পোর্টাল

পোর্টাল

স্কুটির সামনের চাকা পাংচার হওয়া মাত্র আমি বুঝতে পারলাম বাবা কেন বারবার স্পেয়ার চাকা সাথে নেওয়ার কথা বলে। হয়তো আরো কিছু দূর কোনভাবে চালিয়ে নেয়া যেত কিন্তু আমি আমার প্রিন্সেসের উপর ধকল দিতে চাইলাম না। কিংবা সন্ধ্যে হয়ে আসার আগ মুহূর্তে গোধূলি লগ্নে একা একা হাঁটাই বেশি পছন্দের হয়ে উঠেছিল।

স্কুটি ঠেলে একটা ডিভিডি দোকানের সামনে রাখলাম। আমার এখন সাতিবকে টিটি প্র্যাকটিস রুম থেকে বাসায় নিয়ে আসার কথা। সাতিব হচ্ছে আমার ছোট ভাই।

হেঁটে হেঁটে যেতে ঘন্টা পার হয়ে যাবে। তাই ২৪*৭ প্রাইভেট হেল্পলাইন খুলে বসা হামিমকে ফোন দিলাম।
-“সাতিবকে টিটি প্র্যাকটিস ক্লাস থেকে বাসায় নিয়ে আসতে পারবি?”

না পারার কোন কারণ নেই তবুও আমি জিজ্ঞেস করলাম। হামিম পাল্টা প্রশ্ন করলো,
-“তুই কই?”
-“বীচে গেসিলাম। স্কুটির টায়ার গেসে।”
অন্য প্রান্ত থেকে হামিম মুখ দিয়ে একটা শব্দ করলো শুধু। আমি আবার বললাম,
-“আমি ফাহিম মিউজিকের কাছে আছি। তুই সাতিবকে বাসায় রেখে আয়।”

দিনের শুরুর মত শেষটা খুব দ্রুত হয়। মাথার উপর মৌমাছির চাকের মত এক ঝাঁক মশা নিয়ে আমি হাঁটছিলাম। আমি বলবো না আমরা পার্বত্য এলাকায় থাকি। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় কোন এক কালে এই এলাকা আরো বেশী সবুজ ছিল। পিচ ঢালা রাস্তা গুলো আঁকাবাঁকা হলেও খাগড়াছড়ি হিল ট্র্যাক্স এর মত ভয়ঙ্কর বাঁক এখানে নেই। বরং ভাটিয়ারীর ঢেউ তোলা রাস্তার সাথে বেশ মিলে যায়। আমার মাথার উপর উড়তে থাকা মহিলা মশাগুলো রাঙামাটির মশার মত স্বাস্থ্যবতী না মোটেও।

একটা গাঢ় নীল পিক আপ ভ্যান আসতে দেখলাম, টয়োটার হয়তো। হলুদ হেডলাইট জ্বালিয়ে বিপদজনক গতিতে এগিয়ে আসছে। আমি রাস্তার পাশের টিলা ঘেঁষে সরে দাঁড়ানোর আগেই হলুদ লাইট আমার চোখ ধাধিয়ে দিল। ডান-বাম দিক ভুলে গেলাম এক মুহূর্তের জন্য আর সেই এক মুহূর্তের ফাঁকেই গাড়িটা আমাকে ধাক্কা দিল।

রৌদ্রজ্জ্বল একটি দিন। বীচের ভেজা বালু দিয়ে ক্যাসল বানাচ্ছে একটি মেয়ে। টকটকে গোলাপী স্যুইমিং স্যুটটা আমি চিনি। আমার বয়েস যখন পাঁচ কী ছয় আমার বাবা এনেছিল ওটা। গোলাপী রঙ কখনই আমার ভালো লাগতো না। স্যুইমিং স্যুটটাও আমার প্রিয় ছিল না।
অদূরে বাবা-মা বসে। বাবার হাতে একটা বই। মা উঠে এসে আমার কাছে আসছে। মা আমাকে ডাকছে …
-“সায়েরা …?”
কন্ঠটা বিকৃত হয়ে গেল। আমি চোখ খুললাম। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমান হঠাৎ করে যেন কমে গেছে। হলুদ একটা আলো। একটা চেহারা আমার দিকে ঝুঁকে। ঝাপসা চেহারার মানুষটিই আমাকে নাম ধরে ডাকছে,
-“সায়েরা …?”

 

চোখ বন্ধ করতেই চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। কোথাও খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। কেউ একজন বলছে,
-“কিচ্ছু হবে না। আমি ঠিক করে দিচ্ছি…”

আমি হা করে শ্বাস নিতে চেষ্টা করি। আমার মেরুদন্ডে আগুন ধরে যায়। কোমরের কাছে পুড়ছে। আমার পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। আমি ধনুকের মত বেঁকে যাই প্রচন্ড যন্ত্রনায়। আমি বুঝতে পারি, আমি মারা যাচ্ছি।

শর্টফিল্মের মত সারা জীবনের এক ঝলক আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো না। আমার মা শুধু আমার নাম ধরে ডাক দিতে লাগলেন। বিচ্ছিরি গোলাপী সুইমিং স্যুট পড়ে আমি ক্যাসল বানাতে লাগলাম…………

-“সায়েরাআআআআআআআআ ……………………!!!!!”

অমানুষিক এক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আমার মৃত্যু হয়।

চোখ খুলে আমি বাবাকে দেখতে পেলাম। অফিসের ব্লেজার গায়ে মানুষটা উৎকণ্ঠিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। আমার ডান হাতে একটা চিনচিনে অনুভূতি। আমি মারা যাই নি! আমি হাসপাতালে। আমাকে সম্ভবত স্যালাইন দেয়া হচ্ছে, কিংবা অন্য কিছু। আমি আমার পুড়ে যাওয়া পিঠের উপরেই বহাল তবিয়তে শুয়ে।
-“বাবা,” আমার কন্ঠ আমার নিজের কাছেই অপরিচিত শোনায়।

-“ঘুম যাও, বাবা। কথা বলে না,” বাবা সন্তর্পণে আমার কপালে হাত রাখে। আমার মাথা ব্যান্ডেজে মোড়ানো হয়নি। কিন্তু আমি মারা গিয়েছিলাম।

-“বাবা, আমি মারা গেছিলাম!” আমি কথাটা বলেই ফেলি; অনেক অনেক উদ্ভট শোনায় যদিও……

-“তুমি ঘুমোও। কথা বলো না।”

বাবা তোতা পাখির মত একই কথা আউড়ে যায়। আমি কোমা থেকে ফিরে আসা মানুষদের কথা জানি। যারা দাবী করে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে। আমি পুরো জীবনের এক ঝলক চোখের সামনে দেখিনি। কিন্তু আমি জানি আমি মারা গিয়েছিলাম।

আমি বাবাকে সেটা বলার শক্তি পাই না। আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। হলুদ আলোতে আমার দিকে ঝুঁকে থাকা ঝাপসা চেহারার মানুষটিকে আমি হঠাৎ করেই চিনতে পারি।

এরপর সম্ভবত বেশ কয়েকদিন আমি ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিই। মাঝে মাঝে নার্স আর বাবার কথা শুনি। কখনও কখনও সাদা এপ্রন পড়া ডাক্তার কাগজ হাতে পাশে আরেক ডাক্তারকে বলে,
-“শী ইজ অ্যা মিরাকল!”

নার্সের কৌতুহলী প্রশ্ন থাকে বাবার উদ্দেশ্যে,
-“আপনার মেয়ের কি আগে কখন কোন অপারেশন হয়েছিল?”
আমি বুঝতে পারি আমার মস্তিস্ক সক্রিয় যদিও সব ঝাপসা। আমি টের পাই, ডাক্তারদের কাছে আমি বিস্ময়ের কিছু। নার্সদের কাছে স্রষ্টার রহস্য! আমার মেরুদন্ডের এক্স-রে বলছে লাম্বার ভারটিব্রার স্পাইনাস প্রসেসে যে স্পষ্ট দাগ দেখা গেছে তা সদ্য হওয়া কোন বড় অস্ত্রপাচারের। এই অস্ত্রপচার ওরা করেনি। তাহলে কারা করলো? আমার সামনেই ওরা এসব বলাবলি করে। ওরা হয়তো বুঝে না, ঘুমিয়ে থেকেও সজাগ আমি।

অনেকদিন পর, আক্ষরিক অর্থেই অনেকদিন পর সাতিবকে দেখে আমি উঠে বসার চেষ্টা করি। হামিম আর সরফরাজ আংকেলও এতদিনে আমাকে দেখতে আসে।
-“আজকে তোমাকে নিয়ে যেতে আসছি!”

সাতিবের কন্ঠে পূর্ণ উচ্ছ্বাস। আমি হাসি দিয়ে যে প্রশ্ন করি সেটা মোটেও বড় বোন সুলভ না, কিন্তু আমি সুলভ,
-“আজকে স্কুল যাও নাই?”

-“আজ তো শুক্রবার। বন্ধ।”

আমি কয়দিন এখানে পার করলাম কে জানে। সরফরাজ আংকেল ডাক দেন,
-“সাতিব আসো। বাইরে অপেক্ষা করি।”

-“সাতিব আর সরফরাজ আংকেল বাইরে গেলেও হামিম থেকে যায়।

আমি হামিমকে টিজ করি,
-“তোর আম্মা তোকে হসপিটালে আসতে দিল?”
হামিম চেহারায় বিরক্তির ভাঁজ ফেলে,
-“তুই বেটি অ্যাক্সিডেন্ট একটা করে কলেজের হিট গার্ল হই গেলি। অথচ একটা হাতও ভাঙ্গে নাই!”

কলেজের কথা শোনা মাত্র আমার এক্সিডেন্টের রাতের কথা মনে পড়ে গেল। আমি দ্বিতীয়বার না ভেবে বলে ফেললাম,
-“দোস্ত! ঐদিন আমি মরে গেসিলাম। পরে নাবিল আমাকে বাঁচাইসে।” হলুদ আলোতে আমার দিকে ঝুঁকে থাকা সেই মানুষটাকে আমি কয়েকদিন আগেই চিনতে পেরেছিলাম। নাবিল, আমাদের ক্লাসমেট।

-“হুঁ, তোরে জাহান্নামে পাঠাইতে আল্লাহ্‌র বিরক্ত লাগতেসিল, এই জন্যে আবার ফেরত পাঠাইসে……,” হামিম উড়িয়ে দেয় আমার কথা। আমি আবার বলি,

-“সিরিয়াসলি!”

এই বার হামিমের চেহারার এক্সপ্রেশন একটু চেঞ্জ হয়,
-“তুই নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্সের সাথে ডেথ এক্সপেরিয়েন্স গুলাই ফেলসিস। আর কাউকে বলিস না। কাউন্সেলিং সাক্স!”

হামিম কোন কাউন্সেলিং এর কথা বলছে সেটা আমার ভালো করেই জানা। নার্স একটাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে আমি কথা বাড়াই না। হামিম ডান গালে টোল পড়া হাসিটা দিয়ে বের হয়ে যায়। আজ আমার বাসায় ফেরার দিন।

কোন ধরণের দৃশ্যায়মান ব্যান্ডেজ ছাড়াই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাই আমি। একটানা এতদিন শুয়ে থাকায় শরীরটা যা একটু ভার ভার লাগে। বাবা দরজা খোলার পর আমার মায়ের কথা মনে পরে। যদিও আমার নিয়ার ডেথ কিংবা ডেথ এক্সপেরিয়েন্সের পুরোটা জুড়েই ছিল মায়ের আধিপত্য।
-“আম্মু কোথায়?”

-“রুমে আছে।”

বাবার কথা শুনে বুঝতে পারি এর মাঝে একদিন সমস্যা হয়েছিল। আমি নিজের রুমে যাওয়ার আগে আম্মুর রুমে যাই। বিছানার উপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে আম্মু বসে।
-“আম্মু?”

আমার ডাক শুনে আম্মু ফর্সা চেহারার সামনে থেকে কালো চুল সরিয়ে আমার দিকে তাকায়।
-“তুমি কখন আসলে?”

আমি গিয়ে আম্মুর পাশে বসি।
-“কেবল!”

আমি জানিনা আমার এক্সিডেন্টের খবর আম্মুকে দেয়া হয়েছে কি না। আম্মু আমার কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখে,
-“এখন তো জ্বর নেই।” আম্মুর কথা শুনে বুঝলাম যে তাঁকে আমার এক্সিডেন্টের কথা বলা হয়নি।

-“নাহ, সেরে গেছে।”

-“কী খাবে? মাছ রাঁধবো?”
একমাত্র যে জিনিসটা আম্মুকে সুস্থ রাখতে পারে তা হল রান্না। শুনেছিলাম, খোদা এক দিক দিয়ে নিলে অন্য দিক দিয়ে পুষিয়ে দেয়। আম্মু আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই চুল খোঁপা করতে করতে জিজ্ঞেস করে,
-“ঘরে টম্যাটো আছে?”

সরফরাজ আংকেল আর বাবা এক সাথে অফিস ঘরে কাজ করছিলেন।
-“আংকেল, আম্মু খেয়ে যেতে বলেছেন।”
কথাটি বলে চলে যেতে গিয়েও গেলাম না। বাবার টেবিলের কাছে গেলাম। কয়েকটি ছবি। বাবা কোন কেইস নিয়ে কাজ করছে তা বুঝতে কষ্ট হল না। নীল রঙের টয়োটার পিক আপ ভ্যান। সেই পিকআপ যেটা আমাকে ধাক্কা দিয়েছিলো।
-“ছি! মাছ মাছ গন্ধ আসছে তোর গা থেকে!”
বাবা নাক সিটকালো।
-“খাওয়ার সময় তো ঠিকই খাবা!”
সরফরাজ আংকেল হেসে দিল,
-“কী মাছ রে?”
-“কেমন গোয়েন্দা হয়েছেন? গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারেন না কী মাছ!”
সরফরাজ আংকেল টেবিলের উপর থেকে একটা ছবি তুলে আমার হাতে দেয়,
-“এই পিকআপটার নাম বল।“
চলমান কেইস নিয়ে ফ্যামিলি মেমবারের সাথে কথা বলা নিশ্চয়ই ইল্যিগাল।
-“টয়োটার মেই বি। তোমরা এখন রোড এক্সিডেন্ট নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে?”
শেষের প্রশ্নটা বাবার উদ্দেশ্যে ছিল।
-“দেখসোস! আমি বলেছিলাম না? কেউ ধরতে পারবেনা ফার্স্ট লুকে!”
সরফরাজ আংকেল বাচ্চাদের মত বলে উঠলো। বাবা আমার হাত থেকে ছবিটা নিয়ে বলল,
-“এটা ৯৭ এর দিককার ভেলোসিয়াদাদ।”
-“ওঃ! কোন স্টুপিড চালাচ্ছিল?”
সরফরাজ আংকেলের হাসি মিলিয়ে গেল,
-“জানিনা রে। নাম্বার-প্লেট ফেইক।”
আমি কাঁধ ঝাকালাম,
-“এইরকম গাড়িও মানুষ চুরি করে।”

আম্মু রান্না ঘরে একা। দুই বন্ধুকে নিজেদের কাজ করতে গিয়ে আমি রূপচাঁদা রান্নার ট্রেইনিং কমপ্লিট করতে ফিরে গেলাম।

রাতে ঘুমোনোর সময় আমার আবার এক্সিডেন্টের কথা মনে পড়ে গেল। আরো স্পেসিফিকভাবে বলতে গেলে বাবার কেইসটি নিয়ে কাজ করার ব্যাপারটা। বাংলাদেশ ডিবির এমন কোন দুঃসময় আসে নি যে পুরাতন একটা পিকআপ এক্সিডেন্ট নিয়ে তাঁদের সিনিয়র অফিসারদের মাথা খাটাতে হবে।

পৃথিবীতে “কুলেস্ট ড্যাড” অ্যাওয়ার্ডটা একমাত্র আমার বাবার প্রাপ্য। আমি এই জন্য কথাটা বলছি না যে আমার বাবা একজন আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত গোয়েন্দা। প্রত্যেক ডিবি অফিসারেরই পরিবার থাকে। হলিউডি সিনেমার সিআইএ কিংবা এফবিআই অফিসারের মত বাংলাদেশ ডিবির কারো জীবন এত শত বন্ড গার্লে ঘেরা না।
কিন্তু সবাই কুল ড্যাড হতে পারে না।

কয়জন বাবা ছুটির দিনে ছেলেমেয়ের সাথে এক্স-ফাইল এর ম্যারাথন দেখে আর সেগুলো নিয়ে ছেলেমেয়ের সাথে আলোচনা করে?

আরো একটি ব্যাপার আমাকে স্বীকার করতেই হবে, কলেজমেইট নাবিলকে একজন পুরাতন গাড়ি চোর ভাবতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। ওই নির্জন রাস্তায় কেউই ছিলো না আসে পাশে। তাহলে এক্সিডেন্ট এর পরপরই নাবিল কোথা থেকে এলো ওখানে? সে নিশ্চয়ই সেই পিকাপেই ছিলো। তাহলে হয়তো বা সে ঐ গাড়ি চোর গ্রুপেরই একজন। কিন্তু……এটা কিভাবে সম্ভব? নাবিল…গাড়ি চোর?

আমি রুমের দরজা খুলে বের হলাম। বাবার অফিস ঘরে লাইট জ্বলা। সরফরাজ আংকেল চলে গেলেও বাবা এখনও কাজ করছে।

আমাকে রুমে আসতে দেখে বাবা ল্যাপটপ থেকে চোখ সরালো,

-“বুড়ি, ঘুম আসে না?”

-“একটানা এক সপ্তাহ ঘুমিয়েছি। তুমি একটু গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে মেইল করে দেখো তো।“
বাবা আমার কথা ফিক করে হেসে দেয়। এই হাসির উপর কত মেয়ে যে ক্রাশ খেয়েছে কে জানে।
-“কেউ নিশ্চয়ই মারা গেছে ঐদিন?’ আন্তাজে ঢিল ছুড়লাম। কারণ, বাবা অবশ্যই কোন পুরাতন গাড়ি চুরির কেইস নিয়ে রাত জাগছে না। নিশ্চয়ই ব্যাপারটা এর চেয়েও গুরুতর। বাবা মাথা নাড়লো,
-“লাশ দুইটা সনাক্ত করা যায় নি।”

দুইজন মানুষ মারা গেছে সেই রাতে। আমিও হয়তো তাঁদের একজন হতে পারতাম না। কিংবা হয়েছিলাম। যদি না সেইদিন নাবিল আমাকে বাঁচাত। বাবা বোধহয় আমার চিন্তা একটু হলেও পড়তে পারেন, কারণ এর পর পরেই তিনি বললেন,

-“দুইটা বডিই গাড়ির ভেতরে ছিল। আর একটা কথা…ওদের কিন্তু এক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়নি।”
আমি টেবিল থেকে একটা প্রিন্ট করা কাগজ হাতে তুলে নিলাম। তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারে খটমটে কিছু কথা লিখা। আরো কয়েকটি সাদা-কালো ছবি। রেডিয়েশানের মাত্রা কোন পর্যায়ে গেলে মানুষের শরীর এভাবে বিকৃত হয়ে যেতে পারে আমার ধারণাও নেই। সাদা-কালো প্রিন্ট করেও ছবিগুলোর বীভৎসতা খুব একটা এড়ানো যায়নি।
-“কোন টেররিস্ট গ্রুপ তেজস্ক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করছে?”
আমি বাবার কাছে জানতে চাইলাম। বাবা ল্যাপটপ্টা বন্ধ করলো,
-“আমরা এখনও কিছুই জানিনা।”

আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাবা নিশ্চয়ই তাঁর কেইসের সব কিছু আমার সাথে শেয়ার করবেন না সে যত কুলেস্ট ড্যাডই হোক না কেন।

-“আমার শরীরে রেডিয়েশোনের কোন প্রভাব পড়েনি কেন?”

আমি প্রশ্নটা না করে পারিনা। আমাকে এক সপ্তাহ হাসপাতালে কিসের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল তা পরিষ্কার হয়ে যায়। বাবা রুমের কোণায় থাকা কাউচের গিয়ে শরীর এলিয়ে দেয়,

-“বি’কায আই অ্যাম ব্লেসড!”

আম্মু অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই বাবা গেস্ট রুমটাকেই অফিস রুম আর বেডরুম হিসেবে ব্যবহার করছে। শেষ কবে বাবা নিজেদের বেডরুমে ঘুমিয়েছে আমার মনে পড়ে না। আমি হয়তো বাবার মত অতটা ব্লেসড না।

লাইব্রেরির সামনে আমি নাবিল হাসানের দেখা পেলাম। সাথে ওর বন্ধুরা। রেলিঙের উপরে বসে থাকা ছেলেটি সম্ভবত আবীর। নাবিল বুকের কাছে হাত ভাঁজ করে রেখে কথা শুনছে আর মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে হাসছে। কী জিজ্ঞাসা করবো ওকে? কীভাবে আমাকে সেদিন বাঁচালো? নাকি শুধু একটা ধন্যবাদ দিব?

অতগুলো ছেলের মধ্যে গিয়ে ওর সাথে কথা বলার আইডিয়া পারফেক্ট মনে হল না। জিহাদকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখে একটা হাসি দিলাম। প্রায় ছুটে এলো ও আমার কাছে,

-“কত্ত দিন পর দেখা! মিসড ইয়ু সুইটহার্ট!” জিহাদ শেষের কথাটা ফিসফিসিয়ে বলে।

-“মী ঠু!”

মিথ্যে বললাম। এ কয়দিন একবারের জন্যও ওর কথা আমার মনে পড়েনি।

-“তোমার ফোন অফ। হাসপাতালে আংকেল … তাই যেতে পারিনি,” জিহাদ কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে বলে।

-“এক্সিডেন্টে মোবাইল নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু……এত কিছুর পরেও তুমি হামিমের সাথে কথা বল নি??!!”

ফুটবল মাঠে কী একটা ঝামেলার জন্য হামিম আর জিহাদ কথা বলেনা। দুই জনেরই অহংবোধ এতটাই তীব্র যে আমি হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেও ওদের মধ্যে কথা হয়নি। জিহাদ আর কথা বাড়ায় না। অ্যাকাউন্টিং ক্লাসের জন্য চলে যায়। আমিও নিজের ক্লাসের দিকে পা বাড়াই। লাস্ট বেঞ্চের আগের বেঞ্চে বসে হামিম আর নেহা কথা বলছে। আমি নেহার পাশে গিয়ে ব্যাগ রাখলাম।

নোটিশ বোর্ড দেখে মাথায় বাজ পড়লো আমার। একে তো লম্বা সময় পড়াশোনা থেকে দূরে তার উপর পরীক্ষায় আমি দ্বীপবাসিনির মত বন্ধুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হলে পড়েছি। কলেজের সেমিস্টার পরীক্ষার সিট প্ল্যান দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ থেকেই কোমরে দড়ি বেঁধে পড়াশোনা শুরু করবো।

রেলিং এর উপর বসে নাবিল মোবাইল টিপছিল। পড়ালেখার চিন্তা কয়েক মুহূর্তের জন্য সরিয়ে রেখে আমি ওর কাছে গেলাম।

-“হাই!”

কান থেকে ইয়ার পীস খুললো ও, চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।

-“থ্যাঙ্কু!”

আমার হয়তো কিছু ভনিতা করা উচিৎ ছিল কিন্তু আমি সরাসরি ধন্যবাদ জানালাম। নাবিল মাথা নেড়ে আবার ইয়ারপীস কানে লাগাতে গেলে আমি আগ বাড়িয়ে আবার বললাম,
-“একটা প্রশ্ন ছিল।”

নাবিল ভ্রু কুচকালো।

-“ইয়ে … তুমি কীভাবে করলা ঐটা?”

আমার কথা শুনে নাবিল দাঁত বের করে হাসলো,
-“কোনটা?”
-“আমাকে বাঁচালে ক্যামনে?” আমি মারা গিয়েছিলাম কথাটা ওর সামনে উচ্চারন করার প্রয়োজনবোধ করলাম না।

-“আবীর অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিল। টেকনিকালি, হি ইজ দ্যা সেভিওর।”

-“আমি অ্যাম্বুলেন্সের কথা বলছি না, ড্যামিট!”

হঠাৎ করেই আমার মেজাজটা বিগড়ে গেল। পরক্ষণেই মনে হল, নাবিল নিশ্চয়ই আমাকে বলবেনা ও কিভাবে কাজটা করেছিল। সবারই নিজস্ব সিক্রেট থাকে।

-“নেভার মাইন্ড!” ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আমি লাইব্রেরিতে ঢুকে গেলাম। কার্ডটা লাইব্রেরিয়ান আংকেলের টেবিলে রেখেই সোজা কম্পিউটার একটার সামনে বসে পড়লাম।

“পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া শুরু?”

নাবিল পাশের কম্পিউটারের সামনে চেয়ার টেনে বসলো। আমি সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে মারাত্মক পারমানবিক দুর্ঘটনা নিয়ে পড়ছিলাম। বিড়বিড় করে উত্তর দিলাম ওকে,
-“নট এক্সাক্টলি”

-“সিট প্ল্যান দেখেছো?”

-“হু। আমাকে একেবারে নির্বাসনে পাঠিয়েছে।”

–“আমার সিটও উইয়ার্ড জায়গায় পড়েছে। সেটা ঠিক করতেই তো এসেছি।“

শেষের কথাটা প্রায় ফিসফিস করে বললো ও। এরপর নাবিল যে কাজটা করলো তা অবশ্যই কলেজের নীতি বহির্ভূত এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ টের পেলে আমাদের দুই জনের হাতে টিসি ধরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করবে না। আমার চোখের সামনেই ও নিজের সিট অন্য হলে নিয়ে গেল। অবশ্যই কলেজের অফিশিয়াল ডক্যুমেন্টে পরিবর্তন এনে।

-“তোমার রোল কত?”

আমি রোল বলার পরপরেই মনে হল এটা জাস্ট কলেজের সেমিস্টার পরীক্ষা। এতে এতো রিস্ক নেয়ার কোন দরকার নেই।
-“কোন হলে দিবো তোমাকে?”

অবশ্যই আমি পরীক্ষার হলে ২৪X৭ হেল্পলাইন খুলে বসে থাকা হামিমের পাশে থাকতে চাইবো। তাই হামিমের পাশেই দেয়ার জন্যে বললাম।

-“তুমি প্রায়ই এই কাজ কর?”
-“দরকার হলে।”

-“তাহলে তো পরীক্ষার মার্কশীটও পাল্টে দিতে পারো?”

-“পারি। কিন্তু এথিকস বলে তো একটা কথা আছে, তাইনা?”

-“এখন যেটা করলা সেটা এথিকস সাপোর্ট করে?”

নাবিল আমার প্রশ্নের উত্তর দিলো না। নিজেকে রীতিমত স্টুপিড লাগলো। পরীক্ষার হলে কে না একটু আধটু টুকলিফাই করে?

-“ওকে, ডান!”

মাউস ছেড়ে নাবিল উঠে দাঁড়ালো। আমি চারিদিকে তাকালাম। মনে হয় না কেউ এই অপরাধের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আইডিয়া করতে পেরেছে।

-“স্টিল আই ওয়ান্ট টু নো, হাউ ডিড ইউ ডু দ্যাট?”

-“তুমি দেখছি সহজে হাল ছাড় না।”

কথাটা সত্য। বাবার কাছ থেকে এই জিনিস খুব ভালোভাবেই রপ্ত করেছি।

-“তার মানে আমি যেটা ধারণা করেছিলাম তা সত্য?”

অবশ্যই সত্য। তাও জিজ্ঞেস করলাম। নাবিল বাম হাতে নিজের মাথার পিছনের চুল খামচে ধরলো,

“আমি যতই ইজি হতে চাইছি তুমি ব্যাপারটা ততই কমপ্লিকেটেড করছ।”

-“ওকে! আই ডু রেস্পেক্ট ইয়োর সিক্রেটস।” আমিও উঠে দাঁড়ালাম। একজন মানুষকে মানসিকভাবে কীভাবে আটকে ফেলা যায় তার কিছু ছোটখাট টেকনিক আমার জানা আছে, “আমার ডান কাঁধে একটা সেলাইয়ের দাগ ছিল। আমি জানিনা সেই রাতে তুমি কি করেছো, কিন্তু দাগটা আর নেই।”

কথাটি মিথ্যে না। সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে একটা দুর্ঘটনায় আমার কাঁধে কয়েকটা সেলাই পড়েছিল। নতুন দুর্ঘটনার পর বাসায় ফিরে দেখি দশ বছরের পুরনো সেই দাগটা আর নেই।

আমি নাবিলের চেহারার রঙ স্পষ্টভাবে পাল্টে যেতে দেখলাম। ও ঠোঁট ফাঁক করে কিছু বলতে গিয়েও বললো না। আমি কম্পিউটারের দিকে একবার তাকিয়ে বললাম,
-“তুমি একটা সিক্রেট শেয়ার করলে, আমিও করলাম। থিংস শুড বি ব্যালেন্সড, বয়।”

আমি আমার নিজের কথায় মুগ্ধ। নাবিলকে একেবারে স্তম্ভিত করে দিয়ে আমি লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে আসলাম। সত্যি বলতে কি, আমি নিজের জন্য নিজেই গর্ববোধ করছিলাম।

ঘরে ফিরে দেখি সাতিব সোফায় পা তুলে বসে টেনিস খেলা দেখছে।

-“লাঞ্চ করেছো সাতিব?”

-“হু। ফ্রিজে ছিল।”

-“আম্মু?”

-“হু, আম্মুও খেয়েছে।”

এক্সট্রা কাজ থেকে বেঁচে গেলাম। এই চিন্তাটা মাথায় আসা মাত্র আমার কেমন যেন খারাপ লাগলো। আম্মু বেশ কয়েক বছর ধরে অসুস্থ। মাঝে মাঝে যখন স্বাভাবিক ব্যবহার করে তখন আমি তাঁর স্বাভাবিক ব্যবহারের জন্য খুশি হচ্ছি না; খুশি হচ্ছি আমাকে কাজগুলো করতে হচ্ছে না বলে।

দুর্ঘটনায় আমার মোবাইলফোন নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর এখনও নতুন সেলফোন নেয়া হয়নি। ঘরের ফোন দিয়ে কল করলাম হামিমকে। ধরলো ওর আম্মু।

-“আন্টি, আমার পড়া পিছিয়ে গেছে। হামিম যদি একটু বাসায় আসতো তাহলে এক সাথে স্টাডি করতে পারতাম।“

হামিমকে ছাড়া ফিজিক্সের কিছু টপিক বোঝা আমার জন্য অসম্ভব। আমার ধারণা হামিমের জিনেটিক গঠনেই পদার্থবিজ্ঞান ঢুকে গেছে। ওর আম্মু ফিজিক্সের প্রফেসর; আব্বুও ইউএস থেকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স নাকি কি জানি এক সাবজেক্টে পিএইচডি করে এসেছেন। আন্টি অবশ্য হামিমকে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে আমাদের আড্ডার সুযোগ করে দিলেন না,
-“তোমরা তাহলে একসাথে পড়ালেখাও করো?”

আন্টির বিদ্রুপ করার অনেক কারণ আছে। ছোটবেলা থেকে যত ধরনের দুস্টুমি সব এক সাথে করেছি আমরা। যত ধরণের দুর্ঘটনায়, এক সাথেই পড়েছি। সেদিন রাতে যদি হামিম সাতিবকে আনতে না গিয়ে সরাসরি আমার সাথে দেখা করতে যেত হয়তো আমার সাথে ওরও নতুন একটা অভিজ্ঞতা হত।

-“তুমি বই খাতা নিয়ে এখানে চলে আসো। হামিম ফিজিক্সের কিছু সমস্যার কথা বলছিল। এক সাথে দেখিয়ে দিব।“

হামিমেরও যে ফিজিক্সে ঘাপলা থাকতে পারে সেটা শুনতেও খারাপ লাগে। আমাদের ভাগ্য ভালো হামিমের আম্মু আমাদের কলেজের প্রফেসর না।

আমি ফোন কানেই মাথা নাড়লাম,
-“জ্বি আচ্ছা।”

হামিম বাসায় আসলে পড়ার ফাঁকে একটু আড্ডাও দেয়া যেত। হল না। বিকেলটা নিজের হাতে মাটি চাপা দেয়া হয়ে গেল।

সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে দেখি কাপকেক উৎসব চলছে। আম্মু ধুমসে কাপকেক বানাচ্ছে। সাতিব আর বাবা রেসলিং দেখছে আর সেগুলো পেটে চালান দিচ্ছে।

-“তুমি সাতিবকে আনতে যাবে আমাকে বলবে না?”

আমি একটা কেক হাতে নেয়ার আগেই আম্মু হাঁক দিল,
-“হাত ধুয়ে আসো,সায়েরা।”

-“আমি হামিমদের বাসায় ফোন করেছিলাম। তুমি ততক্ষনে বের হয়ে গেছো,” বাবা কৈফিয়তের সুরে বলল। আমি তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে ওদের সাথে কাপকেক উৎসবে যোগ দিলাম,
-“এত্তগুলা কেক কে খাবে?”

-“আমি আর আব্বু কালকে কাপকেক ফেরি করবো।”

সাতিব এখনও এসবে মজা পায়। বাবাও দাঁত বের করে হাসলো,

-“আমি সরফরাজকে ডেকেছি। ও একাই সাবাড় করে দিবে!”

আমি বিরক্ত হয়ে আবার কিচেনে গেলাম।

-“হাত ধুয়ে এসেছো?”

-“হুম। অনেক হয়েছে, চল এখন।“

আমি আম্মুর হাত ধরলাম।

-“কিন্তু এগুলো …?”

-“আসো তো আমার সাথে …”

আমি যখন দুনিয়ার হাবিজাবি বুঝিয়ে আম্মুর হাত ধুয়ে দিচ্ছি তখন সরফরাজ আংকেল বাসায় আসলেন।

 

আমি ভালোভাবে হাঁটতে শেখার আগেই সাঁতার শিখেছি। আর সেটা সম্ভব হয়েছে আমার আম্মুর জন্য। “মাম্মি অ্যান্ড মী সুইমিং কোর্স” এ আমিই হয়তো সবচেয়ে ছোট স্যুইমার ছিলাম। সাতিবের বয়েস যখন চার কি পাঁচ হঠাৎ করেই আম্মুর অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। আম্মুর মাইনর ডিপ্রেশান রূপ নেয় মেজর কিছুতে।

যার ফলাফল হিসেবে আমি সাতিবের বোনের চেয়ে মা-ই বেশি হই। আর আম্মু যতটা না মা তারচেয়ে বেশি ঘরের সবচেয়ে ছোট সদস্য। আম্মুকে ঔষধ দিয়ে শুইয়ে দিই আমি। আম্মু আমার হাত ধরে বলে,
-“আমার বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে।”

আম্মু দীর্ঘদিন ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করেছে। ঘরে থাকতে না চাওয়াটাই স্বাভাবিক।

-“কালকে যাবো আম্মু,” আমি আম্মুকে বুঝ দিই।

আমি অস্বীকার করতে পারিনা, আমার ছোটবেলায় আম্মুর সাথে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আমার ডেথ কিংবা নেয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্সে আম্মুর উপস্থিতি বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক।

নতুন মোবাইল, নতুন সীম কার্ড। হামিমকে এত রাতে কল দেয়া উচিৎ হবে না ভেবে জিহাদকে কল দিলাম।

-“পুরনো সীমটাই উইথড্র করতে পারতে।”

-“হু। পারা যেত। আচ্ছা রাখি।”

-“কাল ফ্রি আছো?” লাইন কাটার ঠিক আগ মুহূর্তে জিহাদ জানতে চাইলো।

-“উঁহু, নাহ। প্র্যাকটিকেল খাতা কমপ্লিট করতে হবে।”

-“আমারও এগ্রিকালচারের খাতা বাকি। একসাথে করা যেতে পারে,” জিহাদ যেন একটা জিনিয়াস। দুর্দান্ত আইডিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরে।

-“বাবা বাসায় থাকবে।” ওর দুর্দান্ত আইডিয়ার দৌড় কতটুকু আমার জানা আছে।

-“ওকে! টেইক কেয়ার সুইট হার্ট!”

লাইন কেটে দিয়ে কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকলাম। ক্লাস নাইনে থাকতে যেরকম অপার কৌতূহল আর আগ্রহ ছিল জিহাদকে নিয়ে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে এসে তা তলানীতে ঠেকেছে। ও নিজেও বুঝে সেটা। তারপরেও যে কেন এভাবে নিজেদের মধ্যেই অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছি, আমরা নিজেরাও জানিনা। মোবাইল ফোন বিছানার উপর রেখে রুম থেকে বের হলাম।

সরফরাজ আংকেল আর বাবা এক সাথে অফিস রুমে। সাতিবকে টিভির রুম থেকে নিজের রুমে পাঠিয়ে দিলাম। নাবিলের ব্যাপারটা হয়তো বাবাকে বলা উচিৎ। কলেজের ছেলেপুলোর মাথা খেয়ে ফেলা মোটেও কঠিন কোন কাজ না। কে জানে, হয়তো কোন জঙ্গি সংগঠন ব্রেইনওয়াশড করে রেখেছে। কত কিছুই হতে পারে।

কলেজ বাস মিস করায় জামিল আংকেলকে কল দিলাম। জামিল আংকেল একজন হাফ এজেন্ট। আমাদের ভাই-বোনের যেকোন বিপদে তাঁকে ডাকার কড়া নির্দেশ দেয়া আছে। অবশ্য সত্যিকারের বিপদে কখন তাঁকে ডাকা হয়নি। কলেজ বাস মিস করা এমন কোন বিপদ নিশ্চয়ই না। জামিল আংকেলের চেহারাই বলে দিচ্ছিল কতটা বিরক্ত তিনি। হয়তো কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছিলেন। আমি জীপের পিছনে ব্যাগ রেখে সামনে গিয়ে আংকেলের পাশে বসলাম।

“আপনি আমাকে দেখতে হাসপাতালে আসেন নাই।“

আমি দাঁত বের করে বললাম। জামিল আংকেল ভ্রু কুঁচকে রেখেই বললেন,
-“আমার কাজ তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। তোমাকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া না।”

-“আপনি সেটাও করেন নাই।”

এই লোকটাকে বিরক্ত করতে আমার অসম্ভব ভালো লাগে। জামিল আংকেল সেটা বুঝতে পারেন কি না কে জানে। উনি গাড়িটা অন্য একটা গলির সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন। সামনে একটা দো’তলা বাড়ির গেইটে এক গাদা মানুষ জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে।

-“আমি একটা কাজে যাবো আর আসবো।তুমি পাঁচ মিনিট চুপ করে বসে থাকবে, ওকে?”

আমার উত্তরের আশা না করেই তিনি নেমে গেলেন। লম্বা লম্বা পা ফেলে জটলা পাকিয়ে মানুষের মধ্য দিয়ে বিল্ডিঙটাতে ঢুকে গেলেন।

আমি কোনদিনও অতটা বাধ্য মেয়ে ছিলাম না। একটা ক্রাইম সিনের সামনে এতগুলো বাঙালি আগ্রহ নিয়ে অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে আমি উঁকিঝুঁকি মারলে তেমন কোন মারাত্মক অপরাধ হওয়ার কথা না।

আমি বিল্ডিংটার ভিতরে যাই নি। বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু মানুষের কথা শুনেছি। মানুষের মুখে যা শুনেছি তাইই যথেষ্ট ছিল। আমি আর জামিল আংকেলের ফেরার অপেক্ষা না করে তক্ষুনি একটা রিকশা নিলাম, গন্তব্য আমার বাসা নয়।

নাবিলের মাকে রীতিমত বিভ্রান্ত মনে হল,
-“আচ্ছা তুমি বস। আমি ওকে ঘুম থেকে ডেকে দিচ্ছি।“

কলেজ থেকে ফিরেই একটা হাট্টাকাট্টা জোয়ান ছেলে কি না ঘুমুচ্ছে! আমি ব্যাগ কোলে সোফায় বসলাম। আন্টিকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হল নাবিলকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে। বেশ খানিকক্ষণ পর নাবিল একটা কালো টিশার্ট উল্টে করে পড়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে এলো। আন্টি একবার উঁকি দিয়ে আবার ভেতরে চলে গেলেন।

-“নাবিল, আমি জানি তুমি সত্যিটা আমাকে বলছো না।“

আমি উঠে দাঁড়িয়ে যথসম্ভব নিচু গলায় বললাম,
-“আমার বাবাকে আমি ভালোভাবেই চিনি। এই কেইসটা বাবা সলভ করেই ছাড়বেন।”

-“কোন কেইস?”

আমাকে কি এতটা নির্বোধ মনে হয়? আমি মাথা নাড়লাম,
-“যেসব টেররিস্ট এর সাথে মিলে এ কাজগুলো তুমি করছো, তারা ধরা পড়বেই।”

-“হোয়াট দ্যা …! আমি কোন টেররিস্ট গ্রুপের হয়ে কাজ করছি না!!”

কথাটা একটু জোরেই বলে ফেললো ও। আন্টি আরেকবার উঁকি দিলেন। আমি তাঁকে দেখেও না দেখার ভান করলাম,
-“তুমি অবশ্যই ঐ রেডিয়েশনের ব্যাপারে কিছু না কিছু জানো।”

-“দ্যাট ওয়াজ অ্যান এক্সিডেন্ট।”

নাবিল ফের গলার স্বর নামিয়ে ফেলল। তবুও আন্টি ওর পিছনে এসে দাঁড়ালেন,
-“কিসের এক্সিডেন্ট?”

নাবিল চমকে উঠলো,
-“অ্যাহ? ওহ … সায়েরার এক্সিডেন্ট হয়েছিল।”

আন্টি তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো। ছেলের মিথ্যে ধরতে একটুও বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। আমি সোফার উপর থেকে আমার ব্যাগ হাতে নিলাম,
-“ইউ বেটার বি ট্রুথফুল সামটাইমস!”

আন্টি একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। ছেলে কিছু একটা ঝামেলা করেছে যেটা উনি ধরতে পারছেন না। আমি ছোট করে উনাকে একটা সালাম দিয়েই বের হয়ে আসলাম।

সাতিবকে টিটি প্র্যাকটিস ক্লাস থেকে নিয়ে এসে দেখি নাবিল বাসার সামনে সিঁড়িতে বসে। ফর্সা চেহারা উদ্ভটভাবে কালো হয়ে গেছে দুশ্চিন্তায়; কিংবা আমারই এমনটা মনে হল। আমার স্কুটিটা গ্যারাজে রেখে দরজা খুললাম।
-“সাতিব ফ্রেশ হয়ে আসো আগে।”

সাতিব চোখ-মুখ চোখা করে কেবল হাতে নেয়া পিএসপিটা সোফায় রেখে ফ্রেশ হতে গেল। আম্মু সোফার উপর পা তুলে টিভি দেখছে। আমাদের উপস্থিতি এখনও বোধহয় ধরতে পারেননি।

-“তুমি আমার রুমে এসো।”

নাবিলকে আমার রুমে ডাকলাম। স্কুটির চাবি টেবিলের উপর রেখে বললাম,
-“তুমি বস। আমি সাতিবকে নাস্তা দিয়ে আসি।”

নাবিল শুধু মাথাটা কাত করলো একবার।

সাতিবকে খেতে দিয়ে এসে দেখি আমার রুমের দেয়াল জুড়ে থাকা ওয়ান রিপাবলিকের সিগনেচার করা পোস্টারের দিকে নাবিল তাকিয়ে। আমাকে ঢুকতে দেখে ও পকেট থেকে হাত বের করে দাঁড়ালো। আমি আমার বিছানায় বসলাম।

-“তুমি ঐ সময় কি একটা টেররিস্ট গ্রুপের কথা বলছিলে?” নাবিল ইতস্ততভাবে জিজ্ঞেস করলো।

-“তুমি যতক্ষন না আমাকে বলবে কি হয়েছিল, আমি একটা কথাও বলবো না।”

নাবিল মাথা নাড়ল। আরো একবার পোস্টারের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভেবে বলল, “সেদিন আসলেই তুমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য মারা গিয়েছিলে।”

কথাটি বলেই নাবিল একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। আমি ওকে ধাতস্ত হতে একটু সময় দিলাম।

-“আমি আসলে … আসলে আমি বস্তুর পরমানুকে কন্ট্রোল করতে পারি। নিজের মত করে সাজাতে পারি। এর মানে হলো আমি লিভিং সেলকেও কন্ট্রোল করতে পারি। তোমার সেদিনকার অবস্থাকে মেডিক্যালের ভাষায় বলে ক্লিনিক্যালি ড্যাড। ঐ অবস্থায়ও মানুষের ব্রেইন বেঁচে থাকে কিছু সময়ের জন্যে। আমি তোমার ব্রেইনকে নিয়ন্ত্রণ করে তোমার হার্টকে আবার সচল করে দেই। ঐ সময় তোমার ডান কাঁধের দাগটাও দূর হয়ে যায়, যেটা আমি জানতাম না। তোমার কথা শুনেই জানলাম। তবে, বিলিভ মি, ওটা আমার ইচ্ছাক্রিত ছিলো না।”

আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কোন না কোনভাবে আমার জীবন বাচিয়েছে। তাই বলে এই না যে ও যা বলবে তার সবই বেদবাণী।

নাবিল আমার টেবিলের উপরে রাখা একটা পেনসিল হাতে নিল বাম হাতের মুঠোয় চেপে ডান হাত দিয়ে ঘোরাতে লাগলো। আমি উঠে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। ওর কপালের এক ফোটা ঘাম খাড়া নাক বেয়ে টুপ করে মাটিতে পড়ল। জাদুকরের মত পুরো লম্বা পেন্সিল ও বাম হাতে পুরে ফেলল।

তারপর খুব সাবধানে টেবিলের উপর হাত ঝাড়লো।

শুকনো পাউডারের মত কিছু পড়ে রইলো টেবিলে। আস্ত পেন্সিল গায়েব!

আমাকে হা হয়ে যেতে দেখে নাবিল বলল,
-“এর একটা সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা আছে।”

আমি কোন সায়েন্টিফিক থিওরি জানতে না চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি উড়তে পারো?”

-“নাহ। আমি বললাম তো। এর একটা সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা আছে।”

-“কী ব্যাখ্যা?”

-“থিংস শ্যুড বি ব্যাল্যান্সড, গার্ল!”

আমি জানি ও কি বোঝাতে চাইছে। কিন্তু ওর দুই হাতের একটা ট্রিক দেখে সব তথ্য রিভিল করে দেয়ার মত বোকামী আমি করবো না।

-“তোমরা জঙ্গি সংগঠন?”

নাবিল দুই হাত তুলে নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো, “তুমি তখন থেকে টেররিস্ট-জঙ্গি কি সব বলে যাচ্ছো! ওটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল!”
-“তোমরা পারমানবিক অস্ত্র নিয়ে হামলা চালাওনি? আজকে যে মানুষগুলা মারা গেল? সেটার কি বলবে?”

আমি অ্যাটাকিং পজিশনে চলে গেলাম। কথা আদায় আমাকে করতেই হবে। নাবিল অবিশ্বাস্য রকমের শান্ত থাকলো। আমাকে ধরে চেয়ারে বসালো ও,
-“কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। ঐ মানুষ দুইজন কোন তেজস্ক্রিয় বোমার কারণে মারা যায়নি।”

আমি ওর কথায় ভরসা পেলাম না। সেটা বুঝতে পেরেই ও বলতে লাগলো,
-“আমরা ভুল করে সেদিন একটা পোর্টাল খুলে ফেলেছিলাম। আমরা জানতামই না এরকম কিছু হতে পারে।”

-“কীসের পোর্টাল?”

নাবিল মুখ খুলে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল,
-“আমি আবীর আর ত্বহাকে ডাকি। এক সাথে সহজে এক্সপ্লেইন করা যাবে।”

আমার কোন কথা অপেক্ষা না করে নাবিল মোবাইল পকেট থেকে বের করলো।

জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি নাবিল বাসার সামনে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে। হাত নেড়ে ওর বন্ধুদের কী যেন বোঝাচ্ছে। আমার পাশে হামিম চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে ঘাড় চুলকাচ্ছে।

-“তোর এই কথাগুলো আংকেলকে বলা উচিৎ।”

-“আমি তোকে বলেছিলাম। হাসপাতালেই!” আমি হামিমকে মনে করিয়ে দিলাম।

-“আমার কাছে সব ভুয়া লাগছে রে। এর চেয়ে আংকেলকে সব বলে দেয়াই বেটার।”

-“ও আমার জীবন বাঁচিয়েছে। আমার ওকে অন্তত একবার চান্স দেয়া উচিৎ।“

আমার কথায় হামিম মাথা নাড়লো। আমি বাইরের তিনজনকে বাসার দিকে আসতে দেখে দরজা খুলে দিলা

-“আমরা তিনজন আসলে এই পৃথিবীর বাসিন্দা না।“

নাবিল এই কথাটি বলে আমার দিকে তাকালো। আমার কাছে আর যাই হোক ওকে কিংবা ওর বন্ধু দুই জনের একজনকেও অ্যালিয়েন বলে মনে হল না। আমার চিন্তাটাই হামিম উচ্চারন করলো শব্দ করে। আবীর হামিমের কথার উত্তরে বলল,
-“প্যারালাল ইউনিভার্স এর কথা তো জানো, নাকি?”

শুরু থেকেই আবীরকে মহা বিরক্ত দেখাচ্ছে।

-“তোমরা আরেকটা পৃথিবী থেকে এসেছো? কীভাবে?”

-“আমার বাবা আর ত্বহার বাবা সরকারী বিজ্ঞানী। সরকার বিভিন্ন গবেষণার জন্য আমাদের বাবাকে টাকা দেয়। যে সব গবেষণার কোন রেজাল্ট আসে না, আই মীন টোটালি ওয়েস্ট যেসব হত, সেগুলো আমাদের বেইসমেন্টে ফেলে রাখা হত।”

বেইসমেন্টে গবেষণার জিনিস ফেলে রাখা! মানুষ এতটা কেয়ারলেসও হয়।

-“সেদিন ঘরে একটা পার্টি ছিল। আমরা তিনজন লুকিয়ে বেইসমেন্টের চাবি নিয়ে লুকিয়ে সব জিনিসপাতি দেখতে থাকি।“

ত্বহাকে হামিম এবার থামিয়ে দিল,
-“বয়েস কত ছিল তোমাদের?”

-“পাঁচ কি ছয়?”

ত্বহা যেন উলটো প্রশ্ন ছুঁড়ে। ওর প্রশ্নের উত্তর বাকি দুইজন দেয় না বরং নাবিল বলতে থাকে,
-“একটা হেলমেট আবীর খুঁজে পায়। আমরা তিনজনই ঐ হেলমেট মাথায় দিয়ে পাওয়ার রেঞ্জার সাজি।”

-“ল্যাবের ফ্রিজ থেকে জুস ও খাইসিলাম কিন্তু!” ত্বহা বলেই হেসে দেয়।

আবীর বিরক্ত হয়; আরো একবার,
-“ঐটা জুস ছিল না, গাধী! আমার আব্বার স্পেশাল ফর্মুলা ছিল!”

-“খেতে তো ভালোই ছিল! তোর আব্বা ভালো জুস বানাইতো কিন্তু!”

ত্বহা কথাটি বলা মাত্র নাবিল শব্দ করে হেসে উঠে। আবীর ক্ষেপে যায়,
-“তোর আব্বার চেয়ে ভালো। আজাইরা একটা ড্রাম বানাই রাখার জায়গা পায় নাই। আসছিল আমাদের বেসমেন্টে!”

আমি হামিমের দিকে তাকাই। হামিমও আহাম্মকের মত চেহারা করে আমার দিকে তাকায়। আমাদের দুইজনকে বসিয়ে এই তিনজন নিজেদের ছেলেবেলার গল্প নিয়ে রীতিমত আড্ডা দিচ্ছে।

-“ঐটা যেই সেই ড্রাম না,” ত্বহা বলল।

নাবিল ত্বহাকে সমর্থন জানায়,
-“ওটা ছিলো একটা ওয়ার্মহোল!”

ত্বহা গর্বের সাথে বলল,
-“মাই ড্যাড ইজ অ্যা জিনিয়াস!”

হামিম আবার বাগড়া দিল ওদের তিনজনকে,
“আর তোমরা একটা ড্রামে ঢুকে এখানে চলে আসলে?” হামিমের কন্ঠে পূর্ণ অবিশ্বাস।

সত্যি বলতে আমার নিজেরও এই কাহিনি মোটেও ভাল্লাগলো না। অন্তত একটা স্পেসশীপ বা এরকম কিছু হতে পারতো। সত্যি বলতে আমি এই তিনজনকে সুপারম্যান বা সেই রকম কিছুই ভাবা শুরু করেছিলাম। মাস দুই আগে দেখা ম্যান অব স্টীল মুভির কাহিনি তখনও মাথায় ঘুরছিল।

-“ওটা সিম্পল ড্রাম না, হামিম। আমার মনে হয় আমরা যে লিকুইডটা খেয়ে ফেলি তার কারণেই আমাদের শরীরে একটা চেঞ্জ আসে। তাই ঐ ওয়ার্মহোল তৈরির ব্যর্থ প্রচেস্টার ছোট্ট টানেলটা আমাদের জন্যই শুধু ওয়ার্মহোল হিসেবে কাজ করে।” নাবিল শান্তভাবে ব্যাখ্যা দেয়।

-“আমাদের গ্যারেজ, তাই আমিই আগে আসি,” ত্বহা হামিমের অবিশ্বাসী দৃষ্টি দেখাও না দেখার ভান করে, “ওকে টেনে বের করতে গিয়ে আমরা তিনজনেই এখানে চলে আসি।”

-“আমাদের পোর্টালটা সাগরে এসে শেষ হয়। আমি আর আবীর সাঁতরে চলে আসলেও নাবিল হাবুডুবু খেতে থাকে।”

-“হাঁটু পানি ছিল। একটা পিচ্চি বাঁচাইসিলো ওকে ……”

আবীর এতক্ষণে দাঁত বের করে হাসে। নাবিল দ্রুত টপিক পালটায়,
-“যাই হউক, এভাবে পোর্টাল দিয়ে চলে আসায় হয়তো আমাদের ফিজিকালি কোন চেঞ্জ এসেছে। আমরা মলিক্যুল কন্ট্রোল করতে পারি।”

হামিমের সন্দেহ দূর হয়না,
-“মলিক্যুল কন্ট্রোল করে নিজেরা নিজেরা পোর্টাল খুলতে পারো?”

নাবিল মাথা নাড়ে,
-“এটা আসলে মনোযোগের ব্যাপার। আবীর মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনা।”
-“তাহলে এতদিনেও পোর্টাল খুলে চলে যাওনি কেন?”

যেই প্রশ্ন আমার করা উচিৎ ছিল সেগুলো হামিম করতে থাকে। ত্বহা উত্তর দিলো ওর প্রশ্নের,

-“আমরা যে পোর্টাল খুলতে পারি সেটা আমরা নিজেরাই জানতাম না। সেইদিন নাবিলকে ঘুম থেকে তুলতে ওর শরীরের মলিক্যুল নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। তখনই একটা ছোট পোর্টাল তৈরি করে ফেলি।”

আমি শিউরে উঠি। এক্সিডেন্টের রাতে আমার শরীরের মলিক্যুল নিয়ে কাজ করার সময় নাবিল রীতিমত আমাকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। নাবিল মাথা নিচু করে বলে, “আমার শরীর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়েই একটা পোর্টাল তৈরি করে ফেলে। আমরা বুঝতে পারি একটা মাঝারি রকমের পোর্টাল হলেই আমরা ফিরে যেতে পারবো।”

ত্বহা জোরে জোরে মাথা নাড়ে, “এরপর সেদিন সন্ধ্যার দিকে আমরা তিনজন একটু বড় একটা পোর্টাল খুলতে গেলেই এক্সিডেন্টটা ঘটে। আমরা জানতামই না এরকম কিছু হতে পারে।”

আমি এতক্ষণে বুঝতে পারি কেন সেই গাড়ির মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি আর কেনই বা লাশ দুটিও শনাক্ত করা যায় নি। হামিম চোয়াল শক্ত করে ফেলে,
-“তোমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পোর্টাল খুলছিলে আর বলছো একটা এক্সিডেন্ট হতে পারে সেটা ধারনাও করতে পারো নি? স্টুপিডিটির সীমা থাকা উচিৎ!”

ওরা তিনজনই চুপ করে থাকে। কি বলবে তাইই যেন খুঁজে পায়না। হামিমের মোবাইল ফোন বেজে উঠে। আমি সময় দেখি। রাত দশটার মত প্রায়। বাবা ফিরেনি। সাতিবকেও খেতে দেয়া হয়নি।

হামিমের সাথেই ত্বহা, আবীর বেরিয়ে যায়। নাবিল দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি ঐ পিচ্চিটাকে চিনতে পেরেছো? যে আমাকে বাঁচিয়েছিল?”

আমি মাথা নাড়ি। আমাকে বীচের ভলান্টিয়ার সংগঠন একটা মেডেলও দিয়েছিল এই কারণে।
-“ব্যাল্যান্স শুড বি মেন্টেইনড, হাহ?”

-“আমার মনে হয়, আমার, ত্বহা আর আবীরের বাবা পোর্টাল তৈরি করছেন। আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নাহলে গত রাতের পোর্টাল আর কে খুলবে?”

-“হতে পারে।“

আমার মনটা বিষিয়ে উঠলো। মানুষ মারা যাচ্ছে। ইচ্ছা করে হোক আর অনিচ্ছাকৃতভাবে – যেভাবেই হোক না কেন। মানুষ মারা যাচ্ছে, খুব নির্মমভাবে।

নাবিল আর কোন কথা না বলে চলে গেল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবা রাতে বাসায় ফিরে নি। এই কেইসটা নিয়ে সত্যিই বেশ খাটতে হচ্ছে তাঁকে। আদৌ এর কোন সুরাহা আছে কি না তা আমি জানিনা।
কলেজে গিয়ে ঘন্টা খানেক পর সরফরাজ আংকেলের ফোন পেয়ে কলেজ থেকে বের হয়ে আসলাম। আমার সহজাৎ প্রবৃত্তি বলছিল, বাসায় ঢোকার পর সব কিছুই পাল্টে যাবে। ট্যাক্সি চালক বারবার লুকিং গ্লাস দিয়ে উঁকি দিয়েও আমার বিরক্তির উদ্রেক করতে পারলো না। আমি শুধু মনে প্রাণে চাইছিলাম আমার মেয়েলি প্রবৃত্তি যেন ভুল প্রমানিত হয়, সরফরাজ আংকেলের কন্ঠ যেন নেটওয়ার্কের কারণেই অতটা বিষাদময় শোনায়।
ট্যাক্সি থেকে নেমেই দেখি সরফরাজ আংকেল রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আংকেলের ভেজা চোখ লাল হয়ে আছে।

বাবা নেই। যেই মানুষটা একটা রাত ঘরে না ফিরলে পরদিন চকলেট আইসক্রীম দিয়ে তা কাভার করার চেষ্টা করতো, সেই মানুষটি নাকি আর ঘরেই ফিরবে না।
-“সায়েরা, শক্ত হও আম্মু!”
আমাকে অবশ্যই শক্ত হতে হবে। কিন্তু শক্ত হওয়ার চিন্তা করা মাত্র যেন আমি আরো বেশি দুর্বল হয়ে গেলাম। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে যতই নিজেকে থামাতে চাইছি ততই ব্যর্থ হচ্ছি,
-“আম্মুকে বলেছেন?”
-“হ্যাঁ”
দরজা নক করে লাভ হল না। ব্যাগ থেকে চাবি বের করে লক খুলতে হল। দরজা খোলার আগে আংকেলকে বললাম,
-“আপনি আম্মুকে ঘুমের ঔষধটা দিয়ে দিবেন। আমি সাতিবকে সামলে নিব।“
যেন কোন মিশনে যাচ্ছি দুই জন। ভিতরে ঢুকতেই দেখি ঘরের অবস্থা বেহাল। ফ্লোরে টম্যাটো কেচাপের বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে। সোফার কুশন সব ছেঁড়া আর এক্স-ফাইলসের ডিভিডি সব ছিটানো। সাতিব রান্নাঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখা মাত্র দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। ১৩ বছর বয়সেই আমার চেয়ে লম্বা হয়ে গেছে সেদিনের পুঁচকেটা।
-“আম্মু দরজা খুলতে দেয় নি!”
সাতিব প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। আম্মুর রুদ্র মূর্তি কখনই ওর জন্য শুভকর কিছু ছিল না।
-“ঠিক আছে। আমি এসে গেছি তো।“
আমি মাথা ঘুরিয়ে সরফরাজ আংকেলের দিকে তাকালাম। আংকেল আম্মুর রুমের দিকে চলে গেলেন। সাতিব আবার ডুকরে উঠলো,
-“বাবা নাকি … ?”
কথাটিও শেষ করতে পারলো না কান্নার দমকে। আমি নিজের দাঁতে দাঁত চেপে ধরলাম। ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। অনেক কাজ বাকি; সময় খুব কম।
-“সাতিব, আমি কি বলছি শুন!”
আমি সাতিবের কাঁধে হাত রাখলাম,
-“আমার রুমে দরজার পিছনে একটা ব্যাগ আছে, ওটা নিয়ে এক দৌড়ে বাবার অফিস রুমে আয়। কুইক!”
সাতিব কোন প্রশ্ন না করে আমার রুমে চলে গেল। আমিও দেরি না করে বাবার অফিস রুমে আসলাম। বাবা বরাবরই গোছানো মানুষ।
প্রথমেই লকার খুললাম আমি। লকারের কোড আমার অজানা কিছু না। আমার জন্মদিনের তারিখটাই।
270395
লকারে তিনটি অস্ত্র। Quantico, Glock 27 আর Sigsoucer P226
Sigsoucer P226 টা আমি চালাতে পারি। বছর দেড়েক আগে, ক্লাস টেনে থাকতে বাবা একদিন শ্যুটিং প্র্যাকটিসে নিয়ে গিয়েছিল। অস্ত্র বের করে লকার আবার বন্ধ করে দিলাম। সাতিব ব্যাগ নিয়ে এসে আমাকে অস্ত্র হাতে দেখল। আমি কথা না বলে স্কুল ব্যাগে অস্ত্রটা ঢোকালাম। টেবিলের উপর থেকে ল্যাপটপ নিয়ে ব্যাগে ঢুকাতে ঢুকাতে ওকে বললাম,
-“রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকো। আমি না আসা পর্যন্ত রুম থেকে বের হবা না।“
-“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
সাতিব জানতে চাইলো। আমি নিজেও জানিনা আমি কোথায় যাচ্ছি তবুও বললাম,
-“আমি রাতের মধ্যেই বাসায় ফিরবো, প্রমিজ!”
সাতিবকে বাবার রুমে রেখেই আমি বের হয়ে আসলাম। সরফরাজ আংকেল আম্মুকে কিছু বুঝাতে চাইছেন; আম্মু শুনছে না। এই মুহূর্তে আম্মুর পাশে থাকা দরকার ছিল। কিন্তু তারচেয়েও বেশি দরকার বাবার শেষ কেইসের সব কিছু নিরাপদে রাখা।

যথারীতি প্রথমেই হামিমকেই ফোন দিলাম। হামিম হ্যালো বলার আগেই আমার মুখ দিয়ে যে কথাটি বের হল সেটা কোন মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ বলতে পারে কি না আমার জানা নেই,
-“দোস্ত, আমার বাবা মারা গেসে।”
যেন বাবা মারা যাওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। সপ্তাহে দুই তিন বার আমি এই খবর আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে দেই।
-“কি বলস এগুলা?”
-“বাবার কিছু জিনিস লুকিয়ে রাখা দরকার। কই লুকাবো?”
হামিম কি বুঝে কে জানে। এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। আমি তাড়া দেই,
-“কই লুকাবো এগুলা?”
-“তুই কোথায়?”
জিহাদদের বাসার সামনে। প্রথমে জিহাদের কাছেই এসব রাখার প্ল্যান ছিল। পরে মনে হল, ওকে ঝামেলায় ফেলার মানে হয় না।
-“ওখানেই থাক। আমি আসছি।“
আমি ফোন কানে মাথা নেড়ে জিহাদদের বিল্ডিং এর পেছনে চলে যাই।। জিহাদের বাবা শখের কৃষিকাজ করে জায়গাটা বেশ সুন্দর সবজি বাগান করে ফেলেছেন।
কিছুক্ষণ পরেই সাইকেল নিয়ে হামিম চলে আসে।

আমি বাসায় ফিরে দেখি সরফরাজ আংকেল সোফায় বসে ছড়িয়ে থাকা ডিভিডিগুলো গুছিয়ে রাখছেন। আমাকে দেখেই প্রশ্ন করলেন,
-“কোথায় গিয়েছিলে?”
-“হামিমের সাথে কথা ছিল।“
-“তোমার বাবার ল্যাপটপটা দাও। লাগবে।“
আমি আংকেলের কথা শুনেও না শোনার ভান করি। কাঁধের হাল্কা ব্যাগ ফ্লোরে রেখেই সোফায় বসি। পাল্টা জিজ্ঞেস করি,
-“আম্মু ঘুমিয়েছে?”
-“হুম”
চোখের সামনে হঠাৎ করেই সাদা কালো ছবিগুলো ভেসে উঠে। রেডিয়েশনে বিকৃত হয়ে যাওয়া শরীরগুলো। কতটা কষ্ট পেতে হয়েছে ওভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে কেউ কি বলতে পারবে? সরফরাজ আংকেল যেন বুঝতে পারেন আমি কি ভাবছি। কাছে এসে আমার কাঁধে হাত রাখেন,
-“আল্লাহ কষ্ট দেননি ওকে। ট্রাস্ট মী!”
-“বাবাকে দেখা যাবে?”
-“কাল সকালে।“
এমনও তো হতে পারে আসলে বাবা না, অন্য কেউ ওটা। হয়তো পোর্টাল দিয়ে অন্য পৃথিবীর কেউ এসে গেছে। বাবাকে হয়তো হঠাৎ আন্ডারকভারে যেতে হয়েছে।
মানুষ কক্ষনও আরেকজন মানুষের চিন্তা পড়তে পারেনা। কিন্তু সরফরাজ আংকেল পারলেন,
-“কোন রেডিয়েশনে না। দুইটা কাঁধে আরেকটা বুকে হিট করেছে।“
কোন পোর্টাল দিয়ে বাবা অন্য পৃথিবীতে চলে যায় নি। অন্য কারো বিকৃত লাশ বাবার প্রক্সি দেয়নি। বাবাকে গুলি করে খুন করা হয়েছে। আরে সেটা অন্য পৃথিবীর কেউ না এই পৃথিবীরই কেউ করেছে।
এই প্রথমবারের মত মনে হল, সত্যিই বাবা আর আসবে না। কোন উপায়ই নেই।

সব ধরণের আনুষ্ঠিকতা শেষে একে একে সবাই চলে যাওয়া শুরু করেছে। চোখের পানিরও বোধহয় শেষ আছে। আমি সোফার উপর পা তুলে বসে ছিলাম। সরফরাজ আংকেল পেছন থেকে বললেন,
-“সায়েরা, ল্যাপটপটা আমার লাগবে।“
আমি আমার পা দুইটা বুকের সাথে চেপে চুপ করে বসে থাকলাম। আমি জানি আংকেল অফিসের চাপে পরেছেন। প্রায় পনের দিন তো পার হয়েই গেল। কিন্তু বাবার শেষ কাজের নথিগুলো আমার দেখা দরকার। আমার নিরবতায় আংকেল বিরক্ত হলেন,
-“আইনগতভাবেই কিন্তু আমি পুরো ঘর সার্চ করতে পারি।“
আংকেলের কথার ধরণ আমার মোটেও পছন্দ হল না। তাঁর সামনেই আমি ল্যাপটপটা বাইরে রেখে এসেছি সেই রাতে। আজ এভাবে অহেতুক ক্ষমতা প্রদর্শনের কোন মানে হয় না। শুকনো কন্ঠে বললাম,
-“তাহলে সেভাবেই খুঁজে দেখান।”
-“তুমি ওটা বাসায় রাখো নি। কোথায় রেখেছো?”
আমি আমার মতই চুপ থাকলাম। উনি আবার প্রশ্ন করলেন,
-“লকারে তিনটা অস্ত্র থাকার কথা। আরেকটা কোথায়?”
আমি এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম,
-“আপনি আইনগতভাবে আমার অভিভাবক না। আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য না।“
আমি টের পেলাম আমার গলা ধরে আসছে। কে বলেছে চোখের পানির শেষ আছে? নেই। চোখের পানির শেষ নেই।
-“আপনি আপনার আইন দিয়ে যা পারেন করে দেখান। আমি ওসব আপনাকে দেবো না!”
আমি প্রাণপন চেষ্টা করলাম না কাঁদতে। দুর্বলতাকে আমি ঘেন্না করি। দুর্বল হওয়াকে আমি ঘেন্না করি।
আংকেল কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম দরজার কাছে সাতিব দাঁড়িয়ে, ওর চোখে বিস্ময়। আংকেল বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন। আমার আর দেরি করা উচিৎ না।

সকালে কলেজে না গিয়ে নাবিল আমাদের বাসায় এলো। আমিই ডেকেছিলাম ওকে। বাবার ল্যাপটপটা ও আসার আগেই ভোরে গিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। সবার প্রথমে ফাইলগুলো সব কপি করে একটা পোর্টেবল হার্ডডিস্কে নিয়ে নিলাম। তারপর মেইল চেক করা শুরু করলাম। কিছু মেইল হাইলাইট করা। কতগুলো আবার বিভিন্ন কোডে ট্যাগ দিয়ে রাখা।
-“আংকেলকে যে গুলি করেছে সে কোন না কোন ভাবে পোর্টালের ব্যাপারে জানে।”
-“আমার মনে হয় না সমগ্র পৃথিবীতে শুধু তোমরা তিন জনই এই ব্যাপারে জানো।“
বাবার মেইলগুলোতে একজন সন্দেহভাজনের কথা বলা হয়েছে। বাবা জামিল আংকেলকে একজনের ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলেছিলেন। ঠিক তাঁর পরের দিনই বাবাকে গুলি করা হয়।
-“আরো কেউ একজন পোর্টাল খুলেছে?” আমার কথার রেশ ধরে নাবিল প্রশ্ন করলো।

-“তোমরা দ্বিতীয়বার কোন পোর্টাল খুলোনি বলছো। অথচ যেদিন তোমার বাসায় গিয়েছি, তার আগের রাতেও কেউ পোর্টাল খুলেছিল।”

-“আমি ভেবেছিলাম আমাদের খোঁজে হয়তো …”

নাবিল কথা শেষ করলো না। হয়তো বুঝতে পেরেছে ওর বাবা অন্য পৃথিবীতে বসে ওর জন্য কোন পোর্টাল খুলছে না।

-“প্রণব বয়ান। এই লোকটা সম্ভবত কিছু জানে।”

আমি নাবিলের দিকে তাকালাম। দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়াচ্ছে শুধু; কিছু বললো না। আমি আবার বললাম,

-“এই দেখো, জামিল আংকেলের মেইলে প্রণব বয়ানের হোটেলের অ্যাড্রেস দেয়া আছে।“
নাবিল মাথা নাড়লো। ও দেখেছে অ্যাড্রেসটা। কলিংবেলের শব্দ হল ঠিক সেই মুহূর্তে।

এই সময়ে কে আসতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতে আমি রুম থেকে বের হলাম। দরজা খুলে দেখি জিহাদ দাঁড়িয়ে।

নাবিলকে আমার রুমে বাবার কম্পিউটার সহ বসিয়ে বাইরের রুমে জিহাদের সাথে কথা বলতে আমার মোটেও ভালো লাগছিল না। জিহাদ বুঝতে পারছিল আমার অস্বস্তির ব্যাপারটা,
-“তুমি কি কোন কারণে আমার উপর ফেড আপ?”
-“হ্যাঁ।“
আমি দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই উত্তর দিলাম।
“কেন?”
-“আমি জানি না।“

একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। আমার রুমে আমার বাবার সম্ভাব্য খুনির নাম খুঁজছে নাবিল। আমার এখন ওখানে থাকা দরকার, কোন টিন এইজ প্রেমের দৃশ্যে না। যে কোন সময় সরফরাজ আংকেল চলে আসতে পারেন, এইবার আমার কড়া কথায় মনে হয়না তিনি ল্যাপটপ ছাড়া ফেরত যাবেন।
-“কাল কলেজে আসবে?”
-“না”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। প্যান্টের পেছনের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে বললাম,
-“আই নীড সাম মোর টাইম।“
জিনিয়াস জিহাদ আমার ইঙ্গিত স্পষ্টতই বুঝতে পারলো। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ও নিজেও উঠে দাঁড়ালো,
-“ওকে। টেইক ইয়োর টাইম।“

-“আমার মনে হয় না এরকম কিছু আমাদের করা উচিৎ হবে।“
সব প্ল্যান হয়ে যাওয়ার পর হামিমই সবার আগে ভেটো দিল,
-“এর চেয়ে সরফরাজ আংকেলকে সব বলে দেয়াই বেটার হবে।“
-“আংকেল পোর্টালের ব্যাপারে জানেন না। উনারা এখনও কোন জঙ্গি গ্রুপের সূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন।”
-“আমি চাইছিলাম জাস্ট একবার শিউর হতে, প্রণব বয়ান পোর্টাল খুলছে কিনা,” নাবিল শীতল কন্ঠে বলল।
-“কিন্তু আংকেলকে গুলি করা হয়েছে,” নাবিল বলল।
-“তুমিও সেটার ভয় পাচ্ছো?” আবীর এক ধরণের টিটকারি মেখে হামিমকে ঠেস দিল। হামিম কোন রিঅ্যাক্ট দেখানোর আগেই আমি সামলে নিলাম,
-“আমি ল্যাপটপটা আংকেলকে দিয়ে দিবো, দোস্ত। কিন্তু আমি চাই – লোকটা কি করছে তা জানতে।”
আমার কথায় হামিম কি বুঝলো আমি জানি না। তবে ও চুপ থাকলো। চুপ থেকেই জানিয়ে দিল আমাদের প্ল্যান ওর মোটেও ভালো লাগছে না।

-“তাহলে আজ সন্ধ্যায় আমরা যাচ্ছি?” ত্বহা যেন শেষ বারের মত নিশ্চিত হতে চাইছে।

আমি আর আবীর একটা টং দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে। আমি সবসময়ই শুনে এসেছি টং এর চায়ের স্বাদ একটু ভিন্ন হয়, আজ স্বাদ নিতে গিয়ে জিব পোড়ানো হয়ে গেল।

-“প্রণব বয়ানের রুম ওরা চিনবে কেমনে? রুম সার্ভিসে কল দিবে?”

আবীর মুখ দিয়ে শিস দেয়ার মত একটা শব্দ করলো,
-“তোমার মনে হয় এইরকম হোটেলে রুম সার্ভিসের ব্যবস্থা আছে?”

শেষ পর্যন্ত হামিম আসে নি। ত্বহা আর নাবিল ভেতরে গেছে। আবীরের ভাষায় ‘এরকম একটা হোটেলে’ ত্বহাকে ভেতরে পাঠানো হয়তো উচিৎ হয়নি। কিন্তু নাবিলের যুক্তি তাহলেই নজর কম কাড়বে ওরা।

-“ইয়ে … তোমরা নাকি আবারও পোর্টাল খুলতে চাইছো?” করবো না করবো না করেও প্রশ্নটা করে ফেললাম।

-“সেটাই তো স্বাভাবিক। বারোটা বছর পরিবার থেকে দূরে আমি।“

পরিবার শব্দটা শুনেই কেমন যেন লাগলো। বাবা নেই। আম্মু থেকেও নেই। এক ছোট ভাই। আমার পরিবার। আবীর আমার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে টং এ দিয়ে আসলো। কিছুক্ষণ পর নিজেই বলতে লাগলো,
-“ত্বহা আর নাবিল খুলতে চাইছে না। প্রথম এক্সিডেন্টে ওরা দুই জনেই শকড।”

আবীর কি একটুও শকড না? জানতে চাইলাম না।

-“কিন্তু আমরা না খুললেও অন্য কেউ তো খুলছে। তাই এই ব্যাপারটা নিয়ে এত মাথা ব্যাথার কিছু তো আমি দেখছি না।”

আবীরের কথার শুনে ওকে আমার একটা বিষাক্ত পোকার মত লাগলো। মানুষ এতটা স্বার্থপর কীভাবে হতে পারে? কিভাবে এতটা স্বার্থপরের মত চিন্তা করতে পারে?

-“আমি একা খুলতে পারছি না। নাহলে …”

হঠাৎ কথার মোড় ঘুরিয়ে ফেলে আবীর। ও খেয়াল করে না ওর কথা শোনার কোন আগ্রহ বা ইচ্ছা আর আমার নেই।

-“অবশ্য আমার পৃথিবীতে আমার বাবা অনেক বড়লোক। আমার কোন সমস্যা হবে না।“

আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। চারপাশে সিগ্রেটের দুর্গন্ধটা না থাকলে এই জায়গাটা যেকোন আলোচনার জন্য বেশ ভালো।

নাবিল আর ত্বহার মত আবীরকে কোন পরিবার দত্তক নেয় নি। অনাথ আশ্রমে বড় হওয়াতেই হয়তো ওর চিন্তা ভাবনা এই রকম; সম্পূর্ণ ভিন্ন।

-“ঐ তো আসছে ওরা।“

প্রথমে ত্বহা; তারপর নাবিল বের হল হোটেল থেকে।

আম্মু বাবার গাবার্ডিন প্যান্ট আর শার্ট পড়ে বসে বসে এক্স-ফাইলস দেখছিল আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই জিজ্ঞেস করলো চকলেট আইসক্রিম এনেছি কিনা।

-“বিকাল থেকে আইসক্রিমের উপর,” সাতিব নিজের রুম থেকেই আমাকে জানালো।

-“আংকেল এসেছিল?”

-“না। ফোন করেছিল। তোমার ফোন বন্ধ কেন?”

আমি ফ্রেশ হয়ে এসে প্রথমেই সরফরাজ আংকেলকে ফোন করলাম। উনি যেন আমার ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলেন। উনাকে বাসায় আসতে বলার পর এত দ্রুত উপস্থিত হলেন যে আমার মনে হল উনি বুঝি দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আংকেলকে ল্যাপটপটা দিয়ে সরি বললাম। যদিও আমার ব্যবহারের জন্য একটা স্যরি যথেষ্ট ছিলনা।

-“অস্ত্রটা?”

আমি চুপ করে থাকলাম। কেন জানিনা অস্ত্রটা হাত ছাড়া করতে আমার বাধছিল। আংকেল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
-“থাক ওটা, রাখো তোমার কাছে। ভাবছি, তোমাকে লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে দিব।“

আমি জানি, সরফরাজ আংকেল আমাকে বিশ্বাস করেন। সেই বিশ্বাসে অবিশ্বাস্য রকমের স্নেহ আছে।

-“আম্মুকে ডাক্তার দেখানো দরকার।“

ঘরে অভিভাবকের জায়গাটা এখন সরফরাজ আংকেল ছাড়া আর কেউ নিতে পারবে না, সেটা আমাদের দুই জনেরই জানা হয়ে গেছে। আংকেল গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন,
-“আমি কথা বলে রেখেছি। কালকেই নিয়ে যাব।”

রাত সাড়ে বারোটার দিকে বৃষ্টিতে জুবুথুবু হয়ে নাবিল বাসায় আসলো। আমি তাড়াহুড়ো করে ওকে একটা শুকনো তোয়ালে দিলাম,
-“এই অবস্থা কেন?”

-“এখন বাসায় গেলে ঝামেলা হবে।”

সেইদিনের পর গেস্টরুম অর্থাৎ বাবার অফিস ঘরে আর ঢোকা হয় নি। রুমে ঢুকেই টের পেলাম ডাস্টিং এর দিকে চোখ দেয়ার সময় এসে গেছে।

-“তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি খাবার আনছি।“

খেতে খেতে নাবিল জানালো, আমি আর ত্বহা চলে আসার পর আবীর আর ও হোটেলে আবার গিয়েছিল। প্রণব বয়ান বাইরে থাকায় রুমের ভেতরে ঢুকে যায় ওরা। কিন্তু ধরা পরে যায়। পালিয়ে আসার সময় আবীরের কাঁধে গুলি লাগে।

যদিও নাবিল সেটা সামাল দিয়েছে।

-“সায়েরা, যে ব্যাপারটা খটকা লেগেছে, তা হল প্রণব বয়ান একজন এজেন্ট। আমি ওর আইডি দেখেছি।“

-“কিসের এজেন্ট?”

-“UPDF ওর আসল নাম আরাফাত খান।.”

আমি দাবী করবো না দেশ-বিদেশের সব সিক্রেট এজেন্সির ব্যাপারে আমি ওয়াকিবহাল। কিন্তু UPDF? পুরোটাই মাথার উপর দিয়ে গেল। কোন দেশের হতে পারে? ভারত নাকি মায়ানমার? আরাফাত খান, পাকিস্তানি না তো?

-“আমার মনে হয়, হামিম ওয়াজ রাইট।।“

যদিও আবীরের কিছু হয়নি কিন্তু হতে তো পারতো। অহেতুক আবেগের বশে ঝুঁকি নিয়েছি। আবেগ দিয়ে দুনিয়া চলে না।

-“কিন্তু পোর্টালের সাথে ওর সম্পর্ক কি সেটা বুঝলাম না।“

-“আর বুঝে কাজ নেই। কালকেই আমি সরফরাজ আংকেলকে সব বলে দিব।“

-“কি বলবে?” নাবিলের চোখে আতংকের ছায়া পড়লো।

-“ঐ পিকআপ এর ঘটনাটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল এই কথা আংকেল বুঝবেন,” আমি ওকে অভয় দিলাম। তবে তাতে কোন কাজ হল বলে মনে হল না,
-“আমাদের তিনজনের ব্যাপারটা জানাজানি হলে তো আমরা আর ফিরে যেতে পারবো না। আমাদেরকে আটকে ফেলবে এখানে।”

ফিরে যাওয়া! আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম,

-“তোমার কি মনে হয় তোমরা সত্যিই ফিরে যেতে পারবে? এই ভাবে মানুষ মেরে?”

-“বারোটা বছর লেগেছে আমাদের এই পোর্টালের ব্যাপারটা জানতে। একটু চেষ্টা করলেই আমরা সেইফ পোর্টাল খুলতে পারবো। একটু চেষ্টা করলেই শিখে ফেলতে পারবো।”

আমি ভেবে পাইনা মানুষ মেরে কিভাবে ওরা নিজেদের পৃথিবীতে ফিরে যেতে চায়। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হল আমার পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই আবার থেমে গেল।

-“ভূমিকম্প?”

নাবিল আমাকে প্রশ্ন করলো। আমার পায়ের নিচের মাটি হঠাৎ কেঁপে উঠেনি, বরং পৃথিবীর প্লেটে কেঁপে উঠেছে; এক কি দুই সেকেন্ডের জন্য।

আমরা কিছুক্ষন চুপ থেকে অপেক্ষা করলাম আবার কোন আফটার শক আসে কি না। আসলো না।

-“রাত হয়েছে, গুড নাইট।“

আমি আমার রুমে চলে আসলাম। শুয়ে শুয়ে গোছাতে লাগলাম কীভাবে সরফরাজ আংকেলকে সব খুলে বলব।

ফজরের নামাজ শেষ করে দেখি নাবিল ভোর হওয়ার আগেই বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। হাজার হোক, বাংলাদেশ বলে কথা। সকালে সরফরাজ আংকেল বাসায় আসলেন আম্মুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে।

-“তুমি কবে থেকে কলেজ যাবে?”

-“যাবো, কয়েকদিনের মধ্যেই।“

সাতিব আরো আগে থেকেই স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। আমাকেও কলেজে যেতে হবে। কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। আংকেল আম্মুকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে আংকেলকে সন্ধ্যায় বাসায় আসতে বললাম। দরজা লাগিয়ে দেয়ার পাঁচ মিনিটের মাথায় আবার কলিং বেল বাজলো।

কোন ফোনকল ছাড়াই জামিল আংকেল বাসায় চলে এসেছেন। হাত দিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন তিনি। হ্যাঁ, সময়ে অসময়ে অনেক জ্বালিয়েছি উনাকে তাই বলে নিশ্চয়ই …

বাবার লকারের অস্ত্র সরফরাজ আংকেল আগেই নিয়ে গেছেন, যা আছে একটা তাও আমার রুমে। জামিল আংকেল চোয়াল চুলকাতে চুলকাতে বললেন,
-“তোমার সাথে আমার পারসোনাল কোন ঝামেলা নেই। সত্যি বলতে তোমাকে আমি কিছুটা শ্রদ্ধা করি। এই বয়সে এই রকম স্ট্রং পারসোনালিটি আমি খুব কম দেখেছি।“

আমি ক্যাজুয়ালি আমার রুমের দিকে এগোতে এগোতে বললাম,
-“আপনাকে দেখে অবশ্য মনে হচ্ছে না আপনি শ্রদ্ধা জানাতে এখানে এসেছেন।“

জামিল আংকেল আমার ইন্টেনশান ধরে ফেললেন। চট করে আমার পথ আটকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন।

-“ওকে, লেট’স কাম টু দ্যা পয়েন্ট। পোর্টাল ওপেনের ব্যাপারে কি জানো বল।“

মুহূর্তেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল। ঘরের শত্রু বিভীষণ তাহলে জামিল আংকেল! শুরু থেকেই পোর্টালের ব্যাপারে উনি জানতেন। ইচ্ছে করেই আমার বাবাকে মিসলীড করেছেন। প্রণব বয়ানের খোঁজ যখন বাবা পেয়ে গেল তখন ঠান্ডা মাথায় সরিয়ে দিয়েছেন।

জামিল আংকেল আবার তাড়া দিলেন আমাকে,
-“কা’মন গার্ল! মানুষ মরছে। প্রতিদিন! গত রাতেও পোর্টালটা খুলেছে কেউ!”

-“আপনারা আমার বাবাকে মেরেছেন?”

সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরেও আমার কথা একটা প্রশ্নের মত শোনাল। জামিল আংকেল হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন,
-“আমরা তাঁর খুনিকে খুজছি। যে একটার পর একটা পোর্টাল খুলে যাচ্ছে।“

-“প্রণব বয়ানের ছবি বাবা আপনাকে দিয়েছিল। বাবা আপনাকে বিশ্বাস করেছিল।“

আমি টের পেলাম আমার কান গরম হয়ে যাচ্ছে। যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে দুই কান দিয়ে।

-“আরাফাত আর আমি এক সাথে কাজ করি। যারা ইল্যিগাল পোর্টাল খুলছে, তারাই হত্যা করেছে তোমার বাবাকে।!”

জামিল আংকেল মিথ্যে বলছেন না, উনার কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আমি বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম।

-“কিন্তু প্রণব বয়ানই তো পোর্টাল খুলছে।”

কিছু না বুঝে আমি আন্দাজেই ঢিলটা ছুড়লাম।

-“আরাফাত ইল্যিগালি পোর্টাল খুলছে না।”

আমি জামিল আংকেলের কথার কোন মাথা মুন্ডু কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমি জানতাম পোর্টাল শুধু নাবিল আর ওর দুই বন্ধুই খুলতে পারে। এখন জামিল আংকেল বলছে পোর্টাল এরও নাকি লিগাল আর ইল্যিগাল ভেরিফিকেশন আছে।

জামিল আংকেল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
-“সায়েরা, আমি আর আরাফাত UPDF এর হয়ে কাজ করি। যারা ইল্যিগাল পোর্টাল খুলে পৃথিবীকে ওয়েভ ফাংশন কলাপ্সড এর দিকে ঠেলে দেয়, তাদের থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা আমাদের কাজ।“

-“আপনারাও অন্য পৃথিবী থেকে এসেছেন?”

জামিল আংকেল মাথা নেড়ে উনার স্মার্ট ফোন আমার চোখের সামনে ধরলেন। আপাতদৃষ্টিতে স্মার্ট ফোন মনে হলেও কিছু হলোগ্রাফিক ছবি আমার সামনে তুলে ধরলো ডিভাইসটা।

-“আমি পৃথিবী ৩১৬৯ থেকে এসেছি। আইনসঙ্গত ভাবে নিরাপদ পোর্টাল তৈরি করে প্যারালাল পৃথিবীর মাঝে আন্তঃযোগাযোগ তৈরি করা যায়। UPDF এর কাজ হল এই সব পোর্টাল যাতে অবৈধ কাজে কেউ ব্যাবহার না করতে পারে সেইদিকে লক্ষ্য রাখা। তাছাড়া অবৈধ পোর্টাল পৃথিবীর জন্যে অনেক ঝুঁকি তৈরি করে। ঝুঁকিপূর্ণ পোর্টাল খুললে সেখান থেকে ক্ষতিকর রেডিয়েশান বের হয়, ভূমিকম্প হয়। এই রেডিয়েশান মুহুর্তেই মানুষকে মেরে ফেলতে করতে পারে। দেখোনি সম্প্রতি রেডিয়েশান এর ফলে কতগুলো মানুষ মারা গেলো? এবং গত রাতেও ভূমিকম্পের একটা আভাস দেখা দিয়েছিল, টের পাওনি?”

আমি মাথা নাড়লাম। ভূমিকম্প টের পেয়েছিলাম। জামিল আংকেল নিজের ডিভাইস পকেটে ঢুকিয়ে বলতে লাগলেন,
-“এবার যারা পোর্টালটা খুলছে তাদেরকে আমরা কিছুতেই ট্র্যাক করতে পারছি না। এবার যারা পোর্টাল খুলছে তাদের প্যাটার্ন পুরোপুরি ভিন্ন। আর ওরা ছোট ছোট সব ওয়ার্মহোল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে যাচ্ছে। যেগুলো খুঁজে ঠিক করা অনেক টাফ!”

-“তার মানে যারা পোর্টাল খুলছে তারাই বাবাকে হত্যা করেছে?”

আমি জানতে চাইলাম। আংকেল মাথা নাড়লেন,
-“তোমার বাবাকে যারা গুলি করেছে তারা আসলেই এই পৃথিবীতে আছে নাকি অন্য পৃথিবীর কেউ, সেটাও আমরা জানি না।”

-“কিন্তু নাবিল বলেছে ওরা আর কোন পোর্টাল খুলছে না।“

-“যেই ছেলেটা ভোর হওয়ার আগেই বেরিয়ে গেল?”

জামিল আংকেল জানতে চাইলেন। আমি মাথা নাড়লাম।

-“থ্যাঙ্ক ইউ, গার্ল!”

প্রায় তুফানের গতিতে আংকেল বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন। সাথে সাথে আমি যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম। বোকার মত জামিল আংকেলকে আমি সব বলে দিয়েছি! এক দৌড়ে আমার রুমে ঢুকে অস্ত্রটা প্যান্টের পকেটে গুঁজলাম আর হাতে স্কুটির চাবি।

আমি স্কুটি নিয়ে নাবিলের বাসায় পৌঁছে দেখি আন্টি বাইরের রুমে সোফায় অজ্ঞান হয়ে। ভিতরে ঢুকতেই দেখলাম নাবিল আর আবীর হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। জামিল আংকেল ওদেরকে কিছু একটা বলছিল যেটা না শুনেই আমি উনাকে থামিয়ে দিলাম,
-“ওরা কোন পোর্টাল খুলেনি। গত রাতে নাবিল আমার বাসায় ছিল। আবীর অসুস্থ। আবীরের পোর্টাল খোলার মত শক্তিই নেই!”

আবীর জোরে জোরে মাথা নাড়ল,

-“আমরা কেউ কোন পোর্টাল খুলিনি। কসম!”

-“সেটা তো এখনি ক্লিয়ার হওয়া যাবে।“

জামিল আংকেল দাঁতে দাঁত ঘষলেন। পকেট থেকে উনার ডিভাইসটা বের করতে করতে বললেন,
-“পোর্টাল খুললে রেডিয়েশোনের প্রভাব শরীরে থেকে যায় কয়েক ঘন্টার জন্য। দেখি কি অবস্থা দুইটার।“

জামিল আংকেল প্রথমে আবীর তারপর নাবিলকে চেক করলেন। নিজের ডিভাইস যেন তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেই ভাবেই তাকিয়ে থাকলেন কয়েক সেকেন্ড। হতাশ ভঙ্গিতে বললেন,
-“তাহলে কে খুলেছে?”

যেন শুধু আমরা তিনজনই ভালো করে জানি যে কে পোর্টাল খুলতে পারে, আর কেউ যেন জানতে পারে না।

-“ত্বহা?”

নাবিল আবীরকে জিজ্ঞেস করলো। আমাদের পায়ের নিচের মাটি আরেকবার কেঁপে উঠলো; দুই কি তিন সেকেন্ডের জন্য। জামিল আংকেল শীতল কন্ঠে বললেন,
-“যা করার দ্রুত করতে হবে।”

হামিমদের পাশের ফ্ল্যাটেই যে ত্বহা থাকে এটা আমার জানা ছিল না। অথচ প্রায়ই হামিমের বাসায় আসা হয়। ত্বহাকে সার্চ করেও জামিল আংকেলকে হতাশ হতে হল।

-“আমরা তিনজন তো বলেছিই, আমরা কোন পোর্টাল খুলিনি।”

আবীর এতক্ষণে আবার গলার জোর ফিরে পেল। ত্বহার চেহারা প্রায় কাঁদ কাঁদ হয়ে আছে। প্রচন্ড ভয় পেয়েছে বেচারী। বিছানায় আন্টি শুয়ে, জামিল আংকেল অভয় দিলেন ওকে,
-“কিছুক্ষনের মধ্যেই জ্ঞান ফিরবে উনার। চিন্তা করো না।”

ত্বহাদের ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে দাঁড়ালাম আমরা। জামিল আংকেল চিন্তিত ভঙ্গিতে নিজের ডিভাইসে তাকিয়ে।

-“এখানে দাঁড়িয়ে থাকা বোধহয় উচিৎ হবে না, চলেন বিল্ডিং এর বাইরে যাই।”

হঠাৎ হামিম বের হয়ে যদি দেখে একটা ছোট খাট দল নিয়ে ওদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আরেক ঝামেলা হবে। জামিল আংকেল মাথা নাড়লেন,
-“হ্যাঁ, তোমরা বরং যে যার বাসায় যাও।”

সিড়ির কয়েক ধাপ নেমেই আংকেল দাঁড়িয়ে গেলেন,
-“একটা ব্যাপার খেয়াল করেছো?”

-“কি?”

নাবিল জানতে চাইলো। আমি আর আবীরও কৌতূহলী। জামিল আংকেল নিজের ডিভাইস আবার পকেট থেকে বের করলেন, কি যে আছে এই ডিভাইসে উনিই জানেন।

-“ওহ ম্যান! এত্ত বড় ব্যাপার!”

আমাদেরকে কিছু না বলেই দৌড়ে উপরে উঠতে লাগলেন উনি। আমরাও কিছু না বুঝে উনার পিছু নিলাম। ত্বহার বাসা না, বরং ওর পাশের ফ্ল্যাট হামিমদের বাসার কলিং বেল চাপ দিলেন উনি। আন্টি দরজা খোলা মাত্র কিছু না বলেই চট করে ছোট্ট অদ্ভুত গুলিটা দিয়ে আন্টিকে অজ্ঞান করে দিলেন।

-“কি করছেন আপনি?”

আমি আর আবীর দ্রুত আন্টিকে ধরে কাউচে শুইয়ে দিলাম।

-“রেডিয়েশান আসছে এই ফ্ল্যাট থেকে!”

জামিল আংকেল আমাদের দিকে না তাকিয়েই সোজা ভিতরে চলে গেলেন। আমাদের কথা শুনে ভিতরের রুম থেকে হামিম বের হয়ে আসলো।

দৌড়ে আন্টির কাছে আসলো ও,
-“আম্মু?”

-“উনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন। একটু পরই জ্ঞান আসবে।”

আবীরের কথায় উল্টে ওকে রক্তচক্ষু দেখালো হামিম। চোখ পাকিয়ে জানতে চাইলো,
-“এগুলা কি করছিস তুই? আমাকে কেন জড়াচ্ছিস এগুলার ভেতরে?”

আমি কি বলব বুঝে পেলাম না। জামিল আংকেল ভিতরের রুম থেকে আবার বাইরে চলে আসলেন,
-“তোমার বাবা কোথায় হামিম?”

হামিম আতংকিত চোখে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা গড়বড় আছে, যেটা ও ধরতে পারছে না।

-“আমি বলছি তোমার বাবা কোথায়?” এবার রীতিমত গর্জে উঠলেন জামিল আঙ্কেল। হামিম কাঁপা কাঁপা হাতে ওর বাম হাতটা তুলল। এক দৌড়ে বাম পাশের ছোট করিডোরটা পেরিয়ে ডানে ঘুরলেন জামিল আঙ্কেল। একটা দরজা। ভেতর থেকে বন্ধ। জামিল আঙ্কেল শেষ বারের মত নিজের ডিভাইসটা বের করে কি যেন শিওর হয়ে নিলেন। এরপর দরজায় খুব জোরে একটা লাথি মারলেন।

হামিমের বিজ্ঞানী বাবা এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই খুলে ফেলছিলেন একের পর এক পোর্টাল- এই কথাটা কিছুতেইই হামিমকে বিশ্বাস করানো যায়নি। সেদিনের পর থেকে আমার সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে ও।
ওর বাবা মিস্টার আরিফ চোধুরী এখন ইউপিডিএফ এর হাতে গ্রেফতার হয়ে আছেন। উনার কপালে কি আছে কে জানে!

ইউপিডিএফ পুরো ঘটনাটাকেই এই পৃথিবীর মানুষদের থেকে আড়াল করে ফেলেছে। ধামাচাপা দিয়ে দেয়া হয়েছে সব কিছুই। আবারও সব কিছু নর্মাল হয়ে আসে। এমনকি, আমি নিজেও।

আমি জানিনা ঠিক কোন পৃথিবীর অপরাধী বাবাকে গুলি করেছিল। সেই অপরাধী কোন ছিঁচকে চোর ছিল নাকি বড় কোন গ্যাংস্টার ছিল। খুনিটা নিজের পৃথিবীর যাকে গুলি করেছিল, সেই সৌভাগ্যবান মানুষটা কি আরেক পৃথিবীতে আমার বাবা কি না সেটাও মাঝে মাঝে আমাকে ভাবায়।

জামিল আংকেলের সহায়তায় সেইফ পোর্টাল দিয়ে আবীর নিজের পৃথিবীতে চলে গিয়েছে সেই দিনই। নাবিল আর ত্বহা এখানকার পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়াটা স্বার্থপরের মত হয়ে যাবে দেখেই হয়তো যায় নি। তবে আর কখনো কোন ধরনের পোর্টাল খুলবে না সেই গ্যারান্টি দিয়ে ছাড় পেয়েছে ওরা।

একটা সেমিস্টার এক্সাম গ্যাপ দিয়ে আমি এখন ঘরে বসে সময় কাটাচ্ছি।

স্মৃতি বড় প্রবঞ্চক।

মানুষ এক কথা বেশি দিন মনে রাখতে পারে না কিংবা চায় না। সব কিছুই মোটামুটি আগের মত হয়ে গেছে শুধু রাতের বেলা বাবার অফিস রুমের লাইট জ্বলে না।

এজন্য অবশ্য কোন কিছুই থেমে নেই।

***************************************** সমাপ্ত ****************************************

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত