সহস্র এক আরব্য রজনী (আলিফ লায়লা) – দ্বিতীয় শেখের কাহিনী

সহস্র এক আরব্য রজনী (আলিফ লায়লা) – দ্বিতীয় শেখের কাহিনী

এবার দ্বিতীয় শেখ তার কাহিনী শুরু করে :

—এই যে দুটি গ্রে-হাউন্ড কুকুর দেখছো, আফ্রিদি সম্রাট, আসলে কিন্তু এ দু’টো কুকুর না। আমার সহোদর বড় দুই ভাই। আমি সবার ছোট। আমাদের আব্ববাজান মারা যাওয়ার সময় তিন ভাইয়ের জন্যে তিন হাজার সোনার মোহর রেখে যান। আমার অংশের মোহর নিয়ে আমি একটা দোকান করলাম। আমার দুই ভাই—এরাও দু’জনে দু’টো দোকান করলো। কিন্তু কিছুদিন বাদেই আমার এক ভাই এক সওদাগর দলের সঙ্গে বছরখানেকের জন্য বিদেশে বাণিজ্য করতে বেরিয়ে গেলো।

বছরখানেক বাদে ফিরে এলো সে শূন্য হাতে। বাণিজ্য করতে গিয়ে সব খুইয়ে এসেছে সে। আমি তাকে বললাম, বাণিজ্যে যাওয়ার আগে পইপই করে বারণ করেছিলাম তোমাকে। শুনলে না। আল্লাহর ইচ্ছে বোধ হয় এই ছিলো। তাই আজ তোমার ভাগ্যের এই হাল। আর সেই কারণেই আমার বারণও তোমার ভালো লাগেনি সেদিন।

যাই-হোক সান্ত্বনা-টাস্তুনা দিয়ে আমার দোকানে নিয়ে এলাম তাকে। ভালো করে গা হাত-পা প ফ করে গোসল করলে সে। আমার দামী পোশাক দিলাম পরতে। তারপর সঙ্গে বসে খানাপিনী সারলাম দু’ভাই। অনেক কথার ফাকে তাকে বললাম, দেখ ভাই, এই এক বছরে বেচাকেনা করে মোটামুটি ভালোই লাভ দাঁড়িয়েছে। আসল যা ছিলো তাই আছে। উপরন্তু লাভ হয়েছে হাজার দিনার। এক কাজ কর। এই লাভের অর্ধেকটা তুমি নাও। আবার দোকান সাজাও। দেখবে, ওতেই বেশ চলে যাবে। কী দরকার বেশি লোভ বাড়িয়ে?

আমার কথা মতো আবার সে দোকান করে কেনা-বেচা করতে লাগলো। এই ভাবে দিন কাটে। একদিন আমার দুই ভাই আমার কাছে এলো। বললো, সওদাগরের একটা দল বাণিজ্যে যাচ্ছে। আমরাও যাবো ঠিক করেছি। দোকানের কেনা বেচায় খাওয়া-পরা চলে যাবে ঠিকই, কিন্তু বড়লোক হওয়া যাবে না। আমরা বড়লোক হতে চাই। দেশের কত লোক বাণিজ্যে গিয়ে ধনী হয়ে ফিরে এসেছে, আমরাও যাবো। আমাদের ইচ্ছে, তুমিও সঙ্গে চলো।

আমি তাদের কথায় ‘না’ করে দিয়ে বললাম, একবার গিয়েও আক্কেল হয়নি, সব খুইয়ে এলে, আবার যেতে চাও কোন লজ্জায়!

আমার ধমকানিতে সেদিন তারা ফিরে গেলো। কিন্তু মাঝে মাঝেই এসে নানা রকম গল্প বলে লোভ দেখাতে লাগলো। কত লোক পথের ভিখিরি থেকে বড়লোক হয়ে দেশে ফিরেছে, তার লম্বা ফিরিস্তি শোনাতে লাগলো আমাকে। কিন্তু বার বার নিষেধ করতে লাগিলাম তাদের। ওসব শুনতে গেলে সোনারগাঁ, কাছে গেলে কিছুই না।

তবুওরা হাল ছাড়ে না। সেদিন ফিরে যায়। কিন্তু কিছুদিন বাদেই আবার ফিরে আসে। আবার আমি তাদের ফিরিয়ে দিই। এভাবে ছটা বছর পার হয়ে গেলো। অবশেষে তাদের প্রস্তাবে রাজি হলাম। আমি। বললাম, এই ক’বছরে যার যা লাভ হয়েছে, নিয়ে এসো।

গুনে দেখা গেলো, ছয় হাজার দিনার লাভ দাঁড়িয়েছে। ঠিক হলো বাণিজ্যের জন্য তিন হাজার দিনার সঙ্গে নেবো; আর বাকী তিন হাজার মাটিতে পুঁতে রেখে যাবো; কে জানে, বিদেশ বিভুঁই, কিছু বলা যায় না। যদি দিনারগুলো খোয়া যায়, তবে দেশে ফিরে পথে বসতে হবে।

আমার কথায় দু’জনেই সায় দিলো। এর পরে প্রত্যেক ভাই এক হাজার দিনার সঙ্গে নিলাম। নানা ধরনের মনোহারী জিনিসপত্র সওদা করে বাক্স-প্যাটরা বোঝাই করলাম। তারপর নৌকায় বোঝাই করে, আল্লাহর নাম নিয়ে পাল তুলে দিলাম।

মাসখানেক কেটে গেছে। একদিন এক বন্দরে নোঙর করলাম। আমরা। একদিনের জন্যে। দশ দিনার লাভে একটা সওদা করে আবার ভাসিয়ে দিলাম নৌকে। অন্য কোনও বড় শহরে যাবো আমরা। আরও কয়েকদিন কেটে গেলো। এক বন্দরে ভেড়ালাম নৌকে। সেই বন্দরেই আলাপ হলো একটি রূপবতী নারীর সঙ্গে। যেমন তার রূপ তেমনি তার যৌবন। কিন্তু বডড গরীব। ছেড়া ময়লা পোশাকে লজ্জা ঢাকতে পারছে না। সে। তার উদাম যৌবন পথচারীর বিভ্ৰান্তি ঘটাতে পারে। মেয়েটিই এগিয়ে এলো, আমায় কিছু সাহায্য করবে, মালিক? আমি বড় গরীব। তার বদলে তোমরা যা বলবে, করে দেবো। আমি তোমাদের সওদা বয়ে নিয়ে যেতে পারি শহরে। কেনা-বেচাও করে দিতে পারি, যদি চাও। আমি খানা পাকাতে পারি।

আমি প্রশ্ন করলাম, কোথায় থাকো তুমি, আর কে আছে তোমার?

ও বললো, থাকি এই শহরেই। আর আপনজন বলতে কেউই নাই আমার। পথে পথে ঘুরি। যদি কেউ খেতে দেয় খাই। যদি কেউ আশ্রয় দেয়, রাত কটাই। না হলে দীন দুনিয়ার মালিক আছেন ওপরে, তার ইচ্ছায় দিন কেটে যায় কোন রকমে।

মেয়েটি গরীব হলে কি হয়, কথাবার্তা শুনে মনে হলো, ভালো বংশের মেয়ে। আমার দিকে আরও একটু এগিয়ে এসে বললে, আমাকে সাহায্য করলে তা ফেলনা যাবে না তোমার। কোনও-না-কোনও ভাবে আমি তোমার উপকারে আসবো। আমাকে একটু আশ্রয় দাও, দেখো, তোমার ভালো হবে।

মেয়েটির কথায়-বিশেষ করে ওর বলার ঢং-এ কেমন মায়া হলে আমার। বললাম, ঠিক আছে, তুমি আমার নৌকায় এসো। আমার কাছেই থাকবে। কাজকাম যা করতে ইচ্ছে হয় করবে, না হয় করবে না। সে জন্যে কিছু এসে যাবে না। আশ্রয় দিচ্ছি বলেই যে তোমাকে কিছু ফেরৎ দিতে হবে, সে কথা মনে রেখো না।

মেয়েটি আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো, এই যদি তোমার মনের কথা, তা হলে আমাকে শাদী করে নাও না কেন?

কেন জানি না, খুব ভালো লাগলো ওর কথাগুলো। তাছাড়া ওর দেহে আছে রূপ-যৌবন। এই নিঃসঙ্গ পরিবাসে একটি সুন্দরী যুবতীর সঙ্গ কে না। চায়! রাজি হয়ে গেলাম তার কথায়। নৌকায় তুলে নিলাম তাকে। ছেড়া-ময়লা পোশাক-আশাক ছুঁড়ে দিলাম জলে। গরম পানি করে ঘষে মেজে সাফ করলাম ওর সারা দেহ। আচ্ছা করে গোসল করালাম তাকে। তারপর দামী শাড়ি পরালাম, সুরমা একে দিলাম চোখে। আতরের সুবাসে মদির হয়ে উঠলো। ওর দেহ। মখমলের গদীর বিছানায় বসালাম তাকে। দুজনে এক সঙ্গে বসে খানাপিনা করলাম। গল্প করলাম। অনেক। ওর জীবনের নানা বিচিত্র কাহিনী শোনালো আমাকে। আমিও শোনালাম আমার জীবনের কাহিনী। এইভাবে দুজনে দুজনার কাছাকাছি হয়ে এলাম আরও। সেই রাতে আমরা মধুযামিনী করলাম। আকাশে আধখানা চাঁদ। নিচে নীল জল। চারদিক নিস্তব্ধ-নিশুতি। শুধু মাঝে মাঝে মাথার ওপর দিয়ে বিচিত্র আওয়াজ তুলে উড়ে যাচ্ছে দু-একটা রাতচরা পাখি। আমরা দু’জনে নৌকার কিনারে বসে চাঁদনী রাতের এই মনমাতানো রূপে মুগ্ধ হতে থাকলাম। ওর হাতে আমার হাত। রাত্রির মুখে ভাষা নাই। আমরাও হারিয়ে ফেলেছি আমাদের ভাষা। রাত যখন গভীর হতে থাকে আমাদের দু’জনের অন্তরঙ্গতাও গভীরতর হতে থাকে আরও। দিনের তাপে উত্তপ্ত হওয়ায় এখন হিমের আমেজ লাগছে। কেমন শীত শীত মনে হতে, ওর নরম উষ্ণ বুকের মধ্যে মুখখানা গুজে দিই। দু’হাতে জড়িয়ে ধরি ক্ষীণ কটি। তারপর কোন রকমে উঠে আসতে পারি শোবার ঘরে। মখমলের নরম গদি আর আমার বুকের চাপে হারিয়ে যেতে থাকে ওরা থারথার নরম দেহ।

দিনে দিনে ভালোবাসা আরও গভীর হয়। শেষে এমন হলো, এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করতে পারি না তাকে। এই ব্যাপারটা খুব ভালো চোখে দেখলো না। আর দুই ভাই। তাদের বয়েস হয়ে গেছে। কোন সুন্দরী রূপসী মেয়ে তাকায় না। তাদের দিকে। আমার বয়েস কম। স্বাস্থ্য ভালো। যৌবনের জোয়ার আছে শরীরে। তাই তাদের হিংসে। আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলে না। তারা। সদাসর্বদা এডিয়ে এডিয়ে চলে। আমাদের আড়ালে দু’ভাই শলাপরামর্শ করে। আমার সৌভাগ্যে-কাতর হয়ে জ্বলে পুড়ে মরতে লাগলো। শকুনীর মতো চোখ দিয়ে উকি মারতে লাগলো আমাদের ঘরে। কী ভাবে আমি তাকে আদর করি, কী ভাবে আমাকে সে আদর করে, কী করে আমরা দুজনে দুজনের মধ্যে হারিয়ে যেতে থাকি—সেই সব একান্ত আপন, একান্ত গোপন দৃশ্য দেওয়ালের ফুটোয় চোখ রেখে দেখে দেখে বিকৃত বাসনা চরিতার্থ করতো তারা। আর আমার নারী ভাগ্যের ঈর্ষায়, আক্রোশে ফেটে পড়তো। আমায় হত্যা করে আমার ধনদৌলত হাতিয়ে নেবার ষড়যন্ত্র করতে লাগলো তারা। বুঝলাম, শয়তান ভর করেছে ওদের ওপর।

একদিন গভীর রাত্রে আমি আমার বিবিকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। এমন সময় চুপি চুপি ঘরে ঢুকে আমাদের দুজনকে তুলে নিয়ে গিয়ে দরিয়ায় ফেলে দিলো ওরা। তৎক্ষণাৎ আমার বিবি এক বিশান জিনির রূপ ধারণ করলো। আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে কুলের দিকে নামালো আমাকে। তারপর কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলো নিমিষে। যে দিকে তাকাই ঘন অন্ধকার। কিছুই ঠাওর করতে পারলাম না। সারারাত সেই নির্জন দ্বীপে, নিরন্ধ্র অন্ধকারে একা বসে রইলাম আমি। সে ফিরে এলো সকালে। বললো, আমাকে চিনতে পারো? বলে তো, কে আমি?

আমি হতভম্ব হয়ে তার এই বিশাল রূপ দেখতে থাকি।

ও বললো, আমি তোমার বিবি। আমি তোমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছি আজ। রাতে। আমি হচ্ছি এক জিনি-আহ। প্রথম দর্শনেই ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে। আল্লাহরও সেইরূপ ইচ্ছে ছিলো। আল্লাহতে আমার গভীর বিশ্বাস। আর এও বিশ্বাস করি, তার ইচ্ছা ছাড়া দুনিয়াতে কোন কিছুই করা সম্ভব না। আমি যখন এক ভিখারিণীর বেশ ধরে তোমার দয়া ভিক্ষা করেছিলাম তখন তুমি আমাকে তোমার বিবি করে নিয়েছিলে। আজ আমি তোমার জান বাঁচাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। কিন্তু তোমার শয়তান ভাই দুটোকে আমি হত্যা করবো।

তার কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম। আমি। অন্তর দিয়ে ধন্যবাদ জানালাম তাকে। কিন্তু আমার ভাইদের হত্যা করবে। শুনে বিচলিত হয়ে পড়লাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভাইদের সব বৃত্তান্ত খুলে বললাম তাকে। সব শুনে সে বললো, আজ রাতেই উড়ে গিয়ে ওদের নৌকোটা ডুবিয়ে দেবো। আমি। নৌকো ডুবে গেলে তারাও মরে যাবে।

আমি বাধা দিয়ে বললাম, খোদা তোমার সহায়, তুমি তা নিশ্চয়ই করতে পারো। কিন্তু আমার অনুরোধ, আর যাই করো, জানে মেরো না ওদের। হাজার হলেও ওরা আমার ভাই। জানো তো একটা প্ববাদ আছে: মুখের উপকার করলে সে তার মর্ম বোঝে না। উল্টে সে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করে। দুষ্ট লোকেরা দুষ্টই থেকে যায়। চেষ্টা করেও সৎ হতে পারে না। সেইটেই তাদের বড় শাস্তি।

না, না, জিনি চিৎকার করে ওঠে, ওদের কোন রেহাই নাই। মৃত্যুই একমাত্র পাওনা।

এই বলে আমাকে কাঁধে তুলে আকাশপথে উড়তে থাকে। উড়তে উড়তে এক সময়ে এসে নামালো সে আমার বাডির দরজায়।

বাডিতে ঢুকেই পুঁতে রাখা দিনারগুলো তুলে নিলাম। তারপর দোকানে গেলাম। দেখলাম, যেমনটি রেখে গিয়েছিলাম। তেমনটি রয়েছে সব। সন্ধ্যেবেলা দোকানের ঝাপ বন্ধ করেবাড়ি ফিরে দেখি, ঘরের দাওয়ায় দু’টো গ্রেহাউন্ড কুকুর শিকলে বাধা। কাছে যেতেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো তারা। আমার কামিজের খুঁট ধরে টানতে লাগলো। কিছুই বুঝতে পারছি না, কি ব্যাপার! এমন সময় আমার বিবি সেই জিনি এসে বললো, এই দুই রত্ন তোমার দুই ভাই।

জিজ্ঞেস করলাম, কি করে হলো এই দশা?

ও বললো, আমার ছোট বোন, যাদুবিদ্যায় সিদ্ধহস্ত সে। বলেছে, দশ বছরের মধ্যে ওদের কেউ মানুষের চেহারা ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

দশ বছর পুরো হয়ে গেছে। এখন আমি আমার সেই শালীর সন্ধানে বেরিয়েছি। তার দেখা পেলে অনুরোধ জানাবো, আমার এই ভাই দুটোকে যদি সে আবার মানুষ করে দেয়। এই আমার ইচ্ছে। আমার শালীর সন্ধানে যেতে যেতে এইখানে এই বটবৃক্ষের নিচে এদের সঙ্গে আমার দেখা। এদের মুখেই শুনলাম, এই সওদাগরের দুর্ভাগ্যের কাহিনী। তাই অপেক্ষা করছিলাম। দেখে যাই, কী ঘটে!

দ্বিতীয় শেখ বললো, আমার কাহিনী তো শুনলে আফ্রিদি সম্রাট। এখন বলে কেমন লাগলো তোমার।

চমৎকার— চমৎকার, এমন চমৎকার কাহিনী আমি কখনও শুনিনি। সওদাগরের আরও একভাগ দোষ মাফ করে দিলাম। আমি।

এবার সেই খচ্চরটার মালিক-তৃতীয় শেখ এগিয়ে এসে সালাম জানালো আফ্রিদিকে। আফ্রিদি বললো, তোমার আবার কি কাহিনী? শোনাও দেখি।

গল্পের বিষয়:
ফ্যান্টাসি

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত