বাচ্চা কাচ্চা

বাচ্চা কাচ্চা

সকাল সকাল কষ্ট করে আব্বুর ঘর গুছালাম, ঝাড়ু দিলাম, জামা ভাঁজ করে আলনায় সাজালাম। তারপর নিজের রুমে এসে ফ্যান ছেড়ে একটু আরাম করে বসলাম।

কিছুক্ষণ পর আমার ছোট্ট ভাতিজি সামিয়া এসে বলতেছে, “ফুপ্পি দেখে যাও, আমি কী করছি!” ওর চোখে মুখে আনন্দের ছটা! যেন মুসা ইব্রাহীমের সাথে সে এভারেস্ট জয় করে এসেছে। সামিয়া আমার আঙুল টেনে আব্বুর ঘরে নিয়ে এলো। দৃশ্য দেখে আমার চোখ ছানাবড়া! বিছানার চাদর উলটে আছে, বালিশ এলোমেলো, আলনার কাপড় সব বিছানায় ছড়ানো, মেঝেভর্তি কুচি কুচি কাগজ!

সামিয়া উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “দেখো ফু্প্পি আমি এগুলো গুছাইছি!” আমার কষ্টে চোখ দিয়ে পানি এসে পড়ল। “ওরে আমি যে দুই ঘন্টা ধরে গুছাইলাম তা কি যথেষ্ট ছিল না?”

দুনিয়ার যাবতীয় প্রশ্ন তার আমার কাছেই থাকে। সেদিন জিজ্ঞেস করতেছে, “ফুপ্পি আজকে কয়টা তারিখ?”
– কয়টা না, বলতে হয় কত তারিখ?
– আজকে কত তারিখ?
– আজকে ১ তারিখ।
– কিন্তু কালকে তো ৩১ তারিখ ছিল। ৩১ এর পর তো ৩২, তাহলে আজকে ১ তারিখ কেন?
আমি তার কঠিন প্রশ্নের জবাব দিতে ব্যর্থ হলাম!

সন্ধ্যায় স্যার এসে আমাকে প্রাইভেট পড়িয়ে যান। আম্মু এসময় স্যারকে কিছু নাশতা খেতে দেন। স্যার ভদ্রতা করে অর্ধেকটা খাবার পিরিচে রাখেন, অর্ধেকটা পেটে চালান করেন। সামিয়ার এখানেও প্রশ্ন, “আম্মু তো বলে খাবার নষ্ট করতে না, তাহলে স্যার অর্ধেক রেখে দেয় কেন?”

– কারণ এটা ভদ্রতা। সবটুকু খেলে লোকে পেটুক বলবে। তাই ভদ্রতা করে একটু রেখে দিতে হয়।

পরদিন স্যারকে যখন নাশতা দেওয়া হলো, পিরিচে কিছুই বাকি থাকলো না! স্যার সবটুকু পেটে চালান করলেন। সামিয়া অবাক হয়ে বলল, “স্যার ভদ্রতাটুকুও খেয়ে ফেলেছে!”

মাঝে মাঝে সামিয়াকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়ে। বাচ্চাদের পড়ানোর ক্ষেত্রে আমি খুবই অপটু! পরীক্ষার আগে ওকে পড়ানোর ডাক পড়ল আমার। বই খুলে দেখি পানি দূষণের কুফল সম্পর্কে সেই বিরক্তিকর ক্যাঁচক্যাঁচানি। বাচ্চাদের পড়া থাকবে সহজ সরল। এতো জটিল কথা তারা বুঝে?

বই বন্ধ করে ওকে নিজের মতো করে বুঝাতে লাগলাম, “শোন সামিয়া। পিপাসা লাগলে তুমি কী খাও? পানি খাও। এই পানি কোথায় থাকে? নদীতে থাকে। নদীতে কী থাকে বলো তো? নদীতে থাকে মৎসকন্যা। নদীর পানি নষ্ট করলে কী হবে? মৎসকন্যা মরে যাবে। মৎসকন্যা মরে গেলে কী হবে? রাজপুত্রের সাথে বিয়ে হবে না। তাই আমাদের কী করতে হবে? নদীর পানি পরিষ্কার রাখতে হবে। বুঝছ?” সামিয়া চোখ বড় বড় করে আমার ভাষণ শুনে মাথা ঝাঁকালো। সে বুঝতে পেরেছে।

আজ সামিয়ার ক্লাস টেস্টের খাতা দিয়েছে। সে পেয়েছে দশে দুই। কারণ সে শুন্যস্থান পূরণ করেছে, “পানি দূষণ বন্ধ করুন, মৎসকন্যা ও রাজপুত্রের বিয়ে দিন।” তাও মৎসকন্যা বানান ভুল!

বোধ হয়, এরপর থেকে আর কখনোই সামিয়াকে পড়ানোর দায়িত্ব আমার কাঁধে পড়বে না!

গল্পের বিষয়:
হাস্যরস

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত