চাপাবাজ জামাই

চাপাবাজ জামাই

বাসা থেকে বের হওয়ার সময় শ্বাশুড়ী আম্মা বলে দিয়েছেন, “বউমা আসার সময় গ্রাম থেকে বেশি করে হাতপাখা নিয়ে এসো, এই গরমে হাতপাখার খুব প্রয়োজন”

আমি একটু করুণ কণ্ঠে বললাম, “জ্বি মা নিয়ে আসবো”

আমার বর ব্যাগপত্র রিক্সায় তুলছে, আমি নিচে নেমে আসার পর বর বললো, “মাইক্রোওভেনের সুইচ আর এসির সুইচ বন্ধ করেছো?”

বরের কথা শুনে আমি হা হয়ে গেলাম, আমাদের ঘরে মাইক্রোওভেন আর এসি কিনলো কবে!! বিয়ে হয়েছে এক মাস হলো,কই আমি তো দেখতে পেলাম না!!

আমি কিছু বলার আগে বর বলে উঠলো, “ওহহ দেখেছো একদম ভুলেই গিয়েছি, বের হওয়ার সময় বুয়াকে বলেছিলাম, বুয়া সব সুইচ বন্ধ করে দিয়েছে”

আমি চোখ বন্ধ করে ভাবলাম, “আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ কি বাড়িতে ছিলো!! কই না তো! শ্বাশড়ী আম্মা, আমি আর আমার বর ছাড়া তো বাড়িতে কেউ থাকে না, তাহলে বুয়া আসলো কোথা থেকে!!”

বর রিক্সায় উঠতে বললো, আমি রিক্সায় উঠে বসলাম, বর রিক্সাওয়ালা’কে বলতে লাগলো, “আরে মামা কি আর বলবো আপনাকে! ব্যবসাবানিজ্য নিয়ে বেশির ভাগ সময় দেশের বাহিরে থাকতে হয়, দেশে এত গরম! কি যে করি! হয়তো কাল-পরশু লন্ডন চলে যাবো কিছুদিনের জন্য”

আমি মাথা ঘুরিয়ে বরের দিকে তাকালাম, যে লোক ১৫ হাজার টাকার চাকুরী করে সে যাবে লন্ডন!! তাছাড়া আগামী সাত দিন তো আমাদের বাড়িতে থাকবে এর মধ্যে লন্ডন আসলো কোথা থেকে!!”

আমি কিছু বুঝে উঠার আগে বাস টার্মিনালে পৌঁছে গেলাম, আমি জানতাম না কোন বাসে করে আমরা যাচ্ছি তবে গতরাতে বর বলেছে আমরা ভাআইপি মানুষ তাই ভিআইপি বাসে করে যাবো, টার্মিনালের টুলে বসে আছি, বাস আসতে আর কিছুক্ষণ, প্রায় দশ মিনিট যাওয়ার পর বর বললো,

উঠো উঠো আমাদের বাস এসে গেছে।
তুমি ভুল করছো,ডিপজল বাস এসেছে, আমাদের বাস আসেনি।

আরে তুমি কি পাগল!! এটাই আমাদের বাস, চলো, চলো…

আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছি, এই ডিপজল বাস আমাদের ভিআইপি বাস!! রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছিলো কিন্তু মানুষের সামনে কিছু বলতে পারছিলাম না, কোনরকম বাসে গিয়ে বসলাম।
বাসের মধ্যে আমি তার সঙ্গে কথা বলছিলাম না, ও নিজেও কথা বলছিলো না, কয়েনদিন আগের একটা খবরের কাগজ বের করা মুখের সামনে ধরে রাখলো, তবে আমার মনে হয় না সে খবরের কাগজটা পড়ছে!!

বাসের মধ্যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।
ও যখন ডাকলো তখন ঘুম ভাঙ্গলো, খাওয়ার জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়েছে, ও আমায় জিজ্ঞেস করলো,

কিছু খাবে?
আমি কিছু বলার আগে ও বলে উঠলো,

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তুমি কি খাবে! আমিও না পাগল! তোমার যত্ন নিতে জানি না, তুমি অপেক্ষা করো আমি শুধু এক বোতল পানি এনে দিচ্ছি…
এ বলে সে গাড়ি থেকে নেমে গেলো, দুঃখে আমার কান্না চলে আসছিলো প্রায়, এ কেমন মানুষ!!
একটু পানি খেয়ে গা হেলিয়ে দিলাম সিটে, গন্তব্যে নেমে দাড়িয়ে রইলাম, ও একটা ভ্যান নিয়ে আসে, ভ্যানে করে বাড়ি পৌঁছালাম, আমাদের দেখে সবাই অবাক কারণ আমরা বলে আসিনি, এটা ছিলো সারপ্রাইজ। ও সবার সাথে কূশল বিনিময় করতে ব্যস্ত, আমি বাধ্য হয়ে মাকে বললাম,

মা খাওয়ার মতো কিছু আছে?
মা কিছু বলার আগে ও বলে উঠলো,

কি বলো? এখনি তো খেয়ে আসলে, এখন আবার মা’কে কি খাওয়ার কথা বলছো?
আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম, ও মা’কে বললো,

আর বলবেন না মা! বাস যখন বিরতি দিয়েছিলো তখন আপনার মেয়েকে বিরিয়ানি খাইয়ে ছিলাম তারপরও দেখুন এখন কেমন খাওয়ার বায়না করছে!!!
আমার খাওয়ার ইচ্ছে সবাই হেসে উড়িয়ে দিলো।
আমি রাগে ফেঁটে যাচ্ছিলাম, রাগ করে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম।
হঠাৎ করে আসাতে কারো কোন প্রস্তুতি ছিলো না তাই দ্রুত খাবারদাবারের ব্যসস্থা করা হচ্ছিলো।
ও আমার দরজায় নক করে বললো,

তোমার আবার কি হলো? দরজা খুলো…
খুলবো না!

আহা রাগ করছো কেন? দেখো আমার শালাকে আমি কি উপহার দিয়েছি…

তার কথা শুনে আমি চমকে গেলাম, এই মানুষ আমার ভাইকে উপহার দিয়েছে!! আমি দ্রুত দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম! আমার এই ছোট ভাইটাকে এভাবে কে সাজিয়েছে!!
ও হেসে বললো,

দেখো ওকে আদিম যুগের মানুষের মতো সাজিয়েছি, কেমন লাগছে?
তুমি! তুমি করেছো একাজ!!

হ্যাঁ, সুন্দর হয়নি?

তাই বলে তুমি আমার ছোট ভাইকে কচুপাতা দিয়ে সাজাবে?

ও হেসে দিয়ে চলে গেলো, কিছুক্ষণ পর দেখি অনেক বাচ্চা বাড়িতে ভীর করেছে, জানতে পারলাম তারা ঢাকায়্যা জামাই দেখতে আসছে, ভীরের মাঝে খেয়াল করলাম প্রায় সব বাচ্চা কচুপাতা হাতে করে নিয়ে এসেছে আদিম যুগের মানুষদের মতো সাজতে, আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম!!

আমার বান্ধবীরা আমার বরকে দেখতে এসেছে, ওরা রুমে বসে গল্প করছে, ওদের হাসির শব্দে আমি ওদের কাছে গিয়ে বসলাম, আমার বর ওদের গল্প শুনাচ্ছে, এর মাঝের ওর একটা কল আসে, ও কল রিসিভ করে বলে,

আরে দোস্ত এটা আবার বলতে হয়! আমার গাড়ি মানেই তো তোর গাড়ি, তুই গাড়ি নিয়ে যা…
ওর কথার শেষে আমার বান্ধবীরা জিজ্ঞেস করলো-

দুলাভাই আপনার গাড়ি আছে?
আরে কি যে বলো তোমরা! আমার তিনটা গাড়ি আছে, একটা আমার,একটা মায়ের আরেকটা বন্ধুদের জন্য ফেলে রাখি সব সময়…

আমি চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে রইলাম।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে, রাতের খাবারের জন্য ওকে ডাকতে গিয়ে দেখি ও মন খারাপ করে বসে আছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম,

মন খারাপ কেন?
আর বলো না! আমার মানিব্যাগে দেখি দশ টাকার একটা নোট নেই!!

ওর কথা শুনে আমি চোখ বড়বড় করে তাকালাম, ও আমার দৃষ্টি দেখে বললো,

না না ঠিক আছে, আমি খাবার টেবিলে যাচ্ছি…
কিছুক্ষণ পর ও খাবার টেবিলে আসলো।
খাবার টেবিলে সবাই মিলে গল্প করছে।
আমার মেঝ ভাই ওকে জিজ্ঞেস করলো-

দুলাভাই আপনি আসবেন আগে তো বললেন না! বললে আমরা রিসিভ করতে যেতাম।
কি যে বলো! তোমাদের কষ্ট দিতে যাবো কেন? আমরা গাড়িতে করে বাস টার্মিনালে এসে ভিআইপি এসি কোচে করে চলে এসেছি, আমাদের কোন অসুবিধে হয়নি।

এসির ঠান্ডা বাতাসের মতো আমার মাথা ঠান্ডা হয়ে গেলো! এত মানুষের সামনে কিছু বলতেও পারছি না! খাবারের বিভিন্ন টাইটেমের মধ্য থেকে ও আলু ভর্তা নিয়ে খাচ্ছিলো, ছোট ভাই জিজ্ঞেস করলো,

দুলাভাই কেমন লাগলো আলু ভর্তা?
আরে আমার প্রিয় শালা, কি যে বলো তুমি! আমি আলু ভর্তার প্রেমে পড়ে গেলাম, আগে কখনো আলু ভর্তা খাইনি, আজ প্রথম। অসম্ভব সুন্দর টেস্ট হয়েছে…!

ওর কথা শুনে আমার মাথা ঘুরে উঠলো, আজ সকালে বের হওয়ার আগেই তো ঠান্ডা ভাতের সঙ্গে আলু ভর্তা খেয়ে বাড়ি থেকে বের হলো আর সে কি বলছে আগে কখনো খায়নি!!

মা ওর পাতে কাতলা মাছের পিস দিতে গেলে সে বলে,

না না মা! আমি কাতলা মাছ খাবো না, তিন বেলা কাতলা মাছ খেতে খেতে আমার অরুচি এসে গেছে…
আমি ওর কথা শুনে আর জ্ঞান রাখতে পারলাম না, আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম, জ্ঞান ফেরার পর তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

তুমি কাতলা মাছ খাওনি কেন?
আর বলো না! এত দামি মাছ খেলেই তো শেষ হয়ে যাবে,খাওয়ার দরকার কি? তোমার মাকে বলো ফ্রিজে রেখে দিতে তাহলে আর শেষ হবে না…

আমি জ্ঞান রাখতে পারলাম না।
আবারও অজ্ঞান হয়ে গেলাম….

বিয়ের সময় শুনেছি আমার বর লন্ডন থাকে, তার নাকি বাংলাদেশ একদম পছন্দ না, আবার শুনেছি বিয়ের পর আমাকে নিয়ে লন্ডনে চলে যাবে কিন্তু বিয়ের পর লন্ডন থাক দূরের কথা আজ পর্যন্ত শিশু পার্কেও নিয়ে যায়নি। বিয়ের দুই মাস চলছে এখন, একদিন রাতে বরের বুকে মাথা রেখে খুব যত্ন করে বললাম,

আমার ইচ্ছের কোন দাম কি তোমার কাছে নেই?
কি যে বলো!! থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে..

তাহলে কথা দাও, আমি যা বলবো তুমি তা শুনবে…

আচ্ছা কথা দিলাম, বলো

আমায় নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যাবে?

বর আমার কথা শুনে রোবটের মতো উঠে বসে, আমিও উঠে বসলাম, বর খুব হতাশা নিয়ে বললো,

কি দরকার ছিলো এত রাতে আমার সাথে মজা করার?
মজা? মজা কোথায় করলাম!

তুমি আমার বউ হয়ে এই কথা বলতে পারলে?

কোন কথা?

কক্সবাজার? তোমার মনে হয় আমি তোমাকে কক্সবাজার নিয়ে যাবো?

নেবে না?

না নেবো না! এই সামান্য পুকুরের সমান একটা সমুদ্র দেখাতে আমি তোমাকে কষ্ট দিয়ে নেবো না, তুমি আমার বউ কিন্তু তোমার নজর এত নিচে কেন বুঝি না!!

বরের কথা শুনে আমি থেমে গেলাম, কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না, কিছু না বলে শুয়ে পড়লাম, বরও শুয়ে পড়েছে। সকাল হতেই বর প্রতিদিনের মতো গোসল করে রেডি হচ্ছে, আমি অবাক হয়ে বললাম-

কোথায় যাচ্ছো?
অফিসে…

অফিসে!!

হ্যাঁ।

আজ তো শুক্রবার!

ওহহ নো!! দেখেছো একদম ভুলে গিয়েছি!

রেডি যখন হয়েছো তখন থাক।

কেন?

আমার মামাতো বোনের শশুড় বাড়ি যাবো, বেশি দূরে না কাছেই…

আমার কথা শুনে ওর মুখ শুকিয়ে এলো তবুও না করলো না, আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। রিকশা ধরে বোনের শশুড় বাড়ির সামনে নেমে বরকে বললাম-

তুমি কিছু নিলে না?
কি নেবো?

কিছু ফল, একটু মিষ্টি…

তোমার কখনো কি কমনসেন্স হবে না?

কেন?

বাড়িতে থাকে তো তোমার মামাতো বোন,বোনের জামাই আর শশুড়, নিশ্চিয় শশুড় মিষ্টি খায় না ডায়াবেটিকসের জন্য আর ওরা দুজন হানিমুন করবে নাকি বসে বসে মিষ্টি খাবে?

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম, এ কেমন মানুষ? এর মধ্যে আমার মামাতো বোন নিচে নেমে আসে, ওর সামনে আর কিছু বলতে না পেরে ভেতরে গেলাম, আমার বর খুব মন খারাপ করে বসে আছে, বোন জিজ্ঞেস করলো,

দুলাভাই আপনার মন খারাপ কেন?
আর বলো না শালিকা! তোমাদের এলাকা এত খারাপ আগে জানলে আসতাম না!

কেন? কি হয়েছে?

এমনিতে আমি কখনো গাড়ি ছাড়া চলতে পারি না তার উপর তোমাদের এই এলাকায় বড় গাড়ি ডুকে না, তোমার বোনের কথা ভেবে রিকশায় করে আসলাম কিন্তু গলির মোড় থেকে কারা যেনো আমার হাত থেকে মিষ্টি আর ফলমূল নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছে, এভাবে খালি হাতে আসতে হয়েছে ভেবে খুব খারাপ লাগছে!

ওর কথা শুনে আমার দৃষ্টি ঠান্ডা হয়ে গেলো! এত বড় চাপাবাজি? মানুষ তাহলে ঠিকি বলে আমার বর আসলেই একটা চাপাবাজ!
মামাতো বোন লাঞ্চের ব্যবস্থা করলো, আমরা তিনজন খেতে বসেছি, মামাতো বোনের জামাই ব্যবসার কাছে বাহিরে গিয়েছে, ওর শশুড় গ্রামে বেড়াতে গেছে, খাবার খেতে খেতে আমার বর বলে উঠলো,

বুঝলে শালি? তোমাদের এমন আমারও তিনটা বাড়ি আছে, বড়সড় বাড়ি আমার পছন্দ না তাই ওমন ছোট বাড়িতে থাকি।
ওর কথা শুনে আমি এক গ্লাস পানি খেলাম!
ও থেমে নেই, ও আবারও বললো,

এই যে তুমি এত রান্না করেছো এতে আমি খুশি হইনি শালিকা…
কেন দুলাভাই? রান্না ভালো হয়নি?

না রান্না একদম ঠিক আছে কিন্তু প্রতিদিন একই খাবার খেতে কারই বা ভালো লাগে বলো? ভিন্ন কিছু হলে তৃপ্তি করে খেতাম..

মনে মনে বললাম, “নিজের মুরোদ নেই এক কেজি তেলাপিয়া মাছ কিনার আবার এত বড়বড় কথা বলছে!”

বিকেল হতেই বাড়ি ফিরে আসলাম, বাড়ি ফেরার পর থেকে আমার বর বিছানার সাথে লেপটে আছে, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

কি গো? তোমার আবার কি হলো?
আহহহ তোমার বোন আজ যা খাওয়ালো না! বাপ দাদার জন্মে এমন খাবার খাইনি…

মনে মনে বললাম, “খাবি কীভাবে? দেখেছিলি কখন?”

আমি একটু মুখ আটকে হেসে বললাম,

তোমার শরীর ঠিক আছে তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ, শরীর একদম ঠিক আছে, বুঝলে বউ,মনে হচ্ছে কয়েকদিন না খেলেও চলবে।

এত খেয়েছো?

আর বলো না, এত ভালো ভালো খাবার দেখে মাথা একদম ঠিক ছিলো না।

তাহলে তুমি বললে কেন, প্রতিদিন একই খাবার খেতে তোমার ভালো লাগে না?

আরে বউ বুঝলে না তুমি! এইটুকু যদি না বলি তবে কি মানসন্মান কিছু থাকবে?

ওর কথা শুনে দ্রুত আমি রুম ত্যাগ করলাম, ওর কিছু না হলেও ওর চাপাবাজিতে আমার কান ফেঁটে যাবে, শ্বাশুড়ি আম্মার সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্পসল্প করে রুমে এসে দেখি ও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে, বিয়ের পর এই প্রথম দেখলাম ও এত জোরে জোরে নাক ডাকছে, মৃদু কণ্ঠে শ্বাশুড়ি আম্মা বললেন,

ও হয়েছে ওর বাবার মতো, মন মতো ভালো খাবার পেটে পড়লে নাক ডেকে ঘুমায়।
মাথায় কাপড় টেনে বললাম,

আম্মা আপনি!
পানি নিতে এসেছিলাম, ওর নাক ডাকার শব্দে রুমে আসলাম…

আম্মা চলে গেলেন, এবার মহাবিপদ আমার! একটা মানুষ এত নাক ডাকলে পাশে আরেকজন মানুষ ঘুমায় কীভাবে!! কানের উপর বালিশ চেপে ধরে কোনরকম রাত পার করে দিলাম।
সকালে উঠে দেখি ও এখনো ঘুমাচ্ছে, বিয়ের পর এটা প্রথম আমি ওর আগে ঘুম থেকে উঠেছি, আমি ওর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম, মানুষটা যতই চাপাবাজ হোক না কেন অদ্ভুত ধরনের একটা মায়া আছে তার ভেতরে, এই নিষ্পাপ মুখের দিকে যে তাকাবে সে তার মায়ায় পড়তে বাধ্য, তার কপালে ছোট করে একটা চুমু খেয়ে আমি রান্না ঘরে গেলাম, আম্মাও উঠেছেন, আম্মা ওনার ছেলেকে দেখতে না পেয়ে বললেন,

উঠেনি তাই না?
জ্বি না আম্মা..

আজ অফিসেও যাবে না দেখো।।

কেন আম্মা? কেন যাবে না?

ওই যে বাপের স্বভাব ধরে রেখেছে।

আম্মার কথা শুনে আমি দ্রুত রুমে গিয়ে ওকে ডাকাডাকি শুরু করি, ও গায়ে কাঁথা টেনে বলে,

আজ অফিসে যাবো না…
কেন? কেন?

ভালোমন্দ খেয়ে শরীর দূর্বল লাগছে।

আমি হা হয়ে ওর কথা শুনলাম।
কেমন মানুষের পাল্লায় পড়লাম কে জানে!
ওর এসব মেনে নেওয়া যায় না তাই মনে মনে একটা প্ল্যানিং করলাম, শ্বাশড়ী আম্মাকে পটিয়ে ওকে নিয়ে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসলাম, সব জায়গায় একই অভ্যাস চাপাবাজি!! একদিন বিকেলে আমি ওকে নিয়ে গ্রামে ঘুরতে বেরিয়েছি, কিছুটা পথ হাঁটার পর আমার কলেজের কয়েকজন ছেলে বন্ধুর সাথে দেখা, ও আমার বন্ধুদের সাথে ভাব বিনিময় করে, বন্ধুদের সাথে কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে ও বলে,

বুঝলে তোমরা? শহরে আমার অনেক বড় বড় অফিস আছে, সেই অফিস থেকে এক দিনে ইনকাম হয় দুই কোটি টাকার উপরে, তোমাদের বন্ধু মানে আমার বউ তো টাকার উপর শুয়ে থাকে সব সময়, তোমাদের কারো যদি চাকুরী দরকার হয় তবে বড় ভাই হিসেবে আমাকে বলবে, আমি নিজের অফিসে তোমাদের চাকুরী দেবো…
ওর কথা শুনে আমি পাথর হয়ে যাচ্ছিলাম, দ্রুত ওকে নিয়ে সেখান থেকে চলে এলাম, নদীর পাড়ে বসে কিছুক্ষণ গল্প করার পর ও বললো,

বুঝলে বউ, গ্রাম আসলেই অনেক সুন্দর, ভাবছি মা আর তোমাকে নিয়ে গ্রামে চলে আসবো।
ওসব থাক এখন! তুমি থাকো, আমি যাচ্ছি…

হ্যাঁ বউ তুমি বাড়ি যাও আমি দোকান এক কাপ চা খেয়ে আসছি…

তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু!

বরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি চলে আসলাম। রাত প্রায় দশ’টা, ও এখনো বাড়ি ফিরেনি, আমি অনেকবার কল করলাম কিন্তু ফোন বন্ধ, দ্রুত বাড়ির সবাইকে কথাটা বললাম, সবাই বসে বসে চিন্তা করছে, তখন রাত প্রায় বারো’টা, বরের ফোন থেকে ফোন আসে, রিসিভ করার পর বর বললো,

বউ! বউ গো আমাকে বাঁচাও, আমি কিডন্যাপ হয়েছি…
কি বলছো! কারা ওরা?

জানি না! মুখে কাপড় বাঁধা, ওরা বলেছে এক কোটি টাকা দিলে আমাকে ছেড়ে দেবে, বউ এত টাকা আমার বাপদাদাও চোখে দেখেনি, আমি এত টাকা কোথায় পাবো? আমাকে বাঁচাও বউ!

বরের কান্না শুনে খুব খারাপ লাগছে, নিশ্চিয় খুব ভয় পেয়েছে কিন্তু এত টাকা কোথায় পাবো?
সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছি, তখন রাত প্রায় দুই’টা, হুন্ডার শব্দে সবাই বাহিরে দৌড়ে এসে দেখলাম দু’জন লোক আমার বরকে ফেলে দিয়ে চলে যাচ্ছে, তাদের দৌড়ে ধরতে পারেনি কেউ, বর কে ঘরে এনে পানি খাওয়ালাম, বর প্রচুর ভয় পেয়ে আছে, চোখ মুখ শুকিয়ে শুটকি লেগে গেছে, ও আরো দুই গ্লাস পানি খেলো, আমি একটু আড়ালে গিয়ে কিডন্যাপার কে কল করে বললাম,

বন্ধু তোর দুলাভাইর অবস্থা খারাপ, এবার মনে হয় চাপাবাজি ছাড়বে।
কি হয় জানাইস!

বন্ধুর ফোন কেটে বরের পাশে আসলাম, এসে দেখি ও আমার বাবাকে বলছে,

আর বলবেন না বাবা, ওরা কিডন্যাপার নাকি নিজের ভাই ঠিক বুঝলাম না।
বাবা বললো,

কেন বাবা? কি করেছে ওরা?
আমি কোটিপতি ভেবে আমাকে তুলে নিয়ে গেছে, ওরা আমার কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছে, আমি দুই কোটি টাকার একটা চেক দিয়ে এসেছি, তারপর আর কি বলবো বাবা! ওরা আমাকে মাছ,মাংস,বিরিয়ানি খাইয়ে বুকে টেনে নিয়েছে….

আমার মাথা ভ্রমরের মতো ঘুরে উঠেছে!
এ মানুষ কখনো পরিবর্তন হওয়ার মতো না।
ওর এসব কথা শুনে আমি বেশিক্ষণ জ্ঞান ধরে রাখতে পারিনি, আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম!

গল্পের বিষয়:
হাস্যরস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত