। তোমাকে কনগ্রেচুলেশন।’

শ্বেতাংগ লোকটি থামতেই কৃষ্ণাঙ্গ লোকটি বলে উঠল, ‘কিন্তু তুমি বোকাও আহমদ মুসা। তুমি তোমার শত্রুকে, ওকুয়া’কে অবমূল্যায়ন করেছ। তুমি কি করে ভাবলে যে ওকুয়ার হেড কোয়ার্টার এত অরক্ষিত, তুমি গার্ডকে ফাঁকি দিয়ে প্রাচীর টপকে প্রবেশ করবে আর কেউ দেখতে পাবে না?’

আহমদ মুসা মনে মনে স্বীকার করল, ঠিকই সে ওকুয়া’কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়নি। তাদের ঘাঁটির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ইউরোপীয় মানে বিচার করেনি। প্রাচীর এবং তার গ্রীলের গায়ে যে অতি সূক্ষ্ম ‘এলার্ম’ তার জড়ানো থাকতে পারে, এটা সে ভাবেইনি। তারপর দরজার আলোক সংকেতের পাশাপাশি কক্ষগুলোতে টিভি ক্যামেরার চোখ তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে, এ বিষয়টার দিকেও সে ভ্রুক্ষেপ মাত্র করেনি। আহমদ মুসার এখন মনে হচ্ছে, এলার্ম তার বা অন্য কোন কৌশলের মাধ্যমে তারা তার প্রবেশ টের পেয়ে গেছে এবং দরজা ও কক্ষগুলোর টিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাকে দেখেছে।

ছাদ ফাটা অট্টহাসি হাসল শ্বেতাংগ লোকটি। বলল, ‘কি ভাবছ আহমদ মুসা। তোমার ভুলের কথা ভাবছ? তোমার ভুল মানে আমাদের বিজয়। কিন্তু এ বিজয় অনেক মূল্যে আমরা অর্জন করলাম। তুমি আমাদের কত লোক মেরেছ, কত ক্ষতি করেছ, তার কোন পরিমাপ নেই। এর পরেও আজ আমি আনন্দিত আহমদ মুসা। তোমার মূল্য তুমি জাননা। তোমাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ধনাগারের মূল্য বিক্রি করা যায়, আবার তোমাকে পনবন্দী বানিয়ে কয়েকটি রাষ্ট্রের কোষাগারের সমুদয় অর্থ হাতে আনা যায়।’

‘ঠিক বলেছেন। আমার সব ক্ষতি পূরণ হয়েছে। সামনের প্রতিবন্ধকতার দেয়ালও ভেংগে পড়েছে। এখন চীফ জাস্টিস শয়তান সুড় সুড় করে সব লিখে দেবে। ফ্রি ওয়ার্ল্ড টিভি এবং ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সিও এখন আমাদের ঘাঁটতে আসবে না। ও! এখনি আমার ইচ্ছা করছে চীফ জাস্টিসকে একটা টেলিফোন করতে।’

আহমদ মুসা অনুমান করল এরা কে, তবু প্রশ্ন করল, ‘এত খুশি হচ্ছেন, আপনারা কারা? মনে হচ্ছে অনেকদিন থেকে আপনাদের সাথে আমার সম্পর্ক।’

‘ওর উৎসুক্যটা মিটিয়ে দাও ফাদার।’ বলল, শ্বেতাংগ লোকটি।

‘তার উৎসূক্য মেটানোর আমাদের কি দায়িত্ব। আর আমাদের পরিচয় নিয়ে তার কি।’ বলল, কৃষ্ণাংগ লোকটি।

‘উৎসুক্য নয়, পরীক্ষা করলাম আপনাদের সাহসের মাত্রাকে। চিনি আমি আপনাদের। ব্ল্যাক ক্রসের প্রধান পিয়েরে পল এবং ‘কোক’ এবং ‘ওকুয়া’র প্রধান ফ্রান্সিস বাইকের ছবি আমি দেখেছি ফ্রান্সের ক্রিমিনাল লিস্টে।’

‘ক্রিমিনাল লিস্টে! মিথ্যে কথা। মুখ সামলে কথা বল আহমদ মুসা।’ ‘ক্রোধে’ ফুঁসে উঠল পিয়েরে পল।

‘মিথ্যে কথা আমি বলিনি। পুলিশ এবং প্রশাসন আপনাদের ফেবার করে, সুযোগ দেয়। এটা তাদের বেআইনি দুর্বলতা। কিন্তু আইনের চোখে আপনারা ক্রিমিনাল। লিস্টে নাম থাকবে না কেন?’

‘এর জবাব তুমি পাবে আহমদ মুসা।’ রক্ত চক্ষু তুলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে পিয়েরে পল একজন স্টেনগানধারীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওর পকেট সার্চ করে অস্ত্র কেড়ে নাও। ওর হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি পরিয়ে দাও। দেখাব কে ক্রিমিনাল।’

স্টেনগানধারী এ নির্দেশ পালন করল।

‘হাতকড়া এবং পায়ে বেড়ি দিয়ে মানুষকে ক্রিমিনাল বানানো যায় না মিঃ পিয়েরে পল, ক্রিমিনাল হয় মানুষ অপরাধের কারনে।’

শান্ত ও স্বভাবিক কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।

আহমদ মুসার কথার উত্তরে কিছু না বলে নির্দেশ দিল পিয়েরে পল, ‘একে এক নম্বর সেলে নিয়ে ভরো।’

‘ডঃ ডিফরজিস এবং ওমর বায়াকে কোথায় রেখেছেন পিয়েরে পল?’

ক্রুদ্ধ পিয়েরে পল এবং ফ্রান্সিস বাইক কেউই এ প্রশ্নের উত্তর দিল না।

চারজন প্রহরী আহমদ মুসার হাত পা ধরে নাগর-দোলার মত করে নিয়ে চলল।

আহমদ মুসার চোখ তারা বাঁধেনি। সুতরাং সব কিছুই দেখল পথের আশে-পাশের।

আহমদ মুসাকে ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামানো হলো।

তাকে প্রবেশ করানো হলো একটি সেলে। সেল বলতে যা বুঝায় কক্ষটি তা নয়।

বেশ প্রশস্থ ঘর। তবে একটি দরজা ছাড়া কোন জানালা নেই। ছাদ অনেক ওপরে। ছাদের কোডে ঢাকা বাল্ব থেকে ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে।

আহমদ মুসাকে মেঝেয় ফেলে ওরা চলে যাচ্ছিল।

আহমদ মুসা বলল, ‘কি ব্যাপার, তোমাদের বন্দীখানা যে একেবারে শূন্য।’

ওরা চারজনই থমকে দাঁড়াল। একজন বাঁকা হেসে বলল, ‘কেন একা থাকতে ভয় করবে? ভয় নেই সাথী আছে।’

‘কোথায়, কাউকে তো দেখছিনা?’

‘আছে তোমার আশে-পাশেই।’

‘তোমরা একজন শ্বেতাংগকে বন্দী করে রেখেছ।’

‘কোন শ্বেতাংগ বন্দী আমাদের নেই, মেহমান আছে।’

একজন প্রহরীর এই কথা শেষ হতেই অন্যজন দ্রুত বলে উঠল, ‘এর সাথে খোশ গল্প কি, চল।’

বলে সে চলতে শুরু করল। তার সাথে অন্যরাও।

তারা চলে যাওয়ার সাথে সাথে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দরজাটি তালাবদ্ধ হবারও শব্দ পেল আহমদ মুসা।

বন্দীখানা খুব খারাপ নয়। ঘরের একপাশে মেঝের সাথে আঁটা স্টিল ফ্রেমের খাটিয়ায় বিছানা পাতা। ঘরের এক কোণে বেসিনে পানির টেপ। এটাসড টয়লেট।

খুব খুশি হলো আহমদ মুসা।

কিন্তু খুশিটা উবে গেল, যখন মনে পড়ল যে ওদের কাছ থেকে আসল কথাটাই আদায় করা যায়নি। ওদের কথায় বুঝা গেলনা ডঃ ডিফরজিস ও ওমর বায়া কোথায়। ওরা বলল কোন শ্বেতাংগ বন্দী নেই আছে মেহমান। এ কথা বলল কেন? আমি তো মেহমানের কথা জিজ্ঞেস করি নি। তাদের তো কত মেহমানই থাকতে পারে। তার কথা আমাকে বলবে কেন? তাহলে সে শ্বেতাংগ মেহমান কি আলাদা ধরনের মেহমান? সে কি ডঃ ডিফরজিস? এই শ্বেতাংগ মেহমানকে প্রহরী কোথায় দেখেছে? এ বাড়িতে?

অনিশ্চয়তার মধ্যেও আহমদ মুসা নিশ্চিত হলো সে ডঃ ডিফরজিস ও ওমর বায়ার কাছাকাছি পৌছেছে, খুবই কাছাকাছি।

আহমদ মুসায় খাটিয়ায় উঠে শুয়ে পড়েছিল। ওমর বায়াদের বিষয়ে চিন্তা করতে করতেই কখন যেন ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল সে।

রাত ১ টার দিকে রাশিদি ইয়েসুগো জোর করে লায়লা এবং ফাতেমা মুনেকাকে শুতে পাঠিয়েছে।

ফাতেমা মুনেকা সন্ধার পর কুন্তে কুম্বা থেকে এখানে এসেছে।

ওদের সান্তনা ও সাহস দিয়ে শুতে পাঠালেও রাশিদি এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি সান্তনা পাচ্ছিল না। তারা লায়লা ও ফাতেমা মুনেকাকে বলেছে বটে যে, আহমদ মুসার কত অভিযানে এ রকম কত দেরী হয়েছে, কত রাত কাবার হয়ে গেছে, এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, কিন্তু তারা নিজেরাই এসব কথায় সান্ত্বনা পাচ্ছিল না। শত্রুর দুই ঠিকানায় খোঁজ নিতে গেছে আহমদ মুসা। শুধু খোঁজ করতেই এতটা দেরী কিছুতেই হবার কথা নয়। তাহলে দেরী হচ্ছে কেন, এই চিন্তা করতে গেলে হৃদয় তাদের কেঁপে উঠছে। আহমদ মুসা কোন বিপদে পড়েছে, এমন কথা ভাবতেও তাদের হৃদয় চৌচির হয়ে যাচ্ছে।

এই দূর্বহ ভাবনার ভারে নিমজ্জিত রাশিদি ও ইয়েকিনির রাত কোন দিক দিয়ে পার হয়ে গেল তারা টেরই পেল না। ফজরের আযানের শব্দে চমকে উঠল দু’জনেই। তাকাল একে অপরের দিকে।

‘ভোর যে হয়ে গেল রাশিদি, উনি ……………কথা শেষ না করেই থেমে গেল ইয়েকিনি।’

উত্তরে রাশিদি ইয়েকিনির দিকে তাকাল। উদ্বেগ-বেদনায় জর্জরিত তার চোখ। কোন উত্তরই দিতে পারল না রাশিদি। মূহুর্ত কয়েক পরে বলল, ‘চল নামায পড়ে আসি।’

দু’জনেই নামাযের জন্যে বেরিয়ে গেল।

নামায শেষে ফিরে ড্রইং রুমে ঢুকে তারা দেখল লায়লা ও ফাতেমা মুনেকা বসে আছে।

রাশিদিরা ঢুকতেই তারা উঠে দাঁড়াল।

তাদের দু’জনের চোখে সহস্র প্রশ্নের বন্যা। মুখ ফুটে তারা কিছুই বলল না। প্রশ্ন যেন তারা উচ্চারণই করতে পারছে না।

রাশিদি এবং ইয়েকিনি কোন কথা না বলেই বসে পড়ল । লায়লারা যে প্রশ্ন নিয়ে ছুটে এসেছে, তার কি উত্তর দিবে তারা। আপনাতেই তাদের মাথা নিচু হয়ে গেল।

লায়লারাও বসে পড়েছে। নির্বাক জবাব থেকেই তারা বুঝে ফেলেছে। নুয়ে পড়েছে তাদের মাথাও।

চারজনের মধ্যে অসহনীয় এক নিরবতা।

কথা বলতে যেন তারা ভয় করছে।

অনেকক্ষণ পর লায়লা মুখ তুলল। বলল, ‘ভাইয়া ওনার কিছু একটা হয়েছে, কোন সন্দেহ আছে কি আর এ ব্যাপারে?’

‘এ কথা ভাবতেও আমার বুক কাঁপছে লায়লা। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে, কেন তাকে একা যেতে দিলাম? কিংবা কেন তাকে ফলো করিনি?’ ভারী গলায় বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘না, এতে অপরাধের কিছু নেই। তাঁকে ফলো করা তিনি পছন্দ করেন না। কুন্তে কুম্বাতে আমরা দেখেছি, যে কাজ তিনি মনে করেন তাঁর একার করার, সেখানে কাউকেই তিনি সাথে নেন না।’ ফাতেমা মুনেকা বলল।

‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি মারিয়া আপার কাছে একথা শুনেছি। তবে মারিয়া আপাই শুধু ব্যতিক্রম, তিনি কোন কোন সময় ফলো করেছেন। তিনি যে ক্যামেরুনে এসেছেন, তাও আহমদ মুসা ভাইয়ের অজান্তে।’ বলল লায়লা।

‘সত্যি? এত বড় সিদ্ধান্ত না বলে নিতে পেরেছেন তিনি? তারপর আহমদ মুসা ভাইয়ের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছে?’ ফাতেমা বলল।

‘আমি রোসেলিনের কাছে শুনেছি আহমদ মুসার অনুপস্থিতিতে ন্যায় ও যুক্তির দাবী যা সে অনুসারেই মারিয়া আপা সিদ্ধান্ত নেন। আমার মনে হয় এ অধিকার তাঁরই থাকা উচিত এবং তাঁর আছে।’ বলল লায়লা।

‘একটা ঘটনা ঘটেছে।’ ইয়েকিনি বলল।

‘কি ঘটনা?’ বলল লায়লা।

‘আহমদ মুসা ভাই যে দু’টি ঠিকানায় গেছেন, সে দু’টি ঠিকানা মারিয়া আপা চেয়েছিলেন। আহমদ মুসা দিতে চেয়েছিলেন। আমার কাছে তাঁকে ঠিকানা দু’টো দিতে বলেছিলেন মারিয়া আপা। পরে আমি যখন আহমদ মুসা ভাইয়ের কাছে ঠিকানা চাইলাম, তিনি হাসলেন। বললেন, ‘ও বিষয়টা তুমি ভুলে যাও, আমিও ভুলে যাই।’ মারিয়া আপার কাছে দেয়া কথার বিষয়টা উল্লেখ করে আমি যখন তাকে চাপ দিলাম, তিনি বললেন, ‘তোমরা মারিয়া জোসেফাইনকে চেন না। ঠিকানা পেলে কোন কারণ ঘটলে সে ঐ ঠিকানায় ছুটতে পারে। সে অসুস্থ। তার ওঠা নিষেধ।’ আমি বলেছিলাম, ‘আপনি নিষেধ করলেও?’ শুনে তিনি হেসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত আমি তার উপর চাপিয়ে দিতে পারব না। এক্ষেত্রে সে তার বিচার-বুদ্ধি অনুসারে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারী। সুতরাং তাকে ঠিকানা না দেওয়াটাই সমাধান।’

থামল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।

‘তারপর কি ঘটেছিল?’ জিজ্ঞেস করল লায়লা।

‘পরে টেলিফোনে মারিয়া আপা ঠিকানার কথা বললে আমি তাঁকে ঘটনা জানিয়েছিলাম। তিনি শুনে অনেকক্ষণ চুপ করেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, আমি জানতাম উনি ঠিকানা দিতে চাইবেন না। দুনিয়ার সব বিপদ তিনি একা মাথায় তুলে নেবেন, আর তিনি চাইবেন তার বিপদে কেউ এগিয়ে গিয়ে বিপদে না পড়ুক। বলতে বলতে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন মারিয়া আপা।’

‘মারিয়া আপা সত্যিই আহমদ মুসা ভাইয়ের যোগ্য সাথী। তার দুরদৃষ্টির কারণেই তিনি ঠিকানা দু’টি চেয়েছিলেন। ঠিকানা পেলে এখন কিছু করা যেত। মারিয়া আপাকে সব কিছু জানানো দরকার।’ বলল লায়লা।

‘ঠিক বলেছ লায়লা। টেলিফোন নয়, চল আমরা সেখানে যাই। সেখানে মারিয়া আপার আব্বা আছে, রোসেলিন আছে। পরামর্শ করা যাবে।’

‘আমারও তাই মত। ইতিমধ্যে আমাদের সব লোকদের সতর্ক করা কি দরকার নয়। আহমদ মুসাকে খোঁজার জন্যে এবং তাকে উদ্ধার করার জন্যে আমাদের সব শক্তিকে কাজে লাগানো দরকার।’

‘ফজরের নামাযের পর সে নির্দেশ আমি দিয়ে দিয়েছি। সকালের মধ্যেই সকলকে আমরা পেয়ে যাব।’

‘চল ওঠা যাক, ভাইয়া।’ বলল লায়লা।

ওরা চারজন উঠে দাঁড়াল।

বেরুবার আগে দেখল, ব্ল্যাক বুল বাইরে থেকে ফিরছে।

রাশিদিদের দেখে দাঁড়াল ব্ল্যাক বুল।

লায়লা এবং ফাতেমা মাথার কাপড় আরও টেনে কপালের আরেকটু নিচে নামিয়ে পাশে সরে গেল।

‘কিছু জানা গেল?’ রাশিদির দিকে চেয়ে শুকনো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল ব্ল্যাক বুল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাশিদি বলল, ‘কিছু জানতে পারিনি, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘চিন্তা করবেন না শাহজাদা, বন্দী আহমদ মুসাকে আমি দেখেছি। বন্দী করলে চিন্তার কোন দাগও পড়তে দেখিনি তার কপালে। এই মানসিক শক্তিকে পরাভূত করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। আমি মনে করি মুক্ত আহমদ মুসার মতই বন্দী আহমদ মুসা অপ্রতিরোধ্য।’

‘আল্লাহ আপনার কথা কবুল করুন।’ একটু থামল রাশিদি।

তারপর বলল, ‘আমাকে শাহাজাদা বলছেন কেন? ইয়েসুগো রাজ পরিবারের সন্তান হিসেবে আমি যদি শাহজাদা হই তাহলে আপনিও তো শাহজাদা।’

কথা শেষ করে রাশিদি ইয়েসুগো না থেমেই বলল, ‘আমরা চীফ জাষ্টিসের ওখানে যাচ্ছি। আপনি এদিকে খেয়াল রাখবেন।’

বলে রাশিদি গাড়ির দিকে এগুতে যাচ্ছিল। ব্ল্যাক বুল বলল, ‘আমার কোন প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন। আমার তিনটি অস্ত্র আছে, কুকুর তিনটি আহমদ মুসার গন্ধের সাথে পরিচিত। তারা আমাদের খোঁজার ব্যাপারে মূল্যবান সাহায্য করতে পারে।’

রাশিদি থমকে দাঁড়িয়েছিল। শুনে বলল, ‘ধন্যবাদ আবদুল্লাহ, অবস্থা তেমন হলে দরকার হতেও পারে।’ বলে তারা গাড়ির দিকে এগুলো।

গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল রাশিদি। তার পাশের সিটে ইয়েকিনি। পেছনের সিটে বসল লায়লা ইয়েসুগো এবং ফাতেমা মুনেকা।

রোসেলিনদের ফ্যামিলি ড্রইং রুমে বসেছে সবাই।

ব্যান্ডেজ বাঁধা বাম হাত ডান হাত দিয়ে ধরে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে ডোনা জাসেফাইন। সাদা গাউন আর সাদা চাদরে আবৃত তার দেহ। কপালের নিচে থেকে মুখের অবশিষ্ট অংশটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। ক্লান্তি ও বেদনায় জর্জরিত তার মুখ। যেন অপরূপ এক ফুল বিধ্বস্ত হয়েছে ঘূর্ণি ঝড়ের চতুর্মূখী দোলায়। তার দু’পাশে বসে রোসেলিন এবং লায়লা। আর রোসেলিনের পাশে এলিসা গ্রেস। আর লায়লার পাশে ফাতেমা মুনেকা।

তাদের মুখোমুখি সোফায় বসে আছে ডোনার আব্বা এবং রোসেলিনের আব্বা।

পাশের সোফায় পাশাপাশি বসে রাশিদি ইয়েসুগো এবং মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।

রাশিদির দেয়া দুঃসংবাদ শুনে ডোনা একটি কথাও বলেনি। শুধু চোখটা বুজে গিয়েছিল তার। আর মুখটা শক্ত হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত ভেতরের বিষ্ফোরণের প্রকাশ ঠেকাবার জন্যে বাধার শক্ত দেয়াল খাড়া করতে চেয়েছিল সে।

ডোনার আব্বাও নীরব। তার চোখে-মুখে দুর্ভাবনার গাঢ় কাল ছায়া।

‘থানা, হাসপাতাল ইত্যাদি চেক না করে কি বলতে পারি আহমদ মুসা শত্রুর হাতে পড়েছে?’ বলল চীফ জাস্টিস।

এই সময় চীপ জাস্টিসের টেলিফোন বেজে উঠল।

রোসেলিন উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরল।

টেলিফোনে কথা বলেই সে তার আব্বাকে বলল, ‘আপনার টেলিফোন।’

চীফ জাস্টিস উসাম বাইক উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরল।

টেলিফোন ধরেই চীফ জাস্টিসের মুখ ম্লান হয়ে গেল। সে কথা বলল না, শুধু শুনলই। শুনতে শুনতে তার চোখ-মুখ উদ্বেগে ভরে গেল।

সবশেষে ‘ভেবে উত্তর দেব’ বলে টেলিফোন রেখে দিল চীফ জাস্টিস।

চীফ জাস্টিস উসাম বাইকের মুখ-ভাবের মারাত্মক পরিবর্তন সবাই লক্ষ্য করেছিল। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল সবাই।

চীফ জাস্টিস টেলিফোন রাখতেই ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি বলে উঠল, ‘কি খবর মিঃ জাস্টিস? খারাপ কিছু?’

চীফ জাস্টিস তার নিচু মুখ না তুলেই বলল, ‘আহমদ মুসা ওকুয়া’র হাতে বন্দী।’

খবরটা বজ্রপাতের মতই ধ্বনিত হলো সকলের কাছে। সকলের মাথাই নুয়ে পড়েছে প্রচন্ড আঘাতে। শুধু ডোনার মুখটাই খাড়া। সে চোখ খুলেছে। মুখটা তার আরও শক্ত হয়ে উঠেছে।

অসহ্য এক নীরবতায় ছেয়ে গেছে গোটা ড্রইং রুম।

রোসেলিন, লায়লা ও ফাতেমা ধীরে ধীরে তাদের নত চোখটা তুলে তাকাল ডোনার দিকে।

তারা ডোনার খাড়া মাথা, চোখ-মুখের অদ্ভুত দৃঢ়তা দেখে বিস্মিত হলো। কিন্তু পরক্ষণেই তাদের মনে পড়ল, ডোনা জোসেফাইন ফ্রান্সের রাজকুমারী এবং আহমদ মুসার বাগদত্তা, আর দু’দশটা মেয়ের সাথে তার তুলনা চলে না।

নীরবতা ভাঙ্গলেন চীফ জাস্টিস নিজেই। বললেন তিনি, ‘আরও কিছু খারাপ খবর আছে।’

‘কি সে খবরগুলো।’ ফ্যাকাশে ত্বরিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল রোসেলিন।

চীফ জাস্টিস উসাম বাইক সবার উপর একবার চোখ বুলালেন। তারপর বললেন, ‘এখানে বাইরের লোক নেই। সব কথাই আমি এখানে বলতে পারি।’

থামলেন চীফ জাস্টিস। একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘টেলিফোন করেছে ‘ওকুয়া’র পক্ষ থেকে ব্ল্যাক ক্রসের প্রধান পিয়েরে পল।’

তারপর চীফ জাস্টিস ডঃ ডিফরজিস এবং ওমর বায়াকে বন্দী রেখে চাপ দিয়ে কিভাবে ওমর বায়ার সম্পত্তি তারা গ্রাস করতে চাচ্ছে তার বিবরণ দিয়ে বলল, ‘আগামী কাল তারা উকিলের মাধ্যমে তাদের কেস আমার কোর্টে নিয়ে আসবে। আমি যদি ওমর বায়ার সম্পত্তি তাদের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা না করি, তাহলে তার ডঃ ডিফরজিসকে আগামী কালই খুন করবে এবং ওমর বায়াকে আপাতত পঙ্গু করে দেবে। দ্বিতীয়ত বলেছে, কুন্তে কুম্বার মুসলমানরা যদি আগামী পরশুর মধ্যে সেখানে আটক কোক’এর লোকদের ছেড়ে না দেয়, তাহলে আহমদ মুসাকে তারা হত্যা করবে।’

থামলেন চীফ জাস্টিস উসাম বাইক।

আবার নেমে এল সেই নীরবতা। সকলের চোখে-মুখে উদ্বেগ ও বিষাদের ছায়া।

বেশ কিছুক্ষণ পর রোসেলিন বলল, ‘তারা দেশের চীফ জাস্টিসকে এইভাবে হুমকি দিতে পারল?’

‘পারল। কারণ আমি পুলিশের সাহায্য নিতে পারছি না। পুলিশকে বললেই ওরা হত্যা করবে ডঃ ডিফরজিসকে। তাঁর প্রতি আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে তারা।’ বলল চীফ জাস্টিস শুষ্ক কণ্ঠে।

‘তুমি কি জবাব দেবে আব্বা ওদের?’ বলল রোসেলিন।

‘ওদের দাবী আমি মেনে নেব না। যে পরিণতিই হোক।’ বলল চীফ জাস্টিস।

‘এখন কি করনীয় আমাদের? বলল রাশিদি ইয়েসুগো।’

‘পুলিশকে যদি সব ব্যাপার জানানো হয়, তাতে কি লাভ হবে?’ বলল চীফ জাষ্টিস।

‘ওকুয়া’র কোন ঠিকানা আমাদের কাছে নেই। পুলিশ নিশ্চয় ওদের কিছু ঠিকানা জানে। তারা যদি সত্যই সক্রিয় হয়, তাহলে কিছু ফল হতে পারে।’ বলল ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি।

‘আমিও এযুক্তির সাথে এক মত।’ বলল মুহাম্মাদ ইয়কিনী।

‘আমাদের কাছে যখন ‘ওকুয়া’র কোন ঠিকানা নেই, তখন পুলিশের সাহায্য ভাল মনে করি।’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘পুলিশকে জানানোর মধ্যে ঝুঁকি আছে। তাছাড়া পুলিশকে সব কথা যেমন আহমদ মুসার কথা বলা যাবে না। সুতরাং পুলিশকে আমি না জানানোই ঠিক মনে করি।’ বলল ডোনা।

‘কিছু তো আমাদের করতে হবে, কিন্তু কোন পথে এগুবো আমরা?’ বলল রাশিদি ইয়েসুগো।

‘আহমদ মুসা যে দু’টো ঠিকানার সন্ধানে গেছে, সে দু’টো ঠিকানা আমি ওঁর কাছে চেয়েছিলাম। উনি দেননি। আমার মনে হয় আল্লাহর কোন ইচ্ছা এর মধ্যে আছে। আহমদ মুসা নিজের স্বার্থে কিছু করছেন না। আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের কল্যাণের জন্যে তিনি কাজ করছেন। সুতরাং আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করবেন। আমি অপেক্ষা করার পক্ষপাতি।’

একটু থামলো ডোনা। একটা ঢোক গিলে আবার শুরু করল, ‘ইতিমধ্যে এটা কাজ করা যায়। যে গাড়ি নিয়ে ওরা পার্কে হাইজ্যাক করতে গিয়েছিল, সেই গাড়ির নাম্বার আমার কাছে আছে। নতুন গাড়ি, লেটেষ্ট মডেলের। সুতরাং নাম্বার নিয়ে রেজিষ্ট্রেশন অফিসে গিয়ে গাড়ির মালিকের ঠিকানা বের করা কঠিন হবে না। এভাবে একটা ঠিকানা ওদের আমরা বের করতে পারি।’

কথা শেষ করে ডোনা তার হাত ব্যাগ থেকে এক টুকরো কাগজ তুলে ধরল রাশিদি ইয়েসুগোর দিকে।

রাশিদি কাগজটি হাতে নিয়ে গাড়ির নাম্বারের দিকে এক চোখ বুলিয়ে পকেটে রেখে দিয়ে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ, চলার একটা পথ পেয়েছি আমরা।’

বলে রাশিদি উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি এবং ইয়েকিনি এখন রেজিষ্ট্রেশন অফিসে যাচ্ছি। লায়লা তোমরা বাড়ি চলে যেও। আমরা গাড়ি রেখে যাচ্ছি।’

‘না, তুমি তোমার গাড়ি নিয়ে যাও। আমি লায়লাদের বাড়ি পৌঁছে দেব।’

‘না রোসেলিন, তোমার এখন বাইরে বেরুনো চলবে না। সংকট না কাটা পর্যন্ত তুমি ওদের টার্গেট।’ বলল ডোনা।

‘বাহ! আপা। আপনি যে আহমদ মুসার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।’ হেসে বলল রোসেলিন।

‘মারিয়া মা ঠিকই বলেছে। রাশিদি যেভাবে বলেছে, সেটাই ভাল।’ বলল চীফ জাষ্টিস উসাম বাইক।

‘ঠিক আছে, তাই হবে।’ বলে রাশিদি ইয়েসুগো ডোনার আব্বা এবং চীফ জাষ্টিসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলতে শুরু করল।

তার পিছু নিল মুহাম্মাদ ইয়েকিনি।

ডোনার আব্বা মিশেল প্লাতিনি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি বিদায় চাচ্ছি। ফরাসী দূতাবাসে এবং ফ্রান্সে জরুরী কয়েকটা কথা বলতে হবে।’

চীফ জাষ্টিসও উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মা তোমরা বস। অফিসে যাওয়ার আগে আমাকে কিছু জরুরী কাজ সারতে হবে।’

ওরা উঠে যাবার পর প্রথম কথা বলল ফাতেমা মুনেকা। বলল, ‘মারিয়া আপা, আমরা উদ্বেগে-আতংকে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। আপনার কথা আমাদের সাহস ফিরিয়ে দিয়েছে।’

‘ধন্যবাদ। উদ্বেগ-আতংক আমার মধ্যেও আছে। প্রকাশ হলে তা আরও বাড়বে। তাই সাহস দিয়ে তা ঢেকে রাখছি।’ ম্লান হেসে বলল ডোনা।

‘দেখছি, আহমদ মুসা ভাইয়ের অনেক গুণ আপনি পেয়েছেন।’ বলল লায়লা।

‘না কিছুই না। আর উনি চান না, তাঁর মত কেউ বন্দুক হাতে নিক।’ ডোনা বলল।

‘কেন?’ বলল লায়লা।

‘তাঁর মতে আজ অস্ত্রের যুদ্ধের চেয়ে বুদ্ধির যুদ্ধ বেশী জরুরী।’

‘কিন্তু শক্তি ও অস্ত্রের যুদ্ধে হেরেছি বলেই তো আমরা ক্যামেরুন থেকে উচ্ছেদ হতে চলেছি। আমাদের শক্তি ও অস্ত্রই আমাদের ভাগ্য ফেরাতে পারে।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।

‘কিন্তু উনি বলেন, জ্ঞান, বুদ্ধি ও সংস্কৃতির যুদ্ধে পরাজিত হবার পর অস্ত্রের যুদ্ধে পরাজয়ের পর্যায় আসে। বুদ্ধির যুদ্ধে শক্তিশালী হলে অস্ত্রের যুদ্ধের প্রয়োজনই হয় না। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে, যখন সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধ প্রথম ও প্রধান বিষয় হিসেবে কাজ করছে।’

‘এসব উনি বলেন। আপনি কি বলেন?’ বলল লায়লা।

‘এই ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা কম। তবে সত্য যেটা তা হলো, প্রকৃত পক্ষে অস্ত্র যুদ্ধ করে না, যুদ্ধ করে বুদ্ধি। যুদ্ধ করার যতগুলো অস্ত্র বুদ্ধির রয়েছে, তাদের মধ্যে অস্ত্র মাত্র একটি। সুতরাং সবক্ষেত্রেই বুদ্ধিরই প্রধান ভূমিকা। সুতরাং আমি তার সাথে একমত। কিন্তু … …’

‘কিন্তু কি?’

‘কিন্তু শত্রুর হাতে অস্ত্র যখন উদ্যত হয়, যখন তাঁর হাতেও অস্ত্র থাকে, তখন আমাকে তিনি অস্ত্র হাতে নিতে নিষেধ করবেন আমি তা মানি না।’ বলতে বলতে ডোনার কন্ঠ ভারি হয়ে উঠল।

‘আপা, আমার মনে হয় এটা আপনি ও তাঁর মধ্যকার নিজস্ব ব্যাপার। আপনার কাছ থেকে তাঁর এটা বিশেষ চাওয়া, সাধারন কোন নীতি নয়।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।

‘এটা আমি বুঝি।’ বলে ডোনা আমিনার করুন কাহিনী তাদের জানাল এবং বলল, ‘এখন উনি এমন একটা শান্তির গৃহাঙ্গন চান যা বারুদের গন্ধে পীড়িত হবে না।’

‘এই চাওয়া তার সঙ্গত নয় কি?’ বলল রোসেলিন।

‘সংগত, কিন্তু স্বাভাবিক নয়। তিনি এবং তাঁর গৃহাঙ্গন পরস্পর বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হতে পারে না। তিনি যদি বারুদের গন্ধে প্লাবিত হন, তাহলে সে গন্ধ তার বাড়ির পরিবেশকে প্লাবিত করবেই।’ বলল ডোনা।

‘আপনিও সংগত কথা বলেছেন আপা।’ বলল লায়লা।

‘তিনিও এটা মানেন। তাই তিনি নির্দেশ দেন না আকাঙ্খা করেন মাত্র।’ ডোনা বলল।

লায়লা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার কাছ থেকে উঠতে ইচ্ছা করছে না, কিন্তু উঠতে হয় আমাদের।’

‘আমার সৌভাগ্য। আপনাকে দেখার আকাঙ্খা আমার পূরণ হলো।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।

‘আমাকে দেখার আকাঙ্খা? কিভাবে জানলেন আমার কথা?’ ডোনা বলল।

‘আহমদ মুসা ভাই কুন্তে কুম্বা থেকে আসার সময় বলেছিলেন, ভাগ্য ভাল হলে ক্যামেরুনে তাকে দেখতেও পার।’ বলল ফাতেমা।

‘আমার প্রসঙ্গ উঠলো কি করে?’

‘তার কথায় আমি বুঝেছিলাম।’ বলল ফাতেমা মুনেকা।

‘বলেছিলেন উনি, যে আমাকে ক্যামেরুনে দেখতেও পার! কিন্তু আমি যে ক্যামেরুনে আসব, তা আসার আগের দিন পর্যন্ত আমি ভাবতেও পারিনি। উনি জানলেন কি করে!’

থামল ডোনা। তার চোখ দু’টি বুজে এল। একটা আবেগের আবেশ তার অপরূপ লাবণ্যকে যেন শতগুণ বাড়িয়ে দিল। ধীরে ধীরে অনেকটা স্বগত কন্ঠে বলল, ‘এ জন্যে তিনি আহমদ মুসা। কি কি হলে কি ঘটে বা ঘটতে পারে, তা যেন সূর্য উঠার মতই তিনি দেখতে পান!’

ডোনা যেন নিজের মধ্যে নিজে হারিয়ে যাচ্ছে। তাকে বিরক্ত করতে দ্বিধা হলো লায়লার। তবু বলল, ‘আপা অনুমতি দিন, উঠব।’

চোখ খুলে সোজা হয়ে বসল ডোনা। বলল, ‘তোমরা যাবে? কিন্তু বিকেলে আসবে তো? আমার কথাই শুধু বললাম। তোমাদের কথা কিছুই শোনা হয়নি।’

‘আসব আপা।’ বলে উঠে দাঁড়াল লায়লা। তার সাথে উঠল ফাতেমা মুনেকা।

ডোনা উঠতে যাচ্ছিল। রোসেলিন তাকে ধরে তুলল।

লায়লা ডোনাকে বাধা দিয়ে বলল, ‘না আমাদের এগিয়ে দিতে হবে না আপনার।’ তারপর লায়লা রোসেলিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি ওঁকে নিয়ে শুইয়ে দাও। বহুক্ষণ উনি বসে আছেন।’

‘ঠিক আছে আমি এগুচ্ছি না। কিন্তু তোমরা বিকেলে আসবে।’

‘আসব আপা’ বলে লায়লা ও ফাতেমা মুনেকা বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

সামনে বোমা ফাটলেও এতটা বিস্মিত হতো না ওকোচা’র আব্বা-আম্মা, যতটা বিস্মিত হলো তারা তাদের রাতের মেহমান, তাদের ওকোচার জীবন রক্ষাকারী বিস্ময়কর লোকটির আটক হওয়ার কথা শুনে।

ওকোচা’র স্ত্রী তার কথা শেষ না করতেই ওকোচা’র আব্বা-আম্মা ছুটল ওকোচা’র ঘরের দিকে। তাদের পিছনে পিছনে ওকোচা’র স্ত্রীও।

ঘরে ঢুকে তারা দেখল, ওকোচা মাথায় হাত রেখে শুয়ে আছে। তার মুখ চুপসে গেছে। সেখানে দুঃখও আছে, আতংকও আছে।

তার আব্বা-আম্মাকে ঘরে ঢুকতে দেখে সে উঠে বসল।

‘বৌমা’র কাছে একি শুনলাম! তুই নাকি বলেছিস, আমাদের গত রাতের মেহমান কোথাও আটক হয়েছে? ওটা ফ্যাংগ গোষ্ঠীর কাজ না তো?’ বলল ওকোচা’র আব্বা।

‘হ্যাঁ, উনি আটক হয়েছেন, তবে ফ্যাংগরা তাকে আটক করেনি।’

‘তাহলে কারা তাকে আটক করেছে?’

ওকোচা মুখ তুলে পিতার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইল। তারপর বলল, ‘সেটা খুব খারাপ খবর আব্বা?’

‘কি বলতে চাচ্ছিস? কারা আটক করেছে তাঁকে?’

‘ওকুয়া’ তাঁকে আটক করেছে।’

‘ওকুয়া?’ মুখটা ফেঁকাশে হয়ে গেল ওকোচা’র আব্বার।

কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না ওকোচা’র আব্বা। বিস্ময় ও উদ্বেগে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছিল তার।

পরে শুষ্ক কন্ঠে সে বলল, ‘ওকুয়া’র লোকদের সাথে তাঁর কি ঝগড়া হয়েছিল?’

‘না, এ কারণে তিনি আটক হননি।’

‘তাহলে তুই ফাদার ফ্রান্সিস বাইককে টেলিফোন কর। ওঁকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। এ খবর শুনে তুই এসে শুয়ে পড়েছিস কেন? তোর দায়িত্বটাই বড়।’

‘ফ্রান্সিস বাইককে টেলিফোন করে কোন লাভ হবে না। তিনি এবং মিঃ পিয়েরে পল স্বয়ং তাকে আটক করেছেন।’

কথাটা শোনার সাথে সাথে ওকোচা’র আব্বা ভয়ে ও বেদনায় যেন একেবারে কুঁচকে গেল।

পাশের চেয়ারে সে ধপাস করে বসে পড়ল। যেন এক নিমিষেই তার শরীরের সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।

ওকোচা’র গোটা পরিবার ‘কোক’(কিংডোম অব ক্রিস্ট)-এর সাথে জড়িত। ওকোচা’র আব্বা জোসেফ বেল ‘কোক’-এর আঞ্চলিক একজন দায়িত্বশীল। ওকোচা এবং তার ভাইরাও ‘কোক’-এর সদস্য। ওকুয়া’র প্রধান ফাদার ফ্রান্সিস বাইক ‘কোক’-এরও প্রধান হওয়ার পর দুই সংস্থা প্রায় এক হয়েছে। কার্যত ‘ওকুয়া’ই এখন সব কিছু চালাচ্ছে। সুতরাং জোসেফ বেলের পরিবারও আজ কার্যত ওকুয়া’র অধীন।

চেয়ারে বসে পড়ার পর ওকোচা’র আব্বা জোসেফ বেল দুর্বল কন্ঠে বলল, ‘তুই কি ভাল করে খোঁজ নিয়ে একথা বলছিস? তুই জানতে পারলি কি করে?’

‘কোক-এর কর্মীদের আজ হেড কোয়ার্টারে ডেকেছিল ফাদার ফ্রান্সিস বাইক। উদ্দেশ্য ছিল, ইদেজা’র ঘটনা এবং সাম্প্রতিক সব বিপর্যয়ে হতাশ কর্মীদের উৎসাহিত করা। আমি গিয়েছিলাম।

স্বয়ং ফাদার ফ্রান্সিস বাইক এবং মিঃ পিয়েরে পল আমাদের সাথে কথা বললেন। শুরুতেই ফাদার জানালেন, ‘ইদেজা ও কুন্তে কুম্বায় যে বিদেশীর কারণে আমাদের বিপর্যয় ঘটেছে, যে বিদেশীর হাতে এ পর্যন্ত আমাদের জনা তিরিশেক লোক নিহত হয়েছে, সেই বিদেশী আজ আমাদের হাতে ধরা পড়েছে। তোমরা জেনে খুশী হবে, এই লোকটি ক্যামেরুনে আসার পর আমাদের শুধু বিপর্যয় নয়, আমাদের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে উঠেছিল, তাকে বন্দী করার পর আমরা সকল বিপদ থেকে মুক্তি পেলাম।’

তারপর তিনি মিঃ পিয়েরে পলের সাথে আলোচনা করে আমাদের বললেন, ‘চল তোমাদেরকে সেই ভয়ংকর লোকটিকে দেখানো হবে।’ বলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। সেখানে বসে বিভিন্ন টিভি স্ক্রীণে বাড়ির প্রত্যেকটি অংশ দেখা যায়।

আমাদেরকে একটা টিভি স্ক্রীণের সামনে বসানো হলো। টিভি স্ক্রীণে নজর পড়তেই আমি চমকে উঠলাম। দেখলাম আমাদের মেহমানকে। তার হাতে হাতকড়া এবং পায়ে বেড়ি পরানো।’

থামল ওকোচা। মুখ নিচু করল সে।

ওকোচার আব্বা জোসেফ বেল বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে ওকোচার দিকে। তার চোখে যেন বিস্ময় ও বেদনা পাগলের মত নৃত্য করছে।

‘তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলো কি সত্য?’

‘সত্য মনে হয় না, কিন্তু সত্য।’

‘অনেক বছর হলো আমি পৃথিবীতে এসেছি। কত মানুষ দেখেছি। মানুষের চোখের দিকে তাকালেই বলে দিতে পারি সে কেমন মানুষ। আমি রাতের মেহমানকে দেখেছি। দুনিয়া এক বাক্যে বললেও আমি বিশ্বাস করবো না যে, সে ক্রিমিনাল। তার চোখে মুখে কোন পাপের স্পর্শ আমি দেখিনি। গতকাল ‘ফ্যাংগ’দের ব্যাপারে যে পরামর্শ সে আমাকে দিয়েছে, সে ধরণের পরামর্শ কোন ক্রিমিনালের মাথা থেকে বের হওয়া অসম্ভব।’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন আব্বা। আজ টিভি স্ক্রীণে বন্দী অবস্থায় তাকে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। দেখলাম তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে খাটিয়ায় বসে আছেন। তিনি যে বন্দী মুখ দেখে তা বুঝা যায় না। মনে হয় তিনি যেন ড্রইং রুমে নিশ্চিন্তে বসে আছেন। প্রসন্ন মুখ তার। নিশ্চিন্ত তাঁর দৃষ্টি। সমগ্র চেহারায় একটা পবিত্রতা। কিন্তু আব্বা তবু অভিযোগগুলো সত্য।’

‘অসম্ভব ওকোচা।’

‘আব্বা, তাঁর আরও পরিচয় আছে।’

‘কি পরিচয়?’

‘তিনি আহমদ মুসা। কোক, ওকুয়া’র সাথে লড়াই করার জন্যেই তিনি ক্যামেরুনে এসেছেন।’

‘আহমদ মুসা? মুসলিম বিপ্লবী, যার সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে, সেই আহমদ মুসা?’ বিস্ময় বিজড়িত কন্ঠে বলল ওকোচা’র আব্বা জোসেফ বেল।

‘হ্যাঁ আব্বা, কোন সন্দেহ নেই।’

উত্তরে কিছু বলল না জোসেফ বেল। তার শুণ্য দৃষ্টি ওকোচার দিকে নিবদ্ধ। অনেকক্ষণ কথা বলল না সে।

এক সময় গা এলিয়ে দিল চেয়ারে। বলল,’ঠিক বলেছিস ওকোচা। উনি আহমদ মুসা হলে তবেই তার সব কজ, সব কথা, সব আচরণের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।’

একটু থামল। থেমেই আবার শুরু করল জোসেফ বেল, ‘তুই লড়াই-এর কথা বললি। ‘কোক’ ও ওকুয়া’র সাথে তাঁর কিসের লড়াই?’

‘আমি সব জানিনা। তবে শুনেছি, মুসলমানদের সম্পত্তি উদ্ধারই মূল বিষয়। তাছাড়া ‘ওকুয়া’র হাতে বন্দী দু’জনকে উদ্ধার করতে চায় আহমদ মুসা।’

‘তাই হবে। আহমদ মুসা যে দেশেই গেছে, এ ধরণের কাজ নিয়েই গেছে।’

থামল জোসেফ বেল।

ওকোচাও কোন কথা বলল না।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

নীরবতা ভাঙ্গল ওকোচার মা। বলল, ‘লোকটাকে ওরা বন্দী রেখে কি করবে?’

‘যা শুনলাম, তাতে বুঝলাম। তাকে বন্দী রেখে ‘ওকুয়া’ কুন্তে কুম্বায় ‘কোক’-এর বন্দী লোকদের মুক্ত করবে। তারপর তাকে হত্যা করবে অথবা বিক্রি করে দেবে।’

‘বিক্রি করে দেবে?’ বলল জোসেফ বেল।

‘হ্যাঁ। আমি শুনলাম ইহুদিদের সংগঠন সিনবেথ, ইরগুন জাই লিউমি, বামপন্থী সংগঠন ‘ফ্র’ এবং শ্বেতাঙ্গ সংগঠন ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান তাকে কোটি কোটি ডোলার দিয়ে কিনে নিতে রাজী আছে।’

‘কিনে ওরা কি করবে?’ জিজ্ঞেস করল ওকোচার মা।

‘কি বল মা, ও নাকি দুনিয়ার সব চেয়ে বড় মানুষ। ওকে হাতে রেখে বড় বড় মুসলিম রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করা যায়। যা ইচ্ছে তা আদায় করা যায়।’

থামল ওকোচা। আবার নীরবতা।

এবার নীরবতা ভাঙ্গল ওকোচা’র স্ত্রী। বলল,‘আমাদের কি কিছু করণীয় আছে?’

কেউ উত্তর দিল না। ওকোচার আব্বা জোসেফ বেল এবং ওকোচা দুজনেরই মুখ নিচু।

‘লোকটির পরিচয় যাই হোক, সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওকোচাকে বাঁচিয়েছে। আবার ফ্যাংগ’দের সাথে আমাদের বড় ধরণের সঙ্ঘাত বাধত, সেটাও সে রোধ করেছে। তার পরামর্শে সঙ্ঘাত ও রক্তারক্তি থেকে যে ফল পেতাম তার চেয়ে বেশী ফল পেয়েছি। তাকে সাহায্য করা কি আমাদের মানবিক দায়িত্ব নয়?’ বলল ওকোচার স্ত্রী।

এবার কথা বলল জোসেফ বেল। বলল, ‘বৌমা তোমার প্রত্যেকটা কথা সত্য। তাকে সাহায্য করা অবশ্যই আমাদের দায়িত্ব। ইচ্ছা হচ্ছে, এখনি ছুটে যাই তাকে উদ্ধার করে আনি, তাতে আমার যে ক্ষতি হয় হোক। কিন্তু তা পারছিনা।’

থামল জোসেফ বেল। তার শেষের কথাগুলো ভারী হয়ে উঠল।

একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘লড়াইটা ‘কোক’ এবং ‘ওকুয়া’র সাথে। সঙ্গঠন দুটো আমাদের অর্থাৎ জাতির। জাতির বিরুদ্ধে আমরা কেমন করে যাব? ধর্মের বিরুদ্ধে আমরা কেমন করে যাব? যদি যাই আমাদের তাহলে মানবতা কেউ দেখবে না। বলবে বিশ্বাসঘাতক। বলবে আমরা শ্ত্রুর কাছে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে গেছি। নিজেদের ধ্বংস করার মত এই দায়িত্ব আমি কেমন করে নেব, কেমন করে আমি তোমাদের নিতে বলব।’

থামল জোসেফ বেল।

একটা অসহায় ভাব তার চোখে-মুখে। কাঁপছিল তার কন্ঠ।

ওকোচা’র স্ত্রী মুখ নিচু করেছে। ওকোচার মুখে কোন কথা নেই। সে মাথা নিচু করে বসে আছে।

ওকোচা’র আব্বা জোসেফ বেলই আবার বলতে শুরু করল, ‘আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আহমদ মুসার প্রতি সদয় হোন, মুক্ত করুন তাকে বন্দীদশা থেকে।’

বলে চোখের কোণ দু’টো মুছে উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তার সাথে সাথে বেরিয়ে গেল ওকোচার মা’ও।

তারা বেরিয়ে যাবার সাথে সাথে অগাস্টিন ওকোচা আবার শুয়ে পড়ল। বাম হাতটা এনে রাখল কপালের উপর। চোখ দু’টি তার বন্ধ। মুখের চেহারা তার বিধ্বস্ত।

ওকোচার স্ত্রী গিয়ে ওকোচার মাথার কাছে বসল। ওকোচার মাথায় হত রেখে তার চুল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, ‘কি ভাবছ তুমি?’

ওকোচা স্ত্রীর একটা হাত হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখ না খুলেই বলল, ‘তুমি যা ভাবছ তাই।’

‘তুমি যে কিছু বললে না?’

‘আমি ভাবছি।’

‘ভাবনার ফল কি হবে?’

ওকোচা চোখ খুলল। স্ত্রীর হাতটা বুকে চেপে ধরে বলল, ‘আমি সে সময়ের কথা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। রক্তাক্ত ও অবসন্ন আমাকে এক হাতে ধরে অন্য হাতে রিভলবার বাগিয়ে তেড়ে আসা লোকদের তিনি বলেছিলেন, আর এক পা এগুলে নির্বিচারে গুলী চালাব। তোমাদেরকে আইন হাতে তুলে নিতে দেব না। এ দোষী হলে তোমরা আইনের কাছে যাও। এই কথা যিনি বলতে পারেন তিনি কোন আইন ভাঙ্গতে পারেন না। আসলে তিনি অন্যায়ের প্রতিকার করতে এসেছেন। আমি আব্বার মত করে জাতির অন্যায়কে ভালোবাসতে পারব না।’

ওকোচা’র শেষের কথাগুলো আবেগের অশ্রুতে সিক্ত হয়ে উঠেছিল।

‘তাহলে কি করবে তুমি?’

‘কি করব আমি জানি না।আমাকে ভাবতে দাও।’

ওকোচার স্ত্রী ওকোচার একটা হাত তুলে নিয়ে চুমু খেয়ে বলল, ‘তুমি বিপদে ঝাঁপিয়ে পড় আমি তা চাইব না। কিন্তু তোমার সাথে আমি এক মত। এবং আমি মনে করি, কর্তব্যের চেয়ে নিজেদের নিরাপত্তার ভয় বড় হতে পারে না।’

ওকোচা ম্লান হাসল। স্ত্রীর হাত মুঠোয় নিয়ে চাপ দিয়ে বলল, ‘তোমাকে বাছাই করতে পেরে, ভালোবাসতে পেরে আমার গর্ব হচ্ছে। ফ্যাংগ-সর্দারের মেয়ের উপযুক্ত কথাই তুমি বলেছ।’

‘দেখ, ফ্যাংগদের হয়তো অনেক দোষ আছে। কিন্তু ‘ফ্যাংগ’রা অর্থ-বিত্ত, সুযোগ-সুবিধার কাছে তাদের নীতিবোধকে খুব কমই বিক্রি করে।’ স্বামীর হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে হেসে বলল ওকোচার স্ত্রী।

‘তার মানে বলতে চাচ্ছ, ‘ওয়ান্ডী’রা অর্থের কাছে তাদের নীতিবোধ বিক্রি করে?’ এক টুকরো মিষ্টি হেসে বলল ওকোচা।

‘আমার স্বামীর গোত্রকে আমি তা বলব না। কিন্তু তুমিই দেখ, ‘ওয়ান্ডী’রা খৃস্টান ধর্ম ও পশ্চিমী সভ্যতার দিকে সাংঘাতিকভাবে ঝুঁকে পড়েছে।’

‘ফ্যাংগ’রাও তো মুসলিম ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তোমার নানার পরিবার তো মুসলমান।’ হেসে বলল ওকোচা।

‘ফ্যাংগরা ঐতিহাসিক ভাবেই মুসলিম ‘ফুলানী’দের সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং তারা নীতি বিক্রি করে ওদিকে যাচ্ছে না। তাছাড়া বিক্রি করবে কিসের বিনিময়ে? মুসলিম হলে তো সুযোগ-সুবিধা কমে, বাড়ে না।’

হেসে উঠল ওকোচা। বলল, ‘তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট হোক। তোমাকে আইন বিভাগে ভর্তি করে দেব। উকিল বানাব তোমাকে।’

ওকোচার স্ত্রী হেসে উঠে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

ওকোচা ঘুমায়নি।

ভোর ৪টা বাজতেই উঠল ওকোচা।

পাশে স্ত্রী অঘোরে ঘুমাচ্ছে।

স্ত্রীর স্খলিত বসন ঠিক করে দিয়ে বিছানা থেকে উঠল ওকোচা।

স্পোর্টস-এর পোশাক পরে দু’তিন মিনিটের মধ্যেই তৈরী হয়ে গেল সে। ড্রয়ার খুলে রিভলবার বের করে জ্যাকেটের পকেটে রাখল।

তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিল।

গার্ড রুমে দারোয়ান অঘোরে ঘুমাচ্ছে।

ওকোচা গেট খুলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

পেছনে অটোমেটিক গেট আপনাতেই বন্ধ হয়ে গেল।

ওকোচার গাড়িটা ছয় সিটের একটা জীপ।

ওকোচার গাড়ি ওকুয়া’র হেড কোয়ার্টারের পুব পাশের গলি দিয়ে প্রবেশ করল।

গাড়িটা গিয়ে দাঁড়াল হেড কোয়ার্টারটির দক্ষিণে দুই বাড়ির পরের একটা বাড়ির গেটে।

গাড়িটি রাস্তার এক পাশে দাঁড় করিয়ে ওকোচা গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং গেরিলার আনন্দ ধ্বনির মত একটা শীষ দিয়ে উঠল।

গেরিলার এই আনন্দ ধ্বনি ‘কোক’দের এবং ‘ওকুয়া’রও নিজস্ব পরিচিতি সংকেত।

সংগে সংগে গেট খুলে গেল।

ওকোচা ভেতরে ঢুকে পকেট থেকে বের করে একটা মুখোশ পরে নিল মুখে। তারপর রিভলবার হাতে নিয়ে সোজা প্রবেশ করল গার্ড রুমে।

গার্ড রুমে গার্ড একজন। সে তার রিভলবারটা টেবিলে রেখে একা একা তাস খেলছিল।

ওকোচার বাম হাতে ছিল একটা রুমাল। ওতে আগেই ক্লোরোফরম ঢেলে নিয়েছিল সে।

ওকোচার পায়ের শব্দে গার্ড লোকটি ঝট করে মুখ তুলল। সেই সাথে তার হাত চলে গিয়েছিল রিভলবারের উপর।

ওকোচার রিভলবার তার দিকে তাক করা ছিল। এবার স্বরটা বিকৃত করে বলল, ‘হাত তুলে দাঁড়াও।’

হাত তুলে দাঁড়াল গার্ড লোকটি।

তার মুখ ভয়ে চুপসে গেছে।

ওকোচা তার বুকে রিভলবার ধরে নাকে চেপে ধরল ক্লোরোফরম মাখানো রুমাল।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড। গার্ড লোকটি সংজ্ঞাহীন হয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়ল।

ওকোচা তার হাত-পা বেঁধে দরজা লক করে বেরিয়ে এল।

বাড়িটা ছোট-খাট একটা গীর্জা।

গীর্জাটা আবাসিক নয়। শুধু রোববারেই খোলা হয়। গীর্জায় থাকে শুধু একজন গার্ড বা প্রহরী, আরেকজন কেয়ারটেকার।

আসলে বাড়িটার গীর্জা-পরিচয়টা একটা মুখোশ মাত্র। ওকুয়া’র একটা গোপন অফিস এটা। গেটম্যান এবং কেয়ারটেকার দু’জনেই ওকুয়া’র লোক।

ওকোচা গার্ডরুম থেকে বেরিয়ে প্রবেশ করল গীর্জায়।

গীর্জার কেয়ারটেকার থাকে গীর্জার মঞ্চের পেছনে ফাদারের জন্যে নির্দিষ্ট কক্ষটিতে।

ওকোচা গিয়ে কক্ষটির দরজায় দাঁড়াল। খুব আস্তে দরজার নব ঘুরিয়ে দরজায় চাপ দিল। দরজা খুলে গেল।

ওকোচার ডান হাতে উদ্যত রিভলবার।

দরজা খুলে দেখল কেয়ারটেকার চেয়ারে বসে ঘুমুচ্ছে।

ওকোচা ক্লোরোফরম ভেজানো রুমাল তার নাকের সামনে ধরল। দু’তিন সেকেন্ডের মধ্যেই তার শরীর আরো নেতিয়ে পড়ল। গাঢ় হলো তার নিঃশ্বাসের শব্দ।

ওকোচা তাকে বেঁধে বাথরুমে ঢুকিয়ে লক করে দিল।

তারপর ওকোচা ঘরটির টেবিলের পাশে দেয়ালের সাথে সেঁটে রাখা আলমারির দিকে এগুলো।

কেয়ারটেকারের কাছ থেকে নেয়া চাবীর গোছা থেকে একটা একটা করে চাবী লাগিয়ে দেখল কোনটা দিয়ে আলমারি খোলা যায়। অবশেষে একটা চাবীতে আলমারির তালা খুলে গেল।

ওকোচা সেই চাবিটি চাবির গোছা থেকে খুলে পকেটে রাখল। তারপর খুলল আলমারির দরজা।

আলমারির দরজা খুলতেই দেখা গেল একটা আলোকোজ্বল সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে।

এই সিঁড়ি আসলে একটা সুড়ঙ্গ পথ। এই সুড়ঙ্গ পথ গিয়ে উঠেছে ওকুয়া’র হেড কোয়ার্টারে ওকুয়া’র প্রধান ফ্রান্সিস বাইকের অফিস রুমের টয়লেটে।

ফ্রান্সিস বাইকের অফিস এবং তার শয়ন কক্ষ পাশাপাশি। মাঝের দেয়ালে রয়েছে দরজা।

ওকোচা আলমারির দরজা বন্ধ করে ডান হাতে রিভলবার বাগিয়ে পা রাখল সিঁড়িতে।

নামতে শুরু করল সিঁড়ি দিয়ে।

ওকোচার চোখে স্থির সংকল্পের চিহ্ন। মুখ হয়ে উঠেছে শক্ত।

আহমদ মুসাকে সাহায্য করার, তাকে মুক্ত করার এই উদ্যোগের সিদ্ধান্ত সে একাই নিয়েছে। এমনকি স্ত্রীকেও জানায়নি।

সে ওকুয়া’কে চেনে তাদের একজন হিসেবে। জানে সে, ধরা পড়লে তার মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু এ উদ্যোগে, এই ঝুঁকি নেয়া ছাড়া আহমদ মুসাকে সাহায্যের আর কোন পথ ছিল না। তার প্রাণ রক্ষাকারী আহমদ মুসার সাহায্যে এগিয়ে না গিয়ে বসে থাকা ছিল তার জন্যে অসম্ভব।

সিঁড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গে নামতে নামতে ওকোচা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল। আর ধন্যবাদ দিল গীর্জার কেয়ারটেকার তার বন্ধু ‘মেডলি’কে। মেডলির কাছ থেকেই সে সুড়ঙ্গ পথের কথা শুনেছে এবং তাকে সাথে নিয়ে একদিন সুড়ঙ্গ পথ দেখেছেও এর শেষ মাথা পর্যন্ত।

সুড়ঙ্গ পথের শেষ মাথায় এসে পৌঁছল ওকোচা। শেষ মাথা থেকে আরেকটা সিঁড়ি উঠেছে উপরের দিকে।

সিঁড়ি বেয়ে উঠে ওকোচা একটা প্ল্যাটফরমের উপর দাঁড়াল।

ঠিক তার সামনেই একটা দরজা।

সে জানে দরজার পরেই ফ্রান্সিস বাইকের অফিস টয়লেট। টয়লেটে কেউ নেই তো!

ঈশ্বরের নাম নিয়ে ওকোচা দরজার নব ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে দরজা খুলল।

না, টয়লেট ফাঁকা। টয়লেট থেকে বাইরে বেরুবার দরজা বন্ধ।

টয়লেট থেকে বাইরে বেরুবার দরজা খুলতে যাবে এমন সময় গোলাগুলীর শব্দ পেল ওকোচা। কয়েক মুহূর্ত পরে স্টেনগানের আবার সেই ব্রাশ ফায়ার।

চমকে উঠে ওকোচা সরে এল দরজা থেকে।

অপেক্ষা করল মুহূর্ত কয়েক। তারপর এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। দেখল ফ্রান্সিস বাইকের অফিস রুম ফাঁকা। তবে অফিস ও ফ্রান্সিস বাইকের শয়ন কক্ষের মাঝের দরজা খোলা।

ওকোচা রিভলবার বাগিয়ে গুটি গুটি পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে চলল।

আহমদ মুসার যখন ঘুম ভাঙল দেখল গোটা ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার।

অন্ধকার কেন?

তাহলে কি ওরা বন্দীরা ঘুমানোর পর লাইট বন্ধ করে দেয়!

আলো নেই মানে টিভি ক্যামেরার চোখও বন্ধ হয়ে গেছে। কেন ওরা এটা করল? আহমদ মুসার হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি এবং এক ইঞ্চি পুরু স্টিলের দরজায় তাকে আটকে কি তাহলে ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে?

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আহমদ মুসা। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল সে। এই অন্ধকার তার কাজের অনেক সুবিধা করে দেবে।

আহমদ মুসা জুতার সোলের পকেট থেকে ল্যাসার বীম পেন্সিল বের করল। প্রথমে হ্যান্ডকাফের তালা গলিয়ে হ্যান্ডকাফ খুলে ফেলল। তারপর ল্যাসার বীম দিয়ে কেটে ফেলল পায়ের বেড়ি। এগুলো দরজার দিকে।

প্রায় দুই রাত এবং পুরো একদিন তার গত হয়েছে এই বন্দীখানায়। এই বন্দীখানার সবকিছুই তার জানা হয়ে গেছে।

অন্ধকার হলেও খুব সহজেই আহমদ মুসা দরজার লক পয়েন্ট বের করে ফেলল। দিনের বেলা হিসেব করেই রেখেছিল আহমদ মুসা। লক বরাবর দরজার চৌকাঠ ও পাল্লার মাঝ দিয়ে আহমদ মুসার ল্যাসার বীমের তীব্র রে প্রবেশ করাল। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় দরজার পাল্লা ঈষৎ কেঁপে উঠল।

খুশী হলো আহমদ মুসা। দরজা খুলে গেছে।

দরজার বাইরে জুতার শব্দ ভেসে এল। শব্দটা ক্রমশ দুর্বল হতে লাগল।

আহমদ মুসা ধীরে ধীরে দরজা ফাঁক করে দেখল, স্টেনগান কাঁধে একজন প্রহরী করিডোর দিয়ে পূব প্রান্তের দিকে চলে যাচ্ছে।

করিডোরের প্রান্তে পৌছার পর প্রহরী ঘুরে দাঁড়াল এবং ফিরতি হাঁটা আবার শুরু করল।

আহমদ মুসা দরজা ভেজিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

প্রহরীর পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। আহমদ মুসার দরজার সামনে এসে পায়ের শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।

প্রহরীটি দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারল আহমদ মুসা। সে কি কিছু সন্দেহ করেছে? দরজা ঠেলে দেখবে কি সে?

না, পায়ের শব্দ শুরু হলো আবার।

নিশ্বাস স্বাভাবিক হলো আহমদ মুসার।

প্রহরীর পায়ের শব্দ দরজা পার হতেই আহমদ মুসা এক ঝটকায় দরজা খুলে করিডোরে নেমে এল। তারপর এক লাফে প্রহরীটির পেছনে গিয়ে পৌছল।

প্রহরী পায়ের শব্দে চমকে উঠে পেছনে ফিরছিল। কিন্তু তার আগেই আহমদ মুসা তার স্টেনগান ধরে ফেলেছে এবং এক হ্যাচকা টানে কেড়ে নিল তার স্টেনগান। ততক্ষণে প্রহরী ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।

আহমদ মুসা এবং সে তখন মুখোমুখি। আহমদ মুসার হাতে স্টেনগান। প্রহরী হাত দিচ্ছিল তার কোমরে ঝুলানো রিভলবারে।

আহমদ মুসার স্টেনগানের নল চোখের পলকে উপরে উঠল,তারপর বিদ্যুৎ বেগে গিয়ে পড়ল প্রহরীটির মাথায়।

একটা চিৎকার দিয়ে প্রহরী লোকটি আছড়ে পড়ল করিডোরের উপর। আহমদ মুসা আঘাত করেই ঘুরে দাঁড়াল।

দৌড় দিল সিঁড়ির দিকে।

আহমদ মুসার মনে আছে তাকে সিঁড়ি দিয়েই নিচে নামানো হয়েছিল। দরজা ছিল না সিঁড়ির মুখে।

সিঁড়ি মুখ একটা ঘরের মধ্যে। নিচে নামার লিফটও এর পাশেই। আহমদ মুসা দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে মেঝেতে পার রাখতেই সিঁড়ি মুখ বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের মেঝের ভেতর থেকে একটা পুরু স্টিল প্লেট গিয়ে ঢেকে দিল সিঁড়ির মুখ।

আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। আর কয়েক মুহুর্ত দেরী করলে সে নিচে আটকা পড়ে যেত।

আহমদ মুসা সিঁড়ি ঘর থেকে বেরুতে যাবে, এমন সময় বাইরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনল।

লুকোবার একটা জায়গার জন্যে আহমদ মুসা চারদিকে চাইল। কিন্তু ঘরের কোথাও এক ইঞ্চি আড়ালও নেই। আছে শুধু দরজার পাল্লা যা দেয়ালের সাথে সেঁটে আছে।

আহমদ মুসা ছুটে গিয়ে দরজার পাল্লাটা একটু টেনে তার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।

অনেকগুলো লোক দৌড়ে প্রবেশ করল ঘরে।

আহমদ মুসা উকি মেরে দেখল, ওরা ছয়জন। দৌড়ে ওরা গিয়ে উঠল লিফটে।

আহমদ মুসা নিশ্চিত, তার খোঁজেই ওরা ছুটছে নিচে। কিসে ওরা টের পেল, প্রহরীটির চিৎকার, না টিভি ক্যামেরার মাধ্যমে? টিভি ক্যামেরার মাধ্যমে হলে আহমদ মুসার উপরে উঠে আসা টিভি ক্যামেরা টের পায়নি কেন? তাহলে কি মনিটরকারীরা আগে কিছু টের পায়নি? ওরা যখন টের পেয়েছে, তখন কি আহমদ মুসা করিডোর পেরিয়ে এসেছিল? সিঁড়ি মুখের দরজা বন্ধ করা দেখেও তাই মনে হয়।

এই সিঁড়ি ঘরও কি টিভি ক্যামেরার আওতায় আছে, ভাবল আহমদ মুসা। যদি থাকে, তাহলে তো সে তাদের নজরে পড়ে যাবার কথা। এবং তাহলে তার সন্ধানে লোক এখনি ছুটে আসবে।

রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করল আহমদ মুসা। চার পাঁচ সেকেন্ডও পার হয়নি। আগের মতই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ পেল আহমদ মুসা। অনেকগুলো পায়ের শব্দ।

স্টেনগান বাগিয়ে একই সাথে চারজন ঘরে ঢুকেছে। ঘরের চারদিকে তারা তাকাচ্ছে।

আহমদ মুসা বুঝল, ওরা এই ঘরে তার সন্ধানেই এসেছে।

ওরা দরজা পেরিয়ে ঘরের মধ্যে ফুট দু’কয়েকের মত সামনে এগিয়েছে। আহমদ মুসা ওদের চোখে পড়ে যেতে বাকি নেই।

আহমদ মুসা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আগে আক্রমণই আত্মরক্ষার একমাত্র উপায়।

আহমদ মুসা চোখের পলকে দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।

একই সাথে উদ্যত স্টেনগান থেকে বেরিয়ে এল এক ঝাঁক গুলী।

ওদের চারজনের স্টেনগান এদিকে মোড় নেবার আগেই ওদের চারজনের লাশ পড়ে গেল মেঝের উপর।

আহমদ মুসা কি করবে ভাবছিল। এমন সময় সিঁড়িতে অনেকগুলো পায়ের দ্রুত উঠে আসার শব্দ পেল সে। সিঁড়ির মুখ থেকে সেই স্টিল-প্লেটটি সরে গেছে সে দেখল।

আহমদ মুসা বুঝল, তার অবস্থান ওরা জানতে পেরেছে কনট্রোল রুম থেকে ওয়াকিটকির মাধ্যমে। অথবা ওরা স্টেনগানের শব্দ পেয়ে উঠে আসছে। তবে সিঁড়ি মুখের দরজা খুলে যাওয়ায় প্রমাণ হচ্ছে কনট্রোল রুম থেকেই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

আহমদ মুসা বাইরের দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিচু হয়ে দৌড় দিল সিঁড়ির মুখের কাছে।

সিঁড়ি মুখে গিয়ে হাঁটু গেড়ে এমন পজিশন নিল যাতে সিঁড়ি ও দরজা দু’দিকেই সে চোখ রাখতে পারে।

সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা লোকদের প্রথম জনের মাথা নজরে এল আহমদ মুসার।

আহমদ মুসা তার স্টেনগানের ব্যারেল নিচু করে সিঁড়ির সমান্তরালে নিয়ে ট্রিগার চেপে ধরল। বেরিয়ে গেল বৃষ্টির মত একরাশ গুলী।

তাকিয়ে দেখল আহমদ মুসা, সিঁড়িতে কোন মানুষ দাঁড়িয়ে নেই। ছয়জনই কি সিঁড়িতে উঠেছিল এবং ছয়জনই কি স্টেনগানের গুলীর মুখে পড়েছে?

একটু অপেক্ষা করল আহমদ মুসা। কিন্তু না কেউ আর নিচু থেকে উঠছে না।

আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াল দরজার দিকে। গুটি গুটি এগুলো দরজার দিকে। দাঁড়াল গিয়ে চৌকাঠের আড়ালে। উঁকি দিল বাইরে।

এই দরজা দিয়েই সেদিন প্রবেশ করানো হয়েছিল তাকে। দরজার পরের ছোট চত্বর পার হয়ে সোজা করিডোর উত্তর দিকে এগিয়ে গেছে, তা বাইরে বেরুবার দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে।

আহমদ মুসার লক্ষ্য বাইরে বেরুবার দরজা নয়। সে পৌছুতে চায় ফ্রান্সিস বাইক এবং পিয়েরে পলের কক্ষে। তাদের কক্ষের পাশেই কোন এক কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়েছে ওমর বায়া এবং ডঃ ডিফরজিসকে।

গত এক দিন দুই রাতের চেষ্টায় খাবার দিতে যাওয়া লোক এবং প্রহরীদের সাথে কথা বলে আহমদ মুসা যেটুকু জানতে পেরেছে তা হলো, দুই কর্তা বন্দীখানার উপরেই থাকেন এবং মেহমানরা থাকেন তাদের পাশেই।

অর্থাৎ ফ্রান্সিস বাইক এবং পিয়েরে পল থাকেন বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তে এবং এক তলায়।

বিস্মিত হয়েছে আহমদ মুসা। প্রবেশ এবং বের হবার পথ থেকে দূরে এবং এক তলার একটা স্থানকে তারা তাদের জন্যে নিরাপদ বা সবদিক থেকে ভাল মনে করলেন কেমন করে?

আহমদ মুসার লক্ষ্য বাড়ির দক্ষিণ প্রান্ত।

আহমদ মুসা দরজা দিয়ে বের হতে গিয়েও ফিরে এল।

বাইরের নিঃশব্দতাকে একটা ঝড়ের সংকেত বলে তার কাছে মনে হলো। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তাকে আক্রমণের নতুন পথ বের করছে নিশ্চয়। তার মনে হলো সামনের চত্বরে যেন ফাঁদ পাতা।

আহমদ মুসা ঘরটির চারদিকে আবার চাইল বিকল্প পথের সন্ধানে। একবার ভাবল, লিফটে সে অন্য তলায় গিয়ে অন্যপথে আবার একতলায় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, লিফটে টিভি ক্যামেরার চোখ পাতা আছে নিশ্চয় এবং লিফটের নিয়ন্ত্রণও কন্ট্রোল কক্ষে থাকতে পারে।

ভাল করে নজর বুলাতে গিয়ে হঠাৎ আহমদ মুসার চোখে পড়ল ঘরের পুব দেয়ালে চাবীর ছিদ্র।

আহমদ মুসা দরজার দিকে স্টেনগান বাগিয়ে ধরে পিছু হটে সেই চাবীর ছিদ্রের কাছে পৌছুল।

আহমদ মুসা তর্জনি দিয়ে নক করে বুঝল, ওটা স্টিলের একটা দরজা।

খুশী হলো আহমদ মুসা।

ডান হাতে স্টেনগান বাগিয়ে ধরে বাঁ হাতে পকেট থেকে ল্যাসার বীম বের করে আন্দাজেই চাবীর ছিদ্রে সেট করে সুইচ টিপল।

আহমদ মুসা একটি পায়ের গোড়ালী ঠেস দিয়ে রেখেছিল দরজায়। কয়েক সেকেন্ড পর অনুভব করল তার পায়ের গোড়ালীতে দরজার পাল্লার মৃদু কম্পন। দরজা খুলে যাবার লক্ষণ এটা।

আহমদ মুসা দরজার উপর তার পায়ের গোড়ালির চাপ শিথিল করতেই দরজার পাল্লা ডান পাশের দেয়ালের ভেতর ঢুকে গেল।

সাথে সাথেই চরকির মত ঘুরে দাঁড়াল আহমদ মুসা। দেখল সেটাও একটা সিঁড়ি ঘর। সিঁড়ি উপর দিকে উঠে গেছে।

আহমদ মুসার উপরে উঠার প্রয়োজন নেই।

সিঁড়ির বিপরীত দিকে ঘরের দক্ষিণ দেয়ালে একটা বন্ধ দরজা দেখতে পেল আহমদ মুসা। দক্ষিণের দরজা পেয়ে খুশী হলো সে।

এই মাত্র পার হয়ে আসা দরজার দিকে স্টেনগান বাগিয়ে আস্তে আস্তে পিছু হটে বন্ধ দরজার কাছে পৌঁছল।

আহমদ মুসা এই মাত্র পেরিয়ে আসা দরজা দিয়ে প্রথম সিঁড়ি ঘরের বাইরের দরজাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।

হঠাৎ তার নজরে পড়ল প্রথম সিঁড়ি ঘরের বাইরের দরজায় একটা মুখ উঁকি দিয়েই সরে গেল। আহমদ মুসা বুঝল ঐ দরজার বাইরে নিশ্চয় আরও লোক আছে। ওরা সুযোগ খুঁজছে।

আহমদ মুসা আরো সতর্কভাবে ঐ দরজার দিকে তার স্টেনগান তাক করল।

এদিকে দক্ষিনের দরজাটি খোলার জন্যে আহমদ মুসা দ্রুত পকেট থেকে সেই মাইক্রো ল্যাসার টর্চ (বীম টর্চ) বের করল। আগের দরজা যেভাবে খুলেছিল, সেভাবে এ দরজাও খুলে ফেলল। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা থেকে এবার সে দরজার পাল্লার উপর পায়ের গোড়ালির চাপ শিথিল করে দিল না।

প্রথম সিঁড়ি ঘরের বাইরের দরজার দিকে একবার তাকিয়ে পায়ের গোড়ালি দরজার পাল্লা থেকে টেনে নিয়েই ট্রিগারে আঙুল রেখে উদ্যত স্টেনগান নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার পাল্লা সামনে থেকে সরে যেতেই আহমদ মুসা চারজনের মুখোমুখি হল। ওরা আসছিল দরজার দিকে।

ওরা আহমদ মুসাকে দেখার মত দৃশ্যের জন্যে প্রস্তুত ছিল না। ওদের স্টেনগানের ব্যারেল নামানো। ওরা মুহুর্তের জন্যে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল।

আহমদ মুসার সিদ্ধান্ত নেয়াই ছিল। ট্রিগারের আঙুলটা চাপল মাত্র। গুলী বেরিয়ে গেল একঝাঁক। ওরা চারজন স্টেনগান তোলারও সুযোগ পেল না। ওদের দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেল।

গুলী করেই আহমদ মুসা যে করিডোর ধরে ওরা চারজন এগিয়ে আসছিল, সেই করিডোর ধরে দক্ষিন দিকে দৌড় দিল।

করিডোরটির দু’পাশে দু’টি ঘর। ঘর পার হবার পরেই করিডোরটি শেষ হয়েছে একটা ছোট্ট আয়তাকার চত্বরে এসে।

চত্বরে মুখ বাড়াতেই আহমদ মুসা দেখল, চত্বরের ওপারে একটা দরজা দিয়ে একজন বেরিয়ে আসছে। তার হাতে রিভলবার।

আহমদ মুসা তার উপর চোখ পড়ার সাথে সাথেই গুলী চালাল। লোকটি দরজার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।

আহমদ মুসা চত্বরে প্রবেশ করল।

ঠিক এই সময়েই পেছনে স্টেনগান গর্জন করে উঠল। করিডোরে থাকলে তার দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যেত।

আহমদ মুসা যে দরজায় লাশ পড়েছিল, সে দরজা লক্ষ্যে এক ঝাঁক গুলী করে সেদিক সম্পর্কে আপাতত নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক লাফে করিডোরের মুখে দেয়ালের আড়ালে হাঁটু গেড়ে বসল। ওদিক থেকে গুলী আসা বন্ধ ছিল।

এরই সুযোগ গ্রহন করলো আহমদ মুসা।

ট্রিগারে আঙুল রেখে ব্যারেলটা করিডোরে নিয়েই গুলী চালাল আহমদ মুসা।

ওরা কয়েকজন দ্বিতীয় সিঁড়ি ঘরের দ্বিতীয় দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আকস্মিক গুলীর মুখে ওরা ছুটে পালায় ভেতরে। একজন গুলী বিদ্ধ হয়ে দরজার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।

আহমেদ মুসা আড়ালে সরে এসে বিড়ালের মত নিশব্দে এক দৌড়ে ছোট্ট চত্বরটা পেরিয়ে সেই দরজায় ফিরে এল, যেখানে গুলী বিদ্ধ লাশটা পড়ে ছিল।

দরজাটা ছিল আধ-খোলা।

মুহূর্তকাল সে দাঁড়াল দরজায়।

তারপর ডান হাতে স্টেনগান ধরে তর্জনি ট্রিগারে চেপে বাঁ হাতে অর্ধখোলা দরজাটি তীব্র বেগে ঠেলে দিল এবং সেই সাথে ট্রিগার চেপে ধরে স্টেনগান ঘুরিয়ে নিল গোটা ঘরে।

ঘর ফাঁকা, কিন্তু দরজার পাল্লার প্রচন্ড ধাক্কায় ভারী কি যেন দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল।

আহমদ মুসা একটু এগিয়ে দরজার পাল্লা সরিয়ে নিল। দেখল, একজন লোক রিভলবার কুড়িয়ে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াচ্ছে।

আহমদ মুসা স্টেনগানের ব্যারেল দিয়ে তার হাতে আঘাত করল। তার হাত থেকে রিভলবার দূরে ছিটকে পড়ল।

আহমদ মুসা লোকটির দিকে ভালো করে তাকাতেই চমকে উঠল, এ যে ‘ওকুয়া’ ও ‘কোক’-এর চীফ ফাদার ফ্রান্সিস বাইক।

আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে আনমনা হয়ে পড়েছিল।

ফ্রান্সিস বাইকের কাছে পড়েছিল একটা লোহার বার। নিরাপত্তার বাড়তি ব্যবস্থা হিসেবে এই ঘরের দরজা বন্ধে লোহার এই বার ব্যবহার করা হয়।

ফ্রান্সিস এই লোহার বার তুলে আকস্মিক আঘাত করল আহমদ মুসার ডান হাতে।

আহমদ মুসা এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তার হাত থেকে স্টেনগানটা ছিটকে পড়ে গেল।

ইতিমধ্যে ফ্রান্সিস বাইক ছুটে গিয়ে তুলে নিয়েছে রিভলবার। তার রিভলবার উদ্যত হল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে।

আহমদ মুসা কিছু ভাববার আগেই একটা রিভলবারের গুলীর শব্দ হলো।

ফ্রান্সিস বাইক ‘আ!’ বলে চিৎকার করে উঠে বাম হাত দিয়ে ডান হাত চেপে ধরে বসে পড়ল। তার হাত থেকে রিভলবার ছিটকে পড়ল।

আহমদ মুসা ফ্রান্সিস বাইকের রিভলবার কুড়িয়ে নিয়ে পিছন দিকে ফিরে তাকাল। দেখল মুখোশ পরা একজন লোক।

আহমদ মুসা বিস্মিত হলো এই ধরনের একজন লোককে দেখে। ভাবল, লোকটি যেই হোক তার বন্ধু- তার পক্ষের লোক।

‘ধন্যবাদ আপনাকে। জীবন রক্ষায় আমাকে সাহায্য করেছেন।’ বলল আহমদ মুসা মুখোশধারী লোকটিকে লক্ষ্য করে।

বলে আহমদ মুসা এগুলো ফ্রান্সিস বাইকের দিকে। বাম হাতে তাকে টেনে তুলে ডান হাতের রিভলবারটা তার মাথায় ঠেকিয়ে বলল, ‘কোন ঘরে আছে ওমর বায়ারা বলুন।’

ফ্রান্সিস বাইক কথা বলল না।

‘দেখুন, এক আদেশ আমি দুই বার করি না। আপনাদের ১৭টি লাশ আমি পেছনে ফেলে এসেছি। তিন পর্যন্ত গুনার মধ্যে কথা না বললে আপনি ১৮ তম লাশ হবেন।’

‘তুমি পিয়েরে পলকে হত্যা করেছ, এর জন্যে চরম মুল্য তোমাকে দিতে হবে।’

‘কোথায় পিয়েরে পল?’

‘এই দরজায় যে লাশ পড়ে আছে, সে পিয়েরে পল।’

আহমদ মুসা সেদিকে একবার তাকিয়ে দেখল সত্যই পিয়েরে পলের লাশ। এতক্ষন খেয়াল করেনি আহমদ মুসা।

‘পিয়েরে পলের জন্যে আমি দুঃখিত।’ বলে এক, দুই… গুনতে শুরু করল।

দুই পর্যন্ত গুনতেই ফ্রান্সিস বাইক বলল, ‘পাশের কক্ষে ওঁরা আছেন।’

মুখোশধারী এগিয়ে এল। বলল অনেকটা ফিসফিসে কন্ঠে, ‘আমি দরজা আগলাচ্ছি। আপনি ওদের মুক্ত করুন।’ বলে মুখোশধারী আহমদ মুসার স্টেনগান তুলে নিল।

‘ধন্যবাদ।’ বলল মুখোশধারীকে লক্ষ্য করে আহমদ মুসা।

তারপর আহমদ মুসা রিভলবারের বাট দিয়ে ফ্রান্সিস বাইকের মাথায় একটা খোচা দিয়ে বলল, ‘আমাকে নিয়ে চলুন সে ঘরে।’

ঘরটির দক্ষিন দেয়ালের পার্টিশন দেয়ালের দিকে এগুলো ফ্রান্সিস বাইক।

আহমদ মুসা যখন ওমর বায়া ও ডঃ ডিফরজিসকে মুক্ত করে মুখোশধারীর সাথে মিলিত হলো আগের সেই কক্ষে, তখন কেবিন মাইক্রোফোনে ঘোষনা হচ্ছিল, ‘আহমদ মুসা তুমি ফাদার বাইককে কতক্ষন আটকে রাখবে, তোমার বের হবার পথ বন্ধ। কিছু লোক মেরেছ, কিন্তু এখানে যত লোক আছে তার ১০ ভাগ মারার মত বুলেট তোমার কাছে নেই। আমাদের নেতাকে সসস্মানে ছেড়ে দিলে এবং আত্মসমর্পন করলে তোমার প্রতি সদয় ব্যবহার করা হবে। তোমাকে ১০ মিনিট সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে সারেন্ডার না করলে আমরা এমন পদক্ষেপ নেব যে তুমি বুঝতেই পারবে না তুমি কখন আমাদের হাতে এসেছ। তুমি পিয়েরে পলকে হত্যা করেছ। এর প্রতিশোধ শুধু তোমার উপর নয়, যত জায়গায় পারি যেভাবে পারি এর প্রতিশোধ তোমাদের উপর নেয়া হবে।’

থেমে গেল মাইক্রোফোনের কন্ঠ।

‘ঠিকই বলেছে ওরা আহমদ মুসা। তুমি অনেক দূর এগিয়েছ। আর এগোবার পথ তোমার জন্যে বন্ধ। গোটা বিল্ডিং-এর মধ্যে এই জায়গাটা আমাদের জন্যে নিরাপদ। এই নিরাপদ জায়গায় কোন শত্রু যখন পৌঁছে, তখন তার জন্যে এটা হয়ে দাঁড়ায় সাংঘাতিক আপদ। সেই আপদ তোমাদের ঘিরে ফেলেছে।’ বলল ফ্রান্সিস বাইক অনেকটা ব্যাঙ্গ করে।

আহমদ মুসা কথা বলার জন্যে মুখ খুলতে যাচ্ছিল।

কিন্তু তার আগেই মুখোশধারী ফ্রান্সিস বাইকের দিকে এগুলো।

আহমদ মুসা দেখল, মুখোশধারী তার পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে ফ্রান্সিস বাইকের নাকে চেপে ধরল।

আহমদ মুসা বুঝল। ফ্রান্সিস বাইককে ক্লোরোফরম করা হলো।

আহমদ মুসা রহস্যময় লোকটির দিকে বিস্ময় দৃষ্টি মেলে তাকাল। কিন্তু তার কাজে বাধা দিল না। কারন, এ পর্যন্ত রহস্যময় লোকটি দুইটি কাজ করেছে, দুইটিই ছিল অপরিহার্য প্রয়োজন।

ফ্রান্সিস বাইক সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গেল। সংগে সংগেই মুখ থেকে মুখোশ খুলে ফেলল মুখোশধারী।

‘ওকোচা তুমি?’ বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল আহমদ মুসা।

ওকোচা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ইংগিত করে ফিসফিসে কন্ঠে বলল, ‘আস্তে, আমার নাম করবেন না।’

‘ও, তুমি ফ্রান্সিস বাইকদের কাছে তোমার পরিচয় গোপন করার জন্য মুখোশ পরেছিলে?’

ওকোচা মাথা নাড়ল।

‘তাহলে তুমি চেন এঁদের? এঁরা চেনে তোমাকে?’

ওকোচা নীরবে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘আসুন আমার সাথে।’

বলে হাঁটা শুরু করল।

‘কোথায়? কোন পথে?’

প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ওকোচা বলল, ‘আসুন আমার সাথে।’

বলে আবার হাঁটতে শুরু করল।

আহমেদ মুসা ফ্রান্সিস বাইককে দেখিয়ে বলল, ‘একে আমি সাথে নিতে চাই।’ বলে আহমেদ মুসা নিচু হয়ে কাঁধে তুলে নিতে গেল ফ্রান্সিস বাইককে।

ওকোচা ছুটে গেন এবং আহমেদ মুসাকে বাধা দিয়ে নিজেই ফ্রান্সিস বাইককে কাঁধে তুলে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল।

আহমেদ মুসারাও শুরু করল ওকোচার পেছেনে হাঁটতে। আহমেদ মুসা আন্দাজ করল, ওকোচা হয় এদের লোক, না হলে এদের ঘনিষ্ঠ কেউ। এখান থেকে বেরুবার কোন গোপন পথ তার জানা আছে।

সম্ভবত গোপন পথেই সে এখানে এসেছে। এ কারণেই ওকোচাকে প্রথমে ঘরের ভেতর দিকের দরজায় দেখা গেছে।

প্রথমে হাঁটছিল ওকোচা ফ্রান্সিস বাইককে কাঁধে নিয়ে। তার পেছনে ড. ডিফরজিস এবং ওমর বায়া। সবার পেছনে আহমেদ মুসা।

সিড়ি ভেঙে যখন সুড়ঙ্গ নামছিল তারা তখন উৎসুক হয়ে উঠল আহমেদ মুসার মন। বলল, ‘এ গোপন পথেন সন্ধান তুমি জান কি করে?’

এবার কথা বলল ওকোচা। বলল, ‘ভাইয়া ওদের ঘরে ভয়েস রেকর্ডার আছে। তাই আমি কথা বলিনি। আমার গলা চিনতে পারলে আমাদের সর্বনাশ।’

বলে একটু থেমে ওকোচা বলল, ‘ভাইয়া আমাদের গোটা পরিবার ‘কোক’-এর কার্যক্রমের সাথে জড়িত। আর এ গোপন সুড়ঙ্গের কথা জানতে পেরেছি আমার বন্ধুর কাছে। সে এই সুড়ঙ্গের বাইরের মুখের একজন পাহারাদার।’

গোটা ব্যাপারটা আহমেদ মুসার কাছে এখন পরিষ্কার হয়ে গেল।

‘আমার আটকা পড়ার খবর তুমি জানলে কি করে?’

‘সে অনেক কথা পরে বলব, ফাদারকে কাঁধে নিয়ে বলা যাবে না।’

‘এ বিপদজনক কাজে তোমার আব্বা তোমাকে একা ছেড়েছেন?’

‘তিনি এবং পরিবারের কেউ জানে না আমি এসেছি।’

‘জানালে কি হত?’

‘আমার আব্বা আপনার মুক্তির জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন, কিন্তু ওকুয়া’র বিরুদ্ধেতিনি কিছু করতে পারবেন না। আর আব্বা মনে করেন, আপনার মুক্তির জন্য কিছু না করা আমানবিক হবে। তবে এজন্য আমি বিপদে পড়ি তিনি তা চান না।’

হাসল আহমেদ মুসা। বলল, ‘তুমি বুদ্ধিমান এবং বিবেচক।’

সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসে সেই কেয়ারটেকারের ঘরের কাছে পৌঁছে ওকোচা টয়লেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘আমার বন্ধুটি এখনে সংজ্ঞাহীন ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে।’

‘আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ ওকোচা।’ বলল, আহমেদ মুসা।

‘আহমেদ মুসা ওকোচাকে কৃতজ্ঞাতা জানানো কি শোভন হয়।’

কথা শেষ করেই ওকোচা বলল, ‘আপনারা এখানে একটু দাঁড়ান, আমি গেটটা দেখে আসি।’

বলে সে বাইরে চলে গেল।

কিছুক্ষন পর ফিরে এসে বলল, ‘সব ঠিক আছে চলুন।’

গাড়িতে উঠতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল আহমেদ মুসা। বলল, ‘ওকোচা গাড়ী ঠিক আছে তো?’

‘তার মানে? গাড়ীতে কেউ কিছু পেতে রেখেছে কিনা।’

‘সে রকমই।’

‘ওকোয়া কিংবা ‘কোক’ সেক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু করতে পারে না।’

‘তারা আসত ডাইরেক্ট এ্যাকশনে। তারা যদি এ গাড়ীকে সন্দেহ করত, তাহলে এতক্ষনে শুধু গাড়ী নয়, আমরা তদের হাতে গিয়ে পড়তাম, নয়তো বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যেতো আমাদের দেহ।’

গাড়িতে উঠে বসল সবাই।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

ড্রাইভিং সিটে ওকোচা। তার পাশে আহমেদ মুসা। পেছনের সিটে ড. ডিফরজিস ও ওমর বায়া। আর গাড়ির মেঝেতে রাখা হয়েছে হাত-পা বাঁধা ফ্রান্সিস বাইককে।

গাড়ি চলছে।

আহমেদ মুসার মন আজ খুব হালকা হতে পারত। ওমার বায়া এবং ড. ডিফরজিস মুক্ত। সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে বড় শত্রু পিয়েরে পল নিহত এবং ‘ওকুয়া’ ও ‘কোক’ -এর প্রধান হাতের মুঠোয়।

কিন্তু এরপরও আহমেদ মুসার মনে দুঃসহ এক ভার। ওমর বায়া মুক্ত হয়েছে, মুক্ত হয়েছে ড. ডিফরজিস, কিন্তু ক্যামেরুনের লাখো মানুষের মক্তি এখনও আসেনি।

একাজে তাকে এখনি ব্রতী হতে হবে।

আহমেদ মুসার মনে পড়ল কেবিন মাইক্রোফোনে দেয়া হুমকির কথা, ওরা প্রতিশোধ নেবে।

আহমেদ মুসার সমস্ত হৃদয় উথলে উঠেছে ক্যামেরুনের মুসলমানদের অন্ধকার জীবনে আগামী সুর্যোদয় দেখার জন্য।

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত