স্মার্ট আম্মু

স্মার্ট আম্মু

তুহির আম্মু একটা নতুন স্মার্টফোন কিনেছেন। এ যুগে একটু স্মার্ট না হলে কি হয় নাকি? আর স্মার্টফোন থাকবে, অথচ তাতে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটস অ্যাপের একাউন্ট থাকবে না তা কি হয়? ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া এক সন্তানের জননী তুহির আম্মু, তার ফেসবুক আইডি খুলেছেন “অবুঝ বালিকা”!

দিনে প্রতি একঘন্টা করে মোট ২৪টা ফটো আপলোড করেন ফেসবুকে৷ ছবিগুলোতে ক্যাপশন থাকে, ‘চুল আঁচড়াচ্ছি গাইজ,’ ‘ডিম সেদ্ধ করছি গাইজ’। গাইজ নামক এই কুল শব্দটা তিনি শিখেছেন তার মেয়ে তুহির কাছ থেকে। তাই প্রতিটা বাক্যের শেষে গাইজ শব্দ জুড়ে দেন। এটুকুই না! তিনি এখন আর বাড়ির কারো সাথেই মুখে কথা বলেন না, কথা বলেন হোয়াটস অ্যাপের মেসেজে। তুহির আব্বু খেতে বসলে স্ত্রীকে নক করে বলেন, “এক চামচ ডাল দাও তো।” তিনি তার স্বামীর প্লেটে এক চামচ ডাল তুলে দেন। ঘরে আলু শেষ হয়ে গেলে তুহির আব্বুকে ছোট্ট করে মেসেজ দেন, “There is no আলু in ঘর। please bring আলু।” বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে লেখাটাও কুলনেস। এটাও শিখেছেন মেয়ের থেকে। আম্মুর যন্ত্রণায় তুলি এখন আর রাত জেগে ফেসবুকিং করতে পারে না। তার আম্মু ওঘর থেকে নক দেয়, “এতো রাতে তোর সবুজ বাতি জ্বলে কেন? ঘুমা।” তুহি ওর বাবাকে নক করে, “বাবা ঘুমাচ্ছো?” বাবা রিপ্লাই দেয়, “না মা, তোর আম্মুর সাথে মেসেজে কথা বলছি।” অথচ তার আব্বু আম্মু একই ঘরের একই খাটে পাশাপাশি ঘুমায়।

তুহি আর ওর আব্বুকে এখন আর সকালে ঘুম থেকে ডেকে দিতে হয় না। সকাল ৮টায় উঠে ওদের দুইজনের হোয়াটস এপে ক্রমাগত মেসেজ দিতে থাকেন তুহির আম্মু। মেসেজের রিংটোনে যদিও দুইজনের ঘুম ভাঙে, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে যায়। তুহির আম্মু এখন আর রুটি বেলে নাশতা বানান না। ফুড সার্ভিসে নাশতা অর্ডার করেন৷ ততক্ষণে বাবা মেয়ে দুইজনকেই পেটে ক্ষুধা নিয়ে বাসা ছাড়তে হয়।

তুহির আম্মু ইউটিউব দেখে মাঝে মাঝে রান্নায় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন। কিছুদিন আগে ইউটিউবে দেখলেন কীভাবে সামুদ্রিক মাছ রান্না করতে হয়। বাসায় সামুদ্রিক মাছ নেই, তাই পাঙ্গাস মাছ দিয়ে ট্রাই করলেন। সেই খাবার দ্বিতীয় বার কেউ ছুঁয়ে দেখারও সাহস করলো না৷ অবশেষে নর্দমার বর্জ নর্দমায় চলে গেল! এছাড়াও তুহির আম্মু মেক-আপ টিউটোরিয়াল দেখে বাসায় দুইঘন্টা ধরে সাজগোজ করেন৷ তুহির আব্বু বাসায় আসলে দরজা খুলে দেন৷ মাঝে মাঝে ভদ্রলোক চিন্তায় পড়ে যান তিনি কি নিজের বাসায় ঢুকেছেন নাকি ভুলে অন্য কারোর! অবশেষে তুহির আম্মুর সেই বিখ্যাত হাসি দেখে মনে পড়ে এটাই তার স্ত্রী। কারণ তার স্ত্রীর দুদাঁতের মাঝে বিরাট একটা শুণ্যস্থান আছে!

আগে তুহির সাথে তার আম্মু লুডুর কোর্ট নিয়ে লুডু খেলতেন। এখন মোবাইলে লুডু খেলেন। আগে তুহির স্যারকে বেতন হাতে তুলে দিতেন। এখন বিকাশ করে দেন। একবার ভুল নম্বরে পাঠিয়ে দিলেন স্যারের বেতন। সেই বেতন পুনরায় পেতে স্যারকে বেশ নাকানিচুবানি খেতে হলো। এরপর সেই স্যার আর পড়াতে আসেননি।

তুহি যখন পড়তে বসে তখন তুহির আম্মু ওঘর থেকে মেসেজ দেন, “মোবাইল না ধরে মনযোগ দিয়ে পড়।” তুহিকে তখন পড়া রেখে উলটো মোবাইল ধরতে হয় মেসেজ চেক করার জন্য। তুহির আগামীকাল পরীক্ষা, রিপ্লাই দেয়, “আম্মু ঘরে এসে উপপাদ্যটা বুঝিয়ে দাও না?” তার আম্মু তখন ইমোতে ভিডিও কল দেন। এখন মোবাইলের যুগ, ঘরে ঘরে হাত ধরে পড়া বুঝানোর সময় আছে? তুহির আম্মু ওপাশের ঘরে বসে ভিডিও কলে তুহিকে উপপাদ্য বুঝিয়ে দেন।

তুহির রেজাল্ট দিল। গণিতে সে ‘মাত্র’ নয় এর জন্য ফেইল করেছে। তুহির ক্লাস ম্যাম কল করলেন তুহির আম্মুকে। তুহির আম্মু হেসে বললেন, “ম্যাম এখন কি আর ফোন কলে কথা বলার যুগ আছে? আসুন ইমোতে ভিডিও কলে কথা বলি।”
তুহির ক্লাস ম্যাম তাকে ভিডিও কলে জানালেন তুহির দুর্দান্ত রেজাল্টের কথা। সবটা শুনে তুহির আম্মু গোমড়া মুখে বললেন, “আচ্ছা তুহি স্কুল থেকে আসলে ওর সাথে কথা বলবো।”

তুহি স্কুল শেষে ভয়ে ভয়ে বাসায় ফিরে। রেজাল্টের ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই তার মা জেনে গেছে এটা নিশ্চিত! কিন্তু বাসার পরিবেশ এতো থমথমে কেন? তবে কি এটা ঝড়ের পূর্বাভাস? তুহি সারাদিন তার আম্মুর পিছুপিছু ঘুরে। চুপচাপ সব কাজ ঠিকমতো করে। তাও তার আম্মু নীরব! সে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, “আম্মু রেজাল্ট দিয়েছে। তুমি কিছু জানো না?”
– জানবো না কেন? সবই জানি।
– কিছু বললে না যে?
– কে বলেছে কিছু বলিনি? তোর হোয়াটস অ্যাপের মেসেজ চেক কর।

তুহি হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ অন করলো। তার আম্মু বিশাল মেসেজ পাঠিয়েছে, “এতো ভালো করে পড়ালাম তাও ফেইল করলি? নীলার আম্মু স্ট্যাটাস দিয়েছে নীলা পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে। আর তুই? নীলার পরীক্ষার খাতা ধুয়ে পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে খা। ব্লা ব্লা ব্লা।” তুহি মেসেজ পড়ে রিল্যাক্স হলো। যাক! অন্তত মেসেজে হলেও তার আম্মু তাকে শাসন করেছে।

তৎক্ষণাৎ তার মনে চিন্তার ঢেউ খেলে গেল৷ সাথে সাথে ফেসবুকে লগ ইন করল। যে ভয় ছিল তা সত্যি হয়ে গেছে। তার আম্মু পাবলিক স্ট্যাটাস দিয়েছে, “আমার মেয়ে তুহি ফেল করেছে গাইজ। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন গাইজ।” সাথে তুহির মিষ্টি চেহারার ছবি।

নাহ! তুহির আর কিছুতেই মুখ দেখানোর উপায় রইলো না!

গল্পের বিষয়:
হাস্যরস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত