বারবিলাসিনী

বারবিলাসিনী

খুব পুরোনো একটি হোটেল, হোটেলের প্রতিটি দেয়ালে শ্যাওলা জমে কালচে রং ধারন করেছে, বিভিন্ন যায়গায় খসে পড়েছে চুন-সুরকি।

বেশ নির্জন অার থমথমে চারপাশের পরিবেশ, অনেকটা ভূতুরেও বলা যায়।
রিহান এই হোটেলেই উঠেছে, এরকম নির্জন যায়গা গুলো রিহানের কাছে খুব ভালে লাগে তাই এই হোটেল উঠা।
তাছাড়া ভূতুরে যায়গা গুলোতে তার কোনো ভয় হয়না, এই হোটেলে অনেকেই অাছে থাকছে।

হোটেলের একটু সামনে একটি হাসপাতাল রয়েছে, সেই হাসপাতলের কিছু ডাক্তার এই হোটেলে থাকে।
হোটেলের ভিতরের পরিবেশ টাও অদ্ভুত, কেমন যেন খা-খা করছে চারদিক টা।
সন্ধা হলেই ঝিঁ-ঝিঁ পোকার শব্দ অার শেয়ালের ডাকে কেঁপে উঠে শ্যাওলা যুক্ত প্রতিটি দেয়াল

সূর্য যখন পশ্চিম অাকাশে হেলে পরার পায়তারা করে তখন রিহান হোটেলের ছাদে বসে নিকোটিনে মগ্ন থাকে।
রিহান বেশ অদ্ভুত রমকের মানুষ, কেউ তাকে কখনো বুঝতে চায়না। বুঝার চেষ্টাও করেনা, অথচ তার এই নিকোটিনের ধোয়া গুলোও চিৎকার করে কিছু বলতে চায়, কিন্তু কেউ কোনো কর্ণপাত করেনা। তাই রিহান এই একাকিত্ব কে বেছে নিয়েছে, বেছে নিয়েছে নির্জন যায়গা গুলোকে।

প্রাত্যহিক ভাবে অাজও ছাদে বসে অাছে রিহান, বরাবরের মতই হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, ধুয়া গুলো একাকার হয়ে যাচ্ছে নীল অাকাশের মুগ্ধ বাতাসে।
মুগ্ধকর বাতাসে রিহানের চুল গুলো উড়ু উড়ু করছে।
সিগারেটে যখন লম্বা একটি টান মারে তখন ধোয়া গুলো শিরা-উপশিরার সাথে মিসে যায়।

সূর্য নীল অাকাশ থেকে নিজেকে অাড়াল করে নিয়েছে, পরিবেশ টা বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, চারদিক টা কেমন যেন খা-খা করছে।
রিহান ছাদের একটি ল্যাম্প এর মৃধু অালোর নিচে বসে হোটেলের নিচের নির্জন পরিবেশ টা দেখছে। অাকাশে এখন মেঘও দেখা যাচ্ছে, কিছুক্ষণ পর পর চাঁদ মামা উকি দিয়ে যাচ্ছে।
মনে হয় বৃষ্টি শুরু হবে এখনই, তবুও রিহান নিজের রুমে ফিরে যাবে না।
কারন বৃষ্টির মাঝেও সে এক অদ্ভুত ভালো লাগা খুঁজে পায়, নিজেকে বৃষ্টির মাঝে বিলিন করে দিতে চায়।

রিহান অানমনা হয়ে ভাবছে হোটেলের নিচতলায় থাকা একটি মেয়ের কথা। মেয়েটা দেখতে খুব সুন্দর তবে একটু গাম্ভির টাইপের। মনে হয় রিহানের মত রাত জাগে সেটা তার চোখের নিচের কালো দাগ গুলোই বলে দিচ্ছে।
তবে মেয়েটার মুখে কিছু একটা হারানোর ভয় সব সময় লেগে থাকে, অনেকটাই অদ্ভুত। প্রায় সময় নিচে নামলে রিহান সেই মেয়েটিকে দেখতে পায়, কিন্তু হাসি নামক জিনিস টা তার মুখে থাকেনা। মনে হয় কোনো এক ঝড়ে সব হাসি-খুশি সে হারিয়ে ফেলেছে।

হঠাৎ রিহানের চোখ যায় হোটেলের নিচে দাড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের দিকে, ল্যাম্পপোস্টের অস্পষ্ট অালোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেয়েটি হাসপাতালের রাস্তা ধরে অানমনা হয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে।
রিহান এটা নিয়ে ভাবে না অার, সে তার মত করে ধোয়া উড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি টানে ভালো লাগা খুঁজে পায় সে।

রিহানের চোখ দুটো ঘুমে অাচ্ছন্ন, খুব ইচ্ছে জাগছে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে।
কিন্তু কোনো লাভ হবেনা, চোখ ঘুমে অাচ্ছন্ন হলেও ঘুম পুরোপুরিভাবে ধরা দেয়না।
বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করা ছাড়া অার কিছুই হয়না।
তবুও নিজের রুমে ফিরে একটু ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করবে সে, রুমে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখে ঘুম এসে গেলো। নাহ্ অাজ অার ঘুম ধরা না দিয়ে পারেনি, তাই গভির ঘুমে মগ্ন সে।

পরদিন সন্ধা বেলায় অাবারও রিহান সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উটছে, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।
ছাদের দরজার সামনে যেতেই রিহান থমকে গেলো, কান্না-যুক্ত মেয়েলি কন্ঠ বাতাসে ভেসে অাসছে।
মনে হয় ছাদে দাড়িয়ে একটি মেয়ে কেঁদে কেঁদে কারো সাথে কথা বলছে।
কৌতুহল ভাবে রিহান মাথা টা একটু সামনে নিয়ে লক্ষ্য করার চেষ্টা করে কে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাঁদছে।

রিহানের চোখ যখন ছাদের পুর্ব-পাশে যায় তখন রিতিমত অবাক হয়ে যায়।
মেয়েটি বাতাসের সাথে কেঁদে কেঁদে কথা বলছে, বার বার একটি কথাই বলে যাচ্ছে “ওগো তোমাকে অামি বাচাতে পারলাম না, অামায় ক্ষমা করে দিও”
রিহান দরজার অাড়ালে দাড়িয়ে মেয়েটির অার্তনাদ শুনে যাচ্ছে।

মেয়েটি কারো উপস্থিতি টের পেয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো দরজার অাড়ালে কেউ একজন দাড়িয়ে অাছে।
মেয়েটির চোখ দিয়ে এতক্ষণ ধরে অঝর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিলো, কিন্তু হঠাৎ ই তা থমকে গেলো।
মেয়েটি ধিরে ধিরে দরজার সামনে অাসতেই রিহান মেয়েটির সামনে চলে অাসে, মেয়েটি রিহান কে দেখে থতমত খেয়ে গেলো।

মেয়েটি রিহান কে দেখে তার শাড়ির অাঁচল দিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো মুছে ফেলায় ব্যস্ত।
অার রিহান অবাক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অাছে।
মেয়েটির কান্নার শব্দে চারপাশ টা নীরব নিঃস্তব্ধ হয়ে অাছে।
নীরাবতায় কেটে যাচ্ছে সময়, দুজন দু দিকে তাকিয়ে অাছে।
রিহানের মনে হাজারো প্রশ্ন এসে জমা হচ্ছে, কিন্তু উত্তর খুঁজার সাহস তার কাছে নেই।

নিরাবতা কাটিয়ে মেয়েটিই রিহান কে প্রশ্ন করলো

-অাপনি এই হোটেলেই অাছেন?

রিহান মাথা ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাতেই মেয়েটির মুখে অভিনয়কৃত মৃধু হাসি ফুটে উঠে

-জ্বি

-ও অাচ্ছা, অামিও এই হোটেলেই অাছি

-জ্বি জানি

-কি করেন অাপনি?

-জ্বি, অামি লেখাপড়া করি অনার্স ২য় বর্ষে। অাপনি?

রিহানের প্রশ্ন শুনে মেয়েটি এক দ্বীর্ঘশাষ ছেড়ে দিয়ে বললো

-অামার টা অপ্রকাশিত থাক?

-অাচ্ছা, একটা কথা বলতে পারি?

রিহানের প্রশ্ন শুনে মেয়েটি একটু ভেবে বললো “হুমম করেন”

-অাপনি কি অসুস্থ? মানে কোনো সমস্যা?

-কেন এমনটা বলছেন?

-না মানে, অামি শুরু থেকেই সব দেখেছি অাজ। তাই বললাম অারকি, হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড

-নো নো ইটস ওকে

-উত্তর টা কি পাওয়া যাবে? অামার মনে হয় এখানে একটা রহস্য লুকিয়ে অাছে

-কি লাভ এক নষ্ট মেয়ের জীবনি শুনে?

-মানে? ঠিক বুঝলাম না

-অামার জীবনের গল্প শুনে শুধু শুধু অাপনি অাপনার সময় নষ্ট করবেন

-অারে না, বলুন যদি অামায় বিশ্বাস করেন তো

-অনেক কিছুই তো অাড়ালে থেকে শুনে নিয়েছেন, বাকিটাও বলছি।
অামার বাবা মা কে অামি জানিনা, খুব ছোট ছিলাম তখন অামি ডাস্টবিনের একটি পাশে বসে কান্না করছি।
এক রিকশাচালক অামি ডাস্টবিনের পাশে কাঁদছি দেখে তিনি অামাকে সেখান থেকে তার বাড়ি নিয়ে যান।
ছোট থেকেই তিনি অামাকে তার নিজের মেয়ের মত করে অামাকে ভালোবাসতেন।
অামার বয়স যখন ১৩ তখন সেই রিকশাচালক (বাবা) মারা যায়, মৃত্যুর অাগে তিনি বলে যান অামি তার নিজের মেয়ে নই। ডাস্টবিন থেকে কুড়ে পেয়েছে অামাকে।

অামি পাশেরই এক এতিমখানায় বড় হয়েছি, লেখাপড়া করার সব ব্যবস্থা ছিলো সেখানে।
অামি অারবি শিক্ষায় শিক্ষিত, অামার বিয়েও হয়েছে এক টুপি দাড়িওয়ালা ছেলের সাথে। অামার স্বামীও ছিলো অামার মতই এতিম, কিন্তু তিনি ছিলেন কোরঅানের হাফেজ।
গ্রামের সব থেকে বড় মসজিদের ইমাম ছিলেন তিনি ভালো ভাবে অামাদের দিন গুলো চলে যাচ্ছিলে।

কিন্তু হঠাৎ একদিন অামার স্বামী অসুস্থ হয়ে পরে, একটি রোগ যেন তার শরিরের শিরা-উশিরায় ঢুকে যায়। তার রক্তে ছড়িয়ে যায় এই রোগটি ডাক্তার রা বলেছে এই রোগ অার কখনো কারো শরিরে দেখা যায়নি।
ডাক্তার বলেছে শহরের কোন এক বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে, অর্থের সংকট ছিলো তাই এখানের এক হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম।

ডাক্তার রা বলেছে অনেক টাকা লাগবে চিকিৎসার জন্য।
কিন্তু পর্যাপ্ত টাকা অামার কাছে ছিলোনা, তাই চিকিৎসা করানো হচ্ছিলোনা।
ডাক্তার অামাকে একটি শর্ত দিয়েছিলো, যদি অামি তার শর্তে রাজি হই তাহলে তিনি বিনা টাকায় চিকিৎসা শুরু করবে।

মেয়েটি থমকে গেলো, রিহান বিশাল একটি দ্বীর্ঘশাষ নিয়ে নিজেকে হাল্কা করে নিলেন। হাতের জ্বলন্ত সিগারেট টাও এখন নিভে গেছে।

-কি শর্ত দিয়েছিলো?

-তারা অামার সতীত্বনাশ করার কথা বলেছিলো, প্রতি রাতে অামার থেকে দু ঘন্টার জন্য তারা চেয়েছিলো যতদিন না অামার স্বামী সুস্থ হবে।

অামি রাজি ছিলাম না, কিন্তু তারা অামার স্বামীকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলো।
মেয়ে মানুষ, কিছু না বুঝেই তাদের প্রস্তাবে অামি রাজি হয়ে গিয়েছিলাম শুধু অামার স্বামীর সুস্থতার জন্য।
কিন্তু ওই নরপিশাচ, পশু রুপি ডাক্তার গুলো যখন অামার দেহ ভোগ করার স্বাদ মিটে গেছে তখন হাসপাতাল থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে অামার স্বামীকে।

মেয়েটার কথা গলায় অাটকে যাচ্ছে, খুব কাঁদছে মেয়েটি। কাঁদার কারনে কথা বলতে পারছেনা, অামি শুধু নিরব দর্শক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছুই বলতে পারছিনা, অামি মনে হয় অামার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি।

-অা..অা…. অাপনার স্বামী?

-গত রাতে মারা গিয়েছে, বডি দিচ্ছে না। বলছে ২০হাজার টাকা বিল পরিশোধ করে ডেডবডি নিয়ে যেতে।

রিহান ভাবতে লাগলো, মানব সমাজের মানবতা অাজ কোথায়? মানুষের বিবেক অাজ বিলুপ্ত, সত্যিই কি বর্তমানে মানুষের ভিতরের বিবেক মৃত?

হঠাৎ পাশ থেকে মেয়েটির একটি প্রশ্ন রিহানের ভাবনায় ছেদ পরলো।

-একটা প্রশ্ন করবো?

রিহান কিছুই বলেনা, শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যা সূচক দিয়েছে।

-অাচ্ছা, এই সমাজ অামাকে এখন কোন চোখে দেখবে? পতিতা? বেশ্যা? বারবিলাসিনী? অাচ্ছা পুরো সমাজ তো এখন চিৎকার করে বলবে অামি বেশ্যা অামি নষ্টা মেয়ে, এই সমাজে অামার কোনো স্থান নেই। কিন্তু তারা? সমাজ কি তাদের দিকে তাকায় না? যারা দিনের পর দিন অামার মত শত মেয়ের সতীত্ব নষ্ট করে দিচ্ছে? সমাজ কি তাদের বেলায় অন্ধ থাকে?

মেয়েটার প্রশ্নের উত্তরে রিহান কিছুই বলেনি, কারন এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। তাই রিহান নির্বাক হয়ে এক টুকরো পাথরের দিকে তাকিয়ে অাছে অার, সাথে কয়েকটা দ্বীর্ঘশাষ।

……………………………………………………………….. সমাপ্ত ………………………………………………………..

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত