বউয়ের নতুন রেসিপি

বউয়ের নতুন রেসিপি

সকাল থেকে অনবরতভাবে আমার পিছন দিয়ে মূষলধারে বৃষ্টি নামছে।
এই পর্যন্ত সাত সাত বার বাথরুমে গিয়েছি।
কিন্তু পেটের বেগটা যেন কোনোমতেই কমছে না।
বউ আমার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে মুখটাকে কাঁচুমাচু করে বললো।
-ওগো তোমার কি পেটে খুব সমস্যা করছে।
বউয়ের দিকে না তাকিয়ে বললাম।
-দাঁড়াও আরেকবার বাথরুমের সাথে মুলাকাতটা সেরে আসছি।

ভোর রাতে যা পেটে ঠুসে ছিলাম এই কইবার বাথরুমে যাওয়াতে সবগুলো পানির মত হড়হড় করে নেমে গেছে।
শরিরটা একদম বাতাসে নুইয়ে পড়ার মত অবস্থা।
ভয়ে আছি,দেশের আবহাওয়া বিদরা যেভাবে রোজ রোজ খারাপ আভাষ ছড়াচ্ছে।
এখন যদি ফণির বদলে বিলকিস বা অন্যকিছু আসে তাইলে তো সবার আগে আমাকে ধরবে।
আটবারের বেলাতে বাথরুম থেকে বার হয়ে আর হাঁটার শক্তি না পেয়ে চিল্লায়ে বউকে ডাক দিলাম।
-ঐ আমাকে এসে ধরো,নইতো এখানেই পড়ে গিয়ে পটল তুলবো।

বউ তাড়াতাড়ি করে এসে জড়িয়ে ধরে কোনরকমে সোফাতে নিয়ে গিয়ে বসালো।

বউয়ের উপরে রাগে শরিরটা আমার পিলপিল করছে।
তাকিয়ে দেখলাম,অপরাধির মত মুখটাকে নিচু করে চুপচাপ বসে আছে।
বেচারির-ই বা কি দোষ,সে তো আমাকে নতুন কিছু একটা খাওয়াতে চেয়ে সারপ্রাইজ করাতে চেয়েছিলো।
কিন্তু সারপ্রাইজডটা যে এতোটা ভয়ংকর হবে আগে জানলে মুখে দেওয়া তো দুরের কথা হাতটা পর্যন্ত লাগাতাম না।

চলুন তাহলে একটু ফ্লাসব্যাক থেকে ঘুরে আসা যাক….
গতকাল দুপুরের নামাজ পড়ে এসে রুমে ঢুকতেই দেখলাম বউ আমার খুব মনোযোগ সহকারে তার ফোনে কিছু একটা দেখছে।
আমি বেশ হাসিমুখে তার পাশে গিয়ে বললাম।
-রোজা মুখে এসব কি দেখছো কানে হেডফোন লাগিয়ে?
বউ আমার কথা শুনে তো মারিমারি অবস্থা,শুধু রোজার কারণে ছেড়ে দিলো।
তারপর ভ্রু-কুচকে বললো।
-সবাইকে নিজের মত ভাবো কেন?কানে হেডফোন লাগানো মানেই কি অন্যকিছু দেখা নাকি?
আমি কেকা ফেরদৌসির রান্নার রেসিপি গুলো দেখছি।
উনি তো নুডুলস দিয়ে খুব সুন্দর সুন্দর খাবার বানায়।
ভাবছি আমিও আজকে নুডুলস দিয়ে কিছু একটা বানিয়ে ইফতারের সময় তোমাকে খাওয়াবো।

মানুষের মুখে শুনেছি কেকা ফেরদৌসি নাকি খুবই ফেমাস একজন রাধূনী।
তবে তার খাবার গুলো একটু অন্যটাইপের।যা সবার পেটে সহ্য হয় না।
কিন্তু বউটা কষ্ট পাবে ভেবে আর কিছু না বলে মুখটাকে হাসি হাসি করে বললাম।
-আচ্ছা বানিও।

বউ-ও আমার কথা শুনে বেশ খুশিতে গদগদ হয়ে আবারো খাবার বানানোর দিকে মনোযোগ দিলো।
বিকেল গড়িয়ে ইফতারির সময় হয়ে আসলে,বউকে এসে বললাম।
-কি গো সময় তো আর বেশি নেই খাবার টাবার কি রেডি হলো নাকি?

বউ একটু খিটখিটে গলাতে রান্নাঘর থেকে বললো”,হ্যাঁ আমার একার দশটা হাত যে সব হয়ে গেছে।আপনি ওখানে সুয়ে পড়েন আমি খাবার নিয়ে গিয়ে আপনার মুখে তুলে দিচ্ছি।

বউয়ের কথাতে রাগ না করে একটু সদাই হওয়ার চেষ্টা করলাম।
সত্যিই তো রোজা থেকে একাহাতে আর কতকিছু করবে,তারউপরে আবার আজকে একটা নতুন আইটেমও নাকি যোগ হয়ছে।
তাই আমি বসে না থেকে রান্নাঘরে গিয়ে বউকে একটু হেল্প করার কাজে লেগে গেলাম।

খাবার প্রায় সবই বানানো শেষ,এখন শুধু টেবিলে নিয়ে গিয়ে পরিবেশন করাতে পারলেই হবে।
আমি টুকটুক করে একেকটা খাবারের প্লেট নিয়ে টেবিলের উপর রাখলাম।
বউকে কিছুটা সাহায্য করাতে বউ দেখলাম বেশ খুশিই হয়ছে।

সবশেষে দু’জনে খাবার টেবিলে বসে পড়লাম।
বউ আমার খাবার প্লেটে এক এক করে সবকিছু তুলে দিয়ে সুন্দরমত সাঁজিয়ে দিলো।
কিন্তু একটা জিনিস বড্ড অচেনা লাগছে।
কোনোরকম দ্বিধা না করে বউকে জিজ্ঞাসা করলাম।
-এইটা আবার কি বানিয়েছো নতুন লাগছে।
-আরে এইটার কথায় তো তোমাকে তখন বলছিলাম।কেকা আপার নুডুলসের আচার।খেয়ে বলবা কিন্তু কেমন হয়ছে?

নুডুলসের আবার আচারও হয়।দেখতেই কেমন জানি লাগছে,তো খেতে কেমন লাগবে উপরওয়ালা ভালো জানেন।
তবুও বউ কষ্ট করে রোজা মুখে তৈরি করছে এখন যদি না খাই,তাহলে তো আবার তাকে কষ্ট দিয়ে ফেলবো।
তাই কিছু না বলে আযান দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পর মসজিদ থেকে আযানের শব্দ ভেসে আসলেই ইফতারি শুরু করে দিলাম।
একে একে সব খাওয়ার পর অবশেষে বউয়ের বানানো নতুন খাবার নুডুলসের আচারটা মুখে দিতেই গিয়ে শরিরটা কেমন জানি করে উঠলো।
-এই আচারটা না হয় নামাজ পড়ে এসে খাবো।নামাজের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
.
ইফতারির থালা রেখে মসজিদে দৌড় দিলাম।এবারের যাত্রাতে তো কোনোরকমে রেহায় পেয়ে গেলাম,কিন্তু বাসায় ফিরলে তো ঠিকি বউ তার নতুন খাবার নুডুলসের আচার খাওয়ানোর জন্য জোর করবে।

ভয়ে ভয়ে বাসায় ফিরে রুমে ঢুকে পড়লাম।
কিন্তু একটু পর বউ আবার ডাকাডাকি শুরু করে দিলো।
-কি হইছে?
-কি হইছে মানে,আমি এতো কষ্ট করে একটা নতুন খাবার বানালাম।
আর তুমি সেইটাকে পাত্তায় দিচ্ছো না।আসলেই তুমি আমাকে ভালোবাসো না।

কথাগুলো বলে বউ আমার ভ্যা করে কান্না শুরু করে দিলো।
মেয়ে মানুষের এই একটা বড় সমস্যা,কিছু হতে না হতেই ফ্যান ফেলা শুরু করে দিবে।
চোখের কোণে যেন পানি সবসময় রেডিই থাকে।
কি আর করার বউয়ের কান্না থামাতে আবার টেবিলে গিয়ে বসলাম।
-দাও দেখি তোমার নতুন খাবার।

বউ আমার কথা শুনে হাসি হাসি মুুখ করে নুডুলসের পুরো বাটিটা আমার সামনে দিয়ে দিলো।
-এই নাও পুরোটা খেতে হবে কিন্তু।
.
বউয়ের অনুরোধ রাখতে গিয়ে একচামচ মুখে দিয়ে দেখলাম।
স্বাদটা একবারে মন্দ হয় নি।
তবে দেখতে কেমন জানি লাগছে।
তবুও বউ রান্না করেছে বলে কথা,ফেলে দেয় কি করে।
পুরো বাটিটা সাবাড় করে দিলাম।
-কেমন হয়ছে গো আমার নতুন রান্না?

বউকে খুশি করার জন্য একটুু বাড়িয়ে বললাম।
-একদম ফাষ্টক্লাস হয়ছে।

আমার কথা শুনে বউ খুশিতে গদমদ হয়ে আমার গাল টেনে ধরে বললো।
-উলেবাবা,আর তুমি তো খেতেই চায়ছিলে না।এখন থেকে রোজ বানাবো কেমন?
-আচ্ছা বানিয়ো।

রাতের বেলাতে বউয়ের তৈরি নুডুলসের আচার কোনো প্রতিক্রিয়া না করলেও ভোরে সেহরি খেয়ে ঘুমানোর পর ঠিকি শুরু করে দিলো।
পেটের ভিতরে এমনভাবে ডাকা ডাকি শুরু করলো।
প্রথমে তো ভেবেছিলাম হয়তো মেঘ লেগেছে বাইরে।
পরে ঘুম ভেঙ্গে দেখি মেঘ আমার পেটে লেগেছে,আর বৃষ্টি নামার জন্য অধির আগ্রহে আমাকে বাথরুমে যেতে বলছে।
আর তখন থেকেই আমার বাথরুমে দৌড়ানো শুরু।
না জানি সারাদিনে আর কতবার মেঘের ডাকে সাড়া দিয়ে বাথরুমে যেতে হবে।

বউয়ের নুডুলসের আচার খেয়ে আজকের রোজাটা আর রাখা হলো না।
কিন্তু যাই খাচ্ছি সবকিছুই পিছন দিয়ে হড়হড় করে পানির মত নেমে যাচ্ছে।

মুখটাকে বিষাদময় করে বললাম।
তোমার কেকা আপার কি আর কোনো নতুন রেসিপি বানায় নি,বানালে আজকেও একটু বানিয়ো।
খেয়ে দেখতাম।
বউ আমার কথা শুনে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো।
-হ্যা,আজকে তো ভাবছিলাম রজনীগন্ধ্যার ফুল দিয়ে আলুর নুডুলস বানাবো।

বউয়ের কথা শুনে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললাম।
আল্লাহ তোমার কাছে বিচার দিলাম,হয় কেকারে সুবুদ্ধি দাও,নইতো আমার তুইল্লা নাও।
নয়তো এখন রোজ রোজ কেকার রেসিপি দেখে দেখে বউ আমাকে অখাদ্য কুখাদ্য খাওয়াবে।
আর তারপর বদ হজম হয়ে মেঘের গর্জন তুলে বাথরুমে গিয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরাতে হবে আমাকে।

গল্পের বিষয়:
হাস্যরস

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত